এক সময় খবরের কাগজে অনেক খবরের ভিড়ে ছোট্ট কয়েক কলমের কিছু বিজ্ঞাপন থাকতো যার শিরোনাম — নিরুদ্দিষ্টের প্রতি পত্র অর্থাৎ বাড়ি থেকে হারিয়ে যাওয়া মানুষের উদ্দেশ্যে চিঠি। সেই বিজ্ঞাপন জুড়ে থাকতো আবেগঘন কিছু কথা যেমন – বাবা ভোম্বল, তুমি কোথায় আছো জানাও। তোমার চিন্তায় মা শয্যাশায়ী। টাকার প্রয়োজন হলে জানিও। শীঘ্রই বাড়ি ফিরে এসো – বাবা।
এমনতরো বিজ্ঞাপন আজও নিশ্চয়ই ছাপা হয় তবে কিশোর বেলার উৎসাহ এখন আর নেই,তাই আনাচেকানাচে চোখ বুলিয়ে তেমন কিছু আজ আর খোঁজা হয়না। তা বলে কি নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে? উঁহু, তেমনটা মোটেই নয়। আমাদের চারপাশের কতকিছুই তো প্রতিদিন নজর এড়িয়ে হারিয়ে যাচ্ছে। সেসব আবার কোনো এক কালে ফিরে আসবে তেমনটাও নয়। যদি ফিরে আসে বা তার দেখা মেলে হঠাৎ করেই তার হলে কিন্তু রীতিমতো হৈচৈ পড়ে যায়।প্রাণিজগতে কিন্তু এই হারিয়ে যাওয়া আর আবার ফিরে আসার লীলাখেলা চলতেই থাকে নিরবচ্ছিন্নভাবে। অতিকায় ডায়নোসরদের কথাই ধরা যাক। জুরাসিক যুগের সেই দানবাকৃতির সরীসৃপের দল পৃথিবী জুড়ে হাঁপিয়ে দাপিয়ে একসময় রঙ্গমঞ্চ ছেড়ে রীতিমতো বেপাত্তা হয়ে গেল। অতীতে এভাবেই পৃথিবীর বিস্তীর্ণ অংশের বিপুল সংখ্যক জীববৈচিত্র্য হারিয়ে গেল চিরকালের মতো। অবশ্য বিলুপ্ত হওয়া এবং হারিয়ে যাওয়ার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। যে নিরুদ্দিষ্টের প্রতি অভিভাবকদের পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপন দেওয়া হতো, তাদের অনেকেই হয়তো আবার স্বগৃহে প্রত্যাবর্তন করতো। ফিরে আসার পর স্বাভাবিক ভাবেই তাদের নিয়ে রীতিমতো হইচই পড়ে যেতো।
জীবজগতের ক্ষেত্রেও এমনটাই ঘটে। হঠাৎ করে হারিয়ে যাওয়া প্রাণিদের দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে খুঁজে পাওয়া গেলে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যান সংশ্লিষ্ট অনুসন্ধানকারী গবেষকরা। এমনই কিছু হারিয়ে যাওয়া প্রাণি এবং তাদের খুঁজে পাওয়ার কথা নিয়েই এই পর্বের আলোচনা। মোট ছয়টি পর্বের এই আলোচনার আজ , দ্বিতীয় পর্ব। আজকের অতিথি ২. Goodenough Swallow Tail Butterfly.কখনো উড়ন্ত প্রজাপতির ছবি তুলেছেন? উত্তর হ্যাঁ বা না যাইহোক না কেন কাজটা যে মোটেই সহজ নয় তা বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন নেই। বাগানে গাছ আছে, গাছে ফুল আছে আর তাই রঙ বেরঙের ডানা মেলে উড়ে বেড়ানো প্রজাপতিও আছে ঢের। এমনি এক সুদর্শন প্রজাপতি হঠাৎ ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ করে উড়ে বেড়াতে বেড়াতে গিয়ে যদি বেমালুম আড়ালে চলে যায় তাহলে তার খোঁজ করা জরুরি হয়ে পড়ে বৈকি !
সেই খোঁজেই নিজেদের ঘরদোর ছেড়ে এক দুর্গম বনপথে পাড়ি দিয়েছিলেন দুই পতঙ্গ বিজ্ঞানী –W.J. Tennent এবং D.K.Mitchell । প্রথম জন অর্থাৎ টেনেন্ট সাহেব যুক্ত রয়েছেন লন্ডনের বিখ্যাত Natural History Museum এর সঙ্গে একজন জীব বিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে। আর মিশেল সাহেব পাপুয়া নিউগিনির মিলনে বে প্রভিন্সের কনজারভেশন ইন্টারন্যাশনাল সংস্থার সঙ্গে। টেনান্ট ও মিশেল এক হারিয়ে যাওয়া প্রজাপতির খোঁজে পাড়ি দিলেন পাপুয়া নিউগিনির দুর্গম Goodenough দ্বীপের উদ্দেশ্যে কেননা ওখানেই শেষবারের মতো দেখা মিলেছিল সেই আশ্চর্য বর্ণময় প্রজাপতির, দ্বীপের নামের সাথে জুড়ে রয়েছে যার নাম – Goodenough Swallowtail Butterfly। লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের সংগ্রহে থাকা দুটি পুরুষ প্রজাপতির সংরক্ষিত নমুনা দেখে নতুন করে তার খোঁজে ময়দানে নেমে পড়ার কথা মাথায় এলো টেনান্টের। সেই ১৯১৫ সালের সংগৃহীত নমুনা কালের নিয়মে অনেকটাই বিবর্ণ হয়ে গেছে। তাই সই , নতুন করে তার তত্বতালাশ করতে দোষ কি? ১৯১৫ সালে বিশিষ্ট পতঙ্গ বিজ্ঞানী Walter এবং Rothschild নাম না জানা নমুনাটিকে শণাক্ত করলেন Graphium weiskel goodenovii হিসেবে। এই নমুনাটির প্রকৃত সংগ্রাহক ছিলেন নিউজিল্যান্ডের সুপরিচিত নৃতাত্ত্বিক Diamond Jenness । ১৯১২ সালে ওই দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় নৃতাত্ত্বিক গবেষণার কাজে গিয়ে তিনি একটি পুরুষ প্রজাপতির সন্ধান পান।ওই একই বছরে বিজ্ঞানী Albert Stewart Meek খুঁজে পেলেন দ্বিতীয় প্রজাপতিটিকে পূর্ব পাপুয়া নিউগিনির উত্তর উপকুলের Goodenough দ্বীপের গহীন অরণ্যে। ব্যস্ , ওই দুটি নমুনাতেই আটকে রইলো প্রজাপতিটির যাবতীয় পরিচিতি। আজ এতো বছর পরে ওই পাপুয়া নিউগিনির গুডএনাফ দ্বীপেই খোঁজ পাওয়া গেছে সোয়ালো টেল প্রজাপতির।গুডএনাফ দ্বীপটি তার সহযোগী বাকি দুটি দ্বীপের মতোই পর্বতসঙ্কুল যাদের গড় উচ্চতা ১০০০ মিটারের বেশি। গুডএনাফ দ্বীপের Oiautukekea হলো সর্বোচ্চ স্থানবিন্দু যার উচ্চতা ২৫৩৬ মিটার। এর আশপাশের এলাকাতেই ১৯১২ সালে বিজ্ঞানী মিক্ এই দুর্লভ প্রজাতির পতঙ্গটিকে আলাদা আলাদা ভাবে প্রথম দেখতে পান দুই বরেণ্য বিজ্ঞানী Jenness ও Meek । দুজনেই দীর্ঘ দুর্গম পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে এই আশ্চর্য সুন্দর প্রজাতির দেখা পান। অবশ্য দুজনেই একই গোষ্ঠীর দুই আলাদা প্রজাতির খোঁজ পেয়েছিলেন।এই প্রসঙ্গে বলা ভালো যে সোয়ালোটেল প্রজাতির প্রজাপতিরা একেবারে দুর্লভ তেমন হয়তো নয়। কেননা Papilionidae পরিবারভুক্ত এই প্রজাপতিরা আকারে বেশ বড়ো শুধু নয়, একই সঙ্গে তাদের ঝলমলে রঙিন ডানা সহজেই নজর কাড়ে। সাথেসাথে এ কথাও বলার যে এই পরিবারের বেশ কিছু প্রজাতির নাম বিপন্ন পতঙ্গদের তালিকায় ইতিমধ্যেই ঠাঁই করে নিয়েছে। পাপুয়া নিউগিনির গুডএনাফ সোয়ালো টেল প্রজাপতিরা এই কারণের জন্যই পতঙ্গবিদদের গভীর অনুসন্ধানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।আসুন এই অবসরে গুডএনাফ দ্বীপের এই আশ্চর্য প্রজাতির প্রজাপতির অপরূপ সৌন্দর্যের বিশেষতা সম্পর্কে দু একটি কথা শুনে নিই। রঙিন বাহারি ডানার কারণেই পতঙ্গ জগতে প্রজাপতিদের এমন খাতির। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন যে গুডএনাফ সোয়ালো টেল প্রজাপতির ডানায় কোনো রঙিন আঁশ থাকে না। এর স্বচ্ছ ডানার মূল পর্দাটি তরল রঙিন ছোপে রাঙানো থাকে। এই কারণে গুডএনাফ দ্বীপের প্রজাপতিদের ডানা অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি মসৃণ,গাঢ় বর্ণের ও উজ্জ্বল।
বিজ্ঞানীরা বলছেন যে এদের ডানায় অত্যন্ত বিরল পিত্ত রঞ্জক বা বাইল পিগমেন্ট থাকে। এর প্রভাবেই এই সোয়ালো টেল প্রজাপতিদের ডানার এতো বাহার! মখমলি কালো রঙের ওপর সবুজ নীল বেগুনি আর গোলাপি রঙের মেলা ডানাগুলোকে অপরূপ সৌন্দর্যের শোভায় শোভিত করেছে। যে একবার দেখেছে সেই বাধ্য হয়েছে এর প্রেমে পড়ে যেতে। হয়তো এই কারণেই এতো দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে বিজ্ঞানীরা অনেক বাধা বিপত্তি পেরিয়ে গুডএনাফ দ্বীপের সোয়ালো টেল প্রজাপতিদের আশ্চর্য লীলাভূমিতে পা রেখেছেন।অনেক সময়ের ব্যবধানে ২০১৫ সালে বিজ্ঞানী টেনেন্ট ও মিশেল নতুন করে এই হারিয়ে যাওয়া বর্ণিল ডানাওয়ালা পতঙ্গের খোঁজে নামলেন। কাজটা এলাম দেখলাম ক্যামেরার শাটার টিপে ক্লিক শব্দ তুলে ছবি তুললাম এমনটা যে নয় তা বিলক্ষণ জানতেন এই দুই বিজ্ঞানী। অগ্রজ বিজ্ঞানীদের অভিজ্ঞতার কথা মাথায় রেখেই তাঁরা এই দুরূহ অভিযানে সামিল হয়েছিলেন। বিজ্ঞানী Jenness তাঁর ডাইরিতে অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছিলেন —
On the mountain slopes the natives told me, were
many villages that no white man had ever visited
…, the centre of the island was believed to be
uninhabited .এমনই এক নির্জন জনবিচ্ছিন্ন দ্বীপ ভূমিতে নিছক হারিয়ে যাওয়া এক পতঙ্গের খোঁজে যাওয়া মোটেই সহজ কাজ ছিলোনা। সেইসব সম্ভাব্য বিপদ বা ঝুঁকির কথা মাথায় রেখেই পাহাড়ের পাকদণ্ডী পথ পাড়ি দিয়ে একেবারে চূড়ায় আরোহণ করা। কেননা পূর্ববর্তী অভিযাত্রী তথা বিজ্ঞানীরা তাঁদের অভিজ্ঞতা সূত্রে জানিয়েছিলেন যে কুয়াশা ঢাকা মিস্টিক পরিবেশই নাকি গুডএনাফ দ্বীপের আবাসিক সোয়ালো টেল প্রজাপতিদের সবথেকে পছন্দের বিচরণক্ষেত্র। সুতরাং যতোই কষ্ট হোক একেবারে শিখর প্রদেশে পৌঁছনো খুব জরুরি ছিল।
পথ সুগম নয়। সেই কারণে লম্বা অভিযানের কথা মাথায় রেখেই দল সাজিয়ে ছিলেন দলনেতা টেনেন্ট সাহেব। স্থানীয় লোকজনের সাহায্য ছাড়া এতো বড়ো একটা অভিযান সফল হওয়া মোটেই সহজ নয়। তাই বিশিষ্ট পর্বতারোহী, পতঙ্গবিদদের সাথে সাথে নেওয়া হয়েছিল স্থানীয় ওয়ামিরাম ও কালাউনা গ্রামের একদল মানুষদের। এঁরা পথ চিনিয়ে নিয়ে যাবে সকলকে। লম্বা অভিযানের পক্ষে এই মানুষেরাই হলেন বিশ্বস্ত গাইড।পাপুয়া নিউগিনির জলবায়ুতে বৃষ্টির দাপট খুব। সারাবছর ধরেই জল ঝরছে মেঘ চাঁদোয়া থেকে। তাই বেশ খানিকটা পথ পাড়ি দিয়ে এসে অভিযাত্রীদের অপেক্ষা করতে হলো টানা কয়েকটি দিন। বর্ষার বৃষ্টিভেজা দিনগুলোতে ডানা মেলে উড়ে বেড়াতে একদমই পছন্দ করে না সোয়ালো টেলরা। তাই অপেক্ষা রৌদ্রস্নাত দিনের জন্য। অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে পাহাড়ের চূড়ায় সূর্যদেব স্বর্ণালী রশ্মির প্রলেপ ছড়িয়ে দেওয়া শুরু করতেই পতপতিয়ে রঙিন বাহারি ডানার ঝাপটে পাহাড়ের শিখর প্রদেশে তুফান তুলে উড়তে শুরু করে সোয়ালো টেল প্রজাপতিরা,গুডএনাফ দ্বীপের সোয়ালোটেল প্রজাপতিরা। সবার প্রথমে ডানা মেলে একটি পুরুষ পতঙ্গ।
পতঙ্গ জগতেও যে পুরুষালি দাপটের দৌরাত্ম্য। তারপর উড়তে থাকে সঙ্গ লোভাতুর স্ত্রী প্রজাপতিরা।ক্যামেরার শাটার পতনের তরঙ্গিত ছন্দে নির্জন পাহাড়তলিতে নতুন সাফল্যের উল্লাস জাগে। হারানিধিকে এতোদিনের ব্যবধানে খুঁজে পাওয়া অভিযাত্রীরা তখন সাফল্যের আনন্দে নিমগ্ন।
গুডএনাফ দ্বীপের এই অভিযান থেকে জানা গেছে অনেক নতুন তথ্য যা আগামী দিনে সোয়ালো টেল প্রজাপতিদের সংরক্ষণ করতে বিজ্ঞানীদের অনেক সাহায্য করবে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২০০০ মিটার উচ্চতায় পৌঁছে এক হারিয়ে যাওয়া পতঙ্গকে খুঁজে পাওয়া খুব সহজ ছিল না। স্থানীয় অধিবাসীরা এ কাজে পাশে না থাকলে হয়তো ব্যর্থ মনোরথ হয়ে অভিযাত্রীদের ফিরে আসতে হতো। এই অভিযানে পুরুষ ও মহিলা এই দুই শ্রেণির প্রজাপতিরই সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা ফলে তাদের প্রজনন বৈশিষ্ট্য সম্পর্কেও বিচিত্র সব তথ্য উঠে এসেছে অনুসন্ধানে। ভবিষ্যতে এই সব তথ্যকে কাজে লাগিয়ে এক হারিয়ে যাওয়া পতঙ্গকে ধরিত্রীর স্থায়ী আবাসিকে পরিণত করা হয়তো সম্ভব হবে।
Following a prolonged period of high tension, the results of West Bengal’s 18th Legislative Assembly election were announced on May 4. We all are aware
আমাদের লক্ষ্য সবার জন্য স্বাস্থ্য আর সবার জন্য চিকিৎসা পরিষেবা। আমাদের আশা, এই লক্ষ্যে ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মী, রোগী ও আপামর মানুষ, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সমস্ত স্টেক হোল্ডারদের আলোচনা ও কর্মকাণ্ডের একটি মঞ্চ হয়ে উঠবে ডক্টরস ডায়ালগ।
সব প্রজাপতিই বিপন্ন। প্রজাপতির খাবার কমছে, পোষক উদ্ভিদ গুলি আগাছা ভেবে কেটে ফেলা হচ্ছে। সঙ্গে আছে কীটনাশক।