আজ থেকে আটত্রিশ বছর আগে আমার মা যেদিন পটল চুরি করে আনল কোচড়ে গুঁজে দু চারটা, সেদিন আমি জেদ করেছিলাম পটল ভাজা খাবার।
এমন নয় যে সামান্য পটল কেনার সামর্থ ছিলনা বাবার। রাতদিন টিউশুনি, তারপর স্কুল, তারপর মিছিল, রাজনীতি, দেওয়াল লেখা এসবের পর সংসারের জন্য সময় থাকত সামান্যই। উঠোনের মোড়ায় বসে বাবা, আর দিনান্তে একপাশে চাটাই এ বসে পড়তাম আমরা আর অন্যপাশে খবরের কাগজের ওপর লেখা হত বিপ্লবের গন্ধ। আলতায়। আমরা পড়তাম সুর করে। কিশলয়। উঠোনের একপাশে কাঠের ঊননে রান্না হত ভাত। ঘর থেকে ফোড়ন আনতে গিয়ে দপ করে জ্বলে উঠত তেল। এবং আমার মা ও। তবুও গজ গজ করতে করতে কানা ভাঙ্গা চীনামাটির কাপে চা আসতো। ধপ করে।মাদুরে উপুর হয়ে আলতায় স্লোগান লেখা কমরেড দের জন্য। উদাস হয়ে বিড়ি ধরিয়ে বাবা বলত, কাল বাজারে যামু। তুমি লিস্ট কইরা রাখো…
তো লিস্ট হত। কিন্তু ঢলঢলে পাঞ্জাবীর পকেট থেকে কোথায় হারিয়ে যেত সেসব..
বিকেল বিকেল একমাথা ঘাম আর রোদে পোড়া তামাটে শরীর নিয়ে বাবা যখন ফিরত ততক্ষণে রাগ ভুলে বারান্দায় পিড়ির সামনে সাজানো হচ্ছে ভাত, ডাল, তরকারী…
এসব তো ছিল প্রায় প্রতিদিনের রুটিন। প্রতিদিনের।
কিন্তু সেদিন সেরকম হয়নি।
সেদিনটা ছিল বোশেখ মাসের এক তপ্ত দুপুর। পটল ভাজা ছাড়া ভাত খাবনা আমি। জেদ আমার বরাবরই।
অথচ পটল যে নেই ঘরে।
ঘরে নেই তো কি আছে!
নদীর ধারের আল পথের পাশে পটল ক্ষেত। দু চারটেই তো।
চাষীরা তো কতবারই সাধে।
কোমরে আঁচল বেঁধে মা অগত্যা চলেই গেল। তাঁর ছোট ছেলের জেদ।কি আর করা!
কোচর ভরে চার কি পাঁচটা পটল এল। চট পট ভাজা হল কাঠের উনোনে। সেই ভাত খেয়ে আমি তখন টিউবওয়েল এর হ্যান্ডেল ঝুলে জল ঝড়িয়ে ধুয়ে ফেলছি হাত। তখনই সে এল। পটল চুরির কথা শুনিয়ে গেল বাড়ি বয়ে। আসলে পটল চুরি নয়। ব্যাপারটা ছিল রাজনৈতিক। সেসব বোঝার বয়েস হয়নি তখনও… শুধু মনে আছে উঠোনের এক কোণে লজ্জায়, অসম্মান এ, অপমানে কিছু, কিচ্ছু না বলতে পারা আমার মা দাঁড়িয়ে ছিল স্থানুবত। স্থবির।
আর দুম করে লক্ষীর ঘট ভেঙ্গে একমুঠো কুড়ি পয়সা দশ পয়সা ছুঁড়ে লোকটার দিকে তেড়ে গেছিলাম লিকলিকে, রোগাপঙটা আমি… কয় টাকা তুমার পটলের দাম। কও। নিয়া যাও…আসো…
ভাড়াটে মানুষের সত্যের মুখে দাঁড়াবার সাহস থাকে না।
সুরসুর করে চলে গেছিল লোকটা।
হাউহাউ কাঁদছিলাম আমি। মা ও।
মিছিল ফেরৎ আমার বাবা মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিল, ঘট ভাঙছস। বেশ করছস। তরে আমি আরেকটা আইনা দিমু…
বছরের শেষ দিনটায় মনে এল সেই স্মৃতি। সে যাক। ভাল থাকবেন সবাই।










