আমরা সবে পাশ করেছি, এই সময়ে আই. এম. এ., কোলকাতা ব্র্যাঞ্চে আলাপ সিনিয়র ডাক্তার বিজন দাসের সঙ্গে। অপ্রতিরোধ্য বলে যে শব্দটা আছে, তা বিজনদার ক্ষেত্রে প্রায় পুরোপুরি প্রযোজ্য। রাজনীতিতে CPIM এর সদস্য এবং সহজাত স্বভাববশতঃ অনেক নেতার সঙ্গেই তার যথেষ্ট আলাপচারিতা বিদ্যমান। অবশ্য, তৎকালীন যুগে নেতারা এতো দুর্লভ বা অনুচর পরিবেষ্টিত থাকতেন না। যাইহোক, তাঁদের মধ্যে এম. বাসবপুন্নিয়া বিজনদাকে কিছুটা স্নেহের চোখেই দেখতেন, হতে পারে বিজনদার তুখোড় ই়ংরেজির জন্য। রঙ কৃষ্ণবর্ণ হলেও, বিজনদা কিন্তু সবসময় ফিটফাট সাহেবদের মতো থাকতো। একবার, কি কারণে বিজনদা জিগ্যেস করেছে বর্তমান সময় সম্পর্কে তাঁর মতামত। উনি একটু থেমে (বিজনদা আমাদের যা বলেছিলেন), “Comrade Das, the situation at present is so complicated that the best thing to do now, is to keep mum”. শব্দগুলোর একটু আধটু বিচ্যুতি হওয়া সম্ভব, কারণ শোনা আর একজনের মুখে(মানে যাকে বলা হয়েছে) এবং সর্বোপরি সময়ের এত বছরের ব্যবধান। কিন্তু, মূল কথাটা ঠিক আছে যে, ‘পরিস্থিতি এতটাই জটিল যে এখন চুপ করে থাকায় সর্বাপেক্ষা শ্রেয় বলেই মনে হয়’!! জানিনা কমরেড বাসবপুন্নিয়া ঠিক কী কারণে বিজনদার উদ্দেশ্যে কথাগুলো বলেছিলেন, উনি তো তখন পার্টির সর্বভারতীয় মুখপত্র People’s Democracy এর সম্পাদক, ওনার পক্ষে তো নীরবতা পালন সম্ভবপর ছিল না। হতে পারে বিজনদার অনর্গল কথা বলে যাওয়ার অভ্যাসকে কিছুটা স়ংযত করার চেষ্টা করেছিলেন মাত্র।
যে কারণেই হোক, কমরেড বাসবপুন্নিয়ার এই উক্তির তাৎপর্য যে কী পরিমাণ, তা তখন সেভাবে না বুঝলেও এখন ভালোভাবেই হৃদয়ঙ্গম করতে পারছি এই প্রান্তিক সময়ে। এই শিক্ষা প্রয়োগ করতে না পারার অনিবার্য ফলশ্রুতি পাওয়া গেছে জীবনে পদে পদে , তাও কী যেন বলে চৈতন্য বা সঠিক বোধোদয় ঘটেনি। আসলে কথায় বলে না, ‘হিরন্ময় নীরবতা’, মানে নীরবতা যা সোনার তুল্য মূল্যবান!
অবশ্য আমরা না বুঝলে কী হবে, জীবনে যারা সফল তারা অবশ্যই জানে নীরবতার মূল্য কতটা,বা কোথায় চুপ করে থাকা অতীব প্রয়োজন। দেখুন না, পৃথিবীতে এতো ধুন্ধুমার কান্ড ঘটে গেলেও রাজ্য ও দেশের প্রধান একেবারে যাকে বলে নিশ্চুপ, হয়তো অতি গভীর চিন্তায় মগ্ন। মৌনতা অবশ্য সার্বিক নয়, আংশিক মাত্র। বলা যেতে পারে, highly selective, ঠিক যেখানে যেখানে সত্যিই জরুরি। এই selectionটা কিন্তু ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ, অতি বুদ্ধিমান ব্যক্তিরা বা তাদের অতিশয় বুদ্ধিমান পরামর্শদাতারা তা সঠিক ভাবেই জানে। তাই, বিরোধীরা হাজার উত্যক্ত করলেও টুঁ শব্দটি নেই, এমনকি ট্যুইটার বা এক্স হ্যান্ডেলেও নয়। অবশ্য আমাদের রাষ্ট্রপ্রধান তো সেদিনই জানা গেলো ইস্রায়েলের প্রধানমন্ত্রীর ‘শুধু ঘনিষ্ঠ বন্ধু নয়, ভাই’, ছোটবেলায় হারিয়ে যাওয়া কিনা জানা নেই! রাজ্যের প্রধানের তো সবকিছুই অতীব রহস্যময়, কিন্তু কোনোটাই বিনা কারণে নয়। কোনো না কোনো উদ্দেশ্য তো রয়েইছে ………
যাক, এসব বলে লাভ কী? আমাদের ছাত্রজীবনে দুনিয়ার যে কোনো প্রান্তে মার্কিনী হস্তক্ষেপ ঘটলেই স্লোগানে-বিক্ষোভে মুখরিত হয়ে থাকতো USIS Library প্রাঙ্গন। লাইব্রেরিটা কি এখনো ওখানেই আছে বা চালু অবস্থায় আছে? থাকলেও ঐ অঞ্চল বা আমেরিকান কনসাল চত্বর আর আন্দোলিত হয় না সেভাবে। ডেসিবেলের মাত্রায় ঐ অঞ্চল কোলকাতার শীর্ষস্থানাধিকারীদের অন্যতম। কিন্তু তা গাড়ির হর্ন ও বিবিধ শব্দের কারণেই, মার্কিন বিরোধী বিক্ষোভ-স্লোগানের contribution সেখানে খুবই বা নিতান্তই অকিঞ্চিতকর! আজকের সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধীরা ওখানে নয়, সম্ভবতঃ সামাজিক মাধ্যম ও হোয়াটস্যাপেই অতি সোচ্চার, হতে পারে তার reach হয়তো আরও অনেক বিস্তৃত পরিধির!!
কী আর করা যাবে?! জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সবই গুলিয়ে যাচ্ছে, কোনটা ঠিক কোনটা ভুল! এখন তো একটাই কাজ, চুপচাপ দেখে যাওয়া। সারা পৃথিবীই দর্শকের ভূমিকায়, আমরা তো কোন ছার, অতি নগণ্য!!
মনে হচ্ছে, এবার বোধহয় চূড়ান্ত নীরবতারই পালা………….










