আজ সকালে একটি বড় বাটিতে সামান্য দুধ গরম করতে গিয়ে উথলে উঠে কিছুটা পুড়ে গেল। আমি পাশেই দাঁড়িয়ে কি একটা কাজ করছিলাম। সেই সময় মোবাইলে একটা অনুষ্ঠানের ভিডিও চলছিল। কি ভাবে ওটা মোবাইলে চলতে থাকে মনে পড়ছে না। কিন্তু কি অনুষ্ঠান চলছিল? আমার গুরুদেব, মালদার প্রয়াত কিংবদন্তি চিকিৎসক ডা পিনাকী রঞ্জন রায় মহাশয়ের জন্ম শতবর্ষ অনুষ্ঠান। আমার পরিচিত যারা আমার একটি বাংলা বই পড়েছেন তাঁরা জানেন, ডা পিনাকী রঞ্জন রায় আর মেদিনীপুরের কুষ্ঠ আশ্রমের পূজ্যপাদ অরুণ কুমার চক্রবর্ত্তী মশাই আমার জীবনের দুই গুরুদেব। ডা পিনাকী রঞ্জন রায় সম্বন্ধে আমার বইতে কিছু কথা লিখেছিলাম। আজ ওনার সম্বন্ধে আর একটি কথা জানলাম।
মহান কর্মযোগী ডা রায়ের সাথে আমার প্রথম দেখা হয় ১৯৯২ সালে। মেদিনীপুর শহরে একটি চক্ষু অপারেশন শিবিরে মাত্র চার ঘণ্টায় একশ আশি জনের চোখের ছানি অপারেশন করেছিলেন। ঐ রকম বুলেট ট্রেনের গতিতে ছানি অপারেশন আমি তার আগে দেখিনি। সেদিন সকালে উনি বলেছিলেন, “এই শরীরের বয়স হয়েছে ছেষট্টি বছর।” সেদিন সকালে ওনার ভাষণে উনি এমন কিছু কথা বলেছিলেন যা আমার সারা জীবন মনে থাকবে। ওনার বলা কিছু কথা আগেই লিখেছি। যে কোন মহান মানুষ ঐ ভাবেই বলেন। সেই সময় দেখেছিলাম, উনি ওনার শিবিরে কাজ করার অন্য সকল কর্মচারীর সাথে ধর্মশালায় ছিলেন। ওনার সামান্য রাতের খাবার, ভোরে উঠে কর্তাল হাতে কীর্তন, এসব খবর তখনই জেনেছিলাম। এও জেনেছিলাম যে, উনি মালদহের হরিশচন্দ্রপুরের জমিদার বাড়ির সন্তান। ছোট বেলায় ওনাদের বাড়ীতে হাতি পুষতে দেখেছেন। পরে আমি মালদহ শহরে ওনার বিশাল বাড়ী দেখে এসেছি। ওনার মহাপ্রয়াণের পরে, ওনার সুযোগ্য পুত্র ডা ধূর্য্যটি প্রসাদ আমাকে দুটি সি ডি পাঠিয়েছিল। সেখানেও দেখেছি ওনার বৈষ্ণব সন্ন্যাসীর মত জীবন যাপন। আজ যে শতবার্ষিকী অনুষ্ঠানের ভিডিও দেখছিলাম, সেই অনুষ্ঠানে মালদহের এক বরিষ্ঠ চিকিৎসক তাঁর সঙ্গে ডা পিনাকী রঞ্জন রায় মশাইয়ের কিছু স্মৃতি কথা বলছিলেন।
এখানেই আমার এক অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়ে গেল। এক যুগ আগে, তখন আমি সবে সাপের কামড় নিয়ে, জেলায় জেলায় গিয়ে ডাক্তারবাবুদের প্রশিক্ষন শুরু করেছি। আমার পরিচিত এক ডাক্তারবাবু সুদূর উত্তর বঙ্গের এক জেলার মুখ্য স্বাস্থ্যআধিকারিক হয়েছেন। ওনার ডাকে মাত্র দিন তিনেকের মধ্যে একটি স্লিপার ক্লাশের ট্রেনের টিকিট কেটে চলে গেলাম। একই ট্রেনে শিয়ালদা থেকেই উঠেছিলেন, সেই CMOH সাহেব। শিয়ালদা স্টেশনে আমার সাথে দেখা করতে এসে জানালেন, ওনার টিকিট এ সি কামরায়। আমার কিছু করার ছিল না। তিন দিন আগে টিকিট কেটে, স্লিপার ক্লাশের টিকিট পেয়েছি, সেটাই যথেষ্ট। ফেরার টিকিটও স্লিপার ক্লাশের ছিল। অন্তত সেই সময় এই “শ্রেণী সংগ্রাম” আমার মাথাতেই ছিল না। ওখানে পৌঁছে আমার সাপের কামড়-এর ক্লাশে আমার এক বন্ধুর স্ত্রীর সাথে দেখা হল। মেদিনীপুরের ব্যস্ত চোখের ডাক্তার হিসেবেই ওরা আমাকে শেষ দেখেছে। আমার এই নতুন মূর্তি ঐ রকম অনেককেই বিস্মিত করেছে। বন্ধু পত্নী জানালেন যে, আমার সেই বন্ধু বেশ ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন, সকালে গেলেই দেখা হতে পারে। পরদিন সকালে গেলাম ওনাদের বাসায়। বন্ধুও যথেষ্ট অবাক হয়েছে, আমার নতুন রূপ দেখে। দুপুরের ট্রেনে ফেরার কথা, ওনারা জেনেছেন। দুপুরে ট্রেনের সময়ের এক ঘণ্টা আগে সেই বন্ধু পত্নী মোবাইলে ফোন করে জানতে চাইলেন, ট্রেনে আমার বার্থ নম্বর কি? উনি একবার দেখা করতে আসবেন। আমি স্লিপার ক্লাশের বার্থ নম্বর বলায় উনি দুবার করে জানতে চাইলেন। গলার আওয়াজ শুনে বেশ বুঝতে পারলাম, উনি খুব অবাক হয়েছেন। জেলায় জেলায় গিয়ে সেখানকার ডাক্তারবাবুদের পড়াতে গিয়ে আর যাই হোক, প্র্ভূত মান সম্মান পেয়েছি। CMOH সাহেব আমার হাত থেকে ব্যাগ কেড়ে নিয়ে ট্রেনে উঠিয়ে দিয়ে গিয়েছেন, এমনও হয়েছে। আজও মনে করি, আমার যোগ্যতার তুলনায় অনেক বেশী পেয়েছি। সেবার স্টেশনে এসে সেই বন্ধুপত্নী আমার হাতে কিছু “রিটার্ন গিফট” দিয়ে গেছিলেন। সেই সময়ও তাঁর মুখের অভিব্যক্তি দেখে বুঝেছিলাম যে, উনি আমার ঐ “স্লিপার ক্লাশের টিকিট” ব্যাপারটিকে খুবই আপত্তিকর মনে করেছিলেন। আর, তারপর থেকেই ওনারা আমার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছেন। সত্যিই তো, এমন অভাগা লোকের সাথে কেই বা যোগাযোগ রাখতে চাইবে? বলা যায় না, কখন হয়তো টাকা ধার চেয়ে বসে! গত বারো-তের বছরের মধ্যে অসংখ্য বার সাপের কামড় এর কাজ করতে ট্রেনে, এরোপ্লেনে যাতায়াত করেছি। একটি সংস্থা ঐ উত্তর দিকের একটি জায়গায় যাওয়ার জন্য এ সি ফার্ষ্ট ক্লাশ টিকিট দিয়েছিল। দিল্লিতে সাপের কামড়ের কাজ করতে যাওয়ার জন্য, ভারত সরকার তিন বার প্লেনের টিকিট কেটে দিয়েছে। শেষের দিকে প্লেনে যেতে বললেও সময় দিতে পারিনি, অনলাইনে যোগ দিই। সি এম সি ভেলোর, আইআইএসসি বেঙ্গালুরু প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান কর্মশালায় যাওয়ার জন্য প্লেনের টিকিট পাঠিয়ে দিয়েছে। আমার সেই বন্ধু আর তার স্ত্রী অবশ্য কোটি কোটি টাকা রোজগার করছেন। আমার এত টাকা দরকারও নেই, চেষ্টাও করিনি।
আমার প্রণম্য গুরুদেবের কথা বলতে গিয়ে কি সব হাবি জাবি কথা বলতে শুরু করলাম। আসলে ঐ যে বললাম, ওনার জন্ম শতবর্ষ উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এক বরিষ্ট ডাক্তার বাবু বলছিলেন। উনি এক ডিসেম্বর মাসের শীতে মালদহ থেকে ট্রেনে কলকাতার দিকে আসছিলেন, স্লিপার ক্লাশের টিকিট। একই কামরায় ডা পিনাকী রঞ্জন রায় মশাইও একটি ওভার কোট গায়ে উঠেছেন। দুজনের দেখা হয়ে গেল। ডা রায় জানালেন, একটি চক্ষু অপারেশন শিবিরে যাচ্ছেন। ওনার সহকারী দলও ঐ ট্রেনে চলেছেন। ঐ ডিসেম্বর মাসের শীতে ওনারা মাঝ রাত্রে বর্ধমান স্টেশনে নেমে , অন্য গাড়ী ধরে চক্ষু অপারেশন শিবিরে যাবেন। আমি উত্তর বঙ্গের স্বাস্থ্য কেন্দ্রে চাকরী করার সময়ও ওনার সাথে চক্ষু অপারেশন শিবিরে দেখা করেছি। তখন ওনার বয়স সত্তর পেরিয়ে গেছে। মানুষ কেমন করে দেবতার পর্যায়ে পৌঁছে যান, নিজের চোখে দেখেছি। ওনাদের কথা শুনে তাই এতই অন্যমনস্ক হয়ে গেলাম যে, পাশেই দুধ ফুটে বাটি উপচে পড়ছে দেখতে পাইনি। এই সামান্য জীবনেই এরকম দেব দর্শন করেছি। এও প্রভুর কৃপা।
22.1.2026.











বা!