মহাশ্বেতা দি
পদ্মবিভূষণ, পদ্মশ্রী, ম্যাগসাইসাই, জ্ঞানপীঠ, সাহিত্য আকাদেমি প্রমুখ বহু নামী পুরস্কারে ভূষিতা স্বতন্ত্র রচনাশৈলীর অধিকারিণী প্রখ্যাত সাহিত্যিক এবং সমাজকর্মী মহাশ্বেতা দেবীর (১৯২৬ – ২০১৬) জন্মশতবর্ষ উপলক্ষ্যে বিভিন্ন অনুষ্ঠান হচ্ছে। গতকাল কবি যশোধরা রায়চৌধুরী আনন্দ বাজার পত্রিকায় একটি চমৎকার উত্তর সম্পাদকীয় লিখেছেন। ফেসবুকে অলোক কুমার লিখেছেন আরেকটি মন ছুঁয়ে যাওয়া প্রতিবেদন।
মহাশ্বেতা দির বিশাল ব্যাপ্ত অননুকরণীয় সাহিত্যকৃতি নিয়ে বিশদে আলোচনা চলছে। শিশু পুত্রকে রেখে গিয়ে বুন্দেলখন্ডের রুখা জমি চষে সেখানকার লোকসমাজ ও লোকগাথা থেকে আহরণ করে লেখা ‘ঝাঁসির রানী’ এক অসামান্য বীরাঙ্গনা কাহিনী। তারপর ধনুকের ছিলার মত তাঁর কলম থেকে বেরোতে থাকলো ‘মাস্টার সাব’ (জগদীশ মাহাতো কে নিয়ে লেখা), ‘অরণ্যের অধিকার’ (বীরসা মুন্ডার কাহিনী), ‘হাজার চুরাশির মা’ , ‘ চেটটি মুন্ডা ও তাঁর তীর’, ‘স্তনদায়িনী’ প্রভৃতি সাড়া জাগানো উদ্দীপনাময় সব উপন্যাস ও গল্প। বসাই টুডু, দ্রৌপদী মেঝেন প্রমুখ অবিস্মরণীয় সংগ্রামী ঋজু চরিত্রগুলি উঠে এসেছে তাঁর রচনায়। আবার জিম করবেটকে বাংলায় নিয়ে এসেছেন অনাবিল আনন্দে। তাঁর সামগ্রিক সাহিত্য দর্শনের মূল সাম্যের প্রতিষ্ঠা।
ঢাকার মিশনারী স্কুল, শান্তিনিকেতনের বিশ্ববীক্ষা, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষা তাঁকে ঋদ্ধ করেছে। আর তো ছিলই এক তুলনারহিত সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার, ঐতিহ্য ও পরিবেশ। মণীশ ও ধরিত্রী ঘটকের কন্যা, ঋত্বিক ঘটকের ভ্রাতুষ্পুত্রী, শচীন ও শঙ্খ চৌধুরীর ভাগ্নী, বিজন ভট্টাচার্যের স্ত্রী এবং নবারুণ ভট্টাচার্যের মা। অত্যন্ত সমাজ ও রাজনীতি সচেতন তিনি জীবনযাপনেও ছিলেন স্বতন্ত্র। উত্তাল গণআন্দোলনে অংশ নিয়েছেন, বিভিন্ন জনমুখী আন্দোলনকে সর্বতোভাবে সাহায্য করেছেন, জনজাতিদের আত্মপ্রতিষ্ঠায় ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। কিন্তু কোন দলীয় বন্ধনে জড়ান নি।
এমনই এক প্রতিভাময়ী সাহসিনী মাতৃ চরিত্র সবসময়ই আমাদের আকর্ষণ করেছে এবং সম্ভ্রম আদায় করে নিয়েছে। ১৯৮০ – ‘ ৮১ হবে। জরুরী অবস্থা পরবর্তী উত্তেজক পরিস্থিতিতে অন্যান্য অনেক কলেজের মত আমাদের মওলানা আজাদ কলেজের ছাত্র সংসদ থেকে তুমুল ছাত্র সমর্থন নিয়ে ছাত্র পরিষদকে বিদায় করে আমরা তখন টগবগ করে ফুটছি। আমাদের সিএসইউ এবং এসএফআই মিলে এলডিএসএফ গড়ে তুলেছি। নির্বাচিত হয়েছি ক্লাশ রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে। সেইসময়েই আরও বেশ কিছু এসএ – ডিএসএ মিলে আমরা তৈরি করলাম ‘অল বেঙ্গল স্টুডেন্টস এসোসিয়েশন (এবিএসএ)’, যা পরবর্তিতে সর্বভারতীয় স্তরে ‘এআইএসএ’ তে রূপান্তরিত হয়। গড়ফা স্কুলের কনভেনশনে বিশিষ্ট নদী বিশেষজ্ঞ কপিল ভট্টাচার্য্য সহ অনেকে আমন্ত্রিত অতিথি হিসাবে এসেছিলেন। সেখানে মহাশ্বেতাদির স্বল্প বক্তৃতার একটি কথা এখনও মনে আছে, “গ্রামে যেতে হবে।”
পরে আমাদের তখনকার নেতা ‘আমার দেশ’ পত্রিকার সম্পাদক অনিন্দ্য ভট্টাচার্যের সঙ্গে মহাশ্বেতাদির বালিগঞ্জ স্টেশনের কাছে বাড়িটায় গেছি।
তারপর এক দীর্ঘ সময় কেটে গেছে। উত্তরবঙ্গের এক প্রান্তিক জেলায় চাকরি করি। একটি কেন্দ্রীয় টিম পরিদর্শনে এসেছে। পরিদর্শন সম্পূর্ণ এবার তাঁরা ফিরে যাবেন। তাঁদের দলপতি ডা. সুরজিৎ মিশ্র দেখা করতে এসে এক অদ্ভুত প্রস্তাব দিলেন। উনি কোথা থেকে জেনে এসেছেন একসময় ‘পিপলস হেল্থ’, ইন্ডিয়ান পিপলস ফ্রন্ট বা আই পি এফের বাংলা মুখপত্র ‘সমকালীন লোক সমাচার’ সম্পাদনা করেছি। উনি মহতী উদ্দেশ্য নিয়ে একটি পত্রিকা বের করতে চান, আমাকে থাকতে হবে। আমি কিছুতেই থাকবো না, আর উনি নাছোড়। যাইহোক সেই পত্রিকা বের করতে কলকাতায় এসে তিনি, ডা. জয়দেব পাঠক আর আমি মহাশ্বেতাদির আশীর্বাদ চাইতে তাঁর কসবা রাজডাঙ্গার নতুন বাড়িতে গেলাম। শুধু আশীর্বাদ নয়, অনেক পরামর্শ, একটি মহামূল্যবান সাক্ষাৎকার দিলেন। আমাদের সঙ্গে অনেকক্ষণ গল্প করলেন, ছবি তুললেন। সেই সময় তিনি বেশ অসুস্থ এবং দর্শনার্থীদের প্রবেশ প্রায় নিষিদ্ধ। কলকাতায় এসে আরও কয়েকবার ওনার সঙ্গে দেখা করেছি। কোন কোন জেলায় কাজ করেছি জেনে একটি কথা প্রায়ই বলতেন, “পুরুলিয়াতে কাজ কোরো।” সেইসময় পুরুলিয়া ভ্রমণে গেলেও কাজ করিনি। পরে যখন পুরুলিয়া জেলাতে যাই, তখন মহাশ্বেতা দির কথাটা মনে পড়ত।
সমীর পুততুন্ড (১৯৫২ – ২০২৬)
আগেই উল্লেখ করা সেই সময়ে আমাদের কলেজে প্রভাস চৌধুরী, নীলকণ্ঠ আচার্য, অসিত পতি প্রমুখ আমাদের ছাত্র সংগঠকরা আসতেন। কলেজে ছিলেন সুহৃদ অধ্যাপক শৈবাল মিত্র। আবার সইফুদ্দিন চৌধুরী, গৌতম দেব, মৃণাল দাস, সমীর পুততুন্ড, রবীন দেব প্রমুখ সিপিআইএম-এর ছাত্র – যুব নেতারা আসতেন। তখন সুস্নাত দাশের মাধ্যমে সামান্য পরিচয়।
পরে সিপিআইএম-এর দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার প্রভাবশালী এই নেতা সফি, নটবর বাগদি প্রমুখ কে নিয়ে ‘পি ডি এস’ নামে আলাদা দল করেন। জ্যোতি বসু, সুভাষ চক্রবর্তী, সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়দেরও যোগ দেওয়ার কথা ছিল। পরে সমীর পুততুন্ড সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রাম আন্দোলনে যুক্ত হন এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর ঘনিষ্ঠ হন।
একদিন রাতে পুরুলিয়া স্টেশন থেকে ট্রেন ধরে হাওড়ায় আসছি। ঠিক আমার সামনের আসনেই বসলেন সমীর পুততুন্ড, তাঁর পাশে অনুরাধা পুততুন্ড। এমনিতেই ট্রেনে ঘুম হয়না। তাঁদের সঙ্গে অনেক রাত অবধি গল্প ও রাজনৈতিক আলোচনা করে খুব ভালো কাটলো।










