যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঘোষণা করলেন যে ইরানকে যুদ্ধে আমরা হারিয়েই দিয়েছি এবং ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু বললেন ইরানের আর লড়াই য়ের ক্ষমতা নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে তার কয়েক ঘন্টার মধ্যে ইরান প্রায় ৪০০০ কিমি দূরে ভারত মহাসাগরে অবস্থিত ব্রিটিশ ও মার্কিন ঘাঁটি দিয়েগো গার্সিয়া তে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়ে এবং ইজরায়েলের আয়রন ডোম ও থাড প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে তেল আভিব ও জেরুজালেমের বুকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়ে, দক্ষিণ ইজরায়েলের নাগেভ মরুভূমিতে গোপন পরমাণু কেন্দ্র সংলগ্ন ডিমোনা ও আরাদ শহরদুটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হানায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করে সারা বিশ্বকে চমকে দিল।
চলমান যুদ্ধ: মধ্য প্রাচ্যের উত্তেজনা ও যুদ্ধ নতুন কিছু নয়, উক্ত অঞ্চলে এশিয়া – ইউরোপের মধ্যে সহজ জাহাজ পথ সুয়েজ খাল নিয়ন্ত্রণ এবং মাটির তলায় খনিজ তেল আবিষ্কারের পর প্রায় দেড়শো বছর ধরে সেখানে অ্যাঙ্গলো – স্যাকসন দের নেতৃত্বে ইউরোপীয় দের দাপট। প্রথম বিশ্ব যুদ্ধ থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ অবধি মূলত ব্রিটিশরা আর কিছুটা ফ্রান্স মধ্যপ্রাচ্যের কর্তৃত্ব করেছে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার বন্ধুরা অর্থাৎ ব্রিটেন, ফ্রান্স, ইরান, ইরাক, ইজরায়েল, সৌদি আরব, মিশর প্রমুখরা কর্তৃত্ব করেছে। আবার নিজ স্বার্থ, তেলের বখরা, শিয়া – সুন্নি বিভেদ, ইসলামি আরব বনাম ইহুদি ইজরায়েল, প্যালেস্তাইন ও জেরুজালেমের কর্তৃত্ব নিয়ে মধ্য প্রাচ্যের দেশগুলির মধ্যেও অবিরত দ্বন্দ্ব, সংঘর্ষ, যুদ্ধ চলেছে। এগুলির কারণ বিশ্লেষণ আমরা ‘ পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ ক্রমে পূর্ব দিকে সরে আসছে ‘(২৬ জানুয়ারি, ২০২৪), ‘ আমরা চলমান বিশ্বযুদ্ধের মধ্যে রয়েছি ‘ (২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬) প্রমুখ প্রবন্ধে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শ্বেত জাতিবাদী, ফাটকা ব্যবসায়ী, যৌন অপরাধী, বৃহৎ পুঁজির কর্পোরেট ও মারণাস্ত্র প্রস্তুতকারী শিল্পগুলির প্রতিনিধি, Bipolar মানসিকতার, আগ্রাসী যুদ্ধবাজ ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয়বার নির্বাচনে জিতে আসার পর বিশ্ব জুড়ে যে অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা, যুদ্ধ, ধ্বংস ও দূষণ প্রবলভাবে বেড়ে গেছে সেটিও তুলে ধরা হয়েছে।
নতুন করে হামলা: গত ৩ জানুয়ারি ২০২৬ বিশ্বের সবচাইতে বেশি খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের অধিকারী ভেনেজুয়েলা আগ্রাসনের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে ইরান আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান তো বটেই সারা বিশ্ব বুঝতে পারছিল। আলোচনার অন্তরালে ইরান দীর্ঘদিন ধরে প্রতিরক্ষা, প্রতি আক্রমণ ও পরমাণু অস্ত্র তৈরির প্রস্তুতিও নিচ্ছিল। কিন্তু ওমানের রাজধানী মাস্কটে এবং সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় মার্কিন – ইরান আলোচনা চলার মধ্যে ২৮ ফেব্রুয়ারি সকালে হঠাৎ করে মার্কিন ও ইজরায়েলি বিমান বাহিনীর প্রায় ২০০ বিমান ইরানের প্রায় ২০০০ জায়গায় যেভাবে ভয়ংকর ড্রোন ও বোমার হামলা চালালো তাতে সারা বিশ্ব চমকে উঠল। প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি ও মৃত্যুর মধ্যে ইরানের বিমান বাহিনী এবং বিমান আক্রমণ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রায় ভেঙ্গে দেওয়া হল। হত্যা করা হল ইরানের সর্বোচ্চ নেতা ও ধর্মগুরু (রাহবার) সপারিষদ ও পরিবারের অনেকের সঙ্গে আলি খামেনেইকে যিনি দীর্ঘ ৩৭ বছর ধরে তাঁর ধর্মীয় মৌলবাদী ও স্বৈরাচারী লৌহ শাসনে ইরানকে শক্ত হাতে বেঁধে রেখেছিলেন এবং বাইরে থেকে মার্কিন, ইজরায়েল ও সৌদির সরাসরি ও ছায়া (Proxy) আক্রমণ এবং দেশের মধ্যে একের পর এক জনবিদ্রোহ নির্মমভাবে দমন করে আসছিলেন।
এরপর পূর্ণমাত্রায় শুরু হয়ে গেল এই পর্যায়ের মার্কিন ও ইজরায়েল বনাম ইরানের যুদ্ধ। মার্কিন – ইজরায়েলি যুদ্ধ বিমান ইরানের রাজধানী তেহরান সহ একের পর এক জায়গায় হানা দিয়ে চলল। ইরান এতটুকুও না দমে তার শক্তিশালী ও অফুরন্ত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ভাণ্ডার দিয়ে ইজরায়েল, মধ্য প্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটি গুলি এবং মার্কিন বান্ধব ইরাক, বাহরিন, কুয়েত, সৌদি, কাতার, ওমান, আমির শাহী, জর্ডানের বিমানবন্দর, বন্দর, শিল্প, তেল সংশোধনাগার, Desalination Plants, বাণিজ্য ও পর্যটন কেন্দ্রগুলি আক্রমণ করে যেতে লাগল। দুপক্ষের সৈন্য ছাড়াও প্রচুর সাধারণ মানুষ হতাহত। এখন অবধি ইরানে ৩০০০ এবং লেবাননে ১০০০ এর বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে, অসংখ্য গৃহহীন ও কর্মহীন । বহু ঐতিহ্যবাহী নির্মাণ অসংখ্য মূল্যবান সম্পদ চিরতরে ধ্বংস হয়ে গেছে। পরিবেশের ঘটে গেছে ভয়ঙ্কর ও অপূরণীয় ক্ষতি। ইরানের সঙ্গে তার ‘ Axis of Resistance ‘ হিজবুল্লাহ, হুতি, ইরাকি শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলি ইজরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন কেন্দ্র ও বাণিজ্য জাহাজগুলি আক্রমণ করে যাচ্ছে। ইজরায়েলও নতুন করে লেবানন ও গাজা আক্রমণ করেছে। এর সঙ্গে বিশ্বের ২০% তেল চলাচল সহ উপসাগরীয় দেশগুলির লাইফ লাইন হরমুজ প্রণালী ইরান বন্ধ করে দিয়ে তার নৌবাহিনী দিয়ে বিদেশী বাণিজ্যিক ও মার্কিন সামরিক জাহাজগুলি আক্রমণ শুরু করেছে। মার্কিন নৌবাহিনী বিশ্বের ১০% খনিজ তেল উৎপাদনকারী ইরানের ৯০ % তেল উৎপাদনকারী খার্গ দ্বীপ আক্রমণ করল এবং বেশ কয়েকটি ইরানি নৌবাহিনীর জাহাজকে ডুবিয়ে দিল। বিশ্বজুড়ে তেল সরবরাহে টান পড়ে ভারতের মত বিভিন্ন দেশে জ্বালানি সংকট শুরু হল। ইজরায়েল ইরানের সাউথ পারস গ্যাস ভাণ্ডারে আক্রমণ চালানোর পর ইরান কুয়েত, বাহরিন, সৌদি, কাতার, আমিরশাহীর গ্যাস ভাণ্ডার ও তেল শোধনাগার গুলি ক্ষতবিক্ষত করে জ্বালানি সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিল। ইতিমধ্যে এপস্টেইন ফাইলের আরও একাংশ প্রকাশিত হয়ে অন্য প্রভাবশালীদের সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কুকীর্তি বেশি করে প্রকাশ্যে এল।
এই গুলির অনেকটাই আমাদের ‘ মধ্য প্রাচ্যের সংকট, উত্তেজনা ও যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি ‘ (৩ মার্চ) ও ‘ ইরান কি অজেয় ‘ (৬ মার্চ) প্রবন্ধে আমরা আলোচনা করেছি। কিন্তু একটি বিষয়ে আমরা লক্ষ্য করছিলাম যে ১৯৯০ – ‘৯১ এর উপসাগরীয় যুদ্ধে (অপারেশন ডেজার্ট স্টর্ম) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পারস্য উপসাগর ও লোহিত সাগরে কয়েকটি অত্যাধুনিক রণতরী নিয়ে গিয়ে মুহুর্মুহু বিমান হানা চালিয়ে সাদ্দাম হোসেনের শক্তিশালী ইরাককে বিধ্বস্ত ও পরাজিত করে। এবার কিন্তু ওমান সাগরে ইউ এস এস আব্রাহাম লিঙ্কন, লোহিত সাগরে ইউ এস এস জেরাল্ড ফোর্ড এবং ভূমধ্যসাগরে ইউ এস এস আইসেনআওয়ার বৃহৎ রণতরীগুলি নিয়ে গেলেও Operation Epic Fury তে এখন অবধি ইরানের উপর সর্বাত্মক আঘাত হানেনি, নাকের ডগায় ইরানের গুরুত্বপুর্ণ বন্দর – আব্বাস দখল করে নি কিংবা হরমুজের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পারস্য উপসাগরে ঢোকার চেষ্টা করে নি।
নিজের স্বার্থে ও সমস্যায় অন্যদের জড়াও: ইরান যেমন যুদ্ধকে প্রলম্বিত করে সমগ্র মধ্য প্রাচ্যে ছড়িয়ে দিয়ে এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট সৃষ্টি করে ও জ্বালানির দাম বাড়িয়ে মার্কিন – ইজরায়েলের উপর যুদ্ধ থামানোর চাপ সৃষ্টি করতে চাইছিল, তার সঙ্গে রুশ ও চিনা সহায়তা নিশ্চিত করতে চাইছিল। অন্যদিকে মার্কিনের ট্রাম্প প্রশাসন এপস্টেইন ফাইল সহ দেশের মধ্যেকার বিরোধ গুলি থেকে মনোযোগ সরানোর পাশাপাশি এই যুদ্ধকে প্রলম্বিত করে অন্যান্য দেশগুলিকে জড়াতে চাইছিল, সংকট সৃষ্টি করে তেলের জোগান ও বিক্রি নিয়ন্ত্রণ করে আরও মুনাফা করা, রাশিয়া ও চিনের সঙ্গে নানাবিধ বোঝাপড়া করে তাদের নিবৃত্ত রাখা এবং ইরান সামরিকভাবে আরও দুর্বল হয়ে পড়লে তারপর সরাসরি আক্রমণ চালানোর পরিকল্পনা করে যুদ্ধকে প্রলম্বিত করছিল।
পরিকল্পনা সবসময় কার্যক্ষেত্রে পুরোপুরি খাটেনা। কিন্তু এটি ঘটনা ক্ষয়ক্ষতির নিরিখে ইরান খুবই বাজে অবস্থায় পৌঁছে গেছে। জ্বালানি সংকট সৃষ্টি হলেও বিশ্ব অর্থনীতি ভেঙে পড়েনি। মধ্য প্রাচ্যের অন্য দেশগুলি আক্রান্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তারা যুদ্ধে জড়ায় নি। ন্যাটোভুক্ত স্পেন যুদ্ধের প্রবল বিরোধিতা করেছে। ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি সহ ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও নর্ডিক দেশগুলি, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া প্রমুখকে যুদ্ধে জড়ানো যায় নি। সম্প্রতি ব্রিটেন ও জাপান হরমুজ প্রণালী খোলার ক্ষেত্রে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার ইনডো – প্যাসিফিক কমান্ড এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উভচর রণতরী ইউ এস এস ত্রিপোলি কে জাপান থেকে এবং ২৫০০ মেরিন কমান্ডো কে ইরান সমীপে নিয়ে আসছে, সেইসঙ্গে ইরানের উপকূলীয় প্রতিরোধ কাঠামোয় আক্রমণ শুরু করেছে। ইজরায়েলের সঙ্গে আক্রমণ করেছে ইরানের নাতাজ পরমাণু কেন্দ্র । ট্রাম্প ইরানকে দুদিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালী খুলে দিতে বলেছেন নইলে ইরানের সমস্ত শক্তিকেন্দ্র ধ্বংস করে দেবেন। ইরান পাল্টা জানিয়েছে যে হরমুজ প্রণালী খোলা আছে শত্রুদের জাহাজ বাদ দিয়ে, আর মার্কিন যদি তাদের শক্তিকেন্দ্রগুলিতে বোমা ফেলে তাহলে মার্কিন ও মার্কিন মিত্রদের কিছু আস্ত রাখবে না। যুদ্ধের তিন সপ্তাহ অতিক্রান্ত, আগামী তিন সপ্তাহ খুব গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে। অন্যদিকে তাইওয়ানকে ঘিরে চিনের তৎপরতা, উত্তর কোরিয়ার নতুন করে দূর পাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইল পরীক্ষা এবং দক্ষিণ কোরিয়া থেকে মার্কিনের কিছু মিসাইল প্রতিরোধ ব্যবস্থা সরিয়ে নেওয়া পূর্ব দিগন্তেও আশঙ্কার জন্ম দিয়েছে। মার্কিনের ইরান মনোযোগ রাশিয়ার আক্রমণের মুখে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনেস্কি কেও অসহায় করে তুলেছে।
ইরানের প্রত্যাঘাত: এখন অবধি মার্কিন ও ইজরায়েলের বিমান আক্রমণ প্রতিহত করতে না পারলেও সমান তালে ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে প্রতি আক্রমণ চালিয়ে যাওয়া ইরানের কয়েকটি অনন্য বৈশিষ্ট্য নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা আজকের প্রতিবেদনের বিষয়।
১) প্রবল প্রতিরোধের মানসিকতা: বিশ্বের প্রাচীনতম ও ধারাবাহিক সভ্যতা; আভিসেনা, আল – খাওয়ারিজমি, আল – বিরুনি, রাজি, ওমর খৈয়াম, ফিরদৌসি থেকে মারিয়াম মিরজাখানি, পার্দি সাবাতি, কারো লুকাস প্রমুখ বিশ্ববরেণ্য পন্ডিতশ্রেষ্ঠদের কর্মক্ষেত্র; উৎকৃষ্ট গালিচা, সাহিত্য, স্থাপত্য, গোলাপ, আঙুর, সুরা, সুন্দর নারী পুরুষদের দেশ পারস্য কিভাবে জুরথ্রুস্ট থেকে ইসলাম হল; সাফাভিদ সাম্রাজ্যে শিয়া হয়ে গেল; কিভাবে পারস্যের নবজাগরণ (Intermezzo) ঘটল সেসব আলোচনায় যাচ্ছি না। কিন্তু দেখা গেছে নবী হজরত মহম্মদের উত্তরসূরী নিয়ে দ্বন্দ্বে বৃহৎ প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে মহম্মদের খুড়তুতো ভ্রাতা ও জামাতা আলি এবং আলির দুই পুত্র হাসান ও হোসেইনের প্রবল প্রতিরোধের মধ্যে মদিনা ও কারবালায় ‘ শাহাদাত ‘ অর্থাৎ ‘ শাহীদ ‘ হওয়া নবীর বংশধর ‘ বারো ইমামের অনুসারী (Ithna Asharis) ‘ , যে ইমামদের ১১ জনই তাদের ভাষ্যে ‘ শাহীদ ‘, পারস্যের রক্ষণশীল ও কট্টর শিয়া ইসলামপন্থীদের প্রধান মতাদর্শগত অনুপ্রেরণা। যুগে যুগে পারস্যের শিয়া সম্প্রদায় আরব, মোঙ্গল সহ আক্রমণকারী এবং প্রতিদ্বন্দ্বী সুন্নি খিলাফতের শাসকদের কাছে প্রবল নিগৃহীত হয়েছেন যা তাঁদের এই প্রতিরোধের মানসিকতাকে (Ideology of Resistance) কে বৃদ্ধি করেছে। আধুনিক যুগেও প্রথমে বৃটিশ, পরে মার্কিন এবং তাদের সঙ্গীদের থেকে বারংবার আক্রমণ ও নিষেধাজ্ঞার (Sanctions) মধ্যে কঠোর জীবনযাত্রা ইরানিদের মানসিকভাবে এত দৃঢ় করে তুলেছে।
২) উন্নত নিজস্ব শিক্ষা ব্যবস্থা: ইরান আফগানিস্তান নয়। ইরানে সব কিছু শিয়া ইসলামি ধর্মে সংপৃক্ত হলেও রয়েছে এক নিজস্ব উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থা। ইরানে ধর্মীয় – সামরিক শাসন ব্যবস্থায় গণতন্ত্র, ব্যক্তি স্বাধীনতা, নারী স্বাধীনতা, জনজাতি স্বাতন্ত্র্য ইত্যাদি দমিত হলেও শিক্ষার হার ভালো। নারী শিক্ষার হার ৮৩% যা সমগ্র মধ্য প্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলির মধ্যে সর্বাধিক। ধর্মীয় পিতৃতন্ত্রের আধারে হিজাব – বোরখা সহ মহিলাদের কঠোর পোশাক নীতি ও আচরণের ফতোয়ার মধ্যেও কর্মস্থলে নারীর সংখ্যা প্রচুর। বিশ্ববিদ্যালয় গুলিতে ছাত্রী ৬০%। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ইঞ্জিনিয়ারিং, গণিত, পদার্থবিদ্যা, রসায়ন প্রভৃতি চর্চা ও গবেষণায় তাঁরা পুরুষদের সমকক্ষ। ১৯৭৯ এর ইসলামি বিপ্লবের সময় যে জঙ্গী ছাত্রদল মার্কিন দূতাবাস ৪৪৪ দিন দখল করে ৫২ জন মার্কিন কূটনীতিককে আটকে রেখেছিলেন তাঁর নেত্রী ছিলেন মার্কিন মুলুকে ছয় বছর পড়াশুনা করা Immunology বিশেষজ্ঞা মাসুমে এবতেকার যিনি ২০১৩ – ‘২১ ইরানের স্বাস্থ্য ও পরিবেশ মন্ত্রী এবং ২০১৭ – ‘২১ ইরানের ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। উন্নত শিক্ষার কারণে সামরিক ও পারমাণবিক গবেষণাতেও ইরান এগিয়ে।
৩) তীব্র পশ্চিম ও মার্কিন বিরোধিতা: প্রথমে ব্রিটিশ সহযোগিতা ও পরে মার্কিন সহযোগিতায় ১৯২৫ থেকে ১৯৭৯ অবধি জনবিরোধী অত্যাচারী শাহ্ পহলবী শাসনে ইরানের সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ ছিলেন। এর উপর ১৯৫৩ তে নির্বাচিত জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী মহম্মদ মোগাদ্দেসকে, যিনি ইরানের তেল শিল্পের জাতীয়করণ, ভূমি সংস্কার প্রভৃতি জনমুখী উদ্যোগ নেন, ষড়যন্ত্র করে অপসারিত ও বন্দী করা তাঁদের আরও ক্ষিপ্ত করে। ১৯৬৩ থেকে শাহ্ পাশ্চাত্যের অনুকরণে যে সংস্কারগুলি (White Revolution) শুরু করেন আয়াতোল্লা রহুল্লা খোমেনির নেতৃত্বে কট্টর শিয়া ধর্মগুরুরা এর তীব্র বিরোধিতা করেন। গ্রেফতার এড়াতে খোমেনি ইরাক, তুরস্ক হয়ে ফ্রান্সে চলে গেলে উত্তর পূর্ব ইরানের ধর্মীয় শহর মাহসাদের আয়াতোল্লা আলি খামেনি সহ অন্য ধর্মগুরুরা নেতৃত্ব দেন। যা একসময় প্রবল জনপ্রিয়তা,
বিপরীতে মার্কিন – শাহ্ বিরোধিতা অর্জন করে ১৯৭৯ তে ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতা হাত বদল করে। বামপন্থী ও গণতান্ত্রিকরা সেই ইসলামি বিপ্লবে যোগ দিলেও আয়াতোল্লা খোমেনির নেতৃত্বে ইসলামি মৌলবাদীরা ক্ষমতায় এসে অচিরেই তাদের কোতল করে। তারপর থেকে মার্কিনের ধারাবাহিক ষড়যন্ত্র, ছায়া যুদ্ধ, যুদ্ধ ও কঠোর নিষেধাজ্ঞা মার্কিনের বিরোধিতায় ইরানের মানুষদের যেমন এক অনমনীয় মানসিকতার জন্ম দেয়, ইসলামি শাসকদেরও ক্ষমতা সংহত করতে সাহায্য করে। কিছু পাশ্চাত্যমুখী ইরানি বাদ দিয়ে বাকিরা মনে করেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শয়তানের কারখানা, মধ্য প্রাচ্যে ইজরায়েল তার স্তম্ভ এবং অন্য মার্কিন অনুগত ইসলামি দেশগুলি মার্কিনের দাস।
৪) শক্তিশালী ধর্মীয় – সামরিক কাঠামো: এটি ১৯৮০ – ‘ ৮৮ অবধি ইরানের উপর চাপিয়ে দেওয়া ইরাক যুদ্ধ এবং তারপর থেকে মার্কিন, ইজরায়েল ও সৌদির ধারাবাহিক ছায়া ও সরাসরি যুদ্ধের কারণে; বিপরীতে রাশিয়া, চিন ও উত্তর কোরিয়ার সাহায্যে শক্তিশালী ও সংহত হয়ে ওঠে। ইরানের রয়েছে শক্তিশালী সেনাবাহিনী (Artesh)। পদাতিক, নৌ, বিমান বাহিনী ও Air Defense Force নিয়ে তার সংখ্যা ৪,২০,০০০। এছাড়াও অন্যান্য বিশেষ ও আধা সামরিক বাহিনী গুলি থাকলেও সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ও ক্ষমতাশালী Islamic Revolutionary Guard Corps (IRGC) যার সৈন্য সংখ্যা ২ লক্ষ। এর প্রধান তিন বিভাগ: (ক) Qud Force যারা বিদেশে অপারেশন করে এবং একসময় দুর্ধর্ষ জেনারেল কাশেম সোলেমানির পরিচালনায় ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, গাজা, ওয়েস্ট ব্যাংক, ইয়েমেন, সুদানের সরকার ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলিকে নিয়ে ইজরায়েল কে ঘিরে ফেলেছিল। (খ) Basij: যারা আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার দায়িত্বে এবং ইসলামি শাসনে ইরানের প্রতিটি সরকার বিরোধী, গণতান্ত্রিক, নারী ও ছাত্র আন্দোলন নির্মমভাবে দমন করেছে। (গ) Aerospace Force: যাদের হাতে ইরানের বিখ্যাত ক্ষেপনাস্ত্র ও ড্রোনের ভাণ্ডার। প্রতিটি সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনীর নিজস্ব কমান্ড ব্যবস্থা ও স্তর থাকলেও তারা পৃথকভাবে দেশের সর্বোচ্চ নেতার, বর্তমানে আহত হয়ে আত্নগোপন করে থাকা মোজতবা খামেনি, সরাসরি অধীনে। দেশের ৮৮ সদস্যের ধর্মীয় গুরুদের ‘ Assembly of Experts ‘ সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত করে। দেশের নিরাপত্তার সর্বোচ্চ সংস্থা ‘ নিরাপত্তা পরিষদ ‘ যার বর্তমান সদস্য Supreme Leader মোজতবা খামেনি, প্রেসিডেন্ট কার্ডিও – থোরাসিক সার্জন মাসুদ পেজেসকিয়ান এবং তাত্ত্বিক, দার্শনিক, সামরিক ও রাজনৈতিক প্রধান আলি লারিজানি যাকেসম্প্রতি ইজরায়েল IRGC প্রধান গোলামরেজা সোলেমানি, গোয়েন্দা প্রধান এসমাইল খতিব, আই আর জি সি মুখপাত্র মহম্মদ নাইনি র সঙ্গে হত্যা করেছে। সংস্কারপন্থী প্রেসিডেন্ট পেজেসকিয়ানের চাইতে ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাগাচিকে ইরানি মেডিয়াতে বেশি দেখানো হচ্ছে।
৫) বিকেন্দ্রিভূত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (Mosaic Defence System): মার্কিন – ইজরায়েলের সঙ্গে দীর্ঘ প্রায় ৫০ বছরের যুদ্ধ চালানোর অভিজ্ঞতা এবং একের পর এক ধাক্কা বিশেষত মোসাদ কর্তৃক প্রচুর রাষ্ট্র নেতা, জেনারেল ও পরমাণু বিজ্ঞানীকে হত্যা করার পর ইরান দেশের ৩১ টি প্রদেশ সহ বিভিন্ন অঞ্চলে স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা কে ছড়িয়ে দিয়েছে। ফলে তেহরান, ইসফাহান, হামাদান, সিরাজ, তাবৃজ, কোম, বুশের, মাহাসাদ, মিনাব, চাবাহার প্রভৃতি বড় শহরের সামরিক ঘাঁটি গুলি আক্রান্ত হলেও ইরান দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ক্ষেপনাস্ত্র প্রতি আক্রমণ চালিয়ে যেতে পারছে। আপৎকালীন এই পর্যায়ে সমন্বয়কারী নেতৃত্ব দিচ্ছে Unified Combatant Command (Khatam Al Anbiya) যা এখন প্রবীণ জেনারেল মহম্মদ আলি জাফরি, তরুণ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এব্রাহিম জোলফিগারি দের সম্মিলিত নেতৃত্বে কাজ করছে।
৬) অপ্রতিসম যুদ্ধ কৌশল (Asymmetric War Strategy): ইরান জানে সে মার্কিন ও ইজরায়েলের সম্মিলিত বিমান ও নৌবাহিনীর এবং সামরিক প্রযুক্তির সমকক্ষ নয়। তাই যেখানে সে এগিয়ে সেই লক্ষ্যভেদী মিসাইল ও কামিকাজে ড্রোন ভান্ডারকে শক্তিশালী করে গেছে। প্রায় ৩০০০ মাঝারিপাল্লার সুপারসনিক ক্ষেপনাস্ত্র ও ড্রোন ছুঁড়ে ইতিমধ্যেই সে ২৭ টি মার্কিন ঘাঁটি, ইজরায়েল এবং বাহরিন, সৌদি, কাতার, ওমান, আমির শাহী জর্ডানের নাভিশ্বাস তুলে দিয়েছে। এমনকি সুদূর সাইপ্রাসের ব্রিটিশ ঘাঁটি, তুরস্ক ও আজেরবাইজান কে আক্রমণ করেছে। এবার সে দূর পাল্লার (২০০০ – ৪০০০ কিমি) হাইপারসোনিক (শব্দের ৫ থেকে ১৫ গুণ অবধি) ভারী payload এর ঘূর্ণায়মান ব্যালাস্টিক সেজ্জিল ও হজ কাশেম ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়তে শুরু করেছে তার ৭২ তম ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণ পর্বে। পাহাড়, জঙ্গল ও মরুভুমির অভ্যন্তরে লুকোনো শহর ও ঘাঁটি গুলিতে এগুলির মত শাহাব, খোরামসার, খাইবারসেকাম, ফাতাহ্ প্রমুখ ভয়ংকর সব ক্ষেপণাস্ত্র কয়েক হাজার থরে থরে সাজানো আছে। এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলি আটকাতে মার্কিন ও ইজরায়েলি আয়রন ডোম ও থাড প্রতিরক্ষা (Interception) ব্যবস্থা হিমশিম খাচ্ছে।
৭) পরমাণু প্রক্রিয়াকরণ (Nuclear Enrichment) : ইরান নাতাজ, ফোর্ডো, বুশের, ইসফাহান, আরাক, পারচিন পাহাড়ের অভ্যন্তরে ও মাটির তলায় লুকোনো ও সংরক্ষিত পরমাণু কেন্দ্রগুলিতে পরমাণু প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে পরমাণু বোমা তৈরি করছে। ইজরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সাবোতেজ চালিয়ে বা বোমা ফেলে এগুলি ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারলেও কিছুতেই বন্ধ করতে পারে নি। ইরাক ও সিরিয়ার ক্ষেত্রে ১৯৮১ তে তারা এক বিমান হানায় সমস্ত পারমাণবিক কার্যক্রম ধ্বংস করতে পেরেছিল।
৮) ছোট ছোট কমিকাজে নৌ যুদ্ধের দ্রুতগামী বোট তৈরি করে হরমুজ প্রণালী ও পারস্য উপসাগরে দাপিয়ে বেড়ানো, মাইন বিছানো, শত্রু জাহাজকে আক্রমণ করা। ছোট সাবমেরিন থেকে টর্পেডো ছোঁড়া। সাগর যুদ্ধে একাধিক নৌসেনার ও বাণিজ্য জাহাজে আগুন লাগা ও ডুবে যাওয়ার কারণে সমুদ্র দূষণের পাশাপাশি সাগর তল দিয়ে যাওয়া cable network ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভবনা। আরব সাগরে পাকিস্তানের বালুচিস্তানে চিন অধিকৃত গদ্বর বন্দরের পাল্টা ভারত ইরানের সিস্তান – বালুচিস্তানে চাবাহার বন্দরে যে অধিকার পেয়েছিল এবং এর মাধ্যমে ইরান ও আফগানিস্তানের সঙ্গে সংযোগ রাখতে পারছিল মার্কিন ভয়ে ছেড়ে চলে আসে। চিন কিন্তু গদ্বর ছাড়াও এই অঞ্চলে জিবুতিতে নৌ ঘাঁটি বানিয়ে অবস্থান করছে। হরমুজ প্রণালীতে এতকিছুর মধ্যেও কেবলমাত্র চিনা জাহাজ অনায়াসে যাতায়াত করতে পারছে। মার্কিন ও ইজরায়েলের বিরুদ্ধে চিন ও রাশিয়া সরাসরি যুদ্ধে না জড়িয়েও ইরানকে সাহায্য করে চলেছে।
৯) প্রতিরোধের অক্ষ (Axis of Resistance) গড়ে তোলা: রাশিয়ার সাহায্য নিয়ে ইরানের কাড বাহিনী ইরাকে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী ছাড়াও লেবাননে শক্তিশালি হিজবোল্লা সেনাবাহিনী গড়ে পশ্চিমে ভূমধ্যসাগর অবধি মুক্তাঞ্চল গঠন করে এবং মধ্য প্রাচ্যে মার্কিন ও ইজরায়েলি লক্ষ্যবস্তু গুলিকে আঘাত হানতে থাকে, সিরিয়ার শিয়া আসাদ সরকারকে মার্কিন ও ইজরায়েলি আক্রমণ থেকে টিকে থাকতে সাহায্য করে এবং মার্কিন ও ইজরায়েলকে প্রতিরোধে সাফল্য গাজা, ইয়েমেন, বাহরিন, সৌদি, সুদানের সশস্ত্র সুন্নি গোষ্ঠী গুলিকেও ইরানের কাছে নিয়ে আসে। ইরান লোহিত সাগরে হুথি দের মাধ্যমে প্রভাব বাড়ায় এবং প্যালেস্টাইনের হামাস কে দিয়ে ইজরায়েল আক্রমণ করায়। লেবাননের যুদ্ধে দক্ষিণ লেবানন থেকে হিজবুল্লাহ ও আইআরজিসি ইজরায়েল কে একটা সময় পিছু হটতে বাধ্য করে। পরে ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়া সিরিয়া থেকে ঘাঁটি গুলি তুলে নেওয়ায় এবং ইজরায়েল ও মার্কিনের জোরালো আক্রমণ ২০২৪ থেকে পরিস্থিতির পরিবর্তন আনে। ১৯৭৯ পর্যন্ত ইরানের সঙ্গে মার্কিন ও ইজরায়েলের সুসম্পর্ক ছিল, কিন্তু ইসলামি বিপ্লবের পর শুরু হয় যুযুধমান দুই ধর্মের দুই দেশের মধ্যে অবিরত ছায়া যুদ্ধ এবং ২০২৪ থেকে সরাসরি যুদ্ধ।
১০) ইরানের অর্থনীতির মূল তেল বিক্রি যা National Iranian Oil Company এর মাধ্যমে (সৌদি Aramco এর পর বিশ্বের সর্ববৃহৎ) ইরানের ধর্মীয় – সামরিক কাঠামো আইআরজিসি নিয়ন্ত্রণ করে। পশ্চিমী নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও চিনকে ৮০% তেল বিক্রি করে ইরান ধনী। এছাড়াও ইরানের তথাকথিত দাতা ও সমাজসেবী সংস্থাগুলির (Bonyads), যেমন Mastafaran Foundation, মাধ্যমে ঘুরপথে বিভিন্ন দেশকে তেল বিক্রি করা হয়। বিভিন্ন সূত্রে এই সংস্থাগুলি ইরানের ২০% জিডিপি অর্জন করে। তেলের মুনাফায় আইআরজিসি ও Bonyads গুলি দেশে – বিদেশে নামে – বেনামে নির্মাণ, হোটেল, শিল্প প্রভৃতিতে লগ্নী করেও প্রচুর আয় করে। রাশিয়াকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন বিক্রি করেও প্রচুর অর্থ এবং পরিকাঠামোগত ও সামরিক – অসামরিক লজিস্টিকস সুবিধা অর্জন করে। এছাড়া ডলার কে এড়িয়ে চিনা ইউয়ান, ক্রিপ্টো কারেন্সি, হাওলা প্রভৃতির মাধ্যমেও ইরান সমান্তরাল যুদ্ধ অর্থনীতি চালাতে সক্ষম হয়।
পরিশেষে নয় আপাতত: ট্রাম্প প্রশাসন একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী ইহুদি লবি, রক্ষণশীল শ্বেতাঙ্গ চার্চ ও যুদ্ধাস্ত্র শিল্পের চাপে, অন্যদিকে ইজরায়েলের প্ররোচনায় এবং গাজায় রিয়াল এস্টেট ও ইরানের তেল নিয়ে নিজের পরিবার ও জামাতা জেরাদ কুশনারের ব্যবসার লোভে, সেইসঙ্গে নিজের নতুন করে প্রকাশ পাওয়া নাবালিকাদের ধর্ষণের অপরাধ চাপা দিতে এই যুদ্ধে জড়িয়েছে। কিন্তু ইজরায়েল ও ইরানের কাছে এই মারণ যুদ্ধ অস্তিত্বের প্রশ্ন। ইজরায়েল জানে প্রবল ইহুদি বিদ্বেষী এবং সামরিক দিক দিয়ে অত্যন্ত শক্তিশালী ইরান যদি পরমাণু বোমা তৈরি করে ফেলে তাহলে তাদের অস্তিত্বের সংকট। আবার ইরান জানে প্রবল ইসলাম বিদ্বেষী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েল যদি তাদের ধর্মীয় – সামরিক কাঠামো ধ্বংস করে দিতে পারে তাহলে আগামী দিনে ইরাকের মত গোলামি করতে হবে। তাই ইরান এবং ইজরায়েলের মধ্যে একজন বিজয়ী আরেকজন পরাজিত না হলে এই যুদ্ধ থামবার নয়। অমীমাংসিত বা Cease fire হলে পুনরায় যুদ্ধের সম্ভাবনা।
পুনশ্চ: খবরে প্রকাশ গত দুদিনের সফল আলোচনার ভিত্তিতে ট্রাম্প ইরানের শক্তিক্ষেত্র আক্রমণ পাঁচ দিন বন্ধ রাখছেন। ইরানের সংবাদ মাধ্যম বলেছে মার্কিনের সঙ্গে কোন আলোচনা হয়নি, ভয় পেয়ে শয়তান পিছিয়েছে, তেলের দাম কমানো একটা কারণ এবং কিছুটা রণকৌশলগত সময় নেওয়া।
২৩.০৩.২০২৬










