অভয়া হত্যা-ধর্ষণ মামলার ফাইল নতুন করে খুলছে। তিন-তিনজন আইপিএস সাসপেন্ড হলেন।
আমাদের মতো অনেকেই, মানে যারা তখন রাস্তায় ছিল, তাদের সবার কাছেই ওই সময়কার স্মৃতিগুলো অমলিন হয়ে জ্বলজ্বল করছে। এবং সকলেই, বোধকরি, সহমত হবেন যে বাকি দুজনের চাইতে ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের সাসপেনশনটাই যেন আমাদের বেশী আনন্দ দিচ্ছে।
হ্যাঁ, বিনীত গোয়েল তথ্যপ্রমাণ লোপাটের কাজে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন – এবং তাঁর ডানহাত ছিল অভিষেক গুপ্তা। অভয়ার বাড়ি গিয়ে কন্যাহারা মা-বাবাকে পয়সা দেওয়ার চেষ্টাও ওই অভিষেক গুপ্তার।
কিন্তু রোজ বিকেলে রীতিমতো সাংবাদিক সম্মেলন করে ক্রমাগত মিথ্যে কথা বলা (যেমন ডা অভীক দে-কে ফিঙ্গারপ্রিন্ট এক্সপার্ট হিসেবে তুলে ধরা) – বলে চলা – সেই বলার মধ্যে মিশে থাকত রাজ্যজোড়া মানুষের আবেগ ও ক্ষোভের প্রতি তীব্র তাচ্ছিল্য – বিদ্রূপ ও শ্লেষও – ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়, মোটামুটি সরকারপক্ষের অতি নিকট দালাল বাদে বাকি সবার চোখেই, ঘৃণ্য হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।
আমাদের মতো যারা অল্পবিস্তর রাস্তায় নেমেছিলাম, তারা ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের আরেক রূপও দেখেছি। প্রতিবাদ-সভার অনুমতি না দেওয়া, জমায়েত ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা, প্রতিবাদীদের নামে কেস দিয়ে হয়রান করা – আরও অনেক পথেই তিনি সরকারকে খুশী করার চেষ্টা করেছেন। সুতরাং, অভয়া খুন-ধর্ষণের প্রমাণ বিলোপের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না থাকলেও, বাকি কাজকর্মগুলোই ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের প্রতি ঘেন্না জন্মানোর পক্ষে যথেষ্ট।
কিন্তু তিন বাঘা আইপিএস-কে সাসপেন্ড করায় খুশী হলেও এটুকু অনস্বীকার্য, খুন বা ধর্ষণ এঁদের কেউই করেননি।
অভয়া কেন খুন হলো, কেন তাকে ধর্ষণ করা হলো – এর সঠিক কারণ আমরা কেউই জানি না। বিভিন্নরকম তত্ত্ব হাওয়ায় ভেসেছে – কয়েকটার অনেক অংশ সত্যি হওয়া খুবই সম্ভব – অথচ, বলাই বাহুল্য, একটিরও প্রমাণ মেলেনি। (তদন্ত-ই যদি না হয়, তাহলে প্রমাণ আর মিলবে কোত্থেকে!)
কিন্তু এটুকু নিশ্চিত করে বলা যেতেই পারে যে স্বাস্থ্যব্যবস্থার লাগামছাড়া দুর্নীতি এই ভয়ানক ঘটনার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত। হয় এই দুর্নীতি লুকোতেই অভয়া খুন – নতুবা, অভয়ার খুনের সঠিক তদন্ত চললে ‘কেঁচো খুড়তে কেউটে’ বেরোনোর সম্ভাবনা, সেকারণেই প্রমাণ লোপাট ইত্যাদি।
এবং এই দুর্নীতি শুধুমাত্র আরজিকরে-ই সীমাবদ্ধ ছিল, এমন নয়। আরজিকরের প্রিন্সিপাল থেকে স্বাস্থ্যভবনের হর্তাকর্তা থেকে আরও কতদূর অব্দি সেই দুর্নীতির বিস্তার – কতটুকুই বা আমরা জানি! সন্দীপ ঘোষ, যদ্দূর জানি, জেলেই আছেন – কিন্তু আরজিকরে যারা তাঁর ডানহাত ছিল, তারা? স্বাস্থ্যভবনের বড়কর্তাদের মধ্যে একজনও তো আইনের হাতে আসেননি – কেউ বড়জোর পদ হারিয়েছেন, বাকি স্বপদে বহাল।
বিনীত গোয়েলের মতো দুঁদে আইপিএস অফিসার আদাজল খেয়ে সরকারি হাসপাতালে অন-ডিউটি ডাক্তারের ধর্ষণ-খুনের মতো নজিরবিহীন ঘটনার প্রমাণ লোপাটের কাজে নেমে পড়লেন – স্রেফ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে? সম্ভব? কে বা কারা তাঁকে এমন কাজের নির্দেশ দিয়েছিল? নাহ্, চরম দাপটের দিনেও সন্দীপ ঘোষের নির্দেশে বিনীত গোয়েল চলতে পারেন না। তাহলে কে?
প্রমাণলোপাটের কাজ যথেষ্ট কুশলতার সঙ্গে চলছে কিনা, তার তদারকির জন্য রাজ্য মেডিকেল কাউন্সিল সদলবলে হাজির হয়েছিল। ওইদিনই। ওইদিন ভোরবেলায়ই নাকি স্বাধীনতা-দিবসের কুচকাওয়াজের মহড়ার জন্য ক্যাম্পাসে হাজির থাকার কথা ছিল (অথচ সেই অর্ডার বের হয় ঘটনার পরে) শাসক-ঘনিষ্ঠ দাপুটে চিকিৎসকের। কেন? এ যে কী আশ্চর্য পরিহাস, যে, স্বাস্থ্যব্যবস্থার লাগামছাড়া দুর্নীতির অন্যতম পাণ্ডা ছিল তারাই, যারা রাজ্যের চিকিৎসার নীতি-নৈতিকতার নিয়ামক – অর্থাৎ রাজ্যের মেডিকেল কাউন্সিল।
অভয়ার বিচারের সঙ্গে একই সুতোয় বাঁধা আরও অনেক অনেএএক কিছু… স্বাস্থ্যব্যবস্থার স্বচ্ছতা ফিরে আসা, স্বাস্থ্য-শিক্ষার দুর্নীতি দূর হওয়া, ভয়ের সংস্কৃতি মুছে ফেলতে পারা, রাজ্যের স্বাস্থ্যব্যবস্থার নীতিনৈতিকতা বজায় রাখা যাদের দায়িত্ব সেই মেডিকেল কাউন্সিলের সম্মান ফিরে আসা… কাজগুলো সহজ নয় কোনোভাবেই… কিন্তু অসম্ভবও বোধহয় নয়।










