ন্যাশনালের হাউসস্টাফশিপ শেষ হয়ে যাবার পর বছর ঘুরে গেল — আমি যে তিমিরে ছিলাম, সেখানেই রয়ে গেলাম। তখন আমার নিয়মিত রোজগারের ভীষণ প্রয়োজন। প্র্যাকটিসে আমি সুবিধে করতে পারব না তা প্রমাণিত হয়ে গিয়েছে। সেই দেওয়ালে পিঠ থেকে যাওয়া দিনগুলোতে আমি পেশা পরিবর্তনের কথাও ভেবেছিলাম। নতুন করে জেনারেল স্ট্রিমে গ্র্যাজুয়েশন করা তো আর সম্ভব নয়, তাই বসতে চেয়েছিলাম পশ্চিমবঙ্গের সিভিল সার্ভিসের পরীক্ষায়। বাবা-মায়ের পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া সম্ভব ছিল না সেটা। আর বাড়িতে অমন ইচ্ছে প্রকাশ করা মাত্র যে নাকচ হয়ে গিয়েছিল, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আত্মীয় স্বজনদের বাড়িতে বেড়াতে গেলেই সেই অমোঘ প্রশ্নাবলী — কি করছিস আজকাল? আরও পড়বি তো? ও, বাড়িতেই আছিস? প্র্যাক্টিস করছিস নাকি?
শুধু বাবা মায়ের নয়, আমি যেন দিন কে দিন নিজেরই চক্ষুশূল হয়ে উঠছিলাম!
এই রকম আঁধার সুড়ঙ্গে হোঁচট খেতে খেতে চলেছি — এমন সময় আলোর দিশারী হয়ে এলো একটা বিজ্ঞাপন। খবরের কাগজের বিজ্ঞাপন। কল্যাণীর জওহরলাল নেহরু হাসপাতাল পেডিয়াট্রিক্সে হাউসস্টাফ চাইছে – এক বছরের অভিজ্ঞতা থাকলে ভালো, না থাকলেও ক্ষতি নেই।
বাবার সঙ্গে কল্যাণী শিল্পাঞ্চল চলে গেলাম ইন্টারভিউয়ের নির্দিষ্ট দিনে। জেএনএম হাসপাতালের চত্বরটি বিশাল। প্রচুর রোগীর ভিড়। আউটডোরের ব্যস্ততা ন্যাশনালকে হার মানায় দেখলাম। ব্যারাকপুর থেকে কৃষ্ণনগরের মধ্যে, এই তল্লাটের সর্ববৃহৎ হাসপাতাল এটি — লোকমুখে, ‘পাঁচশ বেডের হসপিটাল’।
সুপার সাহেবের ঘরে একটা নামকাওয়াস্তে সাক্ষাৎকার হলো বটে, কিন্তু বোঝা গেল যে সেটা নেহাৎই একটা প্রটোকল। কারণ, দেখেশুনে বুঝলাম এঁদের ডাক্তারের অভাব খুবই তীব্র। এদিকে আমার আক্কেল গুড়ুম হয়ে গেল যখন সুপার সাহেব হাসিমুখে জানালেন যে আমি অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার আজই অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিস থেকে নিয়ে যেতে পারি, তবে একটি নগণ্য পরিবর্তন হয়েছে আমার হাউসজবের শর্তে — পেডিয়াট্রিক্সের পরিবর্তে এঁরা আমাকে প্লাস্টিক সার্জারি ডিপার্টমেন্টের হাউসস্টাফ হিসেবে নিযুক্ত করছেন!
আমি মিনমিন করে বলতে চেষ্টা করলাম যে আমার তো জেনারেল সার্জারিরই কোনো অভিজ্ঞতা নেই, প্লাস্টিক সার্জারি দূর অস্ত! আর তাছাড়া ন্যাশনালে আমার এক বছর পেডিয়াট্রিক মেডিসিনে হাউসজবের অভিজ্ঞতাও রয়েছে — খবরের কাগজে পেডিয়াট্রিক্সের কথা পড়েই আমি কাজের জন্য এসেছি। প্লাস্টিক সার্জারি জানলে তো আসতামই না।
উনি হাসিমুখেই বললেন, “পাঁচটা হাউসস্টাফের জন্য বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছিল। তুমি ছাড়া আর একজনও আসেনি। আর পেডিয়াট্রিক্সে তাও একজন হাউস স্টাফ আছে – প্লাস্টিক সার্জারিতে একজনও নেই, রেগুলার অপারেশনগুলো প্রায় বন্ধ হওয়ার জোগাড় হয়েছে। আপাতত পেডিয়াট্রিক্সে তোমায় অ্যাপয়েন্ট করতে পারছি না। যদি এখন জয়েন করো, মাস তিনেক পরে চেঞ্জ করে দেবার কথা ভেবে দেখতে পারি। এবার তুমি দেখো কি করবে! তবে যা ঠিক করো, এখনই জানিয়ে দিতে হবে। তুমি রাজি না হলে জোর করে তো আর নিতে পারি না।”
দোটানার পরীক্ষা আমাকে যতবার দিতে হয়েছে জীবনে, সম্ভবত খুব বেশি মানুষকে দিতে হয়নি।
নেহরু হাসপাতালের সুপারের ঘরে, মিনিটের ভগ্নাংশে যে ঝড়ের গতিতে ভবিষ্যতের দিশা হাতড়েছিল আমার মন, তার উত্তর একটাই হওয়া সম্ভব ছিল — হ্যাঁ, আমি রাজি, প্লাস্টিক সার্জারির হাউসস্টাফ হিসেবে পরের দিন থেকেই কাজে যোগ দিতে আমি প্রস্তুত।
কিন্তু তাড়াহুড়োয় কাজ ভালো হয় না। সাময়িক স্থির রোজগারের আশায়, হঠকারীর মতো যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম সেদিন, তার ফলও ভালো হয়নি। তবে, সে অন্য গল্প।
জেএনএম হাসপাতালের প্লাস্টিক সার্জারি ডিপার্টমেন্টের সুনাম ছিল। আর যাঁর হাত ধরে এসেছিল এই সুনাম, তাঁর সঙ্গে পরিচয় হলো প্রথম দিনেই।
আমি ঠিক করে রেখেছিলাম যে স্যারের তত্ত্বাবধানেই কাজ করতে হোক না কেন, আমার অজ্ঞতা স্বীকার করে নেব প্রথম দিনেই। সেই মতো, স্টাফ রুমে হাজিরা খাতায় সই করেই সারেন্ডার করলাম ডক্টর শ্যামল গাঙ্গুলির কাছে। “স্যার, আমার সার্জারির কোনো অভিজ্ঞতা নেই, ভালোও বাসতাম না কোনোদিন। পেডিয়াট্রিক্সে হাউস জব করা ছিল, তাতেই কন্টিনিউ করব ভেবে এসেছিলাম—”
গম্ভীর গলায় আমায় থামিয়ে বলেছিলেন উনি — “কোন কলেজ?”
আমি আরও গলা নামিয়ে বলেছিলাম — “ন্যাশনাল মেডিক্যাল”–
“হুম। তা, ডান বাঁ চিনে গ্লাভস পরতে পারবে তো? বাকিটা আমি বুঝে নেব।”
ডক্টর গাঙ্গুলিকে দেখে ভয় হতো, ভক্তিও। মনে হতো, আমি পারব। আমাকে পারতেই হবে। যতই খারাপ লাগুক, ভয় করুক, আত্মবিশ্বাস হাত ছাড়িয়ে দৌড় দিক পিছনপানে, আমার শিক্ষকের মুখের দিকে তাকিয়ে আমাকে এগিয়ে যেতেই হবে। যে মানুষটা আমাকে শল্যচিকিৎসার এবিসিডি থেকে শেখাতে আরম্ভ করেছেন পরম যত্নে, তাঁর ঐকান্তিক চেষ্টাকে অপমান করার অধিকার নেই আমার।
সেই কাঁচা বয়সে, অপরিণত মন নিয়ে তখন বুঝিনি যে এভাবে রজতজয়ন্তী সপ্তাহ পার করা বাংলা চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য তৈরি হতে পারে হয়ত, ডাক্তারি শিক্ষা হয় না।
সরকারি আউটডোরের দরজা খোলার আধঘন্টাটাক আগে, সকাল সাড়ে আটটা নাগাদ পৌঁছে যেতাম হাসপাতালে। সেখানে আমার দিন শুরু হতো বার্ন ড্রেসিং দিয়ে। জেএনএমের প্লাস্টিক সার্জারির বেশির ভাগ অপারেশনই হতো পোড়া চামড়ার উপর নতুন চামড়া প্রতিস্থাপন বা স্কিন গ্রাফটিংয়ের অপারেশন।
মানুষের শরীরের কোনো বিস্তীর্ণ অংশ আগুনে গভীরভাবে পুড়ে গেলে, তাকে বাঁচানো মুশকিল হয়ে পড়ে। কারণ, সংক্রমণ। বেশিরভাগ আগুনে পোড়া রোগী সেই সেপসিস কাটিয়ে আর ফিরতে পারে না। যারা ফেরে, তাদের শরীরের দগ্ধ অংশের চামড়া এমনভাবে জুড়ে যায়, যে হাত পা ঘাড় গলা নাড়ানো, এমন কি ঢোক গেলা, কথা বলা, হাসাও তাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। একে ডাক্তারি পরিভাষায় বলা হয় পোস্ট বার্ন কন্ট্র্যাকচার। পোড়া ঘা সম্পূর্ণ শুকিয়ে গেলে, সেই রোগীর প্লাস্টিক সার্জারি করা হতো — তার নিজের শরীরের কোনো অক্ষত অংশের চামড়া, বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে পাতলা করে তুলে নিয়ে, সেই পোড়া অংশে প্রতিস্থাপন করা হতো। কখনো খুব সূক্ষ্ম সেলাই দিয়ে জুড়ে দেওয়া হতো, আবার কখনো সেলাই ছাড়াই চেপে বসিয়ে, তার উপর ওষুধপত্র দিয়ে ড্রেসিং করে প্লাস্টার করে দেওয়া হতো। প্লাস্টার করা হতো ঐ গ্রাফটিংয়ের উপর চাপ বজায় রাখতে, যাতে প্রতিস্থাপিত চামড়া সরে না যায়। পাঁচ দিন পরে সেই ব্যান্ডেজ খুললে বোঝা যেত, রোগীর শরীর সেই প্রতিস্থাপিত চামড়া গ্রহণ করেছে কিনা। না করলে, অপারেশনের পুনরাবৃত্তি হতো। এই দীর্ঘ চিকিৎসার পরে একজন বেঁচে যাওয়া পোড়া রোগীর মোটামুটি কর্মক্ষম জীবনে ফিরতে অনেক সময় বছর ঘুরে যেতো।
সদ্যদগ্ধ এবং স্কিন গ্রাফটিং সম্পন্ন হয়েছে, দুই ধরনের রোগীর ড্রেসিংই করতে হতো আমাকে। অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করতাম, ফিমেল বার্ন ওয়ার্ড যেখানে উপচে পড়ছে রোগীতে, রোজই টেনে আনতে হচ্ছে এক্সট্রা বেড, সেখানে মেল বার্ন ওয়ার্ড প্রায় ফাঁকা। যে হাতে গোনা দু’তিনটি রোগী আছে, তারা সকলেই পেশাগত দুর্ঘটনার শিকার – ইলেকট্রিকের কাজ করতে গিয়ে বা ওয়েল্ডিং করতে গিয়ে পুড়ে গিয়েছে। পোড়া অংশও খুব বিস্তৃত হতো না – বড়জোর হাতের আঙুল, কব্জি বা কনুই অবধি পুড়ত।
কিন্তু ফিমেল বার্ন ওয়ার্ডে প্রায় প্রত্যেকেরই শরীরের ৬০ থেকে ৭০% পোড়া, আর তার কারণ ঐ একটাই — স্টোভ ফেটে যাওয়া। সেখানে মহুয়া রায়চৌধুরী আর সনকা মণ্ডলের দহনভাগ্যে কোনো পার্থক্য নেই।
আবার অপারেশনের ক্ষেত্রে উল্টো ছবি। পুরুষ রোগীদের সিংহভাগই আসত কারেকশনাল সার্জারির জন্য — যাতে তারা ফের কাজকর্ম করে রোজগার করতে পারে। আর মেয়েদের সার্জারির কারণ ছিল কসমেটিক — “ডাক্তারবাবু, অন্তত চলনসই করে দিন দেখতে, নয়ত মুখ দেখাতে পারব না – বাঁচব কেমন করে?” —এই ছিল তাদের আর্তি।
ব্যতিক্রম ছিল নিশ্চয়, তবে নগণ্য।
পোড়া রোগীর পরিচর্যা ব্যতীত প্লাস্টিক সার্জারিতে কিছু টিউমার, সিস্ট বা দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতের মেরামতির অপারেশনও হতো।
প্লাস্টিক সার্জারির কাজ ছাড়াও সপ্তাহে একদিন আমাকে জেনারেল সার্জারির অন কল ডিউটি দিতে হতো। জেনারেল সার্জারির যে ইউনিটে আমি ইমার্জেন্সি ডিউটি দিতাম, তার ইন চার্জ ছিলেন তুখোড় সার্জেন অলোক মজুমদার। দুজন মেডিক্যাল অফিসার, আরও একজন সিনিয়র হাউসস্টাফকে পেরিয়ে উনি আমাকে দেখতে পেতেন বলেও মনে হতো না আমার।
তাই এক মঙ্গলবার, ওঁর অ্যাডমিশন ডে-তে সন্ধ্যেবেলা যখন ওটি-তে ডাক পড়ল আমার, অবাক হয়েছিলাম। আমি প্লাস্টিক সার্জারির সামান্য জুনিয়র হাউসস্টাফ, আমায় ডাকে কেন? ওটি-তে পৌঁছে দেখি হুলুস্থুল কান্ড!
আদতে রোগী গাইনি ডিপার্টমেন্টের। একটি অল্পবয়সি বৌ। প্রথম প্রসূতি। প্রায় ছ’মাসের অন্তঃসত্ত্বা। পেটে প্রচন্ড যন্ত্রণা শুরু হওয়ায় হাসপাতালে নিয়ে এসেছে বাড়ির লোকজন। পেটের চামড়ায় বড় কালশিটের দাগ আর অল্প পরিমাণ রক্তস্রাব দেখে প্রথমে ভাবা হয়েছিল, হয়ত পড়ে টড়ে গিয়ে গর্ভপাত হয়ে গিয়েছে। তারপর, মেয়েটিকে হাসপাতালে আনার পর থেকেই স্বামী বেপাত্তা শুনে গাইনির ডাক্তারবাবুদের অন্যরকম সন্দেহ হয়। ইমার্জেন্সি আলট্রাসোনোগ্রাফির ব্যবস্থা ছিল না জেএনএমে।
তাঁরা অপারেশনে নামেন, কিন্তু সার্জারির ডক্টর মজুমদারকে সঙ্গে নিয়ে নামেন। অ্যাবডোমেন ওপেন করেই তাঁরা দেখেন সাংঘাতিক ব্যাপার — ভয়ঙ্কর আঘাতে (সম্ভবত লাথি) প্লীহা ফেটে গিয়েছে মেয়েটির। সমস্ত পেটে ভর্তি রক্ত — এদিকে পালস ক্ষীণ, জিভ সাদা, প্রাণ পাখি খাঁচা ছেড়ে উড়ু উড়ু করছে।
আমার ডাক পড়ার কারণ হৃদয়ঙ্গম হলো। এই কেস সামাল দিতে সার্জারির দুজন এবং গাইনির দুজন মেডিক্যাল অফিসার সহ ডক্টর মজুমদার নেমে পড়েছেন অপারেশনে।একজন গাইনির ডাক্তারবাবু অন্য ইমার্জেন্সি সামলাচ্ছেন। অথচ সেই মুহূর্তে আরও কাজ রয়েছে। ব্লাড রিকুইজিশন করা এবং তার জন্য রক্ত টানা, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং স্যালাইনের প্রেসক্রিপশন করা ইত্যাদি। কিন্তু সেগুলো করবার জন্য ঐ সময়ে আর কোনো ডাক্তারের হাত খালি ছিল না। অগত্যা, আমি।
যমে মানুষে লড়াইয়ের পরে, সন্তান হারালেও, মেয়েটি কিন্তু বেঁচে গিয়েছিল সে যাত্রা।
তার পরের খবর আমার অজানা।
ডক্টর গাঙ্গুলির সঙ্গে আমার সম্পর্ক গুরু-শিষ্যার সম্পর্কের স্বাভাবিক স্নেহ আর সমীহের সমীকরণ ভেঙে এক অসমবয়স্ক সখ্যে রূপান্তরিত হচ্ছিল।
জেএনএমে তো বটেই, আমি ওঁর প্রাইভেট কেসের অপারেশনগুলোতেও অ্যাসিস্ট করতে যেতে শুরু করলাম। কল্যাণীর চেম্বার, শ্যামবাজার কিংবা দমদমের ঘরোয়া নার্সিংহোম থেকে আরম্ভ করে উডল্যান্ডস-বেলভিউ পর্যন্ত সঙ্গী হতে থাকলাম একের পর এক অপারেশনে। যদি কখনো অ্যানেস্থেটিস্ট মঞ্জুদির আসতে দেরি হতো, স্যার বলতেন — “তুই-ই ড্রিপ চালিয়ে দে”– অভ্যস্ত হাতে রোগীর শিরায় ছুঁচ ফুটিয়ে বিন্দু বিন্দু নুন জল চালান করতে করতে আমার ন্যাশনালের পেডিয়াট্রিক্স ডিপার্টমেন্টের কথা মনে পড়ে যেত। ডক্টর গাঙ্গুলি যখন প্রশংসাসূচক হেসে বলে উঠতেন –“বাহ্, ছোট বাচ্চার ভেনেও এক চান্সেই দারুণ চালালি তো”– আমার মনে পড়ত, সিনিয়র হাউসস্টাফ রাজাদা, সঞ্জয়দা-রা হাতে ধরে শেখাচ্ছে, কেমন করে কোল্যাপ্সড শিরাতেও একবারের চেষ্টাতেই সফলভাবে ঢুকিয়ে দেওয়া যাবে স্যালাইনের ছুঁচ। প্রিয় শিক্ষকের পরম আকাঙ্ক্ষিত স্তুতির বাহুল্যের মধ্যেও মনে হতো, এ পরবাসে আর কতদিন? মনের এক অদ্ভুত টানাপড়েনের মাঝে কান্না পেয়ে যেত ভীষণ।
পর পর দু’বার এক্সটেনশন পেলেও, কোনো অজ্ঞাত কারণে, কল্যাণী জে এন এম হাসপাতাল আমাকে তৃতীয়বার আর হাউসস্টাফশিপে পুনর্বহাল করল না। সেটা উনিশ শ’ ছিয়ানব্বই সালের মাঝামাঝির কথা।
আমিও অবশ্য রিনিউয়ালের জন্য খুব ব্যগ্র ছিলাম না। কারণ বাবার সে বছরই রিটায়ার করার কথা। নৈহাটির কোয়ার্টার আমাদের ছেড়ে দিতে হবে। বাবা জ্যাঠাদের আগরপাড়ার পৈতৃক বাড়ি ততদিনে বিক্রি হয়ে গেছে। বাবা দক্ষিণ কলকাতার উপকণ্ঠে এক ফালি জমি কিনে ফেলেছে মায়ের শখ মেটাতে, সেখানে আমাদের নিজেদের বাড়ি হবে। এতটুকু বাসা।
তাই কল্যাণীর কাজটা চলে যাওয়াতে বিশেষ চিন্তিত হইনি। স্যারের ব্যক্তিগত কেসগুলোয় আগের মতই অ্যাসিস্ট করে যাচ্ছিলাম। কেবল ট্রেনে নৈহাটি-শিয়ালদা করতে হতো খুব, তাই বাড়িতে থাকার সময়টা কমে যাচ্ছিল। এক দিক থেকে ভালই — কারণ, আমার ‘পিচ ডার্ক ফিউচার’ নিয়ে মায়ের ভর্ৎসনামাখা হা হুতাশ বেশি সহ্য করতে হতো না।
ছিয়ানব্বইয়ের পুজোর আগে আমরা কলকাতায় চলে এলাম। বাবার কেনা জমির কাছাকাছি একটা ভাড়া বাড়িতে এসে উঠলাম তিনজনে ।
ডক্টর গাঙ্গুলিরই সুপারিশে শ্যামবাজারের একটা চিলতে নার্সিংহোমে আর এম ও-র চাকরি করছি তখন। অ্যাপেন্ডিসেকটমি, গল স্টোন বা হার্নিয়ার অপারেশন কিংবা টিউমার বাদ দেওয়ার অস্ত্রোপচারে, সাহায্যকারীর ভূমিকা ছাপিয়ে হাতে স্ক্যালপেল তুলে নেওয়ার ক্ষমতা আর আমার কোনোদিনই হলো না। আমি তো চাইওনি সেটা — শ্রদ্ধেয় শিক্ষকের সান্নিধ্যে থেকে, তাঁর কাজের ছায়াসঙ্গী হয়েই কাল কাটিয়ে দিতে চেয়েছিলাম। ভবিষ্যতের কোনো রূপরেখা আঁকতে পারেনি আমার বিক্ষিপ্ত, অস্থির মন।
কিন্তু শ্যামবাজার থেকে বেহালার অন্তিম প্রান্তে নিত্য যাতায়াত করা আমার পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল। হেপাটাইটিস বি থেকে ভুগে ওঠা দুর্বল শরীর এই পরিশ্রমে প্রবল আপত্তি জানাতে আরম্ভ করল।
হঠাৎই পাড়ার এক ওষুধের দোকানদার মারফত খবর পেলাম যে বেহালায় একটা ছোটখাটো নার্সিংহোম মার্কা বেসরকারি হাসপাতাল আছে, যেখানে সারা বছরই ডাক্তারের অভাব লেগে থাকে। সেখানে একবার খোঁজ করে দেখবার পরামর্শ দিলেন ভদ্রলোক।
বাবার সঙ্গে চললাম সেখানে। হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা-পরিচালক ডাক্তার অনুতোষ দত্তের কেবিনে মিনিট পনেরোর ইন্টারভিউ, ওঁর আমার ডাক্তারি পাশ করার পরের শংসাপত্রের ক্ষীণকায় বান্ডিল উল্টে পাল্টে দেখা, বাবার সঙ্গে দু’চারটি ঘরোয়া আলাপচারিতা — ব্যস, তারপরেই হাতে পেয়ে গেলাম অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার।
বেহালা বালানন্দ ব্রহ্মচারী হাসপাতাল আমাকে পেডিয়াট্রিক মেডিসিনের রেসিডেন্সিয়াল মেডিক্যাল অফিসার হিসেবে নিযুক্ত করল — বেতনের অঙ্ক আমার তখনকার মাইনের প্রায় দ্বিগুণ।
আমি অবশ্য স্যালারির ফিগারটা দেখিনি। শুধু, একটা শব্দই দেখেছিলাম, পেডিয়াট্রিক্স। অনেক দিন দেশে বিদেশে ভ্রমণ করে শ্রান্ত শরীরে আপন ঘরে ফেরার স্বস্তি ফিরিয়ে দিয়েছিল শব্দটা।
শ্যামবাজারের নার্সিংহোমের চাকরিটা আমি ছেড়ে দিলাম।
(ক্রমশ)











অনবদ্য আপনার লেখা ❤️❤️🙏
ভাবা যায় না, একজন শিশু চিকিৎসক এত ভাল কীভাবে লিখতে পারেন। অপূর্ব ❤️