দীর্ঘ ৮ বছরের লড়াই, বহু বাধা বিপত্তিকে উপেক্ষা করে, আইনি পথে শেষমেশ জয়! অনেকেই ইতিমধ্যে দেখে ফেলেছেন সেই ভিডিও, খুশির কান্নায় ভেঙে পড়া Dr Shivranjani Santosh- এর মুখ, যে লড়াই এর জয় আসলে জনস্বাস্থ্যের একটা খুব ছোট জয়ের ধাপ। মুনাফালোভী কোম্পানিদের বিরুদ্ধে মানুষের জন্যে লড়াই করা ডাক্তারের জয়।
ORS (Oral Rehydration Solution) বা ORT (Oral Rehydration Therapy) আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের এক সফল ও যুগান্তকারী আবিষ্কার। এর আবিষ্কারের ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে আছে বাংলার মাটি, দুর্ভিক্ষ আর মহামারীর করুণ বাস্তবতা। খুব সাধারণ একটি সত্য তখন চিকিৎসাবিজ্ঞানকে চমকে দিয়েছিল— সঠিক অনুপাতে জল, লবণ ও চিনি মিশিয়ে শরীরে জলের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব, এমনকি মারাত্মক ডায়রিয়ার ক্ষেত্রেও। এই আবিষ্কার কোটি কোটি মানুষের জীবন রক্ষা করেছে এবং আজও করে চলেছে।
১৯৬০-এর দশকে আবিষ্কৃত হয়- চিনি বা গ্লুকোজ আসলে সোডিয়ামকে পুনরায় দেহে প্রবেশ করায় যার ফলে শরীর থেকে লবণ ও জলের ক্ষরণ কমে। এই আবিষ্কার বিলাসবহুল গবেষণাগারে হলেও এর প্রথম সফল ব্যবহারিক প্রয়োগ কোথায় হয়েছিল জানেন? এই বাংলার মাটিতে! ডা: দিলীপ মহালনবিশ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতায় আগত অসংখ্য শরণার্থীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া ভয়ংকর ডাইরিয়াকে পরাস্ত করেছিলেন এই মিশ্রণ দিয়ে। পরে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলি সেই সূত্রকে মান্যতা দেয় এবং আজ বিশ্বজুড়ে এটি ডায়রিয়ার চিকিৎসার মূলভিত্তি হিসেবে স্বীকৃত। ORS আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক সরল অথচ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারগুলির মধ্যে একটি। এই চিকিৎসা পদ্ধতি শুধু চিকিৎসা বিজ্ঞানের সাফল্য নয়, এটি এক মানবিক জয়।
এই প্রেক্ষাপটে “ORS” শব্দটির গুরুত্ব শুধু বৈজ্ঞানিক নয়, নৈতিকও। কারণ এটি সেই ইতিহাস বহন করে যেখানে কিছু অতি সাধারণ পদার্থের ঠিক ঠিক অনুপাতের মিশ্রণ দিয়ে নিশ্চিত মৃত্যুকে ঠেকাতে সক্ষম হয়েছিলাম আমরা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই পবিত্র চিকিৎসার ধারণাটিও ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছিল এক মুনাফাবাজি হাতিয়ার। বাজারে এমন সব পণ্য বিক্রি হতে থাকে যেগুলোর গায়ে বড় অক্ষরে লেখা থাকত “ORS” অথচ ভেতরে WHO নির্ধারিত ইলেকট্রোলাইটের সঠিক অনুপাতের কোনো ছাপই থাকত না। এই অনুপাতের গড়মিলের ফলে একজন সরল মানুষ বিজ্ঞাপনের ফাঁদে পড়ে নিজের প্রিয়জনকে সুস্থ করতে ORS হিসেবে এই পানীয় ব্যবহার করেও সুফল পেতেন না, এমনকি কোনোরকম ক্ষতিও হয়ে যেতে পারত যার ফলে তার অবিশ্বাস তৈরী হত পরীক্ষা ভিত্তিক আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতিতে।
এই প্রতারণার বিরুদ্ধে একা দাঁড়িয়েছিলেন হায়দ্রাবাদের চিকিৎসক Dr. Sivaranjani Santosh। তিনি বুঝেছিলেন, ORS কোনো ব্র্যান্ড নয়। এটি এমন এক চিকিৎসা হাতিয়ার, যা দারিদ্র্যপীড়িত অঞ্চলে অসংখ্য শিশুর জীবন বাঁচিয়েছে, আজও বাঁচাচ্ছে। তাই এই শব্দের অপব্যবহার মানে কেবল একটি ব্র্যান্ডিং-এর ভুল নয়, এটি সরাসরি জনস্বাস্থ্যের প্রতি আঘাত।
তিনি আইনি পথে লড়েছেন, বছরের পর বছর যুক্তি ও প্রমাণ দিয়েছেন, একের পর এক সংস্থার কাছে আবেদন জানিয়েছেন। তিনি ২০২২ সালে একটি PIL দায়ের করেন। সেই একক লড়াই আজ বাস্তব জয় এনে দিয়েছে। Food Safety and Standards Authority of India (FSSAI) ঘোষণা করেছে যে কোনো পানীয় বা পণ্য WHO-এর মানদণ্ড না মানলে আর “ORS” শব্দ ব্যবহার করতে পারবে না। এই নির্দেশের ফলে বাজারে ছদ্ম ORS বিক্রির অবসান ঘটবে এবং রোগীরা আসল চিকিৎসা পণ্য চিহ্নিত করতে পারবেন।
এটি নিছক একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়। এটি একজন ডাক্তারের দৃঢ়তা, নৈতিক শক্তি এবং জনস্বাস্থ্যের প্রতি দায়বদ্ধতার ফল। একজন মানুষ যদি নিজের অবস্থানে অবিচল থাকেন, তাহলে কত বড় পরিবর্তন আনা যায় তার এই উদাহরণ আজ সারা দেশের সামনে।
এই জয় আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ORS কেবল একটি স্যাচেট নয়। এটি বাংলার ইতিহাসে জন্ম নেওয়া, বিশ্বজুড়ে প্রতিষ্ঠিত এক চিকিৎসা বিপ্লব। আর এই বিপ্লবকে রক্ষা করার জন্য একজন ডাক্তার যদি একা দাঁড়িয়ে পারেন, তাহলে তিনিই হয়ে ওঠেন হাজার মানুষের কণ্ঠস্বর।









