কাঁচা সোনার রঙের একফালি রোদ এসে লুটিয়ে পড়েছে তেতলার ফ্ল্যাটের একচিলতে বারান্দায়। সোমনাথ পায়ে পায়ে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ালেন। একটা সিগারেট ধরাবেন নাকি? চট করে পিছন ফিরে দেখলেন, শোবার ঘরের লাগোয়া বাথরুমের দরজাটা বন্ধ। সীমন্তীর স্নান করতে একটু বেশিই সময় লাগে। নিশ্চিন্তে সুখটান দেওয়া যাবে খানিকক্ষণ। অর্ধাঙ্গিনীটি দেখে ফেললে অবশ্য চিত্তির – চিৎকার চেঁচামেচি করে একশা করবে। গত মার্চে করোনারি বাইপাস হয়ে গিয়েছে সোমনাথের।
বারান্দা থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে পাড়ার পুজোর প্যান্ডেলটা। দাবার ছক আর লুডোর বোর্ডের আদল। থিমপুজো। এসব ভাল বোঝেন না তিনি। সাবেকিয়ানাই পছন্দ করে এসেছেন চিরকাল। আর সাবেক পুজো বলতেই ভবানীপুরে মামার বাড়ির দুশো বছরের দুর্গাপুজো।
সব মামাতো মাসতুতো দাদা আর ভাইদের সঙ্গে হইহই করে কালীঘাট পটুয়াপাড়ার ঠাকুর আনা, মল্লিকঘাট থেকে ফুল, গড়িয়াহাট থেকে বাজার, মামার বাড়ির বিশাল ঢালা ছাদে ভোগের রান্নার জন্য তেরপল খাটানো, রাতভ’র জেগে ঠাকুরদালান সাজানো — গলার কাছটা ব্যথা ব্যথা করে ওঠে সোমনাথের।
“আশ্বিনের হিম, একটা মাফলার জড়িয়ে নাও সীতুদা, ঠান্ডা লেগে জ্বর বাধালে আবার কলেজ কামাই হবে যে” —
“এই নাও, গরম চা আর কুচো নিমকি এনেছি – একটু মুখে দাও তো! সেই কখন থেকে খেটে মরছ–“
“এবার বিসর্জনে লরিতে আমি যাবই তোমাদের সঙ্গে, হ্যাঁ! তারপর, ফাঁক বুঝে দু’জনে কেটে পড়ব একসময় — অ্যাই সীতুদা, তুমি আমায় গঙ্গায় নৌকো চড়াবে কথা দিয়েছিলে কিন্তু গতবার — চড়াবে তো ঠিক?”
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন সোমনাথ। আঙুলের ফাঁকে সিগারেটটা জ্বলতেই থাকে, সুখটান দেওয়ার কথা আর মনে থাকে না।
আজ তিরিশ বছর হয়ে গেল সমাপ্তি নেই। এই তিরিশ বছর ধরে এমন একটা দিনও বোধহয় যায়নি, যেদিন মনে পড়েনি তার কথা।
“গত একমাসে মাত্র তিনটে চিঠি! ইস, কত যেন পড়ার চাপ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে! যাও, তিনদিন কথা বলব না তোমার সঙ্গে! শাস্তি!”
অসহায়ভাবে চোখ বোজেন পঞ্চান্ন বছরের সোমনাথ। অষ্টাদশী কিশোরীর অভিমান ভেসে ওঠে বন্ধ চোখের পাতায়।
“জানো সীতুদা, বড়জ্যেঠি সেদিন ছাদে আমাদের দেখে ফেলেছিল বোধহয়”—
চব্বিশ বছরের সোমনাথ পলকে বিবর্ণ হয়ে উঠেছিলেন। “দেখে ফেলেছে? বড়মাইমা? বলিস কি? তারপর?”
সমাপ্তির মুখে কোনো বৈকল্য ছিল না। প্রিন্সেপ ঘাটের চাতালে বসে আগুন রঙের তাঁতের শাড়িটির খুঁট আঙুলে জড়াতে জড়াতে ঠোঁট উলটে বলেছিল– “তারপর আর কি? মাকে বলে দিয়েছে বোধহয়। আজ কলেজে বেরোবার সময় খুব জেরা করছিল আমায়।”
সোমনাথ ভয়চকিত গলায় বলে উঠেছিলেন –“মামা জানতে পারলে তো শিওর মা বাবাকে ডেকে পাঠাবে। তারপর আমার কোর্ট মার্শাল হবে–“
“হবে তো হবে”, নির্ভীক গলায় বলেছিল সমাপ্তি – “এই তো ক’মাস পরেই পাশ করে যাবে তুমি। আর ক্যামপাস ইন্টারভিউতে চাকরিটা তো পেয়েই গিয়েছ – তারপর”—
গলায় নিষিদ্ধ উত্তেজনা নিয়ে ফিসফিস করে উঠেছিল সে – “পালিয়ে যেও আমায় নিয়ে! অনেক দূরে কোথাও পালিয়ে যেও। মন্দিরেও বিয়ে করা যায়, আমি জানি! সেখানে কেউ সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তুলবে না।”
“পালিয়ে গিয়ে বিয়ে?”—নিজের অজান্তেই বুঝি গলা কেঁপে উঠেছিল সোমনাথের।
শাড়ির রঙের আগুন ঝিকিয়ে উঠেছিল সমাপ্তির চোখের তারায়। হিংস্রভাবে বলে উঠেছিল সে — “পারবে না, তাই তো? ইস, সীতুদা, না ভিতুদা তুমি?”
না, ভয় পেলেও সরে আসতে পারেননি সোমনাথ। সরে যাওয়ার চিন্তার ছায়াটুকুও পড়েনি তাঁর মনে। যতই অসিদ্ধ হোক, নিষিদ্ধ সম্পর্কের একটা মাদকতা থাকে, থাকে গোপন রোমাঞ্চ — ঐ বয়সে তা এড়িয়ে যাওয়ার সাধ্য তাঁর ছিল না। শুধু কি তাই? সমাপ্তিকে কি পাগলের মতো ভালবাসেননি তিনি? তার টানেই যে অমন একটা অসামাজিক, অন্যায্য সম্পর্কের স্রোতে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন নিজেকে — এ কথা তো অস্বীকার করার জায়গা নেই। তবে? তবে এমন কেন হলো?
পাড়ার প্যাণ্ডেলের লাউডস্পিকারে পুরোনো দিনের বাংলা গান চালিয়েছে –
‘আজ মন চেয়েছে আমি হারিয়ে যাব,
হারিয়ে যাব আমি তোমার সাথে’ —
বারান্দার ইজ়িচেয়ারটায় গা এলিয়ে দেন সোমনাথ। বড় অবসন্ন লাগছে।
নতুন চাকরির অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার হাতে পেয়ে উচ্ছ্বসিত হওয়ার সময়টুকুও পাননি তিনি। ততদিনে তাঁর আর সমাপ্তির গোপন প্রেমের সংবাদ কিছুটা পল্লবিত হয়ে ছোটমামার কানে উঠে গিয়েছে। সোমনাথের মা বাবাকে ডেকে কিছু জানানো হয়নি ও বাড়ি থেকে। সম্ভবত তাঁর গোঁড়া রক্ষণশীল মামারা নিজেদের বোনকেও পর ভেবে বাড়ির কেচ্ছায় শরিক করতে চাননি।
তবে অস্বাভাবিক তৎপরতায় সমাপ্তির বিয়ে ঠিক করে ফেলেছিলেন ওঁরা। বীরভূমের বোলপুরে। একজন হাইস্কুলের মাস্টারমশাইয়ের সঙ্গে।
বিয়ের দিন কয়েক আগে উদভ্রান্তের মতো তাঁদের শ্যামপুকুরের ভাড়া বাড়ির দরজায় আছড়ে পড়েছিল সমাপ্তি।
মা বাবার সপ্রশ্ন দৃষ্টির সামনেই তাঁর হাত দুটো সবলে জড়িয়ে ধরে পাগলের মতো ঘাড় নেড়ে যাচ্ছিল সে — “পারব না সীতুদা – আমি কিছুতেই পারব না অন্য কাউকে বিয়ে করতে –“
চোখের জল ভাসিয়ে দিচ্ছিল ওর গাল, বুক – তবুও অন্ধ আবেগে হেঁচকি তুলতে তুলতে একই কথা বলে চলেছিল মেয়েটা, “আমায় নিয়ে পালিয়ে চলো তুমি। দূরে কোথাও পালাই, চলো। আমি বাঁচব না সীতুদা, তোমাকে ছাড়া আমি কক্ষণো বাঁচতে পারব না”!
সমাপ্তির এক একটা কথা, এক একটা বাক্য যেন আগুনের হলকার মতো কানের ভিতর ঢুকছিল সোমনাথের, আর একটা গভীর অপরাধবোধের সঙ্গে অসহ এক ভাললাগাও চারিয়ে যাচ্ছিল তাঁর সারা শরীরে। প্রিয়তমা নারীর প্রেমের অলজ্জ উচ্চারণ এত সুখও দেয় বুঝি? তাঁর ভীরুতার সমস্ত লজ্জা যেন ঢেকে দিচ্ছিল সমাপ্তির দৃঢ় অথচ আকুল স্বীকারোক্তি।
আর নিজের বাবা মায়ের হতভম্ব দৃষ্টির সামনে কুঁকড়ে এতটুকু হয়ে যাচ্ছিলেন সোমনাথ।
তারপর? ছিছিক্কার, ঝগড়াঝাঁটি, মনোমালিন্যের জেরে বাপের বাড়ির সঙ্গে মায়ের একরকম সম্পর্কছেদের আবহেই সমাপ্তির বিয়েটা চুকে গিয়েছিল সেই মাস্টারমশাইয়ের সঙ্গে।
নিজের কাছ থেকে নিজের মুখ লুকোবার তাগিদে সোমনাথ তখন নবলব্ধ চাকরি নিয়ে ঘাটশিলায়, রাখা মাইনসে।
সেখানে থাকাকালীনই খবর পেয়েছিলেন, বৌভাতের সপ্তাহ দুয়েক পরে গলায় দড়ি দিয়ে শোবার ঘরে ঝুলে পড়েছিল সমাপ্তি – অনেক প্রশ্নের উত্তর অসমাপ্ত রেখে।
চোখের উপর হাতটা একবার চালিয়ে ইজিচেয়ার থেকে উঠে পড়লেন সোমনাথ। বারান্দায় রোদের তাত বেশি। অল্প ঘাম হচ্ছে। বুকেও একটু চাপ লাগছে কি? বুঝতে পারলেন না।
ঘরে এসে ফ্যানটা বাড়িয়ে দিয়ে বিছানায় আধশোয়া হলেন। সীমন্তী এখনো বাথরুম থেকে বেরোয়নি।
না, শোকে দুঃখে উন্মাদ হয়ে যাননি তিনি। চাকরিতে উঠেছেন পদোন্নতির সিঁড়ি বেয়ে। বিয়ে করেছেন বাবা মায়ের পছন্দের পাত্রীকে। সীমন্তী তাঁদের মধ্যবিত্ত যাপনের পক্ষে একেবারে মাপসই গৃহবধূ। শ্বশুর শাশুড়ির যত্ন, আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে ফিকে হয়ে আসা সম্পর্কে জলসিঞ্চন, সোমনাথের আর্থসামাজিক ধার ও ভার বুঝে সাংসারিক দায়দায়িত্ব পালন — সবকিছু নিপুণভাবে করে এসেছে সোমনাথের স্ত্রী। সন্তান এসেছে জৈবিক নিয়মে। মেয়ে। সে ডাক্তার। ভিনরাজ্যে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন করছে।
হার্টের অসুখ ধরা পড়ার পরে চাকরি থেকে স্বেচ্ছাবসর নিয়েছেন সোমনাথ। দক্ষিণ শহরতলির অভিজাত পাড়ায় এই দুই বেডরুমের নীড়ে তাঁদের স্বামী স্ত্রীর আপাত সুখের সংসার।
এই অবধি ভেবেই আপন মনে মাথা নাড়েন তিনি। আপাত কেন? সুখেরই তো সংসার তাঁর।
সাতাশ বছর ঘর করার পরেও সীমন্তীর সুন্দর মুখে এতটুকু অসন্তোষের ছায়াও তো পড়তে দেননি তিনি। ফুটতে দেননি একটুখানি অবিশ্বাসের আঁচড়। তাঁর তকতকে নিকোনো দাম্পত্যে, একদিনের জন্যও সীমন্তীকে বুঝতে দেননি, এই ছাদ, চার দেওয়াল, রঙিন যৌথযাপন, তাঁর গর্বিত পিতৃত্ব — সব, সবকিছু একেবারে ফাঁপা, সাজানো, কৃত্রিম!
তিরিশ বছর আগের একটা ক্ষমাহীন পাগলামির এটাই বুঝি প্রায়শ্চিত্ত! কেউ চলে গিয়ে প্রায়শ্চিত্ত করে, কেউ বেঁচে থাকার নিরর্থক অভিনয় করে যায় আজীবন।
কিন্তু এবার কি মুখোশে চিড় ধরছে, সোমনাথ? নিজেকেই জিজ্ঞাসা করেন অস্ফুটে। কোথাও কি ছেঁড়া কার্পেটের তলা থেকে উঁকি মারছে সম্পর্কের মেঝের ফুটোফাটা? না হলে পুজোর উপহার হিসেবে হঠাৎ এবারই কেন সীমন্তীর জন্য একখানা আগুন রঙের মুর্শিদাবাদী সিল্ক কিনে নিয়ে এলেন তিনি?
জীবনে বহু শাড়ি তিনি দিয়েছেন স্ত্রীকে, কোনোদিন আগুনরঙের শাড়ি দেননি। ওই রং যেন বন্ধ মনের বাক্সে সযত্নে বন্দী করা ছিল এতকাল। ভুলেও সে বাক্সের ডালা খোলেননি এত বছরে। এবার কেন খুলতে গেলেন? তবে কি মেকি উদযাপনে ক্লান্ত মন ছুটি চাইছে তাঁর কাছে? জানেন না সোমনাথ — কিচ্ছু জানেন না।
আজ অষ্টমী। প্রত্যেক বছর তাঁর দেওয়া শাড়িটি পরে পাড়ার পুজোমন্ডপে অঞ্জলি দিতে যায় সীমন্তী। বিয়ের পর থেকে এমনটাই দেখে আসছেন তিনি।
তাই আজ যখন বাথরুমের ছিটকিনি খোলার শব্দ হলো, তিনি চোখটা বুজে ফেললেন।
ঘরে শ্যাম্পুর হালকা সুবাস ছড়িয়ে পড়ল। সেই সঙ্গে ট্যালকম পাউডারের গন্ধ। নতুন শাড়ির খসখস শোনা যাচ্ছে। না, কিছুতেই চোখ খুলবেন না সোমনাথ। ঠোঁট দুটো কঠিনভাবে টিপে প্রায় মড়ার মতো বিছানায় পড়ে রইলেন তিনি।
তাকাবেন না, তাকাতে পারবেন না। তাঁর সমাপ্তির সব প্রাপ্যই তো সীমন্তী অধিকার করে বসে আছে। ওর প্রিয় রঙটুকু কিছুতেই অন্য কারো গায়ে দেখতে পারবেন না তিনি।
মুহূর্তের কোন দুর্বলতার বশে ঐ আগুনরঙা কাপড়খানা কিনে ফেলেছিলেন, সেটা চিন্তা করে নিজেকে প্রাণপণে ধিক্কার দিয়ে চলেছিলেন তিনি।
আত্মগ্লানিতে ডুবে যেতে যেতে হঠাৎই তাঁর মনে পড়ল, বিয়ের পর থেকে গত সাতাশ বছরে তিনি একবারের জন্যও আগুনরঙের কোনো শাড়ি পরতে দেখেননি স্ত্রীকে।
“শোনো, আমি প্যান্ডেলে যাচ্ছি। অঞ্জলি দিয়েই চলে আসব। মায়াকে বলে যাচ্ছি, তোমাকে শসা দিয়ে দু’পিস টোস্ট আর লিকার চা দেবে। খবরদার মুখরোচক কিছু খাওয়ার জন্য বায়না ধোরো না ওর কাছে। আমি দুপুরে পাতলা করে কম মশলা দিয়ে মাংসের ঝোল করে দেব, খেও। আমার অবিশ্যি আজ নিরামিষ–“
ভয়ে ভয়ে চোখ খোলেন সোমনাথ। সীমন্তী আলমারির চাবি বালিশের তলায় রাখছে। কিন্তু এ কি? ওর পরনে লালপেড়ে গরদ যে! এ তো তাঁর দেওয়া শাড়ি নয়।
তাঁর চোখের প্রশ্ন পড়ে সীমন্তী একগাল হেসে বলে ওঠে – “এটা মুন্নি কিনে দিয়েছে ওর স্টাইপেন্ডের টাকায়। কেমন? সুন্দর না?”
“কিন্তু — কিন্তু, আমার দেওয়া শাড়িটা?”– প্রশ্নটা গলায় আটকে যায়। একটু তোতলা হয়ে যান সোমনাথ।
দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাবার সময় মুখ ফেরায় সীমন্তী। কেমন একটা অচেনা হাসি ওর মুখে। সোমনাথ শুনতে পান,
খুব শান্ত, মৃদু গলায় বলছে সীমন্তী — “ওটা আমি যত্ন করে তুলে রেখে দিয়েছি গো। এই তিরিশ বছরে তো তাকে কখনো কিছু দাওনি — প্রথমবার দিলে — সেটা কি আমি যেমনতেমন করে রাখতে পারি? বলো?”











