প্রিয় সাথী,
এক ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে আমাদের রাজ্য চলেছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প ও কর্মসংস্থানসহ সব ক’টি ক্ষেত্রে চরম নৈরাজ্য। নজিরবিহীন দুর্নীতি আর লুটের করাল গ্রাসে রাজ্যের জনগণ। দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে প্রায় ২৫ হাজার শিক্ষক, শিক্ষা কর্মীর চাকরি বাতিল। প্রতিদিন রাজ্যের কোন না কোন প্রান্তে নারীরা ধর্ষিতা, তারপর হত্যা। বিভিন্ন ক্ষেত্রে আদালতের রায় বা প্রায় সর্বক্ষেত্রে অভিযোগের তীর শাসক রাজনৈতিক দলের কর্মীদের দিকে। শাসক, দুর্নীতি, দুষ্কৃতী নেক্সাস দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। অপরাধীদের অভয়ারণ্য এখন তৃণমূল শাসিত পশ্চিমবঙ্গ।
২০১২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারী পার্ক স্ট্রীটের রাস্তায় রাতের অন্ধকারে গাড়ির মধ্যেই ধর্ষিতা হন সুজেট জর্ডান নামে এক তরুণী। নির্যাতিতার অভিযোগ প্রথমে পুলিশ নিতে চায়নি। ১৬ ফেব্রুয়ারী মহাকরণে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী এটাকে ‘সাজানো ঘটনা’ বলে আখ্যায়িত করেন। ‘সাজানো ঘটনা’র তত্ত্ব খারিজ করে তদানীন্তন গোয়েন্দা প্রধান দময়ন্তী সেন ১৮ ফেব্রুয়ারী, ২০১২ জানিয়ে দেন সুজেট জর্ডান গণধর্ষণের শিকার। তিন অভিযুক্তকে ধরা হয়। তারপরেই ৪ এপ্রিল, ২০১২ দময়ন্তী সেনকে যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম)পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। আরো বিস্ময়কর যে সরকারী আইনজীবী ১১ ডিসেম্বর, ২০১৫ আদালতে অভিযুক্ত তিনজনের সর্বোচ্চ শাস্তি যাতে না হয় তার আবেদন করেন।
২০১২ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারী,আমোদপুর – কাটোয়া ট্রেন থেকে নামিয়ে মেয়ের মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে এক বিধবা মহিলাকে ধর্ষণ করে কয়েকজন দুষ্কৃতী। অভিযোগকারিনী ও তার মেয়ে তিনজনকে চিনিয়েও দেন। মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন “সরকারকে অপদস্ত করার জন্য ধর্ষণের মিথ্যা অভিযোগ করা হয়েছে”। ফলে, ২৭ নভেম্বর,২০১৫ প্রমাণের অভাবে সব অভিযুক্তরা বেকসুর ছাড়া পেয়ে যায়।
২০১২ সালের ৫ জুলাই গোবরডাঙ্গা স্টেশনে তরুণ শিক্ষক বরুণ বিশ্বাসকে খুন করে শাসকদলের ঘনিষ্ঠ দুষ্কৃতীরা। তিনি গাইঘাটার সুটিয়ায় মহিলাদের উপর অত্যাচারের প্রতিবাদে ও দুষ্কৃতীদের শাস্তির দাবিতে সোচ্চার হয়েছিলেন। ২০১২ সালের ৮ মার্চ, উত্তর ২৪ পরগনার বিশরপাড়ায় দোলের দিন রং মাখানোর অজুহাতে ‘ভাগ্নীর শ্লীলতাহানি’ করা হচ্ছে দেখে চুপ থাকতে পারেননি পুলিশ কনস্টেবল অসীম কুমার দাম। রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। তাকে হকি স্টিক দিয়ে পিটিয়ে,ধারালো অস্ত্রে কুপিয়ে বাড়ির সামনে ফেলে রাখা হয়। ১১ ই মার্চ,২০১২ হাসপাতালে অসীম দামের মৃত্যু হয়। তারপর কামদুনি,কাটোয়া, কাকদ্বীপ, সাত্তোর, ধুপগুড়ি থেকে আর জি কর হয়ে বালিগঞ্জ ল’ কলেজ — নারী নির্যাতন, ধর্ষণের ধারাবাহিক মিছিল। রাজ্যের প্রথম মহিলা মুখ্যমন্ত্রী নারী নির্যাতনের এমন সব কলঙ্কজনক ঘটনা নিয়ে দুঃখপ্রকাশ দূরের কথা, মহিলাদের চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা থেকে ‘ছোট্ট ঘটনা’, ‘সাজানো ঘটনা’ ইত্যাদি বলে দুষ্কৃতীদের আড়াল করেছেন। উদ্দেশ্য স্পষ্ট, দুষ্কৃতীদের উৎসাহিত করে ধারাবাহিক ক্ষমতায় থাকা আর সেই সূত্রে দুর্নীতি আর লুটের রাজত্ব কায়েম করা। আর এক্ষেত্রে নারী শরীর, তাকে ব্যবহার করতেও কুন্ঠিত বোধ করেনি শাসক।
তবু, সব কিছুকে হার মানিয়েছে ২০২৪ সালের ৯ আগস্ট আর জি কর হাসপাতালে তরুণী পিজিটির গণধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে কর্মরত চিকিৎসকের প্রতি এই মর্মান্তিক ঘটনায় রাজ্য, দেশ এবং দুনিয়া শিউরে ওঠে। এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক হত্যা। এই হত্যায় রাষ্ট্র, তার ব্যবস্থা সরাসরি জড়িত। ১৪আগষ্ট, ২০২৪ ‘মেয়েদের রাত দখল’ ইতিহাস তৈরী করে। সারা পৃথিবীর বড় বড় দেশের প্রায় ১০০ টি স্থানে বিক্ষোভ সংঘটিত হয়। দেশে-বিদেশে জনগর্জন লাগাতার রাত দখল এবং রাস্তায় প্রতিবাদী জনতার প্লাবনকে ১৯০৫ এর বঙ্গভঙ্গ প্রতিরোধে রবি ঠাকুরের ‘রাখি বন্ধন’ বা ‘৪২ এর ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের সঙ্গেই তুলনা করা যেতে পারে। কলকাতা উচ্চ আদালতের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে এই মামলার তদন্তভার গিয়ে পড়ে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিবিআই এর উপর। কিন্তু ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয় সিবিআই রাজ্য পুলিশের তদন্তের যে ফলাফল তার ওপর নির্ভর করে এগোচ্ছেন। ফলে ক্রমশ প্রহসনে পরিণত হতে থাকে এই তদন্ত প্রক্রিয়া। এখনও বিষয়টি কলকাতা উচ্চ আদালতের বিচারাধীন। সিবিআই এর ভূমিকায় হতাশ অভয়া’র পরিবার সহ বাংলার মানুষ, দুনিয়ার প্রতিবাদী মানুষ। প্রতিবাদী মানুষের মধ্যে বিশ্বাস জন্ম নিয়েছে কেন্দ্র ও রাজ্যের অবস্থানকারী শাসকের মধ্যে ‘সেটিং তত্ব’।
২০২৪ সালের ১৫ অক্টোবর সরকারী বিসর্জন কার্নিভালের দিন আমাদের দ্রোহের কার্নিভাল সংঘটিত হয়। উচ্চ আদালতে মামলা করে অনুমতি পেতে হয়। ৮০ টিরও বেশী সংগঠন দ্রোহের কার্নিভালে যুক্ত হন। তারপর এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে ২৮ অক্টোবর, ২০২৪ অ্যাকাডেমী অফ ফাইন্ আর্টসের সভাগৃহ থেকে অভয়া মঞ্চ গঠিত হয়। সেই সভা থেকেই অভয়া মঞ্চের মূল তিনটি সাধারণ লক্ষ্য ঘোষিত হয়।প্রথম, অভয়ার ন্যায় বিচার ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা। ভবিষ্যতে আর যেন অভয়া না হয়, এমন একটা পরিবেশ সৃষ্টি করা। দ্বিতীয় লক্ষ্য, নারী ও প্রান্তিক লিঙ্গ যৌনতার মানুষের স্বাধীনতা, অধিকার এবং সুরক্ষা। তৃতীয় লক্ষ্য রাজ্যটাকে ভয়ের রাজনীতি মুক্ত করা। এই তিন লক্ষ্যকে সামনে রেখে, সঙ্গে সাম্প্রদায়িক ও ফ্যাসিবাদী প্রবণতা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে দুর্নীতিমুক্ত করে তোলার লক্ষ্যকে যুক্ত করে অভয়া মঞ্চ এগিয়ে চলেছে। রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় অভয়া মঞ্চের শাখা গড়ে উঠেছে। প্রাথমিক স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। এখন ধারাবাহিক সংগঠিত শক্তির আন্দোলন নতুন করে স্বতঃস্ফূর্ততার জন্ম দেবে। আর সেই লক্ষ্যেই আগামী ৯আগস্ট অভয়া হত্যার বর্ষপূর্তিতে অভয়া মঞ্চের আহ্বানে প্রধান কর্মসূচি ‘কালীঘাট চলো’। রাখি পূর্ণিমা’র দিন রাজ্য সরকার ছুটি ঘোষণা করায় সরকারের সদর দপ্তর ‘নবান্ন’ বন্ধ। তাই মুখ্যমন্ত্রীর নিজস্ব অফিসের উদ্দেশ্যে বিচারের দাবিতে স্মারকলিপি জমা দিতে জনগণের এই যাত্রা। কলকাতা লাগোয়া জেলাগুলো থেকে অগণিত মানুষ আসবেন হাজরা মোড়ে, বিকেল চারটেয়। সকালে সারাদিন ধরে গ্রামে শহরে অভয়া স্মরণে ‘রাখী বন্ধন’। জেলায় জেলায় কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। ১৪ আগষ্ট আবার ‘রাত দখল’। রাত ৯টা থেকে রাত ১২ টা পর্যন্ত আমাদের মেয়ের প্রকৃত বিচারের দাবিতে কল্লোলিত হবে নগর, গ্রাম প্রান্তর। রাত ১২ টার পর জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে কর্মসূচির সমাপ্তি।এই গণকনভেনশন ৯ আগষ্ট,’ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনকে স্মরণ করে প্রস্তাব ও দাবি উত্থাপন করছে –
১) ধর্ষক, দুষ্কৃতী ও খুনী দের মদতদাতা শাসক বাংলা ছাড়ো।
২) ‘সেটিং তত্ব’ বাতিল করে সিবিআই অবিলম্বে ন্যায্য বিচার করো। অভয়া’র মূল হত্যাকারীদের অবিলম্বে উপযুক্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। মুখ্যমন্ত্রীর কথার ভিত্তিতে মুখ্যমন্ত্রী ও তৎকালীন কলকাতা পুলিশ কমিশনারকে সি বি আই এর তদন্তের আওতায় আনতে হবে।
৩) অবিলম্বে রাজ্যজুড়ে ভয়মুক্ত রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশ সুনিশ্চিত করতে হবে।
৪) দুর্নীতিবাজ ও লুটেরাদের বাইরে নয়, জেলে রাখতে হবে।
কবিগুরুর কথা দিয়ে এই প্রস্তাবনা শেষ করতে চাই —-
” …… মহাকাল সিংহাসনে —-
সমাসীন বিচারক,শক্তি দাও, শক্তি দাও মোরে,
কন্ঠে মোর আনো বজ্রবাণী, শিশুঘাতি, নারীঘাতি
কুৎসিত বীভৎসা ‘পরে ধিক্কার হানিতে পারি যেন
নিত্যকাল রবে যা স্পন্দিত লজ্জাতুর ঐতিহ্যের
হৃৎস্পন্দনে, রুদ্ধ কন্ঠ ভয়ার্ত এ শৃঙ্খলিত যুগ যবে
নিঃশব্দে প্রচ্ছন্ন হবে আপন চিতার ভস্মতলে।”
২৫ জুলাই,২০২৫










