দ্বিতীয় হুগলি সেতু পেরিয়ে কোনা এক্সপ্রেসওয়ে ধরে সাঁতরাগাছি রেলস্টেশনকে বাঁয়ে ফেলে সোজা এগোলে, উনসানি আর গড়পা ছাড়িয়ে পড়ে নিবড়ার মোড়। সেখান থেকে ডানহাতি রাস্তা ধরলে শলপ। আর বাঁ হাতি রাস্তাটাই হচ্ছে বম্বে রোড — পোশাকি নাম ন্যাশনাল হাইওয়ে সিক্সটিন।
সেই বিশাল চওড়া রাজপথ দিয়ে আরও এগিয়ে গেলে অঙ্কুরহাটি, আলমপুর, ধুলাগড়, রানীহাটি, পাঁচলা পড়ে পথে। তারপরই শুরু উলুবেড়িয়া ২ নম্বর ব্লকের সীমানা। ফুলেশ্বর স্টেশনে যাবার রাস্তা, জামবেড়িয়া ব্রিজ, খলিসানি সব পিছনে ফেলে আরও একটু এগোলে ডান হাতে পড়বে উলুবেড়িয়া ইএসআই হাসপাতাল। বম্বে রোড একটা বাঁক নিয়েছে এখানে। কলকাতা ট্রাম কোম্পানির দ্রুতগতির বাস এক নিশ্বাসে সেই বাঁকটা পেরিয়েই হুড়মুড় করে এসে দাঁড়িয়ে পড়ত একটা ধু ধু করা চৌমাথার মোড়ে। নিমদিঘি। সেখানে নেমে দেখা যেত হাইওয়ে পেরিয়ে ওপারে ঝাঁকড়া বটগাছের নিচ দিয়ে একটা এবড়ো খেবড়ো রাস্তা চলে গেছে দূরে – ওটাই পাঁচবিঘা হাসপাতাল যাওয়ার রাস্তা। পাঁচবিঘা হাসপাতাল, যার ভালো নাম বললে গাঁয়ের লোকই চিনবে না চট করে — বৃন্দাবনপুর ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র।
হাইওয়ে থেকে নামা এবড়ো খেবড়ো রাস্তাটা কিছুদূর গিয়ে ইঁট পাতা গলি হয়ে গেছে। দু’পাশে এক মানুষ উঁচু ঘন বন। প্রখর দৃষ্টি চালালে তার ফাঁকে ফাঁকে মাটির ঘরের দেওয়াল আর বাখারির শিকওয়ালা জানলা দেখা যায়। সেই গলিতে মাঝে মাঝে দু’এক খানা চিলতে মুদির দোকান পড়ে, তার পসরা দেখে ভূতেরও বোধ হয় কান্না পাবে। হাটতলা বলে একটা মাঝারি গোছের বাজারও পড়ে সেই পথে – সেটার অবস্থা খানিক ভদ্রস্থ। কাঁচা আনাজপাতির বেসাতি, চাল ডালের বড় আড়ত, দু’একটা ভালো স্টেশনারী স্টোর্স, এসটিডি বুথ রয়েছে সেখানে। ঐ হাটতলাতেই ফি বছর শীতে বসে উরসের মেলা – কাছেই পীরের মাজার আছে নাকি।
হাটতলা ছাড়িয়ে আরও খানিকটা গেলে বাঁ দিকে আগাছার ঝোপঝাড় হঠাৎ করেই যেন ফুরিয়ে গেছে মনে হবে। দেখা যাবে ঢালা সিমেন্টের একটা চত্বর। তার শেষে যে একচালা লম্বাটে বিল্ডিং, মাথার উপর সাইনবোর্ডে তার পরিচয় জ্বলজ্বল করছে – বৃন্দাবনপুর বিপিএইচসি, উলুবেড়িয়া ২, হাওড়া।
হাসপাতাল বলতে একটা জেনারেল আর একটা হোমিওপ্যাথিক আউটডোর, ড্রেসিং কাম নার্সেস রুম, জংধরা লোহালক্কড়ের গুদাম যেটা কোনও এককালে লেবার রুম ছিল — (ভগবান জানেন সেখানে শেষ বার কবে ডেলিভারি হয়েছে), আর গোটা দুই ঝুলপড়া নোনা ধরা খালি ঘর, তাতে কয়েকটা লোহার খাট ভিন্ন অন্য আসবাব নেই। আউটডোরের ওধারে একটা দু’কামরার অফিস ঘর, প্রশাসনিক কাজকর্ম হয় সেখানে — হাসপাতাল বাড়ির তুলনায় সেটা কিন্তু বেমানান রকম পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন।
হাসপাতাল থেকে খানিক দূরে সার সার একতলা কোয়ার্টার। তার মধ্যে দুটো কোয়ার্টার একটু বড়সড়। সেগুলো বিএমওএইচ আর মেডিক্যাল অফিসারের কোয়ার্টার। সুদূর বেহালা থেকে নিত্য যাতায়াত সম্ভব নয় বলে, এখানেও কোয়ার্টারবাসী হতে হলো আমাকে।
সর্বসাকুল্যে দুজন ডাক্তার – ব্লক মেডিক্যাল অফিসার ডক্টর আশিক হোসেন আর আমি। একজন বয়স্ক হোমিওপ্যাথ রয়েছেন, ডক্টর অনুতোষ সিনহা – তিনি তাঁর নিজস্ব আউটডোর সামলাতেন আর রোটেশনে রবিবার ইমার্জেন্সি ডিউটি করতেন ভীষণ অনিচ্ছায়। পুরোনো পন্থী মানুষ, ক্রসপ্যাথি মন থেকে মেনে নিতে পারতেন না!
বৃন্দাবনপুরের ডক্টরস কোয়ার্টারে প্রথম রাত্রিযাপন কালে ‘গন্ডগ্রাম’ শব্দটির সঙ্গে আমার সত্যিকারের পরিচয় হলো।
কালিয়াগঞ্জ অনেক দূরের গঞ্জ শহর ছিল ঠিকই, কিন্তু গ্রামে নয়, আমার বাস ছিল সেখানকার পৌরসভা এলাকায়। নাগরিক স্বাচ্ছন্দ্য সীমিত হলেও যথেষ্ট স্বাচ্ছন্দ্য ছিল সেখানে। আমার জীবনের প্রথম (এবং শেষ) নির্ভেজাল গ্রাম দেখা হলো বৃন্দাবনপুরে।
যে কোয়ার্টারটি আমাকে অ্যালট করা হয়েছিল সেটি ছিল হাসপাতালের একেবারে শেষ প্রান্তে। হাসপাতালের কোনো পাঁচিল ছিল না, কোয়ার্টারে তো প্রাচীর থাকার প্রশ্নই ওঠে না। আমার বাথরুমের পিছনের দরজার খানিক পর থেকে শুরু হয়েছে মাঠ। মাঠ পেরিয়ে ধানখেত। তার ওপাশে নিবিড় ঘন গাছপালা — যেন বন হয়ে রয়েছে। সন্ধ্যে নামার সঙ্গে সঙ্গে, স্টেট ইলেকট্রিসিটি বোর্ডের বাতি সিঙ্গল ফেজ হয়ে গেল — গ্রুপ ডি দাদা নিখিলদা বলে দিয়েছিল এখানে এটাই দস্তুর। টিমটিমে হলুদ বাল্বের নিচে সকালের বাসি খবরের কাগজটা পড়াও যখন অসম্ভব হয়ে উঠল, সামনের ভুতুড়ে আলো আঁধারিতে দূরের হাসপাতাল বাড়ি অস্পষ্ট, মার্চের শেষ— গরম লাগছে ভালই, কি ভেবে আমি শোবার ঘরের পশ্চিমের জানলাটা খুলে দিলাম। বাইরে তাকিয়ে কেঁপে উঠলাম অজানা ভয়ে।
অন্ধকার। এত নিশ্ছিদ্র ঘন গহীন অন্ধকার যে পৃথিবীতে নেমে আসতে পারে, তা আমার ধারণার বাইরে ছিল। ভয়ের প্রাথমিক ধাক্কাটা কাটিয়ে মনে পড়ল, ওদিকে তো লোকালয় নেই, শুধু ধানখেত — এমন চন্দ্রহীন রাতে অন্ধকার তো উপুড় হয়ে শুয়ে থাকবেই মাঠের উপর। আমার চিন্তার সঙ্গে সঙ্গত করেই যেন ডেকে উঠল একপাল শেয়াল। এত কাছে, মনে হলো বাথরুমের দরজার ওপারেই এসে দাঁড়িয়েছে ওরা।
সেই মিটমিটে আলোর নিচে, নিখিলদার জোগাড় করে দেওয়া রান্নার দিদি সুনন্দাদির রেঁধে দেওয়া রুটি আর সয়াবিনের তরকারি কোনোমতে গলাধঃকরণ করে আমি ঝুপ করে মশারির নিচে ডুব মারলাম। ঝিঁঝিঁর আওয়াজ, দূরের অন্য কোয়ার্টারের বাসিন্দাদের অস্পষ্ট কথাবার্তা, টিউবওয়েলের ক্ষীণ ক্যাঁচকোঁচ শব্দ রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষীণতর হয়ে এলো। সামনের নিমগাছ থেকে ডেকে উঠল কুটুরে প্যাঁচা, অনেক দূরে কোনো কুকুরের ডাক শোনা যেতে লাগল মাঝে মাঝে, ফের প্রহর ঘোষণা করে গেল শেয়ালের দল — আর আমি মশারির নিচে ঘামতে ঘামতে শুনতে লাগলাম বাথরুমের কাঠের দরজায় ওদের আঁচড়ানোর আওয়াজ — কল্পনায় না বাস্তবে, কে জানে!
পরের দিনই কোয়ার্টার বদল করলাম আমি। সামান্য বাক্স বিছানা আর বাসনকোসন নিয়ে উঠে গেলাম নিখিলদার বাসার লাগোয়া গ্রুপ ডি কোয়ার্টারে। হোক এক ঘরের কোয়ার্টার, তবু রাতের ঘুমটুকু তো হবে।
বৃন্দাবনপুরে কাটানো সেই পৌনে দু’বছর সময়, আমার জীবনের সবচেয়ে অনায়াসে বয়ে চলা সময় — কোনো জটিলতার করাঙ্গুলি মেঘাচ্ছন্ন করতে পারেনি তার আকাশ।
দিন শুরু হতো কাঠের জানলায় নিখিলদার টোকায় — “দিদি, থলিটা দিন। বাজার থেকে আজ কি আনব বলুন?”
মশারি তুলে স্টোভে চায়ের জল বসাতেই এসে পড়ত সুনন্দাদি। টিউবওয়েল থেকে খাওয়ার আর স্নানের জল ভরতে ভরতে নিখিলদা ফিরে পড়ত বাজার থেকে। আমি খুপরি জানলায় বসে হা পিত্যেশ করে চেয়ে থাকতাম ইঁট পাতা রাস্তার দিকে – এই কোয়ার্টার থেকে দেখা যেত সেটা। বসে থাকতাম কাগজওয়ালার অপেক্ষায়।
আউটডোর শুরু হতো সাড়ে ন’টা-দশটায়। রোগী হতো প্রচুর। ফার্মাসিস্ট উত্তমদা আসত পাঁশকুড়া থেকে, টেকনিসিয়ান পূর্ণেন্দুদা ঘাটাল থেকে, আরেক গ্রুপ ডি দাদা কারকদা বাগনানের ভিতরের এক গ্রাম থেকে সাইকেলে চড়ে আসত এতটা পথ। কাজের শেষে খানিক গল্পগাছা করে ওরা বাড়ি ফিরে যেত, আমি ফিরতাম কোয়ার্টারে। দুপুর কাটত অস্বাভাবিক আলস্যে। হাসপাতালে ইমার্জেন্সি রোগী প্রায় আসতই না। উলুবেড়িয়া মহকুমা হাসপাতাল ছিল আট দশ কিলোমিটারের মধ্যে, কোনো বিপদ আপদ হলে ছুটত সেখানেই। ক্বচিৎ কোনো আসন্ন প্রসবা হয়ত উলুবেড়িয়া যাবার সময়টুকু দিত না বাড়ির লোকেদের — তাদের ডেলিভারি হতো পাঁচবিঘা হাসপাতালে, কুশলী সিস্টার দিদি রাণুদি বা স্বপ্নাদির হাতে, আর প্রসূতির কপাল নেহাৎ মন্দ থাকলে এই অ্যাক্সিডেন্টাল ডাক্তারনির হাতে।
একটি দুটি করে স্বাভাবিক প্রসবের সংখ্যা বাড়তে আরম্ভ করায়, হাসপাতালে অমিল এমন অনেক অত্যাবশক ওষুধ মায় ইঞ্জেকশনও তখন হাসপাতালের কালভার্টের পাশে হাসানের মুদিখানার দোকানে পাওয়া যেতে লাগল। রোগীর আত্মীয়দের আর হাটতলা কিংবা চার কিলোমিটার দূরের নিমদিঘিতে দৌড়োতে হতো না।
সন্ধ্যে কাটত নিখিলদার কোয়ার্টারে, এক ফালি ছোট্ট সাদা কালো টিভির সামনে। কেবলবিহীন ডিডি বাংলার খবর আর আধুনিক গানের অনুষ্ঠানই তখন বিনোদনের একমাত্র উপায়। নিখিলদার মা ভেজে আনতেন বাদাম আর পাঁপড় — মুড়ির সঙ্গে মেখে মেঝেতে থেবড়ে বসে খেতাম সবাই – পাশের কোয়ার্টারের সুইপার কালিয়া আর আরেক গ্রুপ ডি দাদা বাসুদাও এসে জুটত কখনো কখনো। তার মধ্যেই চলে মাঝে মাঝে কারেন্ট চলে যেত। এদিকে পরের দিনের ডিসট্রিক্ট হেলথ কমিটির মান্থ্লি মিটিংএর জন্য রিপোর্ট তখনো রেডি করা হয়নি। আশিক ওসব ভালো পারত না, চাপিয়ে দিয়েছিল আমার ঘাড়েই। লোডশেডিংএর মধ্যে শীতের রাত্রে নিখিলদার ঘরের মেঝেতে মোটা কাঁথা বিছিয়ে ইমার্জেন্সি লাইটের আলোয় আমি আর নিখিলদা রিপোর্ট তৈরি করছি, আর আমার কোলের মধ্যে গুটিশুটি হয়ে আরাম খুঁজছে স্বপ্নাদির কুট্টি ছেলে বাবুর পোষা নেড়ি কুকুরের ছোট্ট ছানা — রাত বাড়লে ওদের মা এসে ঘেঁটি ধরে নিয়ে যাবে বাগানের মধ্যে, পিচবোর্ড আর চটের তৈরি ঘরে, সেখানে নিখিলদার ভাই প্রকাশদা ঢেলে এসেছে উনুনের গরম ছাই — ওম পাবে ছানারা।
রাত গভীর হবে। স্বপ্নাদির বর স্বপনদা শিফট ডিউটি সেরে ফিরবে কলকাতা থেকে, ঘুমিয়ে কাদা ছেলেকে তুলে খেতে বসবে তিনজনে, রাণুদির বর শব্দ করে জল তুলবে বালতিতে, নিখিলদার মায়ের কাশির আওয়াজের সঙ্গে মিশে যাবে আমার পুঁচকে রেডিওর বিবিধ ভারতীর আপ কি ফরমাইশ — মুসাফির হুঁ ইয়ারোঁ, ন ঘর হ্যায় ন ঠিকানা, বস চলতে জানা হ্যায় —
কোনোদিন মাঝরাতে দরজায় ঠকঠক শব্দ বাজত। বাসুদার গলা পেতাম, “দিদি, রুগী এয়েচে”—
তৈরি হয়ে বেরিয়ে দেখতাম দূরে ভ্যান রিকসার কুপির আলো দেখা যাচ্ছে — ছায়াময় কয়েকটি অবয়ব ঘোরাঘুরি করছে তাকে ঘিরে।
শুধোতাম, “কি রুগী বাসুদা?”
জবাব পেতাম – “ডাইরিয়া দিদি। জলশুন্যি হয়ে পড়েচে—”
টুকরো আলাপচারিতার মধ্যেই চলতে চলতে টের পেতাম পিছু নিয়েছে একটা একলা শেয়াল।
ভয় খেয়ে বলতাম – “ও বাসুদা, শেয়াল আসছে যে পিছনে পিছনে”—
বাসুদা অভয় দিত -।”কিস্যু হবে না দিদি, ও চলে যাবে ঠিক। এইয়ো, যা, যাঃ”—-
বৃন্দাবনপুরে চাকরি করতে করতেই আমি হারিয়ে ফেললাম বাবাকে। বাইপাস সার্জারির অভিঘাত সইতে না পেরে হাসপাতাল থেকে নির্ধারিত ডিসচার্জের দিনেই অন্য কোনো ছুটির টানে বেরিয়ে পড়ল বাবা — মাকে আর আমাকে সঙ্গে না নিয়ে।
বাবা চলে যাওয়ার পরে মাকে একা বেহালার বাড়িতে রাখা আমার পক্ষে একটু কষ্টসাধ্য হয়ে উঠল। মা যদিও আপাতদৃষ্টিতে শক্তসমর্থই ছিল — তবু আমি যেন বুঝতে পারছিলাম, ঘুণ ধরে গিয়েছে কাঠামোয়।
বৃন্দাবনপুরে পা দেওয়ার বছর দেড়েকের মাথায় আমার একটা ছোট্ট মুঠোফোন হলো — আমার প্রথম মোবাইল। হাসপাতাল অফিসে আর এসটিডি বুথে দৌড়োদৌড়ি করে মাকে ফোন করার দিন শেষ। তখন বিছানায় শুয়ে শুয়েই কথা হয় — “সদর দরজা বন্ধ করেছ? সন্ধের ওষুধটা খেয়েছ তো? দিলীপ পৌঁছে দিয়েছে বাজার?”
তবু চিন্তা রয়েই যায় মনে। মাঝরাতে দুঃস্বপ্ন দেখে চমকে জেগে উঠি — আর ঘুম আসতে চায় না। চুপ করে শুনি, ইঁট পাতা রাস্তা দিয়ে হেঁকে চলে যাচ্ছে মসজিদের ভ্যান রিক্সা — “রোজাকারেরা ওঠো, জাগো, সেহরির সময় হলো”—
মনে পড়ে, সামনে ঈদের ছুটি আসছে। আশিক বাড়ি যাবে কয়েকদিনের জন্য। এই মাসের সিএমওএইচ অফিসের মান্থ্লি মিটিং আমাকেই অ্যাটেন্ড করতে হবে।
হাওড়ার সিএমওএইচ অফিসে আমি ছিলাম পরিচিত মুখ। আশিক প্রশাসনিক ব্যাপার ভালো বুঝত না — তাই আমিই যেতাম বেশিরভাগ মিটিংএ। আবার হাসপাতালের সেকেন্ড এমও হওয়ার কারণে, ফিল্ড ভিজিট আর হেলথ ক্যাম্পও চলছিল সমান তালে। ডক্টর কোলের হাতেগড়া শিষ্যা আমি, আমার কাজ স্বাস্থ্যকর্তাদের নজরে পড়েছে, প্রশংসাও কুড়িয়েছে কিছু কিছু।
এমনই এক মিটিংএ হাওড়ার তৎকালীন ডেপুটি সিএমওএইচ ওয়ান ডক্টর সত্যজিৎ চক্রবর্তী আমাকে ডেকে বললেন — “বিএমওএইচ হবে?”
আমি চমকে উঠে বললাম – “কোথায়? বৃন্দাবনপুরে?”
উনি হেসে বললেন – “তা কেন? ওখানে তো আশিকই রয়েছে। সাঁকরাইলের বিএমওএইচ বাগনানের ছেলে, অনেকদিন ধরে বাড়ির কাছে ট্রান্সফার চাইছে – তুমি যদি ওকে রিলিভ করো, তোমারও সুবিধে হবে। সাঁকরাইল কলকাতার অনেকটা কাছে, যাতায়াত করতে পারবে, আবার ফুল ফ্লেজেড বিএমওএইচ হলে তিনটে ইনক্রিমেন্ট বেশি পাবে – মানিটারি গেইনও হবে। তুমি তো প্র্যাক্টিস ফ্র্যাকটিস করো না শুনেছি –”
প্রসঙ্গত, তখন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের হেলথ সার্ভিস ক্যাডার থেকে অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ক্যাডার সদ্য আলাদা করা হয়েছে। আর যারা এই নতুন প্রশাসনিক দায়িত্ব নেবার অপশন দিচ্ছে, বেসিক পে-র উপর আরও তিনটি ইনক্রিমেন্ট পাওনা হচ্ছে তাদের।
সিভিল সার্ভিসে যোগ দিতে না পারার অতৃপ্তি নাকি মায়ের কিছুটা কাছাকাছি চলে আসার দুর্নিবার ইচ্ছে, কোন টানটা বেশি প্রবল ছিল, আজ আর আলাদা করতে পারি না।
ডক্টর সত্যজিৎ চক্রবর্তীর প্রস্তাবে আমি রাজি হয়ে গেলাম।
ডিসেম্বরের এক মলিন বিষণ্ণ বিকেলে অভিমানী অভিযোগহীন বৃন্দাবনপুর আমাকে নিঃশব্দে বিদায় জানালো। ইঁট পাতা রাস্তা, হাসানের দোকান, এঁদো পানাপুকুর আর ঘেয়ো কুকুরছানাদের মায়া কাটিয়ে ফিরে চললাম আমি। কলকাতার কাছে, বাড়ির কাছে, মায়ের কাছে।
সাঁকরাইলের হাজি এসটি মল্লিক বিপিএইচসিতে ব্লক স্বাস্থ্য আধিকারিক হিসেবে যোগ দেওয়া আমার জীবনের নিকৃষ্টতম ভুল। ঐ দিনগুলোর কথা আমি মনেও আনতে চাই না, আলোচনা তো দূরের কথা।
মেমোয়ার্স তো সব সময় মধুর হয় না, কষায়ও হয়। তবে সাঁকরাইলের দিনগুলি শুধুই তিক্ত ছিল না, বিষাক্তও ছিল।
যে স্মৃতি বেদনা নয়, কেবল হলাহল মন্থন করে, তা আর সকলের সামনে বিস্তারিত জানাতে মন চাইছে না।
যে সময়ে আমি সাঁকরাইলে এসেছিলাম, তখন পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ঢেলে সাজানো হচ্ছে। কেন্দ্রের জাতীয় গ্রামীণ স্বাস্থ্য প্রকল্পের টাকায় জননী সুরক্ষা যোজনা, মাতৃযানের বন্দোবস্ত, এইডস সচেতনতার প্রচার, পালস পোলিয়ো, স্কুল হেলথ প্রোগ্রাম, আরও বহু ধরণের কর্মকান্ডের বিস্তার আরম্ভ হলো। প্রতি মাসেই একটি করে নতুন যোজনার রূপায়ণ আমাদের ঘাড়ে চাপত, আর সেই সঙ্গে জুটত বড় বড় অঙ্কের চেক। প্রকল্পের খুঁটিনাটি বোঝার আগেই বুঝে নিতে হতো কিভাবে জমা করব প্রাপ্ত টাকার ইউটিলাইজেশন সার্টিফিকেট। এতদিন পর্যন্ত যেখানে পে বিল আর কন্টিনজেন্সির সামান্য টাকার হিসেব নিকেশ বুঝতে হয়েছে, বড়জোর দায়িত্ব নিতে হয়েছে পালস পোলিয়োর খাতে কিছু বাড়তি অর্থের, দুর্নীতি বলতে ন’মাসে ছ’মাসে কিছু অসাধু কর্মীর অল্প স্বল্প এক্সট্রা টিএ বিল পাস করে দিতে হয়েছে কিছু মৌখিক চাপান উতোরের পরে, সেখানে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ যে কি অনর্থ ডেকে আনতে চলেছে তা আন্দাজ করারও সুযোগ দেয়নি সাঁকরাইল।
প্রতি পদে ঠোক্কর খেতে খেতে বুঝলাম, এই কাজ আমার দ্বারা হবে না। প্রশাসনিক প্রধান হবার যোগ্যতা আমার নেই, কোনোকালে ছিলও না। সত্যি, কত অযুত পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে মানুষের নিজের সঙ্গে পরিচয় হয় — এই কুখ্যাত হাসপাতালটিতে না এলে আমি জানতেও পারতাম না।
হাজি এস টি মল্লিকের আনাচে কানাচে তখন অবিশ্বাস আর লোভের হাওয়ার কানাকানি। প্রতিদিন গিয়ে আয়রন সেফ খুলি আর হিসেব পত্তর নিয়ে বসি — মেলাতে মেলাতে সন্ধ্যে পেরিয়ে যায়, স্টেশন থেকে ট্রেন ধরে সাঁতরাগাছি, তারপর বাস ধরে হেস্টিংস, আবার বাস বদল করে, অটো ধরে বেহালা পৌঁছতে রাত দশটা। পরের টাকার চৌকিদারির দুশ্চিন্তায় সব সময় মুখ শুকনো, ঠিক মতো খাওয়া দাওয়াও করতে পারতাম না। আমাকে নিয়ে মায়ের চিন্তাও তুঙ্গে উঠেছিল, অথচ নিস্তারের পথ জানা ছিল না কারোরই।
একদিন আক্ষরিক অর্থেই সাঁকরাইল হাসপাতালে টাকা উড়তে আরম্ভ করল।
হাসপাতাল অফিসে আমার টেবিলের চাবিবন্ধ ড্রয়ারে পাওয়া গেল টাকার বান্ডিল। লেজার বইয়ের হিসেবে, আয়রন চেস্টে রাখা টাকার সঙ্গে বান্ডিলের টাকা যোগ করতেই অঙ্ক মিলে গেল।
আর এক মুহূর্তও দেরি করিনি আমি। আয়রন সেফ তালাবন্ধ করে চেপে বসেছিলাম হাসপাতালের গাড়িতে। গন্তব্য হাওড়া ময়দানের সিএমওএইচ অফিস।
নিজের প্রোপাগান্ডা কখনো করিনি, করতে হবে বলেও ভাবিনি। সেদিন কিন্তু প্রথমেই সিএমওএইচ স্যারকে সব কথা খুলে বলেছিলাম। তার পরে আকুল গলায় ফরিয়াদ করেছিলাম নিজেরই হয়ে — “বিশ্বাস করুন স্যার, আমি চোর নই। তবে এইভাবে চললে হাসপাতালে যদি টাকা নয়ছয় হয়, অডিটে গরমিল আমি আটকাতে পারব না।”
সিএমওএইচ ডক্টর শংকর সাহা বলেছিলেন — “হুঁ, সাঁকরাইলে এই নিয়ে যে একটা ঘোঁট পাকানো হচ্ছে সে খবর আমার কাছে আছে।”
আমি কৃতজ্ঞ চিত্তে লক্ষ্য করলাম, স্যার আমাকে একবারও জিজ্ঞাসা করলেন না যে, মুগকল্যাণ আমতা বা বালি-জগাছা ব্লকের বিএমওএইচদের তো এইসব আর্থিক গন্ডগোল সামলাতে অসুবিধে হচ্ছে না, তোমার হচ্ছে কেন?
খানিক পরে স্যার বললেন – “তুমি অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস থেকে অপ্ট আউট করার জন্য একটা অ্যাপ্লিকেশন দাও, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। আর ট্রান্সফার বা নতুন প্লেস অফ পোস্টিং চাওয়ার ব্যাপারে কিছু মেনশন করবে না, বুঝলে? আমি দেখছি কি করা যায়!”
আমার পাবলিক হেলথ অ্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস থেকে ইস্তফাপত্র জমা দেওয়ার দিনটি স্পষ্ট মনে আছে – চোদ্দই মার্চ, দু’হাজার সাত। অ্যাপ্লিকেশন জমা করে, হাওড়া ময়দানের জেলা স্বাস্থ্য দফতরের অফিস থেকে তিন ঘন্টার চেষ্টাতেও সাঁকরাইল পৌঁছতে পারিনি সেদিন। সমস্ত দক্ষিণবঙ্গই যেন অবরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। সেইদিন যে বৃহৎ রাজনৈতিক পালাবদলের প্রেক্ষাপট রচিত হয়েছিল বাংলায়, আমার চাকরিভাগ্যের আকাশেও তার ছায়া পড়েছিল কি? জানি না।
পরের দু’মাস কেটে গিয়েছিল নিষ্ফলা প্রতীক্ষায়।
এরই মাঝে একদিন পুরোনো কলেজি বন্ধু তিবর ফোন করল আমাকে। ও তখন পিজির প্লাস্টিক সার্জারি ডিপার্টমেন্টে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কাজ করছে। ওর কথামতো সিভি আর বদলির দরখাস্ত নিয়ে দেখা করতে গেলাম ওর ডিপার্টমেন্টের বড়কর্তার সঙ্গে। ওদের বিভাগে তখন লোকাভাব চলছে — আমার কিছু পূর্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে, তাই বড়স্যার যদি পিজির সুপারের সঙ্গে কথাবার্তা বলে তদ্বির করেন স্বাস্থ্য ভবনে (তখন আর রাইটার্সে নেই স্বাস্থ্য দপ্তর), তাহলে আমার ট্রান্সফারের ব্যাপারটা একটু গতি পায়, এই আর কি! কিন্তু অত লম্বা চ্যানেল বেয়ে কি আর সুপারিশের জোর খাটে?
লাভ কিছুই হলো না আমার।
মা সব শুনে বলল — “যাক, ক্লাসমেটের আন্ডারে কাজ করার লজ্জা থেকে তোকে মুক্তি দিলেন ভগবান। অবশ্য লজ্জা বস্তুটাই তোর নেই, তা নইলে পাশ করার পর পনের বছর কেটে গেল – ডিগ্রি দূরে থাক, একটা পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা জোটাবারও ইচ্ছে হলো না?”
আমি চুপ করেই রইলাম।
দু’হাজার সাত সালের জুন মাসের শেষাশেষি ঠিক করলাম মাকে নিয়ে পুরী ঘুরে আসব কয়েকদিনের জন্য। যদিও আমার অনুপস্থিতির সুযোগে হাসপাতালে বড় ধরণের আর্থিক কেলেঙ্কারি এবং আমার ঘাড়ে সেই ঘটনার দায় চাপার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছিল না, তবু শ্রান্ত শরীর আর অবসন্ন মন ছুটি চাইছিল ভীষণ।
সন্ধেবেলার জগন্নাথ এক্সপ্রেস। একটা এসি থ্রি টিয়ার কামরার সাইড লোয়ার বার্থে গুছিয়ে বসেছি দুজনে, এমন সময় হাতের মোবাইল বেজে উঠল। ফোন করেছেন ডক্টর অশোক পারাল — সাঁকরাইল বিপিএইচসির হোমিওপ্যাথিক মেডিক্যাল অফিসার।
“আপনার রিলিজ অর্ডার এসেছে আজ বিকেলে। অফিস স্টাফেরা হয়ত জানাবে না, আমি জানিয়ে রাখলাম।”
আমি নিচু গলায় জিজ্ঞাসা করলাম – “কোথায় হয়েছে দাদা, জানেন?”
“কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হসপিটাল – ব্লাড ব্যাঙ্ক। ডক্টর আশিস ঘোষ নামে একজন নতুন অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস এম ও আপনাকে রিলিভ করবেন। আমি খবর নিয়ে জানলাম, উনি অলরেডি হাওড়ায় সিএমওএইচ অফিসে জয়েন করে গিয়েছেন।
যান, ভালো করে ঘুরে আসুন। এসে রিলিজ অর্ডার নেবেন। ভালো খবর দিলাম, মিষ্টি পাওনা রইল কিন্তু!”
ট্রেন ছেড়ে দিল। মা কপালে হাত ঠেকিয়ে বিড়বিড় করল — “জয় দারুব্রহ্ম!”
তারপর আমাকে বলল, “অনেক পুণ্যবলে মানুষের জন্মস্থান আর কর্মস্থান এক হয়, জানিস তো! এবারে মন্দিরে গিয়ে ভালো করে পুজো দেবো। যাত্রা শুভ এবার – যাওয়ার মুখেই কত ভালো খবর পেলাম, দেখলি?”
ট্রেন গতি বাড়াল। আমি ভাবছিলাম – এবার তবে নতুন পরিসর, নতুন ক্ষেত্র, নতুন কাজ। সেই পুরোনো অনিশ্চয়তা আবার চাড়া দিয়ে উঠল মাথার ভিতর। আমি পারব তো?
প্রশ্নটা নিয়ে মনের মধ্যে তোলপাড় করতে করতেই সম্পূর্ণ অন্য একটা জিজ্ঞাসার উত্তর পেয়ে গেলাম আকস্মিকভাবে।
আমি হয়ত জীবনে খুব সফল হতে পারিনি, ছুঁতে পারিনি আমার বাবা মায়ের উচ্চাশার শিখর। কিন্তু তার জন্য আমার পেশা নির্বাচন দায়ী নয়।
দক্ষ প্রশাসক, জনপ্রিয় অধ্যাপক, নান্দনিক চারুশিল্পী, প্রসাদগুণ সম্পন্ন সারস্বত সাধক — কিছুই হতে পারতাম না আমি। আমি কেবল চিকিৎসক হতে পারতাম। ঠিক যা আমি হয়েছি। পরিশ্রমী, আত্মবিশ্বাসহীন, মধ্যমেধার একজন “পাতি এমবিবিএস”!
(সমাপ্ত)











