
সক্কাল বেলা। পাকঘরে পাক খাচ্ছি দেখে গিন্নির মেজাজ নিমেষেই তিরিক্ষি হয়ে ওঠে – “আর জায়গা পাওনা? শেষে এখানে এসে লুকিয়েছো? তোমার জ্বালায় তো দেখছি হেঁসেলেও হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে! যাও এখান থেকে। ঘরে গিয়ে বসো, আমি চা বানিয়ে নিয়ে আসছি। রিটায়ার করার পর দেখছি বাওলা হয়ে গেছো । যত্তসব !”
রান্না ঘরের পরিবেশ এমন তেঁতে উঠতে দেখে ওখান থেকে গুটিসুটি পায়ে সরে আসি। কিন্তু ভাবনাটার ভার মাথায় চেপে বসে । খুব সম্প্রতি একদল মার্কিন গবেষকের গবেষণায় একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে, যা আমাদের কাছে রীতিমতো ভয়ঙ্কর। টেফলন প্রলেপ দেওয়া বাসনপত্র ব্যবহারের বিপদ নিয়ে লিখতে গিয়ে দেখেছি যে অনেকেই আধুনিক বাসনপত্র বদলে সাবেকি ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, কিন্তু এখন যদি বলি আমাদের রান্নাঘরের গ্যাস স্টোভকে বদলে ফেলুন , ঐটি মারাত্মকভাবে স্বাস্থ্য দূষণের কারণ, তাহলে কী করবেন? এই সময়ের নবীন প্রজন্মের গিন্নিরা হেঁসেলে খুব একটা আটকে থাকা পছন্দ করেন না। ভালো কথা, কিন্তু তাতেও রেহাই নেই। আমার বড়ো জ্যেঠিমা বলতেন – “রান্নাঘর হইলো বাড়ির হৃদয়। এইখানে গণ্ডগোল হইলে সংসারের সব কাজেরই তাল কাইটা যায়।” হক কথা। এই গবেষকদের মতে হাল আমলের গ্যাস স্টোভ থেকে এমন কিছু টক্সিক উপাদান প্রতিনিয়ত ঘরোয়া পরিবেশে মিশে যাচ্ছে যা থেকে মারণ রোগ ক্যান্সার হবার আশঙ্কা রয়েছে। এতো রীতিমতো হৃদয় বিদারক ঘটনা। বলে কি গবেষকরা?এমন বহুল জনপ্রিয় উপকরণ থেকে বিপদের শঙ্কা? এতো সব্বোনেশে কাণ্ড।
আসুন, মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে ঘাতক বেনজিন সম্পর্কে দু এক কথা জেনে নিই। বেনজিন হলো পেট্রোলিয়ামের একটি প্রাকৃতিক উপাদান যা পেট্রো রাসায়নিক উপাদানগুলোর মধ্যে অন্যতম। বেনজিনের উপস্থিতির কারণেই পেট্রোলিয়াম থেকে একটা মিষ্টি গন্ধ আমাদের নাকে ধরা পড়ে। বেনজিন একটি উদ্বায়ী জৈব যৌগ এবং অবশ্যই বিষাক্ত পদার্থ। ফলে দৈনন্দিন ভোগ্যপণ্য প্রস্তুতিতে এর ব্যবহার বেশ সীমিত। বিজ্ঞানীদের মতে এইটি একটি কার্সিনোজেন অর্থাৎ এইটি আমাদের শরীরে ক্যান্সার ঘটাতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পক্ষ থেকে বেনজিনকে গ্রুপ -১ শ্রেণির কারসিনোজেন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। মূখ্যত বর্ণহীন এই পদার্থটিকে ফার্মাসিউটিক্যালস এবং রাসায়নিক শিল্পে সলভ্যান্ট বা দ্রাবক হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
গবেষকদের দাবি , যে সকল মানুষ ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পের সাথে যুক্ত তাঁরাই সবথেকে বেশি পরিমাণে বেনজিনের সংস্পর্শে আসেন এবং এর দ্বারা প্রভাবিত হন। যদিও ওদেশে এই বিষয়ে আইন করে ব্যবহার মাত্রাকে নিয়ন্ত্রণ করতে বলা হয়েছে যাতে এর কুপ্রভাবকে সীমিত করা সম্ভব হয়। আপনার যদি ধূমপানের অভ্যাস থাকে তাহলে আপনার জন্য বিশেষ সতর্ক বার্তা রয়েছে। জেনে রাখুন সিগারেট থেকে ৯০% বেনজিন সংক্রমণ ঘটে থাকে। আমাদের নিত্য ব্যবহার্য বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক যেমন গ্লু, এ্যাডেসিভ এবং ক্লিনিং এজেন্টে বেনজিন ব্যবহার করা হয় । ফলে এগুলোর সংস্পর্শ থেকেও আমাদের চিন্তা রয়েছে।
আলোচ্য গবেষণার কাজটি একান্তই একটা মার্কিন প্রয়াস যার মুখ্য উদ্দেশ্য হলো সেই দেশের বিভিন্ন আয়তনের আবাসনে গ্যাস স্টোভ থেকে ছড়িয়ে পড়া মারণ দূষক বেনজিনের প্রকৃত মাত্রা নির্ধারণ করা। এই কাজে তাঁরা National Institute of Standards and Technology’s CONTAM model এর সাহায্য নিয়েছেন ছড়িয়ে পড়া বেনজিন সম্পর্কে জানতে। একই সঙ্গে তাঁরা U.S. EPA ‘র স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি পরিমাপের নির্দিষ্ট উপায়গুলো অনুসরণ করে ক্যান্সার হবার সম্ভাবনা যাচাই করতে চেয়েছিলেন। এই গবেষণা থেকে তাঁরা জেনেছেন যে, যেকোনো উপায়ে বেনজিনের সংস্পর্শে এলে তা লিউকোমিয়া বা রক্ত ক্যান্সার ঘটাতে পারে। তাঁদের মতে –
- রান্নাঘর থেকে বেনজিন বাড়ির অন্যান্য ঘরেও ছড়িয়ে পড়ে। এরফলে ঘরের বাতাস দূষিত হয়।
- শরীরের ওজনের অনুপাতে বেনজিন গ্রহণের মাত্রা বেশি হবার জন্য পূর্ণবয়স্কদের তুলনায় শিশুদের মধ্যে এই রোগে আক্রান্ত হবার আশঙ্কা বেশি।
- ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা বা বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা যথাযথ হলে তা এই ঝুঁকি কমায় বটে , তবে সবটা নয়। উপযুক্ত ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা যথাযথ হওয়া সত্ত্বেও অনেকক্ষেত্রেই বেনজিনের উপস্থিতির পরিমাণ নির্ধারিত সহনসীমার ওপরে পাওয়া গেছে।
- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৬.৩ মিলিয়ন নাগরিক সর্বাধিক উচ্চ বেনজিন নির্গমনের শিকার। গবেষকদের মতে এরফলে প্রতি বছর প্রায় ১৬ – ৬৯ জন মানুষ লিউকোমিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। এই মুহূর্তে ঐ দেশের আক্রান্ত মানুষের পরিসংখ্যান ততটা ভয়াবহ মনে না হলেও, এই সংখ্যাটা বেড়ে যাবার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
গবেষকদের মতে এই প্রথম এ ধরনের গবেষণার কাজে হাত দেওয়া হয়েছে যা দীর্ঘ সময়ের জন্য স্বাস্থ্যের ঝুঁকি বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করতে তাঁদের সাহায্য করবে। এই গবেষণা থেকেই জানা গেছে যে গ্যাস স্টোভ থেকে কার্বন মনোক্সাইড ও নাইট্রোজেন অক্সাইডের পাশাপাশি আরও কিছু ক্ষতিকর কার্সিনোজেন নিয়মিত ভাবে আমাদের ঘরোয়া পরিবেশে নিঃশব্দে জমা হচ্ছে আমাদের অজান্তেই।
সমস্যা গম্ভীর সন্দেহ নেই কেননা সমাজের সকল স্তরের মানুষের পক্ষে সমান পরিসরে বসবাস করার সুযোগ নেই। ফলে যাঁরা ছোট ছোট ঘরে,পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশনের সুবিধা বিহীন রান্নাঘরে, আদ্যিকালের গ্যাস স্টোভ জ্বালিয়ে এখনও কাজ করে চলেছেন তাঁদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা হয়তো কপালে ভাঁজ ফেলবে। ভারতের মতো দেশে এইসব বিষয় নিয়ে ভাবনার সুযোগ আছে। শহরের ছোট ছোট খুপরির মতো ফ্ল্যাট বাড়ির পাশাপাশি গ্রামের অগণিত সাধারণ মানুষের জীবনে পরিশুদ্ধ রন্ধন উপকরণ হিসেবে বহুল আলোচিত গ্যাস স্টোভ হয়তো একটা নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করলো। সবকিছুকে রাতারাতি বদলে ফেলা সম্ভব নয় অন্তত আমাদের মতো দেশের সাধারণ মানুষের পক্ষে। ভাবনা জারি থাকুক, চলতি গ্যাস স্টোভকে বদলে নতুন কিছু উদ্ভাবনের। ভাবি আমরাও। কী করে আমাদের ঘরকে সুরক্ষিত রাখতে পারি কেননা কথায় বলে – Safety begins at home.
বিধিসম্মত সতর্কীকরণ
পাঠক পাঠিকাদের উদ্দেশ্যে নিবেদন এই লেখাটি একটি গবেষণা রিপোর্টের ভিত্তিতে লেখা। এই নিবন্ধটি পড়ে বিন্দুমাত্র ভীত, আতঙ্কিত হবেন না। গবেষকরা কিছু সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন মাত্র। তবে সাবধানের মার নেই। ঘরের দরজা জানালা খুলে রাখুন। রান্নাঘর হোক খোলামেলা ও স্বাস্থ্যকর। ধন্যবাদ।
ঋণ স্বীকার: টাইমস্ অফ ইন্ডিয়া, ২২জুলাই,২০২৫
শুক্রবার, জুলাই ২৫.২০২৫













লেখাটি পড়ার পর রান্নাঘরে ঢুকতে কিঞ্চিত ভয় পাচ্ছি যদিও লেখক আমাদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছেন এই বলে যে এটি একটি গবেষণা পত্র। সুতরাং স্বীকৃত সত্য নয়। আধুনিক জীবন আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে। লেখকের বহুবিধ বিষয় নিয়ে লেখা পাঠকদের মনোরঞ্জনের সাথে সাথে শিক্ষিত করে। ধন্যবাদ জানাই।
ভয় কিসের? আমাদের সচেতন হতে হবে। গবেষকদের কাজ তাঁরা করেছেন। আমাদের হেঁসেল চালু থাকুক।
রান্না ঘর খোলামেলা রাখুন এইটা কাজের কথা।পেপার ও রকম অনেক বের হয়। সব মানতে গেলে গুহাবাসী হতে হবে।তারও আবার সমস্যা আছে।যেকোন উন্নতির সঙ্গেই বিষ অঙ্গাগী ভাবে জড়িত।যেমন সমুদ্রমন্থনে অমৃতের সঙ্গে হলাহল।
ওই কাজের কথাটুকু যথা সম্ভব মেনে চললেই যথেষ্ট। বাকিটা ভবিষ্যতের ওপর ছেড়ে দেওয়াই ভালো। মন্থন হলে দেখা যাবে কার পাল্লা ভারী।