মূল বাজেট বইটা না পর্যালোচনা করা দরকার, না হলে সুনির্দিষ্ট করে কিছু মন্তব্য করা মুশকিল।
এতদসত্বেও তাৎক্ষণিকভাবে কিছু কথা মনে হয়েছে এবারের সাধারণ বাজেট নিয়ে অর্থ মন্ত্রীর বক্তব্য থেকে।
ভবিষ্যতে আমরা সুনির্দিষ্ট বক্তব্য জানাতে পারব স্বাস্থ্য দপ্তরের নির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ বিষয়ে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী।
এবারের অর্থ বাজেটটি তে প্রচুর সামাজিক প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। প্রচুর নিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের ঘোষণা আছে। সরকারি কর্মচারীদের জন্যও বড় ঘোষণা হয়েছে এই বাজেটে। এই বাজেটের ঘোষণাগুলো যথাযথ প্রণয়ন করা হয় তাহলে সেটা পশ্চিমবঙ্গের অগ্রগতিতে ভূমিকা নিতে পারে। কিন্তু এর সাথে কিছু প্রশ্নও থেকে যাচ্ছে এই বাজেট নিয়ে, যেগুলো উল্লেখ করা অবশ্যই জরুরি।
- বিজেপি সরকারে আসার আগে বলেছিল পশ্চিমবঙ্গ ড্রাই স্টেট বা মদবিহীন রাজ্য হবে। যদিও অতীতে কোনও রাজ্য মদ বিহীন বিজেপি সরকার ঘোষণা করেছে এমন দৃষ্টান্ত নেই। গুজরাটে কংগ্রেস করেছিল।বিহারে নীতিশ সরকার করেছে। বিজেপি শাসিত রাজ্যে বিজেপি করেছে এমন দৃষ্টান্ত নেই। আর সেই পথ ধরে বাংলায় নির্বাচনের আগে মদ নিষিদ্ধের ঘোষণা পেলেও প্রতিশ্রুতি পূরণ আমরা পেলাম না। উল্টে মদের ব্যবসার অনুমতির ব্যাপারটি তুলে নেওয়া হল, এবং কলকাতা পৌরসভায় ৫০০ মিটার কমিয়ে দেওয়া হল সরকারি স্কুল, ধর্ম প্রতিষ্ঠান থেকে মদের দোকানের দূরত্ব। ফলে বোঝা গেলো এই সরকারও বিগত সরকারের মতন মদ বেচে আয় করতে চাইছে।
- মিড ডে মিল কেন্দ্রীয় সরকারের প্রোজেক্ট। এর টাকা কেন্দ্র দেয়। তাহলে কলকাতা শহরে কেন মিড ডে মিলের দায়িত্ব ইসকনকে দেওয়া হবে? তাহলে কি সরকার মিড ডে মিলের জন্য তার যে টাকা দেওয়ার দরকার সেটা কি দেবে না? নাকি ইসকনকে টাকা দেবে মিড ডে মিল চালাতে? ইসকন কি মন্দির ছেড়ে ক্যাটারিং ব্যাবসায় নামলো? তাহলে ইসকনে দান পাত্রের মাধ্যমে পয়সা নেওয়া বন্ধ করা হবে না কেন? সরকার যখন নিজেই মিড ডে মিল চালাতে সক্ষম তাহলে ইসকনকে কেন কলকাতার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে মিড ডে মিলের দায়িত্ব দেওয়া হবে? সব জায়গায় যদি সরকারি কাজে থার্ড ইঞ্জিন ঢুকে যায় বেসরকারিকরণ করতে তাহলে ডবল ইঞ্জিনের গুরুত্ব কোথায় থাকলো? থার্ড ইঞ্জিন সরকার হোক। তাছাড়া ইসকনের মতো একটি ধর্মীয় সংগঠনের তো সরকারের হয়ে এই কাজটি করার কথা নয়, তাতে আইনি ও সাংবিধানিক বাধা আছে।
- হাইকোর্টের হকার উচ্ছেদ নিয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা ছিল পুনর্বাসন নিয়ে। সেই বিষয় কোনও আলোচনাই হল না, এই বাজেটে যেটা অত্যন্ত হতাশাজনক একটা দিক।
- নতুন অনেকগুলি বিমানবন্দর তৈরির ঘোষণা করেছে বর্তমান রাজ্য সরকার। বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে এরকম একাধিক বিমানবন্দর বিজেপি সরকার অতীতে তৈরি করেছে, যার অভিজ্ঞতা ভালো নয়। কারণ রাজ্যের একটি বা দুটি মূল বিমানবন্দর ছাড়া বাকি বিমানবন্দরগুলোর ব্যবহার বেশিরভাগ বিজেপি শাসিত রাজ্যে চাটার্ড ফ্লাইট ওঠা নামার জন্য সংরক্ষিত হয়ে রয়েছে। নেতাদের বিভিন্ন সময় ভাষণ দিতে যাওয়ার জন্য হেলিকপ্টার বা চার্টার্ড ফ্লাইট অবতরণের জন্য বিমানবন্দরগুলো ব্যবহৃত হয়। এছাড়া এগুলো প্রায় কর্মহীন বলা চলে। অথচ এগুলো তৈরিতে যেমন বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে, তেমন বহু মানুষের ঘর, বাড়ি ভাঙ্গা পড়েছে এই বিমানবন্দর তৈরির পরিকল্পনার ফলে। বহু মানুষ তার পৈতৃক ভিটা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। ফলে এরকম উদ্যোগ আদতে বাংলার পক্ষে কতটা মঙ্গল দায়ক বা কতটা যন্ত্রনাদায়ক হবে তা সময় বলবে।এ টা নিয়ে আর ও পরিকল্পিত ও সচেতন ভাবনা প্রয়োজন ছিল।
- মন্দিরগুলির সংস্কার ও বিকাশের জন্য ১০০০ কোটি টাকা বাজেট বরাদ্দ একেবারেই সমীচীন নয়। কোন বিশেষ ধর্মের প্রতি পৃষ্ঠপোষকতা কোন নির্বাচিত সরকারে কাজ নয়। এ অনেকটা মমতা সরকারের ইমাম ভাতা ও দুর্গা বিসর্জন কান্ডের মতো।
- শ্যামাপ্রসাদের মতো বিতর্কিত ব্যক্তিত্ত্বের বিষয় নিয়ে বাজেট বরাদ্দ।
- এই বাজেটে বলা হয়েছে পূর্বের সরকার ৮.১৫–৮.৫৫ লক্ষ কোটি টাকা দেনা রেখে গেছে। কিন্তু কেন্দ্র ও রাজ্যে যখন এক সরকার রয়েছে বর্তমানে তাহলে কেন্দ্রের দেনার হিসাব ও দেওয়া উচিৎ ছিল, যেটা অর্থমন্ত্রী সুকৌশলে এড়িয়ে গেছেন। ভারতের বর্তমান ঋণ বিশাল। ২০২৩ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী ২০৫ লক্ষ কোটি টাকা। ২০১৪ সালে যে ঋণ কংগ্রেস সরকার রেখে গেছিল ৫৮.৬ লক্ষ কোটি টাকা। সেই ঋণ তো শোধ হয়নি।উপরন্তু বিজেপি সরকার সেই ঋণের পরিমাণ প্রায় ৩ গুণ বাড়িয়েছে ১২ বছরে, যেটা কংগ্রেস বিগত ৬০ বছরেও করে উঠতে পারেনি। রাজ্যে বিগত তৃণমূল সরকার চলে গেলে কেন্দ্রের আঁটকে থাকা অনেক ফান্ড রিলিস হয়েছে। ফলে বোঝাই যাচ্ছে বিগত সরকারের একটা বাধ্যবাধকতার জায়গা রাজ্য চালাতে বিশ্ব ব্যাঙ্কের ঋণের উপর তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান বিজেপি সরকার যারা এই রাজ্যের ঋণ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, তাঁরা কেন্দ্রে এতো ঋণী হলেন কি ভাবে? তাও ঋণে এখন প্রায় বিশ্ব সেরা? এই বিষয় অর্থমন্ত্রীর নীরবতা প্রশ্ন তুলে দিতে বাধ্য। ফলে বাংলার ভবিষ্যৎ এই ঋণের বোঝা কোন দিকে নিয়ে এই নিয়ে চিন্তা থেকেই যায়।
- বিজেপি সরকারে আসার আগে প্রতিশ্রুতি ছিল ৪৫০ টাকার গ্যাস, ২০০ ইউনিট বিদ্যুৎ ফ্রি। এই বিষয়ে বাজেটে কোনও সুনির্দিষ্ট বক্তব্য পাওয়া গেলো না।
- পশ্চিমবঙ্গে বিগত কয়েক বছরে জলবায়ু পরিবর্তন এবং গাছের পরিমাণ কমে যাওয়ায় গ্রীষ্মকালে দাবদাহ অনেক বেড়ে গেছে। সেখানে ম্যান মেড জঙ্গল বা গাছপালা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে। বিশেষত বিগত সরকারের আমলে প্রচুর নদী ও খাল সংস্কারের সময় বহু গাছপালা কেটে দেওয়া হয়েছে। তার বিকল্প হিসাবে নতুন করে বনসৃজন ও বৃক্ষ রোপণের ভাবনা সরকারের ভাবা উচিৎ ছিল। এতে এসি লাগানোর চাহিদা কমতো। বিদ্যুৎ খরচ ও কমতো। অথচ এই ভাবনা অর্থ বাজেটে প্রতিফলিত হল না। যেটা অত্যন্ত হতাশাজনক।
- স্বাস্থ্য বাজেট নিয়ে খুব বেশি কথা বলা নেই। সুনির্দিষ্ট আর্থিক বিলি বরাদ্দ সেরকম কিছু পেলাম না, কেবল আয়ুষ্মান ভারত ছাড়া। বেশ কিছু নতুন কলেজ ও আসনের কথা বলা হয়েছে, তার বাজেট সংস্থান কি হবে? ঔষধ নিয়েও সস্তার জেনেরিক মেডিসিনের পুরানো গল্প।










