গুজরাটের ভাবনগর জেলার গোরখি গ্রাম। এক দরিদ্র কৃষক পরিবারের উঠোন। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে অদ্ভুত দর্শন একদল লোক। তারা এসেছে একটি সার্কাস দল থেকে। তাদের লোলুপ দৃষ্টি পরিবারের ১০ বছরের ছোট ছেলেটির দিকে। ছেলেটির নাম গণেশ বরইয়া। জন্ম থেকেই সে ‘ডোয়ার্ফিজম’ বা বামনত্বের শিকার। তার উচ্চতা মাত্র ৩ ফুট।
সার্কাসের লোকেরা গণেশের বাবার সামনে ৫ লাখ টাকার নোটের বান্ডিল ছুড়ে দিল। তারা বলল, “আপনার এই ছেলের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। ও কোনো কাজ করতে পারবে না। আমাদের কাছে বিক্রি করে দিন, জোকার হিসেবে ওকে আমরা কাজে লাগাব।” ৫ লাখ টাকা এক দরিদ্র কৃষকের জন্য অনেক কিছু। কিন্তু গণেশের বাবা টাকার দিকে তাকাননি। তিনি ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে গর্জন করে উঠলেন— “আমার ছেলে পণ্য নয়। ও সার্কাসের জোকার হবে না, ও মানুষের মতো মানুষ হবে।”
সেই দিনই ঠিক হয়ে গিয়েছিল গণেশের ভাগ্য। বাবার সেই জেদ ছেলের শিরায় শিরায় ছড়িয়ে পড়ল। কিন্তু পথটা ছিল কণ্টকাকীর্ণ। স্কুলে সবাই তাকে নিয়ে হাসাহাসি করত, কিন্তু গণেশ পড়াশোনায় ছিলেন তুখোড়। ২০১৮ সালে তিনি ডাক্তারি পড়ার প্রবেশিকা পরীক্ষায় (NEET) ভালো নম্বর পেয়ে পাস করলেন।
কিন্তু আসল ভিলেন হয়ে দাঁড়াল ‘মেডিক্যাল কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া’ (MCI)। তারা সাফ জানিয়ে দিল— “৩ ফুট উচ্চতা এবং ৭২ শতাংশ শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে তুমি ডাক্তার হতে পারবে না। জরুরি পরিস্থিতিতে তুমি রোগীর নাগাল পাবে না।”
গণেশের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হওয়ার উপক্রম। কিন্তু তিনি হাল ছাড়ার পাত্র নন। তার স্কুলের অধ্যক্ষ ডা. দলপৎ কাটারিয়া এবং তার আইনজীবী তাকে সাহস দিলেন। শুরু হলো এক অসম আইনি লড়াই। গুজরাট হাইকোর্ট তাকে ফিরিয়ে দিল। মামলা গড়ালো ভারতের সুপ্রিম কোর্টে।
দীর্ঘ এক বছর পর, ২০১৮ সালে ভারতের সর্বোচ্চ আদালত রায় দিল— শারীরিক উচ্চতা মেধার মাপকাঠি হতে পারে না। গণেশ জিতলেন। তিনি এমবিবিএস-এ ভর্তি হলেন।
কিন্তু যুদ্ধ শেষ হলো না। মেডিক্যাল কলেজে ক্লাসের বেঞ্চে বসতে তার কষ্ট হতো, প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসে টেবিলের নাগাল পেতেন না। সহপাঠীরা তাকে কোলে তুলে টেবিলে বসাত। পরীক্ষার খাতায় তার ছোট আঙুল দিয়ে দ্রুত লিখতে পারতেন না। প্রথম বর্ষে তিনি ফেল করলেন। কিন্তু এবারও তিনি লড়লেন। বিশেষ অনুমতি নিয়ে রাইটার (Writer) এবং অতিরিক্ত সময় আদায় করলেন। এরপর আর তাকে পেছনে তাকাতে হয়নি।
আজ ২০২৫ সাল। ভাবনগরের স্যার টি জেনারেল হাসপাতালের করিডোর দিয়ে গটগট করে হেঁটে যান সাদা অ্যাপ্রন পরা এক ডাক্তার। তার উচ্চতা মাত্র ৩ ফুট, গলার স্টেথোস্কোপটা প্রায় মাটিতে ঠেকে যায়। রোগীরা প্রথমে তাকে দেখে চমকে যায়, কেউ কেউ বিশ্বাসই করতে চায় না ইনি ডাক্তার। কিন্তু যখন তিনি নিখুঁতভাবে রোগ নির্ণয় করেন, তখন সবাই শ্রদ্ধায় মাথা নত করে।
তিনি গণেশ বরইয়া। ২৫ বছর বয়সী এমবিবিএস ডাক্তার। তিনি জানেন তার সীমাবদ্ধতা, তাই তিনি জটিল সার্জারি করেন না। কিন্তু তিনি প্রমাণ করেছেন, ইচ্ছাশক্তি থাকলে মানুষকে মাপা হয় উচ্চতা দিয়ে নয়, কাজ দিয়ে।
যাকে একদিন সমাজ ৫ লাখ টাকায় কিনতে চেয়েছিল, আজ তার মূল্য কোটি টাকারও বেশি। কারণ তিনি আজ শুধু ডাক্তার নন, তিনি হাজারো মানুষের বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা।
স্যালুট ডা. গণেশ বরইয়া।










