কোন দেশের ‘গণতান্ত্রিক’ বা ‘সমাজতান্ত্রিক’ কাঠামো ভাঙতে ‘রেজিম চেঞ্জ অপারেশন’ (শাসকদল বদল) বা ‘সাবভার্সন’ (অন্তর্ঘাতমূলক চক্রান্ত) কিংবা ‘অ্যানাক্সেশান’ (ভিন্ন দেশ দখল) – এসব গত দুশতাব্দী ধরেই করে এসেছে মার্কিন প্রশাসন। সেই ১৭৭৫ থেকে নিজেদের মধ্যে স্বাপদের মতো জমি নিয়ে কামড়াকামড়ি করে (যার পোশাকি নাম দেওয়া হয়েছে ‘আমেরিকান ওয়ার অফ ইন্ডিপেন্ডেন্স’), ও পরে টেডি রুজভেল্টের দেখানো পথে বা আঙ্কেল স্যামের ‘মনরো ডকট্রিন’ ব্যবহার করে, কখনো মেসোআমেরিকা থেকে আফ্রিকা ও এশিয়াতে যখন তখন শাসক বদল করে এবং কখনো কমিউনিস্ট রাশিয়াকে তাঁবে রাখতে ‘ওয়ারশ প্যাক্ট’কে ভাঙতে, ইউরোপীয় ভূখণ্ডের ‘ইস্টার্ন ব্লক’ ও ‘বাল্টিক’ অঞ্চলকে তারা ‘ন্যাটো’ জোট মারফত করায়ত্ত করেছে।
এশিয়ায় – ইরান, কোরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, লাওস, বার্মা, ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়া, সিরিয়া, কুয়েত এবং দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকার ভূখণ্ডের চিলি, নিকারাগুয়া, কিউবা, গুয়াতেমালা, উরুগুয়ে, প্যারাগুয়ে, হণ্ডুরাস, হাইতি, ফিজি, মেক্সিকো থেকে শুরু করে আফ্রিকার কঙ্গো, চাদ, সোমালিয়া পর্যন্ত মার্কিন আগ্রাসনে আক্রান্ত হয়েছে। এখনো আমেরিকার সরকার চাইছে পোস্ট কোল্ড ওয়ার ন্যাটোভুক্ত ফিনল্যাণ্ড, পোল্যান্ড, এস্তোনিয়া, লিথুয়ানিয়া, লাটভিয়া ও ইউক্রেন বা ক্রাইমিয়াকে নিজেদের আয়ত্তে এনে রাশিয়াকে ঘিরে রাখতে। বা জাপান-তাইওয়ান-ফিলিপিন্সে সেনা ঘাঁটি গেড়ে সমাজতান্ত্রিক চীনের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে। মার্কিন চোখরাঙানি থেকে বাদ পড়ে নি ভারতও। তবে সেটা সামরিক ক্ষমতার বলে নয় – অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরাক্রমে। ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলোতে সেই শাসক বদল করে নৈরাজ্য তৈরী করাতেও হাত রয়েছে তাদের।
আর তার কারণ মার্কিন তথা পুঁজিবাদী দেশগুলোর আসন্ন বাজার সংকট ও মানুষের কর্মহীনতা। একদিকে ‘ইমিগ্রেশন’ মারফত সস্তা মজুর পাওয়ার পদ্ধতি – যার অন্য নাম ছিল ‘গ্লোবালাইজড অ্যাপ্রোচ’ তা মেনে চলা আজ সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে ‘লোকালাইজড অ্যাপ্রোচ’ নিতে গিয়ে তারা অর্থনৈতিক ভাবে ‘ডেভেলপিং কান্ট্রিগুলো’র ‘হিউম্যান রিসোর্স’ আর প্রযুক্তির কাছে হেরে যাচ্ছে। নিজের দেশের জনগণকে আমোদ প্রমোদে ভাসিয়ে আর তাদের সমাজ চেতনাকে কন্ফর্মিসম-এর রাংতায় মুড়ে শোকেসে তুলে রাখলে – এটাই হয়।
অথচ আপনি যদি মার্কিন ও ইউরোপীয় (এবং কিছু ভারতীয়) মাচাদো মিডিয়াকে দেখেন – দেখবেন বলা হচ্ছে মার্কিন পুঁজিবাদী গণতন্ত্রই হচ্ছে গণতন্ত্রের পরাকাষ্ঠা। শ্রেষ্ঠ সমাজব্যবস্থা। কিন্তু, ভেনিজুয়েলার ক্যারাকাসে গতকাল আচমকা অস্ত্রাঘাত করে নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করাটা কতটা সাংবিধানিক, মানবিক বা নৈতিক, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বিশ্বজুড়ে। কারণ, ইলোন, ল্যারি, জেফ, মার্কের বাড়ির পাপোশ মার্কিন সরকার, মাদুরোর বিরুদ্ধে যে পদক্ষেপ নিলো, তার যুক্তিটা – অর্থাৎ, ড্র্যাগ পাচার ও স্বৈরতন্ত্র – একেবারে ছোলার ডালের রূপ ধারণ করা পাতলা পায়খানার মতো।
সদানন্দ মার্কিন জনগণকে এবার বুঝতে হবে, আমোদগেঁড়েমি অনেক হয়েছে। এবার তাদের সরকারের বিরুদ্ধে পথে নামার পালা। কারণ, ১৯৯০ এর দশক থেকে যে একমেরু পৃথিবী দেখে তারা বড়ো হয়েছে – তা বদলে গেছে বহুমেরু বিশ্বে। ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া, চীন, সাউথ আফ্রিকা সম্বলিত অর্থনৈতিক জোটে এখন ইজিপ্ট, ইথিওপিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, সৌদি আরব, এবং আরব আমিরশাহী দেশ সমূহ যুক্ত হয়েছে। এরা বিনিময় কারেন্সি হিসেবে আর ডলারের অস্তিত্ব মানছে না। রাশিয়া ও চিন – দুদেশের সৈন্য সমারোহ কিন্তু আমেরিকার ব্যাকিয়ার্ডে বসে চিমনি স্যুপ আর ভোদকায় চুমুক দিচ্ছে। গ্লোবাল সাউথ (ল্যাটিন আমেরিকা ও আফ্রিকা) এখন আর আমেরিকার অর্থনৈতিক বশ্যতায় থাকতে রাজি নয়। ভারত তো নয়ই।
মাদুরো ড্র্যাগ ডিলার নয়। স্বৈরাচারীও নয়। আসল কথা হলো, ভেনিজুয়েলা পৃথিবীর সর্ববৃহৎ তেলের খনি, যেখানে মাদুরো মার্কিন তেল ব্যবসা মালিক ‘এক্সন মোবিল’, ‘শেভরন’ বা ‘কোনোকোফিলিপ্স’কে ব্যবসা করতে দিচ্ছে না । তাই গত ছত্রিশ বছর ধরে ভেনিজুয়েলাকে নানা অর্থনৈতিক স্যাংশানে বেঁধে রেখেছিলো মার্কিন প্রশাসন। তাতেও তাদের হারিয়ে দেওয়া সম্ভব হয় নি (অবশ্যই চীন বা রাশিয়ার সাহায্যের হাত আছে ও ছিল শ্যাভেজ বা মাদুরো সরকারের মাথায়)। এখন আমেরিকা তাদের দালাল মাচাদো মিডিয়াগোষ্ঠি মারফত ধুয়ো তুলেছে যে ভেনিজুয়েলার ড্রাগ ট্র্যাফিকিংয়ের কারণে তারা সেই সরকারকে ফেলতে চাইবে।
আর তা দেখে কিছু মাচাদো সংগঠন – যেমন আই এম এফ, ইউনেস্কো, ডাব্লিউ এইচ ও বা ইউ এন ও, চুপ করেও থাকবে বেশ কিছুদিন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ব্রাজিল, কিউবা, রাশিয়া, চীন কি এসব দেখে চুপ করে থাকবে? বোধহয় না। সেক্ষেত্রে, সাধু সাবধান।











