গ্রেট নিকোবর দ্বীপখণ্ডের দক্ষিণ-পূর্ব ও দক্ষিণ-পশ্চিমে প্রায় ১৬,৬১০ হেক্টর এলাকা জুড়ে পরিবেশবিধ্বংসী এক ভয়ঙ্কর প্রকল্প তৈরি করতে চলেছে ভারত সরকার। পরিবেশকর্মীদের তীব্র আপত্তি সত্ত্বেও দেশের গ্রিন ট্রাইব্যুনাল এই প্রকল্পে সরকারকে গ্রিন সিগন্যাল দিয়েছে। সবটাই করা হচ্ছে জাতীয় নিরাপত্তার কথা বলে। ভারত মহাসাগরে চীনের প্রভাব প্রতিহত করতে এই প্রকল্পকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কৌশল বলে বর্ণনা করা হয়েছে, তাই জাতীয় স্বার্থেই ৩২ লক্ষ হাজার বছরের পুরোনো গাছ কেটে এলাকার পরিবেশ ভারসাম্য নষ্ট করে মহা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কেন বিতর্ক?
৮১,০০০ কোটি টাকার গ্রেট নিকোবর প্রকল্প যতই সামরিক ও অসামরিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ হোক, সেটা গড়তে গেলে পরিবেশের যে ব্যাপক ক্ষতি হবে সেটা অপূরণীয়। এছাড়া ওই অঞ্চলে আদিকাল থেকে বসবাসকারী আদিবাসী জনজাতির বিপন্নতা এবং নির্মাণকাজের ভূতাত্ত্বিক ঝুঁকি নিয়ে তীব্র বিতর্কের মুখে পড়েছে সরকার। বিরোধীরা একে বাস্তুতন্ত্রের অপূরণীয় অপরিবর্তনীয় ক্ষতি ও স্থানীয় সংস্কৃতির ধ্বংসলীলা বলে মনে করছেন।
এই প্রকল্পের বিরোধিতায় যে যুক্তি:
১. পরিবেশগত বিপর্যয় ও বনভূমি ধ্বংস: এই মেগা প্রকল্পের জন্য প্রায় ৪৯ বর্গ কিলোমিটার সংরক্ষিত বনাঞ্চল ধ্বংস করে আনুমানিক ৮ থেকে ১৮ লক্ষ গাছ কাটা হবে। পরিবেশবিদদের বক্তব্য,এর ফলে গ্যালাথিয়া উপসাগরের সংবেদনশীল বাস্তুতন্ত্র এবং প্রবাল প্রাচীর চিরতরে ধ্বংস হয়ে যাবে।
২. আদিবাসী অধিকার ও জনজাতির অস্তিত্বের সংকট: গ্রেট নিকোবর দ্বীপে আদিবাসী শম্পেন (Shompen) এবং নিকোবারেসি (Nicobarese) জনজাতি বাস করে। বৃহৎ জনপদ ও বন্দর নির্মাণের ফলে এই সংরক্ষিত উপজাতিদের বাসস্থান ও জীবনযাত্রা চরম হুমকির মুখে পড়বে।
৩. ভূতাত্ত্বিক ও ভূমিকম্পের ঝুঁকি: বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রেট নিকোবর দ্বীপটি অত্যন্ত ভূমিকম্পপ্রবণ! এই অঞ্চল সুনামির ঝুঁকিপূর্ণ । সক্রিয় সাবডাকশন জোনে এত বিশাল কংক্রিটের কাঠামো ও বন্দর নির্মাণ করা পরিবেশগত এবং কৌশলগত উভয় দিক থেকেই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত।
৪. নিয়মনীতি লঙ্ঘন ও আইনি উদ্বেগ: পরিবেশগত ছাড়পত্র এবং আদিবাসীদের মতামত নেওয়ার ক্ষেত্রে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। ১৬৬.১০ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে চলবে প্রকল্প। প্রায় ১৩০.৭৫ বর্গ কিলোমিটার এলাকা নেওয়া প্রত্যক্ষ কর্মকান্ডে। অত্যন্ত ঘন ক্রান্তীয় বর্ষা মৌসুমের অরণ্যে ভরা দ্বীপের প্রায় ১৫ শতাংশ (৮৪.১০ বর্গ কিলোমিটার) জমি নেওয়া হবে আদিবাসীদের সংরক্ষিত এলাকা থেকে। এই অঞ্চল শোম্পেন ও নিকোবারি উপজাতির জন্য সংরক্ষিত। সেখানে ওই মানুষেরা বসবাস করেন। তাদের জীবনযাপন সম্পূর্ণই দ্বীপের ভূমিরূপ ও বাস্তুতন্ত্রের উপর নির্ভরশীল। ২০২২ সালে গ্রেট নিকোবরের ট্রাইবাল কাউন্সিল প্রাথমিকভাবে একটি অনাপত্তিপত্র (NOC) দিলেও, পরে তারা তা প্রত্যাহার করে নেয়। তাদের অভিযোগ, প্রশাসন ভুল বুঝিয়ে স্বাক্ষর নিয়েছিল। তাদের প্রাচীন গ্রামগুলি এই প্রকল্পের আওতায় পড়ছে, সে কথা জানানো হয়নি।
পরিবেশবিদ ও বিজ্ঞানীদের বক্তব্য, এই প্রকল্প হলে গ্যালাথিয়া বে-তে বন্দর তৈরি হবে। সেখানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ‘লেদারব্যাক কচ্ছপের’ প্রজনন ক্ষেত্র। বন্দরের নির্মাণ কাজে আলো, শব্দ এবং ড্রেজিং কচ্ছপদের চিরতরে বিলুপ্তির দিকে ঠেলে দেবে। এছাড়াও এন্ডেমিক স্পিসিজরা (অর্থাৎ যে সমস্ত প্রজাতি সারা বিশ্বের মধ্যে শুধু ওইখানেই পাওয়া যায়, এমন কিছু প্রজাতি হলো নিকোবর মেগাপড পাখি, নিকোবর ম্যাকাক) অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলবে। বন্দর তৈরির জন্য হাজার হাজার প্রবাল ধ্বংস হবে। তাতে উপকূলের জলজ বাস্তুতন্ত্র মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সরকার ১৬,১৫০ টি প্রবাল কলোনী স্থানান্তরের কথা বলছে। এটা অবৈজ্ঞানিক ও পরিবেশ বিরোধী পরিকল্পনা। গণহত্যার সামিল। ২০২৪ সালে ৩৯ জন আন্তর্জাতিক স্তরের বিশেষজ্ঞ ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মূ-কে একটি চিঠি লিখে সতর্ক করেন। ২০২২ সালের ২৭ অক্টোবর যখন কেন্দ্রীয় সরকার এই প্রকল্পের ‘স্টেজ ১’ বনজ ছাড়পত্র এবং নভেম্বরে পরিবেশগত ছাড়পত্র ইস্যু করে তখন থেকেই প্রবল বিরোধিতা শুরু হয়। পুনরায় খতিয়ে দেখতে পরিবেশকর্মীদের আপিলের ভিত্তিতে NGT একটি হাই পাওয়ার্ড কমিটি (HPC) গঠন করে। কিন্তু তাদের ৬ সদস্যের বেঞ্চ প্রকল্পের বিরুদ্ধে জমা পড়া সমস্ত আবেদন খারিজ করে দেয় এবং পরিবেশগত ছাড়পত্র বহাল রাখে। যদিও প্রকল্পের বিরুদ্ধে উপজাতীয় অধিকার এবং পরিবেশগত আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে কলকাতা হাইকোর্টের মামলা এখনো বিচারাধীন। এই প্রকল্পে না একোসেন্ট্রিক আর না আনথ্রোপোসেন্ট্রিক এথিক্স, কোনটাকেই পাথেয় করা হয়নি বলে পরিবেশবিদ ও বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, একটি পরিকল্পিত পরিবেশগত বিপর্যয় ডেকে আনা হচ্ছে। অভিযোগ,নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে গ্যালাথিয়া বে উইল্ডলাইফ স্যাংচুয়ারির তকমা খুলে ফেলেছে, অথচ NGT স্বাধীন কোনো পরিবেশগত অডিট করে নি। জুওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (ZSI) এবং ন্যাশনাল সেন্টার ফর সাসটেইনেবল কোস্টাল ম্যানেজমেন্ট (NCSCM)-এর মতো সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন সংস্থার রিপোর্টের ওপর নির্ভর করেছে। এই সংস্থাগুলি প্রকল্পের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল CRZ-1A (কোস্টাল রেগুলেশন জোন) এলাকায় বন্দর নির্মাণের সাফাই দিয়েছে। এটা আইনিভাবে নিষিদ্ধ। ট্রাইব্যুনাল জানিয়েছে যে পরিবেশগত ছাড়পত্রে ‘পর্যাপ্ত সুরক্ষা’ (Adequate safeguards) নিশ্চিত করা হয়েছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই শর্তগুলো সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক ও ভিত্তিহীন। যেমন, সমুদ্রের তলায় ড্রিলিং করে হাজার হাজার পরিণত প্রবাল (Coral) অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার (Translocation) কথা বলা হয়েছে। এটা সামুদ্রিক জীববিদ্যার পরিপন্থী। নিকোবরের ৩২ লক্ষ গাছ কেটে তার পরিবর্তে হরিয়ানার শুষ্ক আরাবল্লী অঞ্চলে গাছ লাগানোর যুক্তি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। বিষুবীয় বর্ষারণ্য ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ কোনোদিন অন্য অঞ্চলের গাছ দিয়ে পূরণ হয় না। এভাবে বাস্তুতন্ত্র কখনো বদলি করা যায় না। একে বলা হচ্ছে “হোলিস্টিক ডেভেলপমেন্ট”, আসলে এটি এক বৃহদ পরিকল্পিত পরিবেশগত বিপর্যয়।
আশঙ্কা এটাই যে গ্রেট নিকোবর প্রকল্প মারাত্মক প্রাকৃতিক ধ্বংসলীলায় ডুবে না যায়! ওই এলাকায় প্রাকৃতিক বিপর্যয় অনিবার্য হয়ে উঠছে লক্ষ লক্ষ গাছ কেটে ফেলার জন্য, অন্যদিকে গোটা উন্নয়ন যজ্ঞ ডুবতে পারে সুনামি আছড়ে পড়লে, যার সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি।
সকলকে বুঝিয়ে নো অবজেকশন আর গ্রিন ক্লিয়ারেন্স পাওয়া যেতে পারে ক্ষমতার জোরে, কিন্তু লক্ষ লক্ষ গাছ কাটলে প্রকৃতি যেভাবে প্রতিশোধ তুলবে তাকে আটকানোর ক্ষমতা কোনো আদানি কোম্পানি বা ভারত সরকারের নেই!
তাই মনে পড়ছে পুরোনো প্রবাদ: পাপ ছাড়ে বাপকে, ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিও না।













সংংক্ষিপ্ত এবং বস্তুনিষ্ঠ লেখা।