প্রথমেই বলি, ধুলোঝড় একটি প্রাকৃতিক ঘটনা যা সাধারণত গ্রীষ্ম কালের শুকনো পরিবেশেই ঘটে থাকে। আসলে গরমের সময় মাটি খুব তেতে ওঠে। এরফলে মাটি বা ভূমি সংলগ্ন বায়ু গরমে অশান্ত হয়ে প্রবলভাবে ছোটাছুটি করার সময় মাটির একেবারে ওপরের স্তর থেকে ধুলো এবং মাটি উড়িয়ে নিয়ে যায়। বাতাস স্বাভাবিকের তুলনায় জোরে বইতে থাকলে তার ক্ষমতা বেড়ে যায়, সৃষ্টি হয় ঝড়ের। ঝোড়ো হাওয়ায় যদি বিপুল পরিমাণ ধুলিকণা থাকে তাহলে তাকেই আমরা বলি ধুলোঝড়। খুব সম্প্রতি ভারতের মুম্বাইয়ে এমনই এক ধুলোঝড় দাপাদাপি করে গেল। ঝড়ের দাপটে বড়ো বড়ো বিলবোর্ড ভেঙে ষোলো
জন নিরীহ সহ নাগরিকের প্রাণ কেড়ে নিল। ধুলোঝড়ের ফলে কোন এক অঞ্চলের ধূলিকণা অন্যত্র পরিবাহিত হয়। বায়ুর গতিবেগের ওপর নির্ভর করে, ধুলোবালি কতদূর পর্যন্ত পৌঁছে যাবে সেই বিষয়টি । মরু অঞ্চলে ধুলোঝড় অথবা বালি ঝড় একটি অতি স্বাভাবিক ঘটনা । বছর কয়েক আগে ইরাক সহ পাশের প্রতিবেশী দেশগুলোতে কমলা রঙের ধুলোঝড়ের দাপট লক্ষ করা গিয়েছিল। সেই ধুলো কণার একাংশ বাতাসে ভেসে ভেসে শেষে থিতু হয়েছিল আমাদের দেশের পশ্চিমাংশে।
কেন ঘটে এমন ঘটনা? আসলে দীর্ঘ বৃষ্টিহীন শুখা পরিস্থিতির কারণে মাটির কণাগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সংসক্তি একেবারেই থাকেনা,ফলে বাতাসের পক্ষে তাকে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া সহজ হয়। নিছক একটি প্রাকৃতিক ঘটনা হলেও এই ঝড় স্থানীয় বায়ুমণ্ডলের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। প্রবল ধুলোঝড়ের দাপটে স্বাভাবিক দৃশ্যমানতা সাময়িকভাবে হ্রাস পাওয়ার পাশাপাশি বায়ুতে বিপুল পরিমাণে ভাসমান পরিযায়ী ধুলোকণার উপস্থিতি বাতাসকে দূষিত করে তোলে যা পরিণামে আমাদের শরীর- স্বাস্থ্য- সুস্থতার ওপর গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। মুম্বাই শহরের সাম্প্রতিক ধুলোঝড়ের ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে নগরায়ণের উদগ্র তাড়নায় আমরা আমাদের জনবহুল শহর,নগরগুলোর পরিবেশকে কতটা ধ্বস্ত করে ফেলেছি। কেবল কংক্রিটের জঙ্গল গড়ে আমরা আমাদের দায় মেটাতে গিয়ে এমন প্রাকৃতিক অস্থিরতা উৎপন্ন করে চলেছি সজ্ঞানে । এদিকে সমানে বেড়ে চলেছে ধরিত্রীর তাপ । উষ্ণায়নের ফলে আগামী দিনে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে এবং তা আমাদের শারীরিকভাবে ক্রমশ আরও অসুস্থ করে তুলবে, আরও বেশি মানুষ অসুস্থ হবেনএমনই আশঙ্কা করছেন তথ্যনিষ্ঠ গবেষক ও বিজ্ঞানীরা।
আবহবিদদের গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে একটা সাধারণ মাত্রার ধুলোঝড় মোটামুটিভাবে কয়েকটি সাধারণ উপাদান বহন করে,যেমন – ধুলো,বালি,মাটিকণা। এগুলো পরিবাহিত কণিকার একেবারে সাধারণ পরিচিতি।এছাড়াও বাতাস বহন করে নিয়ে যায় বিপুলসংখ্যক অণুজীবী ব্যাকটেরিয়া এবং ছত্রাকের বীজ যা আমাদের শরীরতন্ত্রের ক্ষেত্রে সর্বাংশে বহিরাগত । এমন সব বায়ু বাহিত উপকরণ আমাদের শরীরের কার্ডিও ভ্যাসকুলার তন্ত্রের ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষতঃ যারা ইতিমধ্যেই শ্বাসযন্ত্রের নানাবিধ সমস্যায় আক্রান্ত হয়েছেন তাঁরা এমন ঘটনার কারণে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। এছাড়া সাধারণ বয়স্ক নাগরিক ও শিশুদের পক্ষে ধুলোঝড়ের ঘটনা নতুন করে শারীরিক সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। কলকাতা শহরের বর্ধমান বায়ু দূষণের মাত্রা নাগরিকদের ফুসফুসকে আরও আরও বেশি সংখ্যায় আক্রমণ করছে।ধুলোঝড়ের আকস্মিক ঘটনা এই আশঙ্কাকে যে বহুগুণে বাড়িয়ে দিতে পারে তা বলাবাহুল্য। তাই এই পরিস্থিতির মোকাবিলায় আমাদের যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। এই বিষয়ে দু একটা কথা বলা জরুরি মনে করেই আলোচ্য নিবন্ধের অবতারণা।
ধুলোঝড়ের দাপট আমাদের শরীরের ভারসাম্যকে কতটা প্রভাবিত করতে পারে তা কতগুলো বিষয়ের ওপর নির্ভর করে।
- ধুলো কণার আকার।
- ধুলো কণার উৎস।
এছাড়া খেয়াল রাখতে হবে যে শরীরে আগে থেকেই কোন সমস্যা আছে কিনা যার প্রকোপ ধুলোবালিছাইয়ের সংস্পর্শে এলে আগের তুলনায় অনেকটাই বেড়ে যেতে পারে। আর কতক্ষণ আপনি এমন ঝড়ের মুখোমুখি হয়েছেন তাও এক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ধরুন বাইরে বেরিয়ে আপনাকে ধুলোঝড়ের সম্মুখীন হতে হয়েছে এবং আপনি কোন নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজ না পেয়ে গোটা সময়কালটিই বাইরে কাটাতে বাধ্য হয়েছেন, সেক্ষেত্রে আপনাকে সমস্যায় পড়ঊড়ূতে হতে পারে। ধুলো কণার উৎসের ,এঢ় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ,কেননা বিভিন্ন ধরণের ভাসমান অজৈব কণিকা যারা বিভিন্ন ধরনের অ্যানথ্রোপজেনিক উৎস থেকে উৎপন্ন, যাদের সঙ্গে আমাদের শরীরের৬ঊ কোন পূর্ব পরিচিতি নেই, শরীরী ব্যবস্থার বিপর্যয়ের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
গবেষকদের মতে ধুলোবালির সংস্পর্শে আমাদের শরীরে দু ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে – স্বল্পমেয়াদের সমস্যা ও দীর্ঘ মেয়াদী সমস্যা।
ধুলোঝড়ে বাহিত ধুলোকণা শরীরে যে ধরনের সাময়িক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে সেগুলো হলো –
১. ত্বক বা চামড়ার প্রদাহ বা সহজ কথায় চুলকানি বাড়তে পারে।
২. চোখ জ্বালা করা, লাল হয়ে যাওয়া কনজেন্টিভাইটিসের প্রকোপ বেড়ে যেতে পারে।
৩. গলা ও নাক জ্বলতে পারে। বেড়ে যেতে পারে কাশি বা হাঁচির প্রকোপ।
এই ধরনের উপসর্গগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সাময়িক। পরিস্রুত জল দিয়ে ধুয়ে নিলেই স্বস্তি পাওয়া যায়। এগুলো নিয়ে খুব বেশি উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই।
তবে যেসব মানুষ শ্বাস যন্ত্রের সমস্যায় আক্রান্ত হয়েছেন বা যাঁদের হৃদ্ ঘটিত অসুবিধা রয়েছে তাঁদের জন্য বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। যাদের হাঁপানি বা এমফিসেমা রয়েছে ধুলোঝড় তাঁদের শরীরের পক্ষে মোটেই ভালো নয়। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে ধুলোবালির সংস্পর্শ যাদের ক্ষেত্রে মারাত্মক হতে পারে তাঁরা হলেন –
১.সদ্যোজাত শিশু, সাধারণ শিশু ও কিশোর।
২. প্রবীণ মানুষেরা যাঁদের বয়স ৬৫ +
৩. গর্ভবতী মায়েরা
৪. যেসব মানুষ হাঁপানি এবং ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিসঅর্ডারের কারণে নিয়মিত শ্বাসকষ্টের শিকার।
৫.কার্ডিও ভ্যাসকুলার তন্ত্রের সমস্যায় আক্রান্ত মানুষেরা।
৬. ক্রনিক মধুমেহ বা ডায়াবেটিস্ রোগের রোগীরা।
এই সব মানুষেরা ধুলোবালির সংস্পর্শ থেকে প্রয়োজনীয় সাবধানতা অবলম্বন করবেন। উল্লিখিত মানুষজনের খেয়াল রাখতে হবে যে তাঁরা রীতিমতো ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন সুতরাং বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে এমন প্রাকৃতিক সংকটের সময়ে।
প্রশ্ন উঠতে পারে ধুলোঝড়ের সময় কী কী ভাবে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত আমাদের প্রত্যেকের? এই বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা জারি করেছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের অভিমত –
- ঝড়ের সময় ঘরে থাকতে হবে। ঘরের দরজা জানালা সব বন্ধ রাখতে হবে।
- সম্ভব হলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে থাকতে হবে।
- নাক ও মুখ উপযুক্ত গুণমানের মাস্ক দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে।এই কাজে একটি ভিজে কাপড়কেও ব্যবহার করা যেতে পারে।
- এই সময় কোন বাইরের কাজ করা উচিত নয়।
এতোসব বিধিনিয়মকে যথাযথ ভাবে মেনে চলার পরেও যদি আপনি শারীরিক উপসর্গ লক্ষ্য করেন তাহলে কালবিলম্ব না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। এই বিষয়ে কোন দ্বিধা করবেন না। যারা নিজেদের শারীরিক উপসর্গের জন্য নিয়মিত ওষুধ সেবন করেন তারা ওষুধ খাওয়া বন্ধ করবেন না। ঝড়ের সময় বা ঝড় থেমে যাবার পর যদি বুকে টান বোধহয় অথবা যদি আপনার ঘ্রাণ শক্তি লোপ পায় অথবা যদি হঠাৎ করে শুকনো কাশির মাত্রা বেড়ে যায় অথবা যদি প্রবলভাবে শ্বাসকষ্ট দেখা দেয় তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। হৃদযন্ত্রের সমস্যায় ভুক্তভোগী মানুষরাও প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে পারেন। মনে রাখতে হবে, সাবধানতার মার নেই।
















