“অভয়া” আমাদের মাঝে আর নেই। এই সমাজের গর্ভ থেকেই জন্ম নেওয়া কিছু পশু নৃশংসভাবে তাঁকে ধর্ষণ ও হত্যা করে আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে ২০২৪-এর ০৯ ই আগস্ট! দীর্ঘ সময় পার হয়ে চলেছে… এখনও নরাধমদের শাস্তি দেওয়া যায় নি। এই বর্বর পশুগুলি এখনও আমাদের সমাজে আছে। তাই তো অভয়া’র মতো শত শত অভয়া এখনও হয়ে চলেছে।
অভয়া’র ন্যায়বিচারের দাবী, মেয়েদের সুরক্ষা, নিরাপত্তার দাবী, লিঙ্গ বৈষম্য অবসানের দাবীতে জলপাইগুড়ি অভয়া মঞ্চ লড়াই – আন্দোলনের পথে আছে, থাকবেও।
আমরা মনে করি, শুধু মনে করাই নয়, আসলে বিশ্বাস করি, শুধুমাত্র রাজপথে মিছিল, সভা, সমিতি করে, শ্লোগান তুলে বর্তমান অভয়া দের সামনে একটা সুন্দর- সুস্থ পরিবেশ আনা যাবে না। সমাজের একেবারে ভেতরের জগদ্দল মতো থাকা পরিস্থিতির যদি গুণগত উত্তরণ ঘটানো না যায় তাহলে ঐরকম বীভৎস, নৃশংস ঘটনা বারংবার ঘটতে থাকবে। মানুষ হিসেবে একটি মেয়েকে দেখবার, প্রতিষ্ঠিত করবার লড়াইয়ে আমরা আমাদের সীমিত ক্ষমতা নিয়ে পথে আছি, এবং থাকবোও।
এই ভাবনা নিয়েই আমরা শিরীষতলা ওয়েলফেয়ার অর্গানাইজেশনের সাথে একসাথে শুরু করেছি, “অভয়া পাঠশালা”। চলছে পাঠশালা। হ্যাঁ, এটা ঠিক, অভয়া পাঠশালা চলতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছে, কিন্তু তাও চলছে। এবার আমরা, “নির্মলা ফুটবল কোচিং ক্যাম্প” এর সাথে একসাথে শুরু করতে চলেছি এক নতুন পথের লড়াই। শুরু হতে চলেছে “অভয়া ফুটবল কোচিং ক্যাম্প”। জলপাইগুড়ি শহর সন্নিহিত শতাব্দী প্রাচীন ডেঙ্গুয়াঝাড় চা বাগানের হাসপাতাল সংলগ্ন মাঠে আগামী ০৮ ই আগস্ট ২০২৬ আমরা সবাই মিলে স্মরণ করবো চলে যাওয়া ‘অভয়া’কে, নতুন অভয়াদেরকে নিয়ে। ৭০ জনের মতো মেয়ে, যারা থাকে ঐ চা বাগানের শ্রমিক মহল্লার স্বল্প পরিসর ঘরে, যারা আসবে আশেপাশের বস্তি এলাকা থেকে। কেউ ওঁরাও, কেউ মুন্ডা, কেউ সাঁওতাল, কেউ বা নাগেশিয়া, কেউ রাজবংশী, কেউ আবার বর্ণ হিন্দু – বিভিন্ন পিছিয়ে থাকা জনজাতির, সম্প্রদায়ের মেয়েরা আসবে আমাদের ক্যাম্পে। এই ফুটবল কোচিংয়ের কোচ ঠিক হয়েছে। বিনা পারিশ্রমিকে আমাদের কোচ শ্রী শংকর সিনহা প্রশিক্ষণ দেবেন। সেন পাড়া নিবাসী নির্মলা কোচিং ক্যাম্পের শ্রী অমিত রায়, তার সাথীদের নিয়ে যুক্ত হয়েছেন। যৌথ সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগামীতে জলপাইগুড়ি অভয়া মঞ্চের মহিলা ফুটবল টীম তার নিজস্ব পরিচয় নিয়ে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় খেলবে, ঐ মেয়েরা, আজকের অভয়ারা প্রতিষ্ঠিত হবে। এটাই তো আমাদের স্বপ্ন।
আগামী ০৮ আগস্ট ডেঙ্গুয়াঝাড় চা বাগানের খেলার মাঠে সারাদিন ব্যাপী এক টুর্নামেন্টের মধ্য দিয়ে শুরু হবে এই কোচিং ক্যাম্পের। ঐ দিন ০৮ টি টীম অংশগ্রহণ করবে। সবাই সেদিন ঐ বাগানের খেলার মাঠে, খেলা শেষে পাত পেড়ে খাবে। ঐ দিন অনুষ্ঠানের শুরুতে আমরা আমাদের খেলোয়াড়দের ও উপস্থিত ক্রীড়ামোদীদের অভয়া’র যন্ত্রণার কথা তুলে ধরবো, দীর্ঘদিন ধরে তার বিচার না পাওয়ায় যন্ত্রণার কথা বলবো। শুধু অভয়া নয়, তামান্না, রুমি…… অভয়া’র মতো যারা চলে গেছেন, তাঁরা কেনো এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হলেন….. সেই কথা তুলে ধরে প্রতিবাদের বৃত্তের পরিধি বাড়িয়ে নিতে বদ্ধ পরিকর। আমাদের সাধ্য ও ক্ষমতা সীমিত, আমরা জানি, কিন্তু আমাদের বিশ্বাসের জায়গাটা অসীম। শুধুমাত্র এই অসীম বিশ্বাসের জায়গাটাকে মূলধন করেই আমরা এগোবো।
জলপাইগুড়ি অভয়া মঞ্চের প্রতিটি সদস্য, সদস্যাদের কাছে একটা বার্তাই পৌঁছে দিতে চাই, আপনারা ঐ দিন ঐ ডেঙ্গুয়াঝাড় চা বাগানের মাঠে আসুন। উৎসাহ দিন আজকের অভয়াদের। এই বছর নয় তারিখের আনুষ্ঠানিক অভয়া শ্রদ্ধা-স্মৃতি তর্পণ হবে ০৮ ই আগস্ট সারাদিন জুড়ে। সকলের উপস্থিতি, অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে সমষ্টিগত আকাশছোঁয়া স্পর্ধা আর জেদ নিয়ে আমরা বিকল্প গঠনমূলক লড়াইয়ের পথ প্রশস্ত করবো।
প্রতিবাদ, প্রতিরোধের চেনা ছকের বাইরে বেরিয়ে, আগামীর শাণিত চেতনার প্রতিবাদী অভয়া সৃষ্টির লড়াইয়ে আপনি নিশ্চল, নিশ্চুপ থাকবেন না। আমাদের এই বিকল্প ভাবনার কথা, তার প্রয়োগের কর্মসূচির কথা সমাজ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিন। আমাদের অভয়া মঞ্চের বিভিন্ন শাখা, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, তাদের কাছেও বিনম্র আবেদন, ঐ দিন আপনারাও আসুন, আমাদের পাশে এসে দাঁড়ান। এরপর থেকে প্রতিদিন বিকেল বেলা মাঠে যখন আমাদের অভয়া ফুটবল টীমের মেয়েরা এসে অনুশীলন করবে, তাদের হাতে পানীয় জলের গ্লাস, ছোলা- গুড় তুলে দিতে আমি, আপনি, সকলকে যেতে হবে তো। জলপাইগুড়ি অভয়া মঞ্চ এই যে নতুন রূপের প্রতিবাদী লড়াইয়ের ডাক দিচ্ছে, তাতে সাধারণ মানুষদের যুক্ত করে লড়াইয়ের ক্ষেত্রকে প্রসারিত করতে আপনাকে আসতেই হবে – এটাই তো ঘটমান কঠিন সময়ের ডাক!











