৩ ডিসেম্বর ২০২৬
২৫ শে ডিসেম্বর থেকে ৩১ শে ডিসেম্বর, বর্ষশেষের এই কয়েকটা দিন সারা দেশ উৎসবে মেতে উঠতে চাইলেও বর্ষশেষ বা নববর্ষ বরণের আনন্দে সবাই সামিল হতে পারলেন না। ক্যালেন্ডার বদলে গেলেও এরাজ্যের বাস্তবতা বদলায়নি। স্বৈরাচার, অত্যাচার, দুর্নীতি আর নারী নির্যাতনের রোজনামচা অপরিবর্তিত।
একরত্তি মেয়ে ১০ বছরের তামান্নাকে হারানো মা সাবিনা ইয়াসমিন বছরের শেষ দিন আত্মঘাতী হওয়ার চেষ্টা করলেন। তামান্নাকে হারানোর যন্ত্রণা, অভিযুক্তদের শাস্তি না হওয়ার যন্ত্রণার মুখে চরম পরিণতির পথে হাঁটার চেষ্টা করলেন তামান্নার মা। একমাত্র মেয়ের খুনের বিচার চাওয়ায় শাসক দলের দুষ্কৃতীদের হুমকির মুখে পড়ে পরিবারের কথা ভেবে উদ্বেগে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন – ২০২৫’র শেষ দিনও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে গেল এই রাজ্যের বর্তমান চেহারা। পলাশীর গ্রামীন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, পরে অবস্থার অবনতি হলে শক্তিনগর জেলা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় সাবিনা ইয়াসমিনকে। পুলিশ ঐ রাতেই চিকিৎসকদের চাপ দিয়ে সাবিনাকে ছুটি করিয়ে দেয়। কতটা নৃশংস এ রাজ্যের পুলিশ প্রশাসন তা এই ঘটনা থেকেই প্রমাণিত। তামান্নার মা এখন স্থিতিশীল ও কলকাতায় স্টুডেন্টস হেলথ হোমে চিকিৎসারত। প্রসঙ্গত, গত ২৩ জুন,২০২৫ নদীয়ার কালীগঞ্জ বিধানসভার উপনির্বাচনে গণনার দিন শাসক দুষ্কৃতিদের ছোঁড়া বোমের আঘাতে ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে যায় ছোট্ট তামান্না।।
মহিলা মুখ্যমন্ত্রীর শাসনে এ রাজ্যে আইন শৃঙ্খলা তলানিতে গিয়ে নেমেছে, নারী নির্যাতন বেড়েই চলেছে, প্রতিদিন তার প্রমাণ সংবাদ মাধ্যমে। ২৫ ডিসেম্বর বড়দিনের উৎসবের রাতে রানাঘাটে একটি হোমে দল বেঁধে ধর্ষণের পর মানসিক ভারসাম্যহীন মূক ও বধির এক তরুণী প্রাণ হারিয়েছেন। গতকাল কল্যাণী এইমসে তার মৃতদেহের ময়না তদন্ত হয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে রানাঘাটের এই তরুণীকে দীর্ঘদিন ধরেই হোমে শারীরিক অত্যাচার করা হচ্ছিল। ২০২৪ সালের ৯ আগস্ট অভয়া হত্যার পর অল্প কিছুদিন নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনা প্রকাশ্যে কম আসলেও অল্প কিছুদিন পর থেকেই দুরন্ত গতিতে ছুটছে এ রাজ্যে নারী নির্যাতন, ধর্ষণ ও খুনের ঘটনা। আসলে অভয়া হত্যার পর প্রশাসনের শীর্ষে থাকা ব্যক্তিরা কিছুটা ভয় পেয়েছিলেন, ব্যাকফুটে গিয়েছিলেন। কয়েক মাস যেতে না যেতেই স্বমহিমায় ফিরেছে বাংলা! বিকৃত রুচি ও মানসিকতাকে উৎসাহিত করেই শাসক তার লুটতরাজের ব্যবস্থা কায়েম রাখতে চায়। রাজ্যের নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে ততই ঘটনার গতি বাড়ছে। যে ক’টি ঘটনার বিচার হচ্ছে, রায়দান হচ্ছে, সব ক’টি ক্ষেত্রেই অপরাধীদের শাসক যোগাযোগ স্পষ্ট।
পশ্চিমবঙ্গের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেই চলেছে। বর্ষ শেষের আগের রাতে দিল্লির নির্ভয়ার স্মৃতি ফেরালো বিজেপি শাসিত রাজ্য হরিয়ানার ফরিদাবাদ। চলন্ত গাড়িতে দল বেঁধে ধর্ষণ করা হলো ২৮ বছরের এক তরুণীকে। গোটা রাত ধরেই শারীরিক অত্যাচার চলে তরুনীর উপর। তারপর দ্রুতগতির গাড়ি থেকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হয় তাকে। ক্ষতবিক্ষত হওয়া শরীর নিয়ে আশঙ্কাজনক অবস্থায় দিল্লি সংলগ্ন ফরিদাবাদের এক বেসরকারী হাসপাতালে তার চিকিৎসা চলছে। শুধু ফরিদাবাদই নয়, উত্তরপ্রদেশের আমেথিতে ১৩ বছরের এক দলিত নাবালিকাকে ধর্ষণ করেছে তার গ্রামেরই এক যুবক।
রাজ্য অথবা দেশ, দুই শাসকের প্রত্যক্ষ মদতে ধর্ষণ, শ্লীলতাহানি সহ মেয়েদের উপর অত্যাচার ক্রমশ বেড়ে চলেছে। অপরাধীদের লোক দেখানো গ্রেপ্তার হলেও শাস্তি হয় না। ধর্ষকদের মুক্তির দাবিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মিছিলে হাঁটেন শাসক ঘনিষ্ঠ নেতারা। বিলকিস বানোর ধর্ষকরা ছাড়া পেয়ে যায়। অভয়া মঞ্চ ক্রমবর্ধমান এই নারী নির্যাতনের তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছে, অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছে এবং এ রাজ্যের সমস্ত গণতন্ত্রপ্রিয় মানুষকে ঘটে চলা নারী নির্যাতন, ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার প্রতিবাদে রাস্তায় নামার আহ্বান জানাচ্ছে।









