তিনি মুখ্যমন্ত্রী। আনছেন রাজ্যে গুণ্ডা দমন আইন, চাইছেন বিনা বিচারে এক বছর জেল বন্দি রাখতে। এরপর যদি রাষ্ট্রসংঘের সনদের কথা তুলে বলা হয়, অপরাধী যে তারও বিচার পাওয়ার অধিকার আছে, যদি সংবিধানের ধারা তুলে বলা হয়, বিনা বিচারে গ্রেপ্তার কি মানবাধিকার হরণ নয়? তাহলে গুণ্ডা দমন আইন কি সংবিধান সম্মত ? গুণ্ডা দমন আইনে শুধু এলাকায় গুণ্ডাদের গুণ্ডাগিরির কথা বলা হয় নি, বলা হয়েছে, সাধারণ মানুষের কারুর আচরণে কাজে কথায় যদি কোথাও অশান্তি সৃষ্টি হয় বা হতে পারে বলে প্রশাসনের আশঙ্কা হয় তাহলে প্রয়োগ হবে গুণ্ডা আইন। তাঁকে পচতে হবে জেলে বিনা বিচারে এক বছর কমপক্ষে। অর্থাৎ স্রেফ আশঙ্কা করে একটা মানুষকে আটকে রাখা, গ্রেপ্তার না করেই, ফলে জামিন পাওয়ার সম্ভাবনাও নেই, এরকম ভয়ঙ্কর আইন এই রাজ্যে প্রথম।কেন?
দুশ্চিন্তার ব্যাপার। এই আইনে বাড়ি বসে নিজের ওয়ালে ফেসবুক পোস্ট করলেও প্রশাসনের মনে হতে পারে, কোনো এলাকায় বা জনগোষ্ঠী আক্রান্ত হতে পারে, এমন অভিযোগ এনে রাজনৈতিকভাবে যাঁরা বিরোধী, তাদের আটক করে রাখা হতে পারে, উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে বন্দি করা হতে পারে লেখক, সাংবাদিক অধ্যাপক শিক্ষক যাঁরা সরকারের বিরুদ্ধে লিখবেন, মানবাধিকার কর্মী ,পরিবেশ কর্মী, সরকারের বিরুদ্ধে তথ্য আইনের আন্দোলন সংগঠিত করা আর টি আই কর্মী, কোনো জন সমাবেশ থেকে সরকারবিরোধী ভাষণ হলে সে তো গুণ্ডা দমনে আটক হতে পারে। এ তো বিরোধী কণ্ঠস্বর চিরতরে বন্ধ করার নিদান!
এরকম আইন ব্রিটিশরা করেছিল দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের দমন করতে। তারপর জরুরি অবস্থার সময় ও স্বৈরাচারী ইন্দিরা গান্ধীর আমলে কুখ্যাত মিশা আইন, পরে TADA , UAPA একের পর এক আইন এই দেশে কেন্দ্রে বিভিন্ন সরকার করেছে।বিরোধী দলের নেতা, সাংবাদিক, লেখক, ছাত্রনেতা গ্রেপ্তার করা হয়েছে জাতীয় নিরাপত্তা আইনে। এখনও চালু UAPA, তারপরেও আরও একটি কঠোরতম দমন আইন,এই গুণ্ডা আইন, কেন দরকার হয়ে পড়ল ?
মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, যে সব আইন আছে তার চাইতেও কড়া আইন দরকার এখন রাজ্যে। কারণ? উন্নয়নে লাগবে? জমি অধিগ্রহণ করতে অনিচ্ছুক কৃষক বাধা দিলে কিংবা তাদের নিয়ে আন্দোলন সংগঠিত করা হলে ? কৃষিক ছাত্র শ্রমিক আন্দোলন করলেই গুণ্ডা? সরকারি প্রকল্পে বাধা দিলেই হাজতবাস? এরপর বিরোধীদের সঙ্গে কি এটাই হবে?
কোমরে দড়ি, ডিম ছুঁড়ে বোধ হয় শুভেন্দু অধিকারী ভেবেছেন , এতদিন প্রেম নিবেদন হচ্ছিল, আর বিরোধী তৃণমূল টুকরো টুকরো করেও রাজ্য শান্তিপূর্ণ রাখা যাবে না? কারণ হকার উচ্ছেদ থেকে স্মার্ট মিটার, সরকারের নির্বিচার জনবিরোধী নীতি ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে মানুষকে রুখে দাঁড়াতে সংগ্রাম করতে নেতৃত্বে এখন বাম দলগুলি। তাদের দমন করতেই কি এই আইন?
রাজ্যে নাকি শৃঙ্খলা বজায় রাখা প্রয়োজন। পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে, সামনে দাঁড় করিয়ে পঞ্চায়েত অফিস থেকে স্কুল সর্বত্র চলছে ডিম ছুঁড়ে , গণ ধোলাই। সরকারের ভার্সান: বহু অত্যাচারে অত্যাচারিত হয়েছে মানুষ । এসব তাই স্বাভাবিক প্রকাশ। এসব জন বিক্ষোভ,যত হবে তত রাজ্যে শৃঙ্খলা ফিরবে। বিরোধী দলের বহু প্রার্থীদের বাড়ি ভাঙচুর করার সময় বিক্ষোভকারীদের পাহারায় থাকছেন পুলিশ। ফলতায় প্রকাশ্যে বিরোধী দলের প্রার্থীকে কান ধরে হাত জোর করিয়ে হাফ প্যান্ট পরিয়ে হাটানো রাজ্যের নতুন সরকারের শৃঙ্খলা ফেরানোর নমুনা। সরকারের বিরুদ্ধে তার স্ত্রী ও অনুগামীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারী ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশের লাঠিচার্জ, তারপর ভিডিও ছবি দেখে দেখে আন্দোলনকারীদের বাড়ি ক্রোক করে নিলামে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী। এসব হল রাজ্যকে শৃঙ্খলায় ফেরানোর জন্য পদক্ষেপ।
তারপর এই গুণ্ডা আইন। কিন্তুগুণ্ডাগিরি কাকে কয়? সেটাও মুখ্যমন্ত্রী ঠিক করে দিয়েছেন। এই আইনে তাই কী হবে,এসব নিয়ে প্রশ্ন বাতুলতা। এস পি যদি মনে করেন কারুর কথায় বা আচরণে অশান্তি হচ্ছে, বা ভবিষ্যতে হতে পারে, তাহলে তিনি সেটাকেই গুণ্ডা গিরি হচ্ছে বলে মনে করবেন। তাঁর মনে হওয়াটাই এই আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে যথেষ্ট! প্রশাসন ,সরকার আর শাসক দল যা মনে করবে সেটাই আইন?! এরই নাম ক্ষমতাতন্ত্র।
বাজেট শেষে সাংবাদিক সম্মেলনে বর্তমানের সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রীকে, তাতেই ক্ষিপ্ত হয়ে শুভেন্দু অধিকারীর প্রশ্ন”: আপনি কোন পেপার? আপনার প্রশ্ন শুনেই বুঝতে পারছি, আমি সব দেখছি …
মুখ্যমন্ত্রী দেখলে কী হয়! বাঘের দেখা ! বিকেলেই সরকার শোকজ করল সেই কাগজকে, তাদের যে জমির উপর দশ তলা বিল্ডিং সেটা ফেরত নিয়ে নেবে সরকার।কারণ লিজের শর্ত ভঙ্গ করা হয়েছে। তিন দিনের মধ্যে সন্তোষজনক উত্তর না পেলে শুরু হবে ব্যবস্থা ।
এই সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক মতপার্থক্য ঘটলে, কোনভাবে সরকারের দোষ চোখে পড়লে একেবারে বোবা হয়ে যাওয়াটাই হবে দস্তুর। এখনই । নইলে রাষ্ট্রবাদী সরকারের চোখে তিনি হবেন দেশদ্রোহী। তাঁর প্রতিবাদী ভূমিকাই জেলে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট।এই দেশে এখন জীবন জীবিকা দুইই অনিশ্চিত আশঙ্কায়।
এরপরও উচ্ছেদ নিয়ে আন্দোলন হলে, উন্নয়নে বাধা দিলে এই রাজ্যে তো শান্তি শৃঙ্খলা রাখতে হবে! তাই গুণ্ডা দমন আইন!!
বাংলায় নতুন সরকারের কর্ণধার বলছেন: আর বরদাস্ত হবে না।
“ল্যান্ড জিহাদ, লাভ জিহাদ, জোর করে ধর্মান্তরকরণের বিরুদ্ধে এই সরকার কঠোর ও কঠিন আইন আনবে। ” বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ১৮৯ তম জন্মদিবস উপলক্ষে আয়োজিত আরএসএস’র সভায় মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে উপস্থিত হয়ে শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন , ” রাজ্যে আসছে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি। আপনাদের সরকার, রাষ্ট্রবাদের সরকার। যে কথা আপনারা (সঙ্ঘ) আমাদের দিয়ে রেখেছেন, পূরণ করার দায়িত্ব আমাদের। আমরা করবো।” মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ফলতায় মানুষের কাছে গিয়ে ক্যামেরার সামনে বলছেন( ভিডিওর সত্যতা যাচাই করে দেখা হয়নি), এখানে যাঁরা হিন্দু আছেন তাঁরা আগামীকালের মধ্যে বাড়ির মাথায় ধ্বজা লাগাবেন। জিহাদিদের থেকে নিজেদের আলাদা করে নিন, আলাদা থাকবেন। রাস্তার দাবিতে মুসলিম মহিলারা আবেদন করলেন, উত্তরে মুখ্যমন্ত্রী বলছেন, আগে ধর্মান্তরিত হন, তারপর হবে।
এটা কি আইনের কথা? সংবিধানের কথা?
প্রশ্ন করাই যেখানে অপরাধ, সেখানে তো দরকার গুণ্ডা দমন আইন!
এই আইন আসলে পশ্চিমবঙ্গে নতুন সরকারের কর্তৃত্ববাদী রাজনৈতিক চরিত্রের প্রকাশ।মুখ্যমন্ত্রী সর্বদা বিধান সভায় হুমকি দিচ্ছেন।এই আইনের ভিত্তি বিচার নয়, সন্দেহ। প্রমাণ নয়, প্রশাসনিক মতামতই নির্ধারণ করবে নাগরিকের অধিকার। এই আইন বলবৎ হলে রাজ্যে গণআন্দোলনের ভবিষ্যত কী? শ্রমিক-কৃষকের সংগ্রাম, ছাত্র-যুবদের প্রতিবাদ কি শেষ পর্যন্ত গুণ্ডা আইনেই দমন হবে? প্রশ্নটা স্বাভাবিক বুঝেই মুখ্যমন্ত্রীকে আশ্বাস দিয়ে বলতে হল: “নিশ্চিন্তে থাকুন, অপ্রপ্রয়োগ করবো না। রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় ব্যবহার হবে না। ভদ্রলোকের বিরুদ্ধে প্রয়োগ হবে না। শুধু গুন্ডাদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা হবে এই আইন। এই আইন যদি না মানতে চান তাহলে ইন্ডিয়া জোট (ইন্ডিয়া মঞ্চ)’র কোনও রাজ্যে গিয়ে থাকুন।”
মুখ্যমন্ত্রীর শেষ বাক্যটা মনে রাখার মতো: মানতে না চাইলে অন্য রাজ্যে গিয়ে থাকুন! এভাবে কোনো সরকারের সমালোচক বা বিরোধীকে বলা যায় নাকি? রাজ্যে গণতন্ত্র চলছে নাকি কায়েম হল ফ্যাসিস্ট শাসন ?










