মামুনি কীভাবে আমাদের পরিবারকে একসাথে বেঁধে রেখেছিল, আগেই বলেছি। এর পেছনে একটা কারণ ছিল। ঠাকুমা মারা যাবার পর আমাদের পরিবারটা যেন হঠাৎ ভিত হারিয়ে ফেলল — একটু ছন্নছাড়া, dysfunctional। ঠাকুরদা ডুবে গেলেন আধ্যাত্মিকতায়, নিজের জগতে সরে গেলেন। জেঠু মায়ের শোকে পাঁচ বছরের জন্য উধাও হয়ে গেলেন অজ্ঞাতবাসে — কোথায়, কীভাবে কাটল সেই বছরগুলো, কেউ জানত না। অবশ্য শেষমেশ ফিরেও এলেন। এই ভাঙাচোরা পরিবারে মামুনি এসে হাল ধরল শক্ত হাতে, নিজের কাঁধে তুলে নিল সংসারের ভার। তবে বোহেমিয়ান জেঠুকে বশে আনা মোটেই সহজ ছিল না। একবার না বলে-কয়ে জেঠু তিনদিন হাপিস, ফিরে এলেন যখন, মামুনি এক ফোঁটাও রেয়াত না করে জেঠুর আলমারিতে সযত্নে জমিয়ে রাখা দামি হুইস্কির বোতলটা ঢেলে দিল বাথরুমের বেসিনে — কোনো ভাষণ নয়, কোনো তর্ক নয়, শুধু নীরব একটা শাস্তি। তবে বাবা ছিল একেবারে অন্যরকম, ছিল যেন মামুনির নিজের ছেলে। জেঠুর প্রভাবে মামুনি নাস্তিক হয়েছিল ঠিকই, তবু প্রতি রাতে শুতে যাবার আগে নিজের বাবা, মা,ঠাকুরদা, জেঠু আর বাবার ছবির সামনে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে প্রণাম করে নিত — যুক্তি আর ভক্তির মধ্যে এক আশ্চর্য আপস।
একটা গল্প বলি।
বাবা চলে গেছে তখন প্রায় চার বছর। আমার বয়স বারো। সপরিবারে, জেঠুর এক বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে আমরা বেরিয়ে পড়েছিলাম কেদার-বদ্রী যাত্রায়। সে আমলে কেদারনাথ পৌঁছাতে হাঁটতে হতো প্রায় ১৪ কিলোমিটার, ঘণ্টার হিসেবে প্রায় আটটা ঘণ্টা। রাস্তায় তখন আজকের মতো ভিড় ছিল না। অক্টোবরের মাঝামাঝি, লক্ষ্মী পূর্ণিমার দিন — পাহাড়ি পথ প্রায় জনশূন্য, নিঃঝুম। এর কিছুদিনের মধ্যেই মন্দিরের দরজা বন্ধ হয়ে যাবে বেশ কয়েক মাসের জন্য; পুরোহিতরা, স্থানীয় বাসিন্দারা সবাই নেমে যাবেন সমতলে। তীর্থযাত্রীও হাতে গোনা। অনেকটা পথ হাঁটার পর কালেভদ্রে চোখে পড়ে একটা-দুটো চায়ের গুমটি, তাও সব সময় খোলা থাকে না। শেষ এক ঘণ্টাটা আমরা আটকে গেলাম এক ভয়াবহ তুষারঝড়ের মধ্যে — বরফের কণা যেন সূচের মতো মুখে বিঁধছে, বাতাসের হুইহুই শব্দে কানে তালা লেগে যাচ্ছে, আর এমন ঘন তুষারপাত যে পাশের মানুষটাকেও চোখে দেখা যাচ্ছে না। কোনোমতে হোঁচট খেতে খেতে আমি আর দিদি কেদারনাথে পৌঁছে যখন পিছন ফিরে তাকালাম, দেখি বহু দূরে সেই ধোঁয়াটে সাদা ঝড়ের পর্দার মধ্যে দিয়ে ফুটে উঠছে দুটো আবছা গোলাপি ছোপ — ডাকব্যাকের রেইনকোট পরা মা আর মামুনি, ধীরে ধীরে হেঁটে আসছে আমাদের দিকে।
থাকার জায়গা বলতে একটা জরাজীর্ণ, ফাটল-ধরা ঘর — দেওয়ালে হিমশীতল বাতাস ঢোকার ফাঁকফোকর, মেঝেয় ঠান্ডার কামড়। তার মধ্যেই গাদাগাদি করে, কম্বল মুড়ি দিয়ে জবুথবু হয়ে বসে-শুয়ে রইলাম আমরা সবাই। ঘরে আগুন নেই, কোনো হিটিং নেই। মধ্যবিত্ত জেঠুর সাধ্যে তখন পাঁচতারা হোটেল জোগাড় করা তো দূরের কথা, সেসময় ওই দুর্গম পাহাড়ে অমন কিছু বিশেষ ছিলই না। এমন সময় ঘরের মালিক এসে এক বোতল ব্র্যান্ডি ধরিয়ে দিয়ে গেলেন, বললেন ঠান্ডা কাটাতে সাহায্য করবে। সেটা গ্লাসে গ্লাসে ভাগ হয়ে সবার হাতে পৌঁছাল। ঠান্ডা আদৌ কাটল কিনা মনে নেই, কিন্তু ব্র্যান্ডির তেজে গোটা দাশগুপ্ত পরিবার রীতিমতো মাতাল হয়ে গেল। জেঠুর বন্ধু মণিজেঠু গলা ছেড়ে ধরলেন রবীন্দ্রসঙ্গীত, সুরটা যেন সেই বরফঢাকা ঘরের দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসছিল। দিদি ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ করে কাঁদতে শুরু করলো, কিছু একটা মনে করে বা এমনিই। আর মামুনি — মামুনি একেবারে বুক ফাটিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল, স্পষ্ট বাঙ্গাল টানে চিৎকার করে বলল, “আমারে ঢিল লঙ্গর কইরা শ্বশুরের ভিটায় ফালাইয়া দাও।” ঢিল লঙ্গর মানে sling shot বা গুলতি গোছের কিছু — যেন কেউ তাকে কেদারনাথ থেকে সশব্দে দু এক পাক ঘুরিয়ে সোজা ছুঁড়ে ফেলে দেবে বাড়ির উঠোনে। কিন্তু যে জিনিসটা এখনও ভাবলে গায়ে কাঁটা দেয়, সেটা হলো — মামুনি বেনারসে তার নিজের বাপের বাড়ি ফিরে যাবার কথা বলেনি, বলেছিল টালিগঞ্জে, তার শ্বশুরের ভিটায় ফেলে দিতে। সেই এক লহমার কান্নাতেই বোধহয় ভেতরের খাঁটি আকুতিটা বেরিয়ে এসেছিল।
বেনারসের অতি সাধারণ এক পরিবারের অতি সাধারণ একটি মেয়ে কীভাবে এক dysfunctional দাশগুপ্ত পরিবারের সমস্ত দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে, তাদের নিজের করে নিয়েছিল — এটা তারই গল্প।











