কৃষ্ণা দি তখন থাকতেন শ্যামবাজার টেলিফোন এক্সচেঞ্জ-এর পাশে।
হঠাৎই আমাকে ডাকতে আসে একটি ছেলে, এসে বলে, _প্রদীপ্ত দা পাঠিয়েছে, আমার মা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, আপনাকে একটু দেখতে যেতে হবে।
গিয়ে দেখি,কফি হাউসের পরিচিত মুখ, কৃষ্ণা দি, চোখে পড়ার মতো রোগা আর ঋজু, অদ্ভুত শাদা চুল আর গভীর চোখ, হাতে সিগারেট।
সেই কৃষ্ণা দি, বিছানায় শুয়ে, আমাকে দেখে বললেন , _তুমি এখানেই থাকো? জানতাম না তো ….যাইহোক তাড়াতাড়ি ঠিক করে দাও,কাল বিকেলে একটা মিটিং আছে।
সেবারে কী হয়েছিল ঠিক মনে নেই, খুব সম্ভবত শ্বাসকষ্টের সমস্যা বেড়ে গেছিল,ফলে ভর্তি করতে হলো। আমার তত্বাবধানে রইলেন বাগবাজারের একটা নার্সিংহোমে। তারপরে সুস্থ হয়ে বাড়িতে ফিরলেন।আর ঐ ক’দিনে হয়ে গেলেন আমার বন্ধু।
তারপরে এখানে সেখানে দেখা হয়, বিশেষত কফি হাউসে।
একবার রাঘব বন্দ্যোপাধ্যায় আমাকে বললেন একটা অসরকারি সংস্থার উদ্যোগে ফুটপাতবাসী ঝুপড়িবাসী গঙ্গার ধারে বসত করে থাকা বাচ্চাদের নিয়ে একটা স্বাস্থ্য বিষয়ক কর্মশালা করতে।ট্যাংরার সেবাকেন্দ্র, সেখানেই যেতে হবে।রঘু দা বললেন, _শোনো বাজারে তোমার যা সুনাম তুমি তো সকালে পৌঁছতে পারবে না, আমার এক ডার্লিং তোমাকে ফোন করবে আগের দিন, তার সঙ্গে চলে আসবে টাইম মতো_
ভাবলাম, আনন্দবাজার পত্রিকার লোক, তার _ডার্লিং_ বোধহয় তেমনই কেউ হবে …. হঠাৎ আগের দিন সন্ধ্যায় মোবাইলে ফোন, _কাল সকালে তাড়াতাড়ি তৈরি থেকো, একটা ট্যাক্সি নিয়ে তোমাকে তুলে যাব।রাঘব বলেছে তোমাকে তাগাদা দিতে যাতে দেরি না করো_….*
*কৃষ্ণা দি-র সঙ্গে গল্প করতে করতে সময় কেটে গেল, তারপরে বিকেলে কর্মশালা শেষে একসঙ্গেই ফিরলাম — না,শ্যামবাজারে নয়, কলেজ স্ট্রিট কফি হাউসে।
নকশালপন্থী রাজনীতির প্রতি আমার সমালোচনা মৈত্রী মতান্তর — সবই জানতেন কৃষ্ণা দি। একদিন কফি হাউসে হাসতে হাসতে বললেন, _ও তো রামকৃষ্ণর চ্যালা,গা থেকে সিপিআইএর গন্ধ যায়নি_ , সেদিন ওখানে সরোজ দত্তর মূর্তি ভাঙার রাজনীতি নিয়ে কথা হচ্ছিল।
এমনই এক রাতে হঠাৎ একটা ফোন, _আমি কার্তিক পাল বলছি, লিবারেশন-এর_ ….
হ্যাঁ হ্যাঁ, বলুন..
বলছি, আমরা সিঙ্গুর গেছিলাম।আপনার পেশেন্ট কৃষ্ণা বন্দ্যোপাধ্যায় হঠাৎ করেই অসুস্থ হয়ে পড়েছে,বমি করেছে, একটু শ্বাসকষ্ট হচ্ছে,ও বলছে আপনার আন্ডার-এ ভর্তি হবে, আমরা এখন বিটি রোড পেরোচ্ছি, নিয়ে আসছি বাগবাজারে, আপনি একটু চলে আসুন_
সেই যাত্রায় আবারও দিনকয়েক ভর্তি থেকে বাড়ি ফিরলেন কৃষ্ণা দি।
কিন্তু তখন থেকেই শ্যামপুকুরের পাট চুকিয়ে বাইপাসের ধারে চলে গেছেন রক্তিমের কাছে।
তারপরও বারকয়েক আমার বাগবাজারের চেম্বারে এসেছেন, তখন পারকিনসন্স আর কাঁপার সমস্যা বেশ বাড়ছে।
তা সত্ত্বেও কথা বলতে বলতে হাঁপিয়ে গেলেও অসমাপ্ত বাক্যগুলো পৌঁছে দিতে চেয়েছেন ওঁর স্বপ্নের পথে চলতে থাকা নতুন ছেলেমেয়েদের কাছে। আমার সঙ্গে গল্প করেছেন, তর্ক হয়েছে। কিন্তু কৃষ্ণা দি তো শেষ পর্যন্ত কৃষ্ণা দি-ই, যাবতীয় অসম্ভবকে তুচ্ছ করার দুঃসাহসী সময়ের অন্যতম নায়িকা। ফলে কফি হাউসের সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে জানতে চেয়েছেন, _এবারের ইলেকশনে তোমার পার্টির ম্যানিফেস্টো বেরিয়েছে?একটু দিও তো_
ক্রমশ কলেজ স্ট্রিট আসা বন্ধ,কফি হাউসের সিঁড়ি দিয়ে উঠে দোতলায় পৌঁছে ঐ জটলায় কৃষ্ণা দি-র অনুপস্থিতি — এভাবেই সময় বুড়ো হয়েছে, আমরাও।
রক্তিমের সঙ্গে দেখা হলে খবর পাই কেমন আছেন।
মাসদুয়েক আগে হঠাৎই রক্তিমের সঙ্গে আবারও দেখা হলো হাতিবাগানের মোড়ে, সেদিনই শেষ খবর পেলাম কৃষ্ণা দি-র।
আর এই কিছুক্ষণ আগে হোয়াটসঅ্যাপ খুলে দেখলাম কৃষ্ণা দি প্রয়াত হয়েছেন।
দেখা হলো না…..
তাই দূর থেকেই লাল সেলাম কমরেড ✊🏼
ইন্টারন্যাশনাল গানটার শেষে আছে, _এসো মোরা মিলি একসাথ…._ দেশের এই পরিস্থিতিতে, কৃষ্ণা দি, এটাই হোক আমাদের শপথ ✊🏼✊🏼












