ভুটান থেকে ফেরার পথে জলদাপাড়ায় একরাত্রি কাটিয়ে পরের দিন ভোর ভোর গন্ডার দেখতে বেরিয়ে পড়লাম। জিপ সাফারির টিকিটের লাইনে দাঁড়িয়ে রাঢ়ী ভাষায় কথোপকথন শুনছিলাম। মেদিনীপুর থেকে একদল যাত্রী বাসে করে জলদাপাড়া সফরে এসেছেন। জনৈক বৃদ্ধাকে নিয়ে কথাবার্তা চলছিলো। হাঁটুর ব্যথায় কাবু ছিলেন গত কয়েকমাস ধরে। তথাকথিত পাশকরা চিকিৎসকেরা কোনোভাবেই ব্যথা কমাতে পারেননি। তারপর কি এক অব্যর্থ আয়ুর্বেদিক ওষুধে পুরো ব্যথা গায়েব। তাইই তো তিনি এ সফরে অংশ নিতে পেরেছেন। কিন্তু গতকাল সন্ধ্যে থেকে হঠাৎ “গ্যাস” জমে গিয়ে সারা গা হাত পা ফুলে গেছে। “গ্যাসের চোটে” প্রস্রাব বন্ধ। ট্যুর আয়োজক তিনরকম গ্যাসের ওষুধ দিয়েছেন। কিন্তু গা হাতের ফোলা কমেনি। অবশেষে মাদারীহাট হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে। সকালের জিপসাফারি এখন দূরঅস্ত।কোনোভাবে বৃদ্ধাকে জ্যান্ত বাড়ি ফেরাতে পারলে ট্যুর আয়োজক হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন। আয়োজকের স্যাঙাৎ অতশত না বুঝে তখনও পাশ করা চিকিৎসকের অকর্মণ্যতা নিয়ে মুখর।
পাশে দাঁড়িয়ে আমি উনাদের বক্রোক্তি চুপচাপ হজম করে চলেছি। নিজের চিকিৎসক সত্ত্বা ঊষ্মা প্রকাশ করতে চাইলেও ভারে টিকবো না ভেবে আমি আর আমার চিকিৎসক স্ত্রী স্পিকটি নট হয়ে আলুভাতে মার্কা নিরীহ চোখে উনাদের বাক্যশূল হজম করে চলেছি।
কিন্তু বাধ সাধলো আমার স্বভাব আলাপী মাতৃদেবী। চিকিৎসকের মা হওয়ার গর্বেই হোক বা খানিক মনোযোগ আকর্ষণের জন্যই হোক, স্বদেশীর কষ্ট দেখে আকুল মনে আমাদের পর্দাফাঁস করে দিলেন।
পাশ করা ডাক্তার হওয়ার অপরাধে আমরা তখন কাঁচুমাচু।
তিন-চারজন রোগা পাতলা ভদ্রলোক এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন “আপনারা ডাক্তার”?
ধরা পড়ে ভ্যাবাচ্যাকা মুখে জবাব দিলাম- “ভুল বশত:”
এবার হঠাৎ পট পরিবর্তন। “পাশকরা” ডাক্তার দেখে ট্যুর আয়োজক এতক্ষণের নিন্দামন্দ ছেড়ে একরকম হাতজোড় করে বললেন, একটু দেখে দেবেন? নাহলে কত বড় বিপদে পড়বেন, তার ফিরিস্তি দিলেন।
আমার আবার দয়ার শরীর। বললাম, সাফারি শেষে অবশ্যই দেখে দেব।
এরপর গন্ডার, হর্ণবিল, হাতি, ময়ূর আর দূর্লভ মদনটাক পাখি দেখে ফিরে আসতেই একরকম চ্যাং-দোলা করে ধরে নিয়ে গেলেন উনারা কাছের এক হোটেলে।
বৃদ্ধার বয়স ষাট পেরিয়েছে। হাঁটুর হাড় ক্ষয় জনিত অস্টিওআর্থ্রাইটিসের ব্যথা কমাতে এদিক ওদিক দেখিয়েছেন। কিন্তু “পাশকরা” চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র নিয়মিত সেবন কখনোই করেননি ও ব্যায়াম করার নিদানকে পাত্তাই দেননি। অবশেষে গ্রামের এক স্বঘোষিত আয়ুর্বেদ চিকিৎসকের কাছে গিয়ে মোক্ষলাভ হয়েছে। কি এক কৌটো ভরা ওষুধে দু-দিনেই ব্যথা গায়েব। কিন্তু এখন সারা গা ফুলেছে। প্রস্রাব সকাল থেকে বন্ধ। ধীরে ধীরে শ্বাসকষ্ট বাড়ছে। মুখখানা কেমন যেন চাঁদের মত অস্বাভাবিক রকম গোলাকার। যেকোনো “পাশকরা” চিকিৎসকের বুঝতে অসুবিধা হবার কথা নয়, কি হয়েছে।
তাও নিশ্চিত হবার জন্য কৌটোটা হাতে নিয়ে ভেতরের ওষুধ গুলো হাতে রেখে দেখলাম, কিছু ওষুধের গায়ে লেখা “ডেক্সা”, অর্থাৎ কিনা ডেক্সামেথাসোন গ্রুপের অ্যালোপ্যাথিক স্টেরয়েড ওষুধ। আর কিছু লাল রঙের আইবুপ্রোফেন গোত্রের বহুপরিচিত অ্যালোপ্যাথিক ব্যথার ওষুধ। যার অবৈজ্ঞানিক প্রয়োগে কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে প্রস্রাব বন্ধ হয়েছে। আর স্টেরয়েডের অপপ্রয়োগে হাইপোথ্যালামো-পিটুইটারী-অ্যাড্রেনাল অ্যাক্সিস ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে প্রবল বমি ও দুর্বলতা,গা হাত মুখ ফোলা দেখা দিয়েছে। যাকে চিকিৎসা পরিভাষায় আমরা আয়াট্রোজেনিক কুশিংস সিনড্রোম বলে থাকি। এর প্রভাবে হাড়ের ব্যথা সাময়িক কমলেও শরীরের সমস্ত হাড়গোড় ক্ষণভঙ্গুর হয়ে স্বল্প আঘাতেই ভেঙে যায়।
চিকিৎসা বড্ড জটিল ও সময়সাপেক্ষ এসব ক্ষেত্রে। প্রথমত ধীরে ধীরে স্টেরয়েডের প্রভাব থেকে মুক্ত করতে হয়। কিছুক্ষেত্রে কাঁটা দিয়েই কাঁটা তুলতে হাইড্রোকর্টিসোন প্রয়োগ করে নিয়ন্ত্রিত ভাবে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা চালাতে হয়। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রোগী অত ধৈর্য্য রাখতে না পেরে আবার স্টেরয়েডের অপপ্রয়োগের পথে ঝুঁকে পড়ে মৃত্যুমুখী হয়ে পড়েন।
বৃদ্ধাকে অনেক বোঝানোর পরেও তিনি খুব বুঝেছেন বলে মনে হলো না। আপাতত ঊর্ধ্বমুখী প্রেসার দেখে একটা ডাই-ইউরেটিক প্রয়োগ করে সাময়িক স্বস্তি দিয়ে বিদায় নিলাম। যাবার আগে বারবার করে সমস্ত কিছু আরও একবার বুঝিয়ে বাড়ি ফিরে এন্ডোক্রাইনোলজিষ্টের কাছে চিকিৎসা করানোর নিদান দিয়ে এলাম।
কিন্তু এ যে আমার অরণ্যে রোদন ছাড়া কিছুই নয়, তা আমি ভালোভাবে জানি। প্রতিনিয়ত চেম্বারে এধরনের রোগীর ভিড়ে নিজেকে অসহায় লাগে। হাটে বাজারে ব্যথা কমানোর আয়ুর্বেদিক ওষুধের প্রলোভনে অসাধু ব্যবসায়ীরা স্টেরয়েডের ফাঁদে ফেলছেন সাধারণ মানুষকে। মরলে মরুক। ব্যথা তো কমেছে। আর তাছাড়া মরার সময় হাসপাতালে পাশকরা চিকিৎসকের কাছেই মরবে। ফলে খুব সহজেই মৃত্যুর দায়ভার “পাশকরা” চিকিৎসকের ঘাড়ে চাপিয়ে অসাধু ব্যবসার রমরমা বাজার জারি থাকবে।









