বুদ্ধদেব বসু প্রসঙ্গটি এভাবে উত্থাপন করেছিলেন – “ধর্ম নিয়ে বাদানুবাদ যেমন মহাভারতে একটি নিত্যকর্ম, রামায়ণে সে-রকম নয়। কেননা রামই সেখানে সর্বাধিপতি ও সর্বতোভাবে প্রতিদ্বন্দীহীন … এমন নয় যে তর্ক কখনো ওঠে না, কিন্তু শেষ কথাটি সর্বদাই রামচন্দ্রের – তিনি যা বলবেন সেটাই মান্য, তিনি বলেছেন ব’লেই।” (বুদ্ধদেব বসু, মহাভারতের কথা, সিগনেট প্রেস, ২০২২, পৃঃ ৯৬)
এরকম একটি পর্যবেক্ষণের সাথে আমাদের যাপিত সময়ের রাষ্ট্রের কিছু উল্লেখযোগ্য সামঞ্জস্য আমরা দেখতে পাবো। এই যেমন ধরুন রাষ্ট্রের মনে হয়েছে SIR হবে, ফলে তা হবেই – অশক্ত, অসুস্থ, ক্যান্সার-আক্রান্ত রোগি, বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের যতই অসুবিধে হোক না কেন। এমনকি দুয়েক’টি মৃত্যুও ঘটুক না কেন। রাষ্ট্র চেয়েছে বলে নতুন সংশোধিত শ্রম আইন চালু হবে – ট্রেড ইউনিয়ন কিংবা বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর যত বিরোধিতাই থাকুক না কেন। রাষ্ট্র চেয়েছে, সুতরাং নতুন নতুন ডিটেনশন সেন্টার হবে। ২০২৩-এর জানুয়ারির কথা ভাবুন। দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা যৌন নিগ্রহের অভিযোগে অলিম্পিক্সের মেডেল জয়ী কুস্তিগিরেরা – বিশেষ করে সাক্ষী মালিক, বিনেশ ফোগট এবং বজরং পুনিয়ারা – দিল্লির হাঁড়-কাঁপানো ঠাণ্ডায় যন্তর মন্তরে বসে ধর্ণা দিয়েছিলেন ভারতের কুস্তি সংস্থার প্রেসিডেন্ট রাষ্ট্রের সমর্থনপুষ্ট ব্রিজভূষণ শরন সিং-এর বিরুদ্ধে। তারপর? রাষ্ট্র চায়নি, তা-ই কার্যত কিছু হয়নি। এরকম উদাহরণ বাড়িয়ে লাভ নেই – আমাদের “অভয়া”র কথা আপাতত উহ্যই রাখলাম। সর্বোপরি যখন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল এবং রাষ্ট্র প্রায় মিশে যায়, প্রায় একাকার হয়ে যায়, তখন দলের কথাই রাষ্ট্রের কথা তথা ভাষ্য হয়ে ওঠে।
রামের সময়ে ছিল রাজা এবং প্রজাসমষ্টির জনসমাজ। কোন রাজনৈতিক দল বা নিরন্তর নিঃসাড়ে কাজ করে চলা সর্বময়তাসম্পন্ন কোন সংগঠন ছিলনা। প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখ করা যায় নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর মতো সংবাদপত্রে সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে (২৬ ডিসেম্বর, ২০২৫) আকৃতিতে বড়ো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন “From the Shadows to Power: How the Hindu Right Reshaped India”। এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে – “The R.S.S. originated as a shadowy cabal for the revival of Hindu pride after a long history of Muslim invasions and colonial rule in India, its early leaders openly drawing inspiration from the nationalist formula of Fascist parties in Europe during the 1930s and 1940s.”
রামের সময়ে অনুপস্থিত, কিন্তু এখন সেরকম সংগঠনগুলো রয়েছে দল এবং তার অনুসারী রাষ্ট্রের বার্তাকে সমাজের সর্বস্তর অবধি পৌঁছে দেবার জন্য। সেসময়ে প্রজাদের মাঝে জনশ্রুতি ছিল, যা রাজার কান অবধি পৌঁছত। জনশ্রুতির গুরুত্বও ছিল। এখন জনশ্রুতি নির্মাণ করা হয় নিরন্তর, প্রতি মুহূর্তে, পলে অণুপলে। এবং রামের আরেকটি বৈশিষ্ট্য ছিল – নিবাত, নিষ্কম্পভাবে একজন পুরুষের দৃষ্টি, যেখানে নারীর কোন স্থান নেই। আমাদের বর্তমান রাষ্ট্রের সঙ্গে অনেকাংশে মিলে যায় যে!
রামায়ণের জনশ্রুতির একটি নমুনা দেওয়া যাক। “সীতার সম্ভোগজনিত সুখ রামের হৃদয়ে কিরূপ প্রবল! (কীদৃশং হৃদয়ে তস্য সীতাসম্ভোগজং সুখম্।) পূর্বে রাবণ যাঁকে সবলে ক্রোড়ে তুলে লঙ্কায় নিয়ে গিয়ে অশোকবনে রেখেছিল, যিনি রাক্ষসের বশে ছিলেন, সেই সীতাকে রাম কেন ঘৃণা করেন না? যদি আমাদের পত্নীদের এই দশা হয় তবে আমাদেরও সয়ে থাকতে হবে, কারণ রাজা যা করেন প্রজা তারই অনুকরণ করে। মহারাজ, পুরবাসীরা নগরে ও জনপদে সর্বত্র এইপ্রকার কথা বলে (এবং বহুবিধা বাচো বদন্তি পুরবাসিনঃ)।” (রাজশেখর বসু, বাল্মীকি রামায়ণ (সারানুবাদ), ১৩৯০ বঙ্গাব্দ, পৃঃ ৪৩১ – উত্তরকাণ্ডঃ ৪৩.১৭-২০)
এরকম জনশ্রুতি তো রাষ্ট্র নির্মাণও করতে পারে। করা সম্ভব। করা হচ্ছেও।
রাষ্ট্র এবং জনসমাজ
স্বাধীনতার প্রাক্কালে যখন কন্সটিটুয়েন্ট অ্যাসেম্বলির প্রেসিডেন্ট “জাতির জনক” মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধির নাম করে স্বাধীনতা ঘোষণার মিটিং শুরু করলেন, তখন বাইরে সমবেত জনতা শ্লোগান দিচ্ছিল “মহাত্মা গান্ধি কি জয় – মহাত্মা গান্ধির জয়”। প্রায় সবাই গান্ধি টুপি পরে ছিল – গান্ধির অজান্তে এবং অনুমতি ছাড়াই। কিন্তু গান্ধি ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত ছিলেন না, এমনকি পতাকা উত্তোলনের সময়েও। কোথায় ছিলেন তিনি? হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা অধ্যুষিত বেলেঘাটার (কলকাতা) হায়দারি মঞ্জিলে। তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষ সেখানে তাঁর সঙ্গে দেখা করেন এবং জানতে চান পরের দিন অর্থাৎ ১৫ আগস্ট কী ধরনের উদযাপন করা হবে। গান্ধির উত্তর ছিল – “সর্বত্র মানুষ বুভুক্ষায় মারা যাচ্ছে … তুমি কী মনে কর এরকম বীভৎসার মাঝে কোনরকম উদযাপন করা যায়?” (রামচন্দ্র গুহ, ইন্ডিয়া আফটার গান্ধী, ২০১৭, পৃঃ ৮)
হিন্দুস্তান টাইমস-এর এক সাংবাদিক যখন “স্বাধীনতা” উপলক্ষে তাঁকে কোন বার্তা দিতে অনুরোধ করেন তখন তাঁর জবাব ছিল তিনি শুষ্ক হয়ে গেছেন। বলার কিছু নেই। এমনকি বিবিসি সংবাদসংস্থার প্রতিনিধি তাঁকে বারংবার কোন বিবৃতি রেকর্ড করার জন্য উপরোধ করতে থাকেন, তখন তিনি তাঁর সেক্রেটারিকে জানান – “ওদেরকে বলে দাও যে আমি ইংরেজি জানি এ কথা ভুলে যেতে।” (রামচন্দ্র গুহ, প্রাগুক্ত)
এই সেই গান্ধি যিনি ১৯১৯ সালে প্রথমবারের জন্য জনতার জাগরণের জন্য চম্পারনে নীলকরদের “তিনকাঠিয়া” প্রথার বিরুদ্ধে জনগনের সত্যাগ্রহ আন্দোলনের সূচনা করলেন। দল, নেতৃত্ব এবং গোষ্ঠীর বৃত্তের বাইরে নিয়ে এলেন আন্দোলনকে – প্রতিষ্ঠা করলেন জনসমাজে, জনতার হৃদয়ে এবং অস্তিত্বে।
সেই গান্ধি ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট “স্বাধীন” ভারত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময়ে নিজেকে রাষ্ট্র তৈরির প্রক্রিয়া থেকে নিজেকে বিযুক্ত করে রাখলেন। আশা করি আমাদের বিবেচনার গভীরতায় এর গুরুত্ব থাকবে। তিনি রাষ্ট্র-কেন্দ্রিক কোন সমাজের কথাকে তাঁর ভাবনার কেন্দ্রীয় অবস্থানে স্থাপন করেন নি। তাঁর চিন্তার কেন্দ্রীয় অবস্থানে ছিল জনসমাজ – হিন্দু-মুসলিম-শিখ-খৃস্টান এবং “হরিজন”দের নিয়ে ভারসাম্যে গঠিত এক সমাজ।
অথচ গান্ধির কল্পনায় ছিল এক সুন্দর “রামরাজত্ব” এবং পছন্দের সঙ্গীত ছিল রামধুন – “রঘুপতি রাঘব রাজারাম / পতিত পাবন সীতারাম … ঈশ্বর আল্লা তেরে নাম / সব কো সন্মতি দে ভগবান।”
নাথুরাম গডসের গুলিতে এই বৃদ্ধ অশক্ত মানুষটির মৃত্যুর সময়েও উচ্চারিত শেষ কথাটি ছিল “হে রাম”! ফলে রাম এবং তাঁর কার্যকলাপ ভারতীয় হিন্দুসমাজের অন্তত এক সুবিশাল অংশের মানুষের মাঝে বুঝে বা না-বুঝে চর্চিত, অনুসৃত এবং মান্যতা পেয়েছে।
এখানেই রামের, রামমন্দিরের এবং এর জন্য জনমত তৈরির লক্ষে বিনিয়োগ করা কোটি কোটি টাকার রাজনৈতিক প্রোজেক্টের গুরুত্ব। এবং আমাদের আলোচনাও এই পরিসরে সীমাবদ্ধ। এর অতিরিক্ত কিছু নয়।
রবীন্দ্রনাথের রাষ্ট্র ও সমাজভাবনা আমাদের বহুজনের কাছে কমবেশি সুপরিচিত। তাঁর কিছু প্রাসঙ্গিক ভাবনা আমরা এই প্রেক্ষিতে দেখে নিতে পারি। “হিন্দুসভ্যতা যে এক অত্যাশ্চর্য প্রকাণ্ড সমাজ বাঁধিয়াছে, তাহার মধ্যে স্থান পায় নাই এমন জাত নাই। প্রাচীন শকজাতীয় জাঠ ও রাজপুত; মিশ্রজাতীয় নেপালী, আসামী, রাজবংশী; দ্রাবিড়ী, তৈলঙ্গী, নায়ার—সকলে আপন ভাষা, বর্ণ, ধর্ম ও আচারের নানা প্রভেদ সত্ত্বেও সুবিশাল হিন্দুসমাজের মধ্যে একটি বৃহৎ সামঞ্জস্য রক্ষা করিয়া একত্রে বাস করিতেছে। হিন্দুসভ্যতা এত বিচিত্র লোককে আশ্রয় দিতে গিয়া নিজেকে নানাপ্রকারে বঞ্চিত করিয়াছে, কিন্তু তবু কাহাকেও পরিত্যাগ করে নাই—উচ্চ-নীচ, সবর্ণ-অসবর্ণ, সকলকেই ঘনিষ্ঠ করিয়া বাঁধিয়াছে, সকলকে ধর্মের আশ্রয় দিয়াছে, সকলকে কর্তব্যপথে সংযত করিয়া শৈথিল্য ও অধঃপতন হইতে টানিয়া রাখিয়াছে।
রেনাঁ দেখাইয়াছেন, নেশনের মূল লক্ষণ কী, তাহা বাহির করা শক্ত। জাতির ঐক্য, ভাষার ঐক্য, ধর্মের ঐক্য, দেশের ভূসংস্থান, এ-সকলের উপরে ন্যাশনালত্বের একান্ত নির্ভর নহে। তেমনি হিন্দুত্বের মূল কোথায়, তাহা নির্ণয় করিয়া বলা শক্ত। নানা জাতি, নানা ভাষা, নানা ধর্ম, নানাপ্রকার বিরুদ্ধ আচার-বিচার হিন্দুসমাজের মধ্যে স্থান পাইয়াছে।” (“ভারতবর্ষীয় সমাজ”)
এ প্রবন্ধেই বললেন – “কিন্তু এ কথা আমাদিগকে বুঝিতে হইবে, আমাদের দেশে সমাজ সকলের বড়ো। অন্য দেশে নেশন নানা বিপ্লবের মধ্যে আত্মরক্ষা করিয়া জয়ী হইয়াছে—আমাদের দেশে তদপেক্ষা দীর্ঘকাল সমাজ নিজেকে সকলপ্রকার সংকটের মধ্যে রক্ষা করিয়াছে। … সাহেবের বেহারা সাত টাকা বেতনের তিন টাকা পেটে খাইয়া চার টাকা বাড়ি পাঠাইতেছে, পনেরো টাকা বেতনের মুহুরি নিজে আধমরা হইয়া ছোটো ভাইকে কলেজে পড়াইতেছে—সে কেবল আমাদের প্রাচীন সমাজের জোরে। এ সমাজ আমাদিগকে সুখকে বড়ো করিয়া জানায় নাই—সকল কথাতেই, সকল কাজেই, সকল সম্পর্কেই, কেবল কল্যাণ, কেবল পুণ্য এবং ধর্মের মন্ত্র কানে দিয়াছে। সেই সমাজকেই আমাদের সর্বোচ্চ আশ্রয় বলিয়া তাহার প্রতিই আমাদের বিশেষ করিয়া দৃষ্টিক্ষেপ করা আবশ্যক।” (প্রাগুক্ত)
রবীন্দ্রনাথ বা গান্ধি, কারও ভাবনাই নির্বিচারে গ্রহণ করার প্রয়োজন নেই। এ নিয়ে যথেষ্ট সৃজনশীল তর্ক-বিতর্ক হতে পারে এবং হবার প্রয়োজনও আছে। কিন্তু দুই চিন্তকের দেশ নিয়ে ভাবনার কেন্দ্রে রয়েছে সমাজ, রাষ্ট্র নয়। আবার অন্য দিক থেকে দেখলে, সমাজের প্রয়োজনীয়তা বর্তমান সর্বগ্রাসী রাষ্ট্রও বোঝে। এবং এ কারণেই সমাজকে গড়ে পিটে নিতে ধর্মীয় রসে, রাম-রসে সিঞ্চিত করে।
উত্তর-উপনবেশিক ভারত এবং সমাজ
১৯৪৭-এ যখন ভারতের ক্ষমতার হস্তান্তর তথা স্বাধীনতা অর্জিত হল তখন ভারতীয় উপমহাদেশে দেশীয় রাজ্যের (princely states) সংখ্যা ছিল ৫৬৫টি – সমগ্র ভারতের জনসমষ্টির ৪০%। (পার্থ চ্যাটার্জি, দ্য ট্রুথস অ্যান্ড লায়েজ অফ ন্যাশনালিজমঃ অ্যাজ ন্যারেটেড বাই চার্বাক, ২০২১, পৃঃ ৬৭)
এত সংখ্যক princely states এবং জনসমষ্টি নিয়ে গঠিত একটি দেশে নাগরিকের ধারণা খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব – উচ্চ বর্গের কিছু মানুষের মধ্যে ছাড়া। এখানে নাগরিকের কোন অস্তিত্ব ছিল না। হঠাৎ করেই এরা “আধুনিক” ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল। স্বাধীন ভারতের একটি সংবিধান – যা আজ আমাদের প্রধান অবলম্বন – রচিত হল আমেরিকা, ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্সের মতো দেশের সংবিধানকে অনুপুঙ্খ বিচার-বিবেচনা করে।
একটি পার্থক্য রয়ে গেল এক্ষেত্রে যে উল্লিখিত ৩টি দেশের সমাজের ভিত্তিমূল থেকে যে পরিবর্তনগুলো শ’দুয়েক বছর ধরে ধীরে ধীরে সংঘটিত হচ্ছিল তারই লিখিত বা অলিখিত (যেমন ইংল্যান্ড) রূপ ছিল এই সংবিধান। বিশেষ করে মধ্য ও উত্তর ইউরোপে পুঁজিবাদী অর্থনীতি বিকশিত হবার জন্য শ্রম ও পুঁজির দ্বন্দ্বের সামাজিকভাবে প্রতিফলিত চেহারায় ছিল সমাজের বিভিন্ন বর্গের নাগরিক মানুষের ক্ষেত্রে ব্যক্তির অধিকার, ভোটাধিকার, কাজের অধিকার, মজুরির অধিকার, সার্বিক অধিকার, সর্বজনীন শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের অধিকার, সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে আইনের সাহায্যে বিচারের অধিকার এবং আরও অনেক ধারণার উদ্ভব। সমাজে প্রজা থেকে নাগরিক সত্তায় উত্তরণ হল ব্যক্তি মানুষের। সে আর কেবলমাত্র সমাজবদ্ধ জীব নয়। সহজ কথায় বললে, সমাজের ধারণা অন্তর্হিত হল – সে স্থান দখল করলো রাষ্ট্র এবং নাগরিকের মধ্যেকার সরাসরি সম্পর্ক। ফুকোর ভাষায় এক নতুন ধরনের governance তথা প্রশাসনিক পদ্ধতি চালু হল।
এই সামগ্রিক প্রক্রিয়া একদিনে হয়নি। আগে যেমন বলেছি, শতাধিক বছরের একটি “গর্ভাবস্থা” (gestation period)-এর মধ্য দিয়ে গিয়ে এরকম পরিণত রূপ নিয়েছে। ভারতে এই সমগ্র প্রক্রিয়াটি মাত্র কয়েক দশকের মধ্যে এবং কোন সামাজিক মন্থন বা বিপ্লব ছাড়া সম্পাদিত হয়েছে। এই অর্থে এখানে যে আধুনিকতার চেহারা এবং রূপ আমরা দেখি তা হল কার্যত একটি engrafted modernity তথা রোপিত আধুনিকতার প্রতিবিম্ব। ফলত এখানকার সুবিস্তৃত এবং সর্বব্যাপী সামাজিক মানসিকতা বা সোশ্যাল সাইকিতে রয়ে গেল পুরনো আচারবিচার, আনুগত্য, প্রজা (নাগরিকের বিপরীতে) হিসেবে নিজেকে দেখা। এখানে কোন “সিভিল সোসাইটি” সেভাবে গড়ে ওঠার সময় এবং রাজনৈতিক সুযোগ পেল না। পরিণতিতে, তর্কযোগ্যভাবে, যে সমাজ গড়ে উঠল সেটাকে আমরা পার্থ চ্যাটার্জির ভাষায় ভাষায় বলতে পারি “পলিটিকাল সোসাইটি” – যে সমাজ প্রাত্যহিক রাজনৈতিক “গুল্পে” অংশগ্রহণ করে, অধিকারের পরিবর্তে অনুদান-খয়রাতিতে বেশি ভরসা রাখে এবং পেশিতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কাজে আসে ও ভোট দেয়, ভোট করায়।
১৭৯৫ সালে প্রথম প্রকাশিত টমাস পেইনের দ্য এজ অফ রিজন-এর একটি প্রধান প্রতিপাদ্য ছিল যুক্তিচর্চা এবং স্বাভাবিক/প্রাকৃতিক নিয়মকে প্রকাশিত এবং প্রতিষ্ঠিত ধর্মের ওপরে স্থান দিতে হবে। এবং একই সঙ্গে সেসময়ের সংগঠিত খ্রিস্টধর্ম (আমাদের এখানে হিন্দু বা মুসলিম ধর্মের সঙ্গে তুলনীয়), বাইবেলের দৈবী প্রেরণা (আমাদের ক্ষেত্রে নন-বায়োলজিকাল জন্ম এবং ঈশ্বরের আদেশের সঙ্গে তুলনীয়) এবং গোঁড়ামোর বিরুদ্ধে কার্যত কামান দাগলেন “সাদাদের” নাগরিক সমাজের মধ্যে থেকে – এই নাগরিক সমাজে কালো অথবা বাদামী মানুষদের কোন স্থান ছিল না। তিনি খুব স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছিলেন – “It is from the Bible that man has learned cruelty, rapine, and murder; for the belief of a cruel God makes a cruel man.” (দ্য এজ অফ রিজন)
স্বাধীন ভারতের সংবিধান পেশ করার সময়ে (২৫ নভেম্বর, ১৯৪৯) আম্বেদকর একটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্যবেক্ষণ রেখেছিলেন। তাঁর পর্যবেক্ষণে – “Constitutional morality is not a natural sentiment, it has to be cultivated. We must realise that our people have yet to learn it. Democracy in India is only a top dressing on an Indian soil which is essentially undemocratic”।
রামচন্দ্রকে নিয়ে পুনর্বিবেচনা
বুদ্ধদেব বসু লিখছেন – “রাম যখন যেটিকে কর্তব্য ব’লে মেনে নেন তা সাধন করেন ক্ষিপ্র বেগে, সম্পূর্ণভাবে ও নিষ্কুণ্ঠ মনে। অন্যায় যুদ্ধে বালীকে বধ ক’রে তিনি মুহূর্তের জন্য অনুতপ্ত হলেন না (কিষ্কিন্ধ্যাঃ ১৬-১৮) আর তপস্যারত শম্বুকের শিরশ্ছেদ করতে গিয়ে একবার পলক পড়লো না তাঁর চোখে (উত্তরঃ ৭৪-৭৬)। এরপরে বুদ্ধদেব আরও বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। (প্রাগুক্ত, পৃঃ ৯৭-১০৭)
উপরের উল্লিখিত অংশটির সঙ্গে টমাস পেইন-এর মন্তব্যের সঙ্গে অদ্ভুত রকমের সাযুজ্য দেখতে পাচ্ছি।
আমরা এবার সীতার সঙ্গে রামের আরও কিছু সংলাপ একটু খুঁটিয়ে দেখে নিই। যুদ্ধকাণ্ডে যখন রাবণ মৃত, রাম জয়ী এবং সীতাকে নিয়ে স্বগৃহে ফিরেছেন, তখন সীতাকে রাম বলছেন – “তুমি জেনো এই রণপরিশ্রম (যোহয়ং রণপরিশ্রমঃ) – সুহৃদগণের বাহুবলে যা থেকে মুক্ত হয়েছি – এ তোমার জন্য করা হয় নি। নিজের চরিত্র রক্ষা, সর্বত্র অপবাদ খণ্ডন, এবং আমার বিখ্যাত বংশের গ্লানি দূর করবার জন্যই এই কার্য করেছি। তোমার চরিত্রে আমার সন্দেহ হয়েছে, নেত্ররোগীর সম্মুখে যেমন দীপশিখা, আমার পক্ষে তুমি সেইরূপ কষ্টকর। তুমি রাবণের অঙ্কে নিপীড়িত হয়েছ, সে তোমাকে দুষ্ট চক্ষে দেখেছে, এখন যদি তোমাকে পুনর্গ্রহণ করি তবে কি করে নিজের মহৎ বংশের পরিচয় দেব? যে উদ্দেশ্যে তোমাকে উদ্ধার করেছি তা সিদ্ধ হয়েছে, এখন আর তোমার প্রতি আমার আসক্তি নেই, তুমি যেখানে ইচ্ছা যাও। আমি মতি স্থির করে বলছি – লক্ষণ, ভরত, শত্রুঘ্ন, সুগ্রীব বা বিভীষণ, যাঁকে ইচ্ছা কর তাঁর কাছে যাও, অথবা তোমার যা অভিরুচি তা কর।” (রাজশেখর বসু, বাল্মীকি রামায়ণ (সারানুবাদ), ১৩৯০ বঙ্গাব্দ, পৃঃ ৩৮১-৩৮২)
এখানে আরেকটি কঠোর উক্তি রাম করেছিলেন – “এতা দশ দিশা ভদ্রে কার্যমস্তি ন মে ত্বয়া (যুদ্ধঃ ১১৬/১৮)। হে সীতা, তোমার জন্য দশটি দিকের দরজাই খোলা আছে, তোমার যেদিকে খুশি চলে যেতে পার। আর কঃ পুমাংস্তু কুলে জাতঃ স্ত্রিয়ং পরগৃহোষিতাম্।। (যুদ্ধঃ ১১৬/১৯) কোন কুলিন লোক আছে, কোন ভদ্র বংশের লোক আছে যার স্ত্রী এতদিন অপরের বাড়িতে বাস করেছে, তাকে সে আবার বাড়িতে ফেরত নেবে। একদিন দুদিন নয়, মাসের পর এতদিন ধরে তুমি রাবণের কাছে বাস করে গেছ। রাবণ তোমাকে নিজে কোলে করে তুলে নিয়ে গেছে, যে রাবণের পাপদৃষ্টি তোমার উপরে পড়েছে। তাই এটা কখনই হতে পারেনা যে তার কাছে এতদিন থাকার পরেও তোমাকে সে ভোগ করেনি। আমার নিজের একটা সম্মান আছে, তাই আমি তোমাকে আর নিতে পারলাম না।” (স্বামী সমর্পনানন্দ, বাল্মীকি রামায়ণ, ২০১০, পৃঃ ৩১৯)
সীতা শুধু একবারই গদগদস্বরে বলেছিলেন – “নীচ ব্যক্তি নীচ স্ত্রীলোককে যেমন বলে তুমি আমাকে সেরূপ বলছ কেন? যখন হনুমানকে পাঠালে তখন আমাকে বর্জনের কথা জানাও নি কেন? আমি তখনই জীবন ত্যাগ করতাম, তোমাদের অনর্থক কষ্ট পেতে হ’ত না। পরাধীন বিবশ অবস্থায় রাবণ আমার গাত্র স্পর্শ করেছিল, এই দোষ আমার ইচ্ছাকৃত নয়।” (রাজশেখর বসু, প্রাগুক্ত, পৃঃ ৩৮২)
শেষ কথা
আমি এ আলোচনার আর বিস্তারে যাচ্ছিনা। কিন্তু রামের কতকগুলো বৈশিষ্ট্য আমাদের আলোচনায় পরিস্ফুট হয়। সেগুলোর কয়েকটি পরপর সাজালে এরকম –
(১) কৃত্তিবাস বা তুলসীদাসের রামের মতো বাল্মীকির রাম নরম-সরম দয়াময় কোন মানুষ নন। একজন দৃঢ়, শত্রুর ব্যাপারে অনুকম্পাহীন, কঠোর মানুষ।
(২) প্রয়োজনে যাকে শত্রু বিবেচনা করবেন, তাকে অমার্জনীয় অনৈতিকভাবে হত্যা করতে কোনরকম দ্বিধাদ্বন্দ্বের অবকাশ নেই তাঁর মধ্যে।
“তাঁর মর্ত্যলীলার প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত – নিষ্কম্প্র, নিষ্করুণ, নিষ্কলুষের – তিনি পালন ক’রে যাচ্ছেন তন্নিষ্ঠভাবে তাঁর কুলধর্ম, তাঁর রাজধর্ম, তাঁর স্বধর্ম – এবং এটাই তাঁর মহামানবত্বের প্রমাণ ও প্রতিষ্ঠাভূমি … মহামানব, সাধারণ মানবিক বৃত্তির বহু ঊর্দ্ধে, এক অদ্বিতীয় কর্মবীর ও ধর্মবীর – এই হলেন বাল্মীকির রামচন্দ্র। এই রাম আমাদের পক্ষে বড়ো সুদূর, যেন শ্বাসরোধকারী, কষ্টকরভাবে ঊর্ধ্বমুখ হ’য়ে তবে আমরা তাঁর খবিন্দুর দিকে তাকাতে পারি। প্রায় যেন অসহনীয়ভাবে ধর্মপরায়ণ – এমনি তাঁকে মনে হয় আমাদের … এমনকি হতে পারে না যে রাম তাঁর সীতাবর্জন-জনিত বিশাল শোক মহৎ চেষ্টায় চেপে রেখেছিলেন নিজের মধ্যে, এক সমুদ্রকে নিঃশব্দ করে দিয়ে অবশিষ্ট জীবন যাপন করেছিলেন? তা-ই ভাবতে আমাদের ভালোবাসি আমরা, সেটাই আমাদের মনঃসম্মত – কিন্তু বাল্মীকিতে তন্নতন্ন করে খুঁজেও তার কোন নিদর্শন আমি জোটাতে পারিনি।” (বুদ্ধদেব বসু, প্রাগুক্ত, পৃঃ ১০২-১০৩)
(৩) নারীদের ব্যাপারে তাঁর unwaveringly male gaze। এখানে honour killing-ও কোন গুরুত্বপূর্ণ বা হৃদয়ে ক্ষত তৈরি করার মতো কোন বিষয় নয়।
“নারীকে একমাত্র রক্ষা করে তার স্বামীর প্রতি প্রেম ভালোবাসা। স্বামীর ভালোবাসাই স্ত্যরীর ঠিক ঠিক রক্ষাকবচ। সেইজন্য আমি বলছি (রাম লক্ষ্মণকে বলছেন), তোমরা এভাবে সীতাকে নিয়ে এসো না, সীতাকে বল পায়ে হেঁটে আমার কাছে আসতে।” (স্বামী সমর্পনানন্দ, বাল্মীকি রামায়ণ, পৃঃ ৩১৮)
(৪) বংশের মর্যাদা এবং জনশ্রুতি কী বলে তার ওপরে নির্ভর করে গর্ভবতী নারীকে বিসর্জন দেওয়া এবং অগ্নি পরীক্ষা দিতে হবে কিনা।
(৫) সীতার কাতরোক্তির কোন উপযুক্ত জবাব দেবার প্রয়োজন মনে করেন না। পুরুষের কথাই শেষ কথা। যেমনটা একজন দৃঢ়মুঠি স্বৈরতন্ত্রী শাসকের ক্ষেত্রেও আমরা দেখতে পাবো।
সম্ভবত এতগুলো কারণের সমাপতনের ফলে আজকের ভারতবর্ষে রামের এবং রামমন্দিরের প্রয়োজন। সঙ্গে প্রয়োজন, যেমনটা আগে বলেছি, সুচারুভাবে জনশ্রুতি উৎপাদন করা।













বর্তমান সময়ে এক অতি মূল্যবান আলোচনা।
লেখকের পড়াশোনা র গভীরতা পাঠককে ঋদ্ধ করে। একসাথে ভারতীয় ও পাশ্চাত্য মতামতকে তুলে তিনি নিজের বক্তব্য কে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
রাম সম্পর্কিত আলোচনার এই দিকগুলো বৃহত্তর ভারতে কোন গুরুত্ব পায় না। সেখানে মর্যাদা পুরুষোত্তম ভগবান রামচন্দ্র ই শেষ কথা। আমরা যে যুক্তিবাদ এর আলোয় সমাজকে দেখতে শিখেছি, গত ত্রিশ বছরে তার পরিসর অনেকটাই সংকুচিত হয়ে গিয়েছে। বিশেষ করে প্রবাসী ভারতীয়দের মধ্যে এই রক্ষনশীলতা বেশি করে প্রকট।
যখন গোটা বিশ্বে দক্ষিণপন্থীদের উত্থান দেখা যাচ্ছে, তখন এই ধরনের বিরুদ্ধমত আমাদের ব্যালেন্স রাখতে সাহায্য করে।
ধন্যবাদ কৃষ্ণেন্দু🌹