১৯৫৬ – র এক ঝোড়ো রাত। ১৫ নভেম্বর মেক্সিকোর ভেরাক্রুজ বন্দর থেকে ছেড়ে যে লজঝড়ে ভাড়া করা ‘ গ্রানমা ‘ নামক জলযানটিতে ঠাসাঠাসি করে চেপে ৮৭ জন তরুণ গাল্ফ অফ মেক্সিকো, ইউকাতান চ্যানেল হয়ে ক্যারিবিয়ান সাগর ধরে কোন রকমে এগোচ্ছিলেন তাঁরা প্রবল বিপদে পড়লেন। জলযানের উপর বেশি ওজনের চাপ, পর্যাপ্ত পানীয় জলের অভাব, প্রবল সি সিকনেস ইত্যাদি সমস্যাতো ছিলই, এবার সমুদ্রের উথাল পাথাল ঢেউয়ে জলযান টি প্রায় ডুবতে বসেছে। কিন্তু এই তরুণ দের তো হার মানলে হবে না। তাঁরা তো কুবান বিপ্লবের মহা দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন।
ফিদেল কাস্ত্রো, রাউল কাস্ত্রো, কেমিলো সিয়েনফুয়েগো, জুয়ান আলমিতদা, জ্যাসু মতানে প্রমুখ এদের নেতৃত্বে কুবার তরুণ তরুণীরা প্রবল অত্যাচারী বাতিস্তা সামরিক একনায়কতন্ত্র কে হঠাতে প্রবাদপ্রতিম কবি ও বিপ্লবী নেতা হোসে মার্তি র শততম জন্মদিনে ২৬ জুলাই ১৯৫৩ তে সশস্ত্র অভ্যুত্থানের ঘটিয়েছিলেন। মানকান্দা সামরিক দুর্গ আক্রমণ করেছিলেন। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। বাতিস্তার বাহিনীর কাছে তাঁরা পরাজিত হন। বেশিরভাগ বিপ্লবীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। অল্প কিছু পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও বাকিরা ধরা পড়ে জেল বন্দী হন। মার্শাল ল জারি হয়।
এরমধ্যে জাতীয়তাবাদী ‘ কুবান পিপলস পার্টি ‘র জনপ্রিয় নেতা ফিদেল এবং তাঁর কমিউনিষ্ট সহোদর ‘ পপুলার সোসালিষ্ট পার্টি ‘ র নেতা রাউল সঙ্গীদের নিয়ে জেলে বসেই তৈরি করে ফেলেছেন ‘ MR – 26 – 07 ‘ বিপ্লবী দল। তাঁদের ১৫ বছরের সাজা হলেও প্রবল আইনি লড়াই চালিয়ে এবং বিপুল গণ আন্দোলনের চাপে তাঁরা দুই বছরের মাথায় জেল থেকে বেরিয়ে গুপ্ত হত্যা এড়িয়ে সহযোগী ফ্রাঙ্ক পেইন্সের হাতে ওখানকার সংগঠনের দায়িত্ব দিয়ে অন্য সংগঠকদের নিয়ে গোপনে মেক্সিকো তে পালিয়ে যান। সেখান থেকেই চলতে থাকে কুবান বিপ্লবের প্রচেষ্টা। মেডিকেল ছাত্রাবস্থায় সহপাঠী আলবার্তো গ্রানাদো কে সঙ্গে নিয়ে ‘ লা পেদ্রসা (শক্তিমান) ‘ নামক এক ভাঙাচোরা বাইকে চেপে সমগ্র লাতিন আমেরিকা মহাদেশ ও সেখানকার মানুষদের জানতে ১৯৫২ তে মহাদেশীয় অভিযান চালানো আর্জেন্টিনীয় তরুণ ডাক্তার আর্নেস্তো ‘ চে ‘ গুয়েভারাও তাঁদের সঙ্গে যোগ দিলেন।
নির্দিষ্ট দিনের তিনদিন পরে কোনরকমে গ্রানমা যখন কুবান উপকূলের প্লায়া দে লা কলোরাডোনে র জলাভূমিতে ২ ডিসেম্বর অবতরণ করল ততদিনে বাতিস্তার সেনারা সব জেনে গেছে। গুলির বৃষ্টির মধ্যে ওখানেই বেশিরভাগ বিপ্লবীর মৃত্যু হল। ফিদেল, রাউল, চে, ক্যামিলে এরকম মাত্র ১৯ জন লম্বা ঘাসের বন ধরে প্রাণ নিয়ে কোনরকমে পালাতে পারলেন।
জনগণ কে নিয়ে ঘুরে দাঁড়ানো: কুবার দক্ষিণ পশ্চিমের সিয়েরা মায়েস্ত্রা র পাহাড় জঙ্গলে তাঁরা আশ্রয় নিলেন। বাতিস্তার সেনা বাহিনীর তল্লাশি থেকে দরিদ্র জনজাতির কৃষকরা তাঁদের প্রাণ বাঁচালেন। এবার তাঁদের আন্দোলনের অভিমুখটাই বদলে গেল। শোষিত নিপীড়িত কৃষক ও জনজাতিদের সংগঠিত করে তাঁরা এগোতে লাগলেন। প্রথম দিকে ব্যর্থ হলেও পরে সাফল্য পেতে শুরু করলেন। ১৯৫৭ তে লা প্লাটা দখল হল, ১৯৫৮ তে সান্তা ক্লারা। পেইন্স এবং অন্যরাও বিভিন্ন জায়গায় সফল অভ্যুত্থান ঘটালেন। রাজধানী হাভানা সহ অন্যত্র গণ বিক্ষোভ চলছিল। ১৯৫৯ র ১ জানুয়ারি বিপ্লবী রা হাভানার দখল নিয়ে নিলেন। সংঘটিত হল ঐতিহাসিক কুবান বিপ্লব। বাতিস্তা ডোমিনিকান রিপাবলিকে পালিয়ে গেলেন। তৈরি হল পশ্চিম গোলার্ধের একমাত্র সমাজতান্ত্রিক দেশ।
একটু পিছনে ফিরি: সোনার দেশ ভারতে পৌঁছতে তখন পর্তুগিজ ও স্প্যানিয়ার্ডস দের নেতৃত্বে ইউরোপীয়দের একের পর এক অভিযান চলছে। এরকমই এক ভারতে পৌঁছনোর অভিযানে ইতালিয় কলম্বাসের নেতৃত্বে স্প্যানিয়ার্ডস জলদস্যুরা দক্ষিণ আমেরিকায় পৌঁছল। কলম্বাস তার বাহিনী নিয়ে বাহামা হয়ে ১৪৯২ তে সাগরবেষ্টিত মনোরম এই দ্বীপটিতে পৌঁছলেন। উর্বর জমি এখানে অবারিত – তাই নাম হয়ে গেল কুবাও। স্থানীয় তিন প্রজাতির আমেন্দিয়ান জনজাতিরা চাষ ও শিকার করে এবং মাছ ধরে খেত। তাদের মেরে ধরে শেষ করা হল। যে কজন বেঁচে থাকল স্প্যানিয়ার্ডসদের আনা সংক্রামক রোগে শেষ হয়ে গেল। এখানে প্রচুর নিকেল, ক্রোমিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, তামা পাওয়া গেল। দেখা গেল এখানকার জমিতে খুব ভালো আখ, তামাক, কলা, কফি, আনারস ইত্যাদি ফলে। এরজন্য পশ্চিম আফ্রিকা থেকে কৃষ্ণাঙ্গ ক্রীতদাসদের নিয়ে আসা হল। কুবার জনসংখ্যা তাই মিশ্র জনসংখ্যা – ৬৪% শ্বেতাঙ্গ, ২৭% মিশ্র, ০৯% কৃষ্ণাঙ্গ।
এবার শুরু অত্যাচারী স্প্যানিয়ার্ডসদের স্পেনের থেকে কুবার স্বাধীনতা অর্জনের লড়াই। ১৮৬৮ তে কার্লোস সেসপেদেশ স্বাধীনতা ঘোষণা করলেন। ক্যালিকসো গার্সিয়ার নেতৃত্বে ১৮৭৫ – ‘ ৮৫ স্বাধীনতার লড়াই চলল। এরপর ম্যাকসিমো গোমেজ প্রমুখরা সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে চললেন। হোসে মার্তি ১৮৯৫ তে শহীদ হলেন।
ইতিমধ্যে ১৮৯৮ এর স্পেন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জয়ী হয়ে কুবার দখল নিয়ে নিয়েছে। ১৯০২ অবধি কুবায় সরাসরি মার্কিন শাসন চলল। এরপর থেকে মার্কিনের পদলেহী পুতুল সরকার গুলিকে বসানো হত যারা মার্কিন অঙ্গুলি হেলনে চলত এবং মার্কিনের স্বার্থ রক্ষা করত। বড় বড় মার্কিন ব্যবসায়ীরা কুবার দরিদ্র কৃষকদের সীমাহীন শোষণ করে বড় বড় লাভজনক আখ, তামাক ও কৃষি খামার, চিনির কল, খনি ইত্যাদি নির্মাণ করে প্রচুর মুনাফা করতে লাগলেন। তাদের সঙ্গী করে নিলেন এক শ্রেণীর কুবান মুৎসুদ্দি কে। সাধারণ কুবান দের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠল। ঐ ধনীরা সুন্দর উপকূল গুলিকে ঘিরে নেশা, ফূর্তি, জুয়া, পতিতালয়, বেলেল্লাপনার পরিবেশ গড়ে তুলল। এর বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছিল। এর সঙ্গে রাষ্ট্রের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দল আন্দোলন পরিচালনা করছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অর্থনীতি ভেঙ্গে পড়ে পরিস্থিতি আরও খারাপ হল। প্রথমে Cuban Revolutionary Party, তারপর ফিদেল কাস্ত্রো প্রমুখের নেতৃত্বে Cuban People’s Party গণ আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছিল। ‘ ৫২ এর নির্বাচনের জনাদেশ উপেক্ষা করে মার্কিন মদতপুষ্ট বাতিস্তা সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ক্ষমতা দখল করে পীড়ন চালাচ্ছিল। তার বিরুদ্ধে ১৯৫৩ থেকে শুরু হয়ে ১৯৫৯ তে সফল কুবান বিপ্লব।
এগিয়ে চলা: তারপর শত কষ্ট ও কৃচ্ছ সাধনের মধ্যে শিরদাঁড়া সোজা করে মানুষকে সঙ্গে নিয়ে কঠিন পথচলা। একদলীয় সমাজতন্ত্রের অধীনে ভূমি সংস্কার, আধুনিক কৃষি ও জলসেচের ব্যবস্থা। শিল্প ও অর্থনীতির জাতীয়করণ। সকলের জন্য পানীয় জল, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য। পরিকাঠামো গঠন। খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি, পাশাপাশি রেশনিং। পতিতাবৃত্তি নিষিদ্ধকরণ এবং সমাজতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক আন্দোলন। এরপর নিয়ন্ত্রিত পর্যটন; চিকিৎসা; মেডিকেল পর্যটন; বায়োটেকনোলজি প্রভৃতির মাধ্যমে এবং আখ, চিনি, তামাক, সিগার, কফি, রসালো ফল, মাছ, নিকেল, কোবাল্ট ইত্যাদি রপ্তানি করে অর্থনীতির উন্নতি। শক্তিশালী সৈন্য বাহিনী ও গণ মিলিশিয়া গঠন। খনিজ তেল, ইস্পাত, গম, ভুট্টা, মেশিন, ওষুধ ইত্যাদি প্রয়োজনীয় দ্রব্য অন্য দেশ থেকে আমদানি।
ভারত ও পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থী দের মনোযোগ দিয়ে শেখার: ১৯০২ তে কুবায় প্রথম কমিউনিষ্ট পার্টি তৈরি হয়। তারপর ১৯৪৪ এ কমিউনিষ্ট ও সমাজতন্ত্রী রা মিলে তৈরি করেন Popular Socialist Party। ১৯৫৫ তে বিপ্লবীরা যে MR – 26 – 07 তৈরি করেছিল সেটি বর্ধিত হয়ে ও সমাজতন্ত্রী রূপ নিয়ে ১৯৬১ তে হল Integrated Revolutionary Organization (ORI)। ১৯৬২ তে ORI, Popular Socialist Party, Revolutionary Directory সবাই মিলে তৈরি হল United Party of Socialist Revolution of Cuba (PURSC)। ১৯৬৫ তে এটি উত্তীর্ণ হল Communist Party of Cuba (PCC) তে। এর ছাতার তলায় কুবান রা একত্রিত ও সংগঠিত।
সমস্ত প্রতিবিপ্লব ছিন্নভিন্ন করে: ১৯৫৯ তে কুবান বিপ্লবের পর থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নানাভাবে ষড়যন্ত্র, আক্রমণ, অভ্যুত্থান ইত্যাদি ঘটিয়ে কুবার সমাজতন্ত্রী সরকারকে ফেলে দেওয়ার এবং ফিদেল সহ নেতৃত্বকে হত্যা করার চেষ্টা করে গেছে। এরমধ্যে ‘ বে অফ পিগে ‘র দিক থেকে নিকারাগুয়ার কন্ট্রাদের দিয়ে বড়সড় হামলা চালানো হয় যা জেনারেল র্যামোস এবং ফিদেলের নেতৃত্বে সেনাবাহিনী ব্যর্থ করে। এরপর ‘ একামপ্রের প্রতিবিপ্লব ‘। ছয় বছর ধরে চলা এই সশস্ত্র হামলা সেনা বাহিনী ও জনসাধারণ সম্মিলিতভাবে পরাজিত করে। এভাবে চলতেই থাকে।
মার্কিনকে প্রতিহত করতে এবং নিজেদের উন্নতির জন্য কুবা সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের সাহায্য নিতে থাকে। ১৯৬২ তে সোভিয়েত ইউনিয়ন কুবাতে পারমাণবিক আন্তর্মহাদেশীয় মিসাইল বসাতে গেলে মার্কিনের সঙ্গে সোভিয়েত ও কুবার যুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। শেষ মুহূর্তে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সোভিয়েত কুবা থেকে মিসাইল ঘাঁটি সরায়, অন্যদিকে মার্কিন তুরস্ক ও ইতালি থেকে আন্তর্মহাদেশীয় মিসাইল ঘাঁটি সরায় এবং প্রতিশ্রুতি দেয় যে কখনও কুবা আক্রমণ করবে না। কিন্তু সেই থেকে বিশ্ব জুড়ে মার্কিন ও রুশের মধ্যে ঠাণ্ডা যুদ্ধের (Cold War) শুরু। আর সেই থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কুবার উপর নানাবিধ নিষেধাজ্ঞা (Sanctions) আরোপ করে এবং কুবাকে অবরোধ (Embargo) করে সেখানকার জনজীবন বিপর্যস্ত করে দেওয়ার চেষ্টা করে। কুবায় খাদ্য, বিদ্যুৎ এবং অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়।
অনুপম স্বাস্থ্য ব্যবস্থা: এই সবের মধ্যেও স্বাস্থ্য ও ক্রীড়ায় কুবা অগ্রগতি ঘটায়। কুবার শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা সর্বজনীন (Universal) এবং নিঃশুল্ক (Free)। বিশ্বের মধ্যে জনপ্রতি ডাক্তার ও নার্সের সংখ্যা কুবায় সবচাইতে বেশি। কুবা এক উন্নত স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে তোলে যা উন্নয়নশীল দেশগুলির কাছে মডেল পরিগণিত হয় এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) স্বীকৃতি দেয়। কুবার ডাক্তার ও নার্স রা দেশের প্রতিটি অঞ্চলে সমাজের (Community) মধ্যে বাস করেন। প্রতিটি এলাকায় Consultorio রয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষ ২৪ ঘন্টা তাদের পরিষেবা পান। এর উপরে রয়েছে Policlinicos যেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরিষেবা পাওয়া যায়। Medical General Integral নীতির মাধ্যমে কুবা দেশ থেকে একে একে মারাত্মক সংক্রামক রোগগুলিকে নির্মূল করে। শিশু মৃত্যুর হার সহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য সূচকে কুবা উন্নত দেশগুলির থেকে এগিয়ে। হাভানার American School of Medicine (ELAM) প্রভৃতি মেডিকেল স্কুল ও হাসপাতাল গুলিতে বিদেশ থেকে চিকিৎসার ও মেডিকেল শিক্ষার জন্য বহু রোগী এবং শিক্ষার্থী রা আসেন। প্রায় ১৬০ টি দেশে কুবার চিকিৎসক রা পরিষেবা দেন। যে কোন বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও স্বাস্থ্য সংকটে কুবার International Health Mission দক্ষ চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য কর্মীদের দল পাঠায়। হাইতি, ঘানা, পেরু, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্থান বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন মহামারী তে, বন্যা, সুনামিতে; ইবোলা মহামারীর সময় পশ্চিম আফ্রিকায়; কোভিড মহামারীর সময় ইতালি তে বারবার আমরা দেখেছি।
আন্তর্জাতিক উদ্যোগ: নিজস্ব সমস্যা সমাধান এবং অগ্রগতির পাশাপাশি কুবা সবসময়ই আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক দায়িত্ব পালন করে গেছে। কুবার ছোট কিন্তু শক্তিশালী সেনা বাহিনী অ্যাঙ্গোলা, কঙ্গো, সিরিয়া বিভিন্ন দেশে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ভাড়াটে সৈনিকদের বিরুদ্ধে সেই দেশের সেনাদের সঙ্গে যুদ্ধে অংশ নিয়েছে। কুবা ছিল বিশ্বজুড়ে নিরজোট আন্দোলন (Non Aligned Movement) এবং লাতিন আমেরিকা জুড়ে মার্কিন আধিপত্য বিরোধী Bolivian Alliance for the America, Pink Tide Movement প্রভৃতির হোতা। লাতিন আমেরিকার বহু দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা কুবা গড়ে দিয়েছে।
১৯৯১ একটি জল বিভাজিকা: যে সোভিয়েত ইউনিয়ন বার্ষিক ৪.৩ বিলিয়ন ডলার আর্থিক সাহায্য সহ পরিকাঠামো, তেল প্রভৃতি জোগাতো তার পতন, অন্যদিকে মার্কিনের নেতৃত্বে অবরোধ বৃদ্ধি এবং নয়া উদারতাবাদী অর্থনীতির বিশ্বায়নের ফাঁদ কুবা কে ১৯৯১ এর পর থেকে গভীর সংকটে ফেলে দেয়। এরমধ্যেও কুবা অনেক কষ্ট করে পরিস্থিতি সামাল দেয়। চাভেজের ভেনেজুয়েলার সঙ্গে ‘ তেলের বদলে ডাক্তার ‘ কর্মসূচীর মাধ্যমে খনিজ তেল সরবরাহ নিশ্চিত করে। অর্থনীতির আংশিক উদারীকরণ ঘটায়। সাম্রাজ্যবাদী মার্কিনের সহ্য হয় না। তারা Toricelli Doctrine সহ নিত্যনতুন বাধা সৃষ্টি করে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসী, বীভৎস ও বিকৃত রূপ ট্রাম্প প্রশাসন প্রথম পর্বেই বিনা প্রমাণ ও প্ররোচনায় কুবাকে সন্ত্রাসবাদী পরিচালিত রাষ্ট্রের আখ্যা দেয়।
দ্বিতীয় ও সাম্প্রতিক পর্বে ট্রাম্প প্রশাসন কুবার উপর আরও বিপদ চাপিয়ে দেয়। কুবাকে যে ভেনেজুয়েলা ও মেক্সিকো খনিজ তেল দিত তাদের হুমকি দিয়ে ভয় দেখিয়ে খনিজ তেল সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। ফলে কুবা এক অভূতপূর্ব সংকটের মধ্যে পড়ে যায়। বিদ্যুৎ উৎপাদন, কল কারখানা, খনি, গণ পরিবহন সব বন্ধ হয়ে যায়। যে দেশগুলি থেকে কুবা খাদ্য ও প্রয়োজনীয় দ্রব্য আমদানি করত তাদের উপর কড়া শুল্ক চাপিয়ে কুবাতে খাদ্য ও সার্বিক সংকট তৈরি করে। তার উপর ট্রাম্প ঘোষণা করেন যে তিনি এবার কুবার দখল নিয়ে নেবেন।
এবার দেখার যে মার্কিনের নাকের ডগায় থাকা সাগর বেষ্টিত ৪,১৯৬ টি ছোট ছোট দ্বীপের সমাহার পশ্চিম গোলার্ধের এই সমাজতান্ত্রিক ও মার্কিন প্রতিস্পরধী ছোট রাষ্ট্র কুবা কিভাবে এই ভয়াল মার্কিন আগ্রাসন প্রতিরোধ করে? কুবার দ্বিতীয় প্রজন্মের কমিউনিষ্ট নেতা এবং দেশের বর্তমান প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ – কানাল জানিয়েছেন কুবা শেষ পর্যন্ত লড়াই করবে। আগামী দিনে সেখানে ভেনেজুয়েলা না ইরানের চিত্রনাট্য নাকি অন্যকিছু ঘটতে চলেছে সেটির আশঙ্কায় বিশ্ববাসী।
২৫.০৩.২০২৬










