পরদিন ভোরবেলা অন্ধকার থাকতেই ওরা বেরিয়ে পড়ল। গ্রাম ছেড়ে, বোরাম পাহাড়কে বাঁয়ে রেখে পাহাড়ি ঢালে চলতে হবে উত্তর পুবে। গ্রাম পেরিয়ে জঙ্গলে ঢুকল অন্ধকারেই। মংলু আর ছৈনা রাস্তা চেনে, অসুবিধে হল না। যতক্ষণে পুব-আকাশে সূর্য উঠছে, ততক্ষণে ওরা গ্রাম থেকে অনেকটাই দূরে।
প্রথম দিকে পথ সমতল ছিল। আস্তে আস্তে চড়াই হতে শুরু করেছে কখন। সামান্য চড়াই, তবু ছৈনা আস্তে আস্তে পিছিয়ে পড়তে থাকল। মংলুও ওর সঙ্গেই চলে। পান্তু কিছুটা চলে, দাঁড়ায়, চারপাশের ভোরের দৃশ্য দেখে, পাখির ডাক শোনে — ওরা ধরে ফেললে আবার চলে। শীত শেষ হয়ে পাহাড়ের জঙ্গলে বসন্ত এসেছে। গাছে গাছে নতুন পাতার ভীড়। রোদ পড়ে কচি কলাপাতার মতো রঙ ঝকঝক করছে। কোনও কোনও গাছে নতুন পাতা হয়েছে — তার রঙ সবুজ নয়, হলদেটে গোলাপি। কী দারুণ দেখতে! চলতে চলতে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে ছৈনা বলল, “ওই দেখ। সামনে, বাঁ দিকে কী।”
পান্তু ওদিকেই দেখছিল। সামনে বিরাট কালো পাথুরে জমি ঢালু হয়ে নেমে গেছে দূরে একটা নদীর তীর অবধি। বলল, “ঝিরনি নদী না?”
মংলু বলল, “হ্যাঁ। আর ওই নদীর তীরের পাথরগুলো — সেখানেই আমরা পিকনিক করতে এসেছিলাম। চিনতে পারছিস?”
পারছে। পান্তুর ছোটোবেলার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিন। সেইদিনই ওদের স্কুলের হেড মিসের স্বামী আক্কা আঙ্কেল ওদের গুহাগুলো দেখিয়ে এখানকার ঠগীর গল্প বলেছিল,। ওরা জেনেছিল, ঝিরনি নদীর নামটা মিষ্টি হলেও তার অর্থ খুব মিষ্টি না। ঠগীদের দলপতিরা একটা সাংকেতিক কথা বলে খুন করার নির্দেশ দিত। তাকে বলত ঝিরনি দেওয়া। ওই নদীর পাশে ঝিরনি দিয়ে খুন করত বলে নদীর নামই ঝিরনি নদী হয়ে গেছে।
বিকেলে ওরা গভীর জঙ্গলের মধ্যে একটা ছোটো ঝরনার ধারে থামল। ওদের সঙ্গের জল শেষ। পান্তু ক্যাম্পিঙে অভিজ্ঞ। জঙ্গলে জল খুঁজে বের করতে জানে। কিন্তু মংলু আর ছৈনা আছে বলে ওকে খুঁজতে হল না। ছৈনা জিজ্ঞেস করল, “ঝরনার জল খাবি? সঙ্গে কিছু আছে, যা দিয়ে শোধন করা যাবে?”
পান্তু একটা ছোট্ট যন্ত্র বের করে বলল, “এই দেখ। এটা জলকে আল্ট্রা-ভায়োলেট শোধন করে দেয়।” যন্ত্রের দাঁড়াটা জলে ডুবিয়ে কিছুক্ষণ ধরে রেখে বলল, “নে। খেয়ে দেখ।”
তাঁবু খাটিয়ে ওরা অন্ধকার হবার আগেই খেয়ে নিল। পান্তু বলল, “সঙ্গে আলো আছে, কিন্তু সূর্য ডোবা-মাত্র ঘুমিয়ে পড়ব। তাহলে ব্যাটারিও বাঁচবে, আর ভোরে উঠে রওয়ানা দিতে পারব।”
ছৈনা আর পান্তু শোবার জোগাড় করতে লাগল, মংলু চারিদিকে ঘুরে এল — পাছে মাঙ্কা বা ওর দলবল ওদের পিছু নিয়ে থাকে। পান্তু ভাবল, আসলেও কি আর ওরা বোকার মতো জানান দেবে? তবু মংলু আর ছৈনাকে নিশ্চিন্ত ও আর চিন্তা করল না। ক্লান্তিতে সকলেরই ঘুম এল তাড়াতাড়ি।
ভোরে-উঠে-রওয়ানা মানেই ভোরে-উঠে-রওয়ানা নয় — সেটা ক্যাম্পিঙে অনভিজ্ঞ মংলু আর ছৈনা বুঝল পরদিন। টেন্ট খুলতে হবে, ভাঁজ করে গুটিয়ে ব্যাকপ্যাকে প্যাক করতে হবে, তা ছাড়া খেতেও হবে। পান্তু বলল, “একেবারে খেয়ে নিলে আবার খাবার জন্য থামতে হবে না। সময় বাঁচবে। তাহলে কপাল ভালো থাকলে একেবারে যেখানে যেতে চাই সেখানে গিয়েই দুপুরের খাবার খেতে পারব।”
কপাল সত্যিই ভালো। ওরা যেখানে পৌঁছেছে, সেখান থেকে পাহাড়টা অল্প ঢালু হয়ে নামতেই থাকল। ফলে চলতে অসুবিধে হল না। খাদের ধারে যখন পৌঁছল, তখনও সূর্য মাঝ-আকাশে আসেনি। সুবিধেমতো জায়গায় মালপত্র নামিয়ে রেখে ওরা খাদের ধার ধরে হেঁটে গেল। খাদটা অর্ধগোলাকৃতি। কিছুটা যাবার পরে খাদের পাশের দেওয়ালটা দেখা যায়। পান্তু শুয়ে পড়ে খাদের একেবারে ধারে চলে গেল। বাইনোকুলার দিয়ে মন দিয়ে অনেকক্ষণ ধরে দেওয়ালটা দেখল। তারপরে উঠে দাঁড়িয়ে বাইনোকুলারটা ছৈনার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “দেখ — সিঁড়িগুলো রয়েছে। ধরার কিছু নেই অবশ্য, তাই তরতর করে নামা যাবে না। দড়ি রাখতে হবে। র্যাপলিং করে…”
কিন্তু ছৈনা তো মন দিচ্ছে না। তাকিয়ে আছে দূরের দিকে। “অ্যাই ছৈনা?”
“হ্যাঁ?”
“কী দেখছিস আকাশে?”
“ওই দূরের পাহাড়টা দেখতে পাচ্ছিস? ওই যে, ওটা?”
পাহাড় না দেখতে পাওয়া সহজ না। পান্তু দেখতে পাচ্ছে। বলল, “কী আছে ওতে?”
ছৈনা বলল, “ওই পাহাড়ের নিচেই আমাদের গ্রামটা। এখান থেকে দেখা যায় না। কিন্তু পাহাড়ের ওপরের ঢালে হঠাৎ একটা আলো ঝলকালো।”
পান্তু বলল, “তাতে কী হয়েছে?”
ছৈনা বলল, “কিছু না। কিন্তু পাহাড়ের গায়ে কী থাকতে পারে যা থেকে সূর্যের আলো চমকাতে পারে?”
পান্তু ঠাট্টা করে বলল, “একেবারে সিনেমার মতো। দূরের পাহাড় থেকে হিরোকে বাইনোকুলার দিয়ে দেখছে ভিলেন…”
চমকে উঠে ছৈনা বলল, “ঠিক বলেছিস! তা-ই হবে। তার মানে ওখান থেকে মাঙ্কা আমাদের ওপর নজর রাখছে?”
পান্তু হেসে ফেলল। বলল, “তোর মাথা রাখছে। হঠাৎ মাঙ্কা আমাদের ওপর নজর রাখতে যাবে কেন? তাছাড়া তুই তো ওকে বলেছিস আমরা ও-ও-ই দিকে যাচ্ছি। এদিকে হঠাৎ দেখতে যাবে কেন?”
ছৈনাও হাসল। বলল, “ওকে আমি মোটেই বিশ্বাস করি না, তাই। যাকগে, যাক… তুই কী বলছিলি?”
পান্তু ওদের খাদের দেওয়ালের সিঁড়িগুলো দেখাল। বলল, “ওই পথেই যেতে হবে। দেখ। দড়ি লাগবে। প্রথম দিকের সিঁড়িগুলো বেশ দূরে দূরে — যদি মানুষের তৈরি হয়, তাহলে ইচ্ছে করেই এমনভাবে করা — যাতে হঠাৎ কেউ এলেও সহজে নেমে যেতে পারবে না।”
প্রথম থেকেই ঠিক ছিল, মংলু পাহাড় বেয়ে নামবে না। ওর রক ক্লাইম্বিং-এ অভ্যেসও নেই, আর মাথায় চোট লাগার পরে আত্মবিশ্বাসও নেই। ও থাকবে ওপরে, টেন্টে। নিচে যাবে কেবল ছৈনা আর পান্তু।
“কী করে নামব?” জানতে চাইল ছৈনা।
“আমরা প্রথম থেকেই দড়ি ব্যবহার করব। চল, গিয়ে দেখি কোথায় দড়ি বাঁধা যাবে…”
*
পরদিন সকালে খাদের ধারের একটা বিরাট পাথরে দড়ি বেঁধে পান্তু আস্তে আস্তে দড়ি ভর করে নেমে গেল গুহার মুখ অবধি। একটা বড়ো গুহার ভেতরে ঢুকে প্রথমেই টর্চ জ্বেলে চারিদিক দেখে নিল — কোনও প্রাণী-টানি আছে কি? এত খাড়া পাহাড়ের দেওয়ালে বাঘ-ভালুক উঠে আসতে পারবে না — তবু, বলা তো যায় না, যদি অন্য পথ থাকে? সাপ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। শীত চলে গেছে, সাপ এখন আর ঘুমিয়ে নেই, তবু…
সাপ-টাপ নেই। আগের দিন সন্ধেবেলা পান্তু খেয়াল করেছিল গুহা থেকে বাদুড় বা চামচিকে বেরোচ্ছে না — এখনও টর্চের আলো গুহার উঁচু ছাদে ফেলে দেখে নিল — না, তারাও নেই। এরকম গুহায় কেন বাদুড় বা চামচিকে নেই? কে জানে। তবে সে রহস্য সমাধান করতে পান্তু আসেনি। ওকে টেনে এনেছে অন্য রহস্য। পকেট থেকে মোবাইল বের করল। সিগনাল নেই। সেটাই স্বাভাবিক। গুহার মুখে অবশ্য আছে। উজানগড়ের সিগনাল তাহলে এতদূরেও আসে। ছৈনাকে ফোন করে বলল, একে একে ব্যাকপ্যাক দুটো নামিয়ে দিতে। গুহার ভেতরে ব্যাকপ্যাক গুছিয়ে রেখে আবার ফোন করল।
“পারবি নামতে, না আমি যাব?”
“পারব।”
দেখতে দেখতে ছৈনা নেমে এল। তাঁবুতে রইল মংলু। প্রথমেই ব্যাকপ্যাক থেকে লম্বা নাইলনের দড়ির আর একটা কুণ্ডলী বের করল পান্তু। গুহামুখের পাথরের সঙ্গে এক দিক বেঁধে, দড়ি ছাড়তে ছাড়তে দু-জনে ভেতরে ঢুকল। ভেতরে যদি অনেক গুহা মিলে সত্যিই ভুলভুলাইয়া হয়, তাহলে এই দড়ি ধরেই ফিরে আসবে আবার।
গুহাটা মস্তো, তাই সুড়ঙ্গটাও বড়ো, অনেকটা উঁচুও। আস্তে আস্তে দিনের আলো কমে এল। টর্চ ছাড়া আলো নেই। অজস্র গুহাপথ। ডাইনে বাঁয়ে অনেক সুড়ঙ্গ — কোনওটা হয়ত বাইরে যাবার রাস্তা, কোনওটা আরও ভেতরে ঢোকার। কোনওটা সরু, হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকতে হবে, কোনওটা বড়ো, কিন্তু ওরা যেটায় আছে, তার মতো বড়ো একটাও নয়। পান্তু প্রত্যেকটার মুখে নিচে, ডানদিকে চক দিয়ে ১, ২, ৩… লিখতে থাকল — ছৈনা বলল, “নম্বর দিচ্ছিস কেন?” গুহার ভেতরে গলাটা গমগম করে উঠল, চমকে উঠল দুজনে।
পান্তু ফিসফিস করে বলল, “এই গুহায় কিছু না পেলে অন্যগুলোতেও যেতে হবে এক এক করে। তাই নম্বর দিয়ে রাখছি।”
ঘুটঘুটে অন্ধকার। ওদের হাতের টর্চ ছাড়া আর কোনও আলো নেই। হঠাৎ পান্তুর উত্তেজিত ফিশফিশ শুনল ছৈনা। “ছৈনা, দেওয়ালে দেখ।”
পান্তুর টর্চের আলো পড়েছে গুহার দেওয়ালে — ওদের মাথার উচ্চতায় একটা আংটা। কাছে গিয়ে ভালো করে দেখে পান্তু বলল, “লোহার। একেবারে বাজে কথা নয়, এখানে মানুষের উপস্থিতি ছিল! ছৈনা, ঠিক পথেই এসেছি।”
দু-দিকের দেওয়ালেই কিছু দূরে দূরে আংটা। কোনওটাতে লাঠির মতো কিছু লাগানোও আছে।
“মশাল?” জানতে চাইল ছৈনা।
পান্তু ঘাড় হেলিয়ে খেয়াল করল এই অন্ধকারে দেখা যাবে না। বলল, “হ্যাঁ। তা-ই মনে হচ্ছে। হয়ত এখনও জ্বালালে জ্বলবে।”
ছৈনা বলল, “জ্বালিয়ে দেখব?”
পান্তু বলল, “দরকার কী? মশালের আলো আমাদের লাগবে না — উপরন্তু অত পুরোনো মশাল জ্বালাতে গেলে যদি কোনও সমস্যা হয়?”
প্রায় মিনিট পাঁচেক চলেছে ওরা। ছৈনা সামনে টর্চের আলো ফেলে বলল, “সামনে যেন একটা বড়ো জায়গা?”
বড়ো জায়গাই বটে। গুহাটা একটা প্রায় গোলাকৃতি জায়গায় এসে পৌঁছেছে। এখানে ছাদটাও আরও অনেকটা উঁচু। চারিদিকের দেওয়ালে অজস্র আরও গুহামুখ। ছৈনা বলল, “বাবা! এত পথ? এখানে আস্তানা করা ভালোই — অনেক পালানোর রাস্তা, বল?”
পান্তু বলল, “পালানোর পথ পরে দেখবি। এখন এটা দেখ…”
চমকে ছৈনা দেখে সামনে একটা মূর্তি। পাথর কেটে বানানো, খুব শৈল্পিক হয়ত নয়, কিন্তু বোঝা যায় নারীমূর্তি, একাধিক হাত, আর…
“কালীমূর্তি নয়।” বলল ছৈনা।
পাশ থেকে পান্তু বলল, “না। ভবানী। অষ্টভূজা। এখন আর শাড়ি-টাড়ি কিছু বাকি নেই। পচে পচে পড়ে গিয়েছে নিচে।” টর্চের আলো দিয়ে নিচে পড়ে থাকা পচে কালো হয়ে যাওয়া কাপড়ের টুকরোগুলো দেখাল পান্তু।
ছৈনা নিজের টর্চের আলো ফেলে ভালো করে মূর্তিটা দেখল। বলল, “ঠিক বলেছিস। ভবানী। সিংহবাহিনী। বাঘ নয়। দেখ, কেশরের মতো দেখাচ্ছে না?”
পান্তুও দেখল। বলল, “হ্যাঁ। আর মা সিংহের ওপর আসনিপিঁড়ি হয়ে বসে রয়েছেন। ছত্রপতি শিবাজী এই ভবানীর পুজো করতেন।”
“বলি হত না?” এদিক ওদিক তাকিয়ে জানতে চাইল ছৈনা। “হাড়িকাঠ নেই।”
পান্তু একটু আনন্দের নাচ নেচে নিল, তারপরে বলল, “আক্কা আঙ্কেলের ঠগীর গল্পটা যদি ঠিক হয়, তাহলে বলি-টলি হত না। ঠগীরা বাংলার ডাকাত নয় — বলি দিয়ে পুজো করত না। ওদের নিবেদন ছিল অন্য কিছু…” বলে চারিদিকে — মাটিতে, দেওয়ালে — টর্চের আলো ফেলতে ফেলতে পান্তু বলল, “দাঁড়া, ছবি নিই…”
ক্যামেরা বের করে মূর্তির ছবি নিল পান্তু। তারপরে বলল, “খুব সাবধানে আলো ফেলে ফেলে চলতে হবে রে। মাটিতে অনেক কিছু রয়েছে হয়ত।”
পান্তুর টর্চের আলো পড়েছে একটু দূরেই মাটিতে একটা কালচে কিছুর ওপর… “ওটা কী?” জিজ্ঞেস করল ছৈনা।
“কে জানে… বড়ো কার্পেট, কাপড়… সতরঞ্চি… ছিল কোনও দিন… মনে হচ্ছে ওখানে থেকে থেকেই পচেছে। স্যাম্পেল নিয়ে দেখা যাবে কত পুরোনো — কী ছিল…”
আস্তে আস্তে, পায়ে পায়ে দুজনে এগিয়ে গেল। পান্তু বলল, “যা ভাবছি, তা যদি হয়, তাহলে এখানে আর একটা জিনিস থাকা উচিত…” বলে সাবধানে আরও এগিয়ে গেল। টর্চ দিয়ে দেখতে দেখতে একটা জায়গায় আলো ফেলে বলল, “এই দেখ… ঠিক ধরেছি… সাবধানে আয়।”
ছৈনা এগিয়ে গিয়ে কী দেখছে বুঝতে পারল না… বলল, “কী ওটা?”
পান্তু বলল, “এখানে গুহার মেঝেতে একটা গর্ত না? ধুলো ময়লায়, বা অন্য কিছুতে ভর্তি…”
ছৈনা খুব নিশ্চিত হতে পারল না। বলল, “ওটা গর্ত? কিছু দিয়ে খুঁচিয়ে দেখ।”
আঁতকে উঠে পান্তু বলল, “না, না। দাঁড়া। খুব সাবধানে করতে হবে, কাছে আসিস না।” তারপরে গুহার ধারে সরে গিয়ে ব্যাকপ্যাক নামিয়ে বের করল একরাশ সরঞ্জাম। ছৈনাও ইতিহাসের ছাত্র, কিন্তু একজন ঐতিহাসিককে এমন কিছু ব্যবহার করতে কখনও দেখেনি। পান্তু ওর হাতে একটা মার্কার কলম দিয়ে বলল, “তুই লিখবি…” তারপরে গ্লাভস পরল, সিল করা প্যাকেট থেকে একটা সন্না বের করে সাবধানে সেটা দিয়ে মাটির সেই জায়গাতে খুঁচিয়ে একটু মাটি, ধুলো — যা-ই বেরোল, একটা জিপ-লক দেওয়া প্লাস্টিক ব্যাগে ভরে, ভালো করে মুখ বন্ধ করে ছৈনার হাতে দিয়ে বলল, “লেখ… ফ্রম হোল ইন গ্রাউন্ড, টু সেন্টিমিটার ডাউন।” ছৈনা এরকম দেখেছে কেবল বিদেশী ছবিতে — খুনের তদন্তে পুলিশের কাজ। বলল, “এগুলো নিয়ে কী করবি?”
পান্তু বলল, “অ্যানালিসিস। তাহলেই কত পুরোনো, আর কী আছে, সব বোঝা যাবে।”
“কে করবে অ্যানালিসিস? তুই?”
“দূর বাবা! আমি কী করে করব? ল্যাবরেটরিতে পাঠাব। লিন্ডেন সাহেব খুব ইন্টারেস্টেড। ও-দেশে বসেই ঠগী নিয়ে রিসার্চ করছে কত বছর। ওকে আক্কা আঙ্কেলের গল্প বলেছিলাম। কী উত্তেজিত! বলেছিল, শ্রুতি, দিস ইজ আন-হার্ড অফ। কোনও দিন শোনা যায়নি ঠগীদের আস্তানার কথা… এখন এগুলো পাঠালে আনন্দে পাগল হয়ে যাবে।”
আরও কিছুটা খুঁড়ল পান্তু, আরও খানিকটা ধুলো-মাটি নিয়ে ব্যাগে ভরে লেখা হল ‘মাটির গর্তের পাঁচ সেন্টিমিটার নিচ থেকে’… কিছুটা খোঁড়ে, কিছুটা ব্যাগে ভরে, আর লেখা হয়, সাত সেন্টিমিটার… দশ সেন্টিমিটার… পনেরো সেন্টিমিটার… ইত্যাদি। গর্তটা শেষ পর্যন্ত প্রায় আঠেরো সেন্টিমিটার গভীর। সবচেয়ে বেশি চওড়া মুখটা প্রায় দশ সেন্টিমিটার। বোঝা-ই যায়, গুহার পাথুরে মেঝেতে ছেনি, বা সেরকম কিছু দিয়ে মেরে গর্ত করা হয়েছে।
“গাঁইতি হতে পারে…” বলল পান্তু। দেখি, এখানে পাই কি না…”
“তাহলে তুই ধরেই নিয়েছিস এটা ঠগীদের আস্তানা ছিল?”
পান্তু থেমে বলল, “ওই গর্তটা — ওরকম গর্ত করত ঠগীরা। ওরা বলি দিত না। বেরোনোর আগে সবাই মিলে বসে গুড় উৎসর্গ করত ভবানীকে। তারপরে সবাই গর্তে আঙুল ডুবিয়ে গুড় খেত। ওকে বলত…”
“টুপুনির গুড়…” বলে দিল ছৈনা।
“বাঃ, জানিস তো!” অবাক হয়ে বলল পান্তু।
“তোর পাল্লায় পড়ে…” মানল ছৈনা। “ছিলাম ইন্টার্ন্যাশনাল হিস্ট্রির টিচার — বলশেভিক রেভোলিউশন পড়াই ক্লাসে — আর তোর পাল্লায় পড়ে এখন ঠগী শিখছি…”
“বেশ করছিস। তাহলে বলি-টলি হত না, তাই হাড়িকাঠ নেই। এবারে দেখ, গাঁইতি বা কোদাল পাস কি না।”
“কবর দেবার জন্য মাটি খোঁড়ার যন্ত্র?”
“হ্যাঁ।” বলে পান্তু বলল, “ওই দেখ, দেবীর পায়ের কাছে আরও কী কী আছে। চল…”
ছৈনা বলল, “তুই যা, আমি পেছনে পেছনে যাব। এই ঘুটঘুটে অন্ধকারে নিজের টর্চের আলো ছাড়া যেখানে আলো নেই, সেখানে আমি এখানে ওখানে যাব না। তুই আগে ছবি তুলে নে সব, স্যাম্পেল কালেক্ট করে নে…”
পান্তু বলল, “আমরা কী বোকা রে! ব্যাগ ভর্তি নানা রকম আলো নিয়ে এসেছি কেন?”
দুজনে উত্তেজিত হয়ে ব্যাগ থেকে আলোগুলো বের করে গুহার মধ্যে নানা জায়গায় জ্বালিয়ে রাখল। তাতে অবশ্য অন্ধকার খুব বেশি দূর হল না। পান্তু বলল, “সিনেমার আলো লাগবে। রাতকে দিন করার।”
তবু, এখন আর ঘুটঘুটে অন্ধকার নেই। ছৈনা বলল, “এখানে ওখানে যাবার আগে, এক একটা জায়গার ছবি আর স্যাম্পেল নে।” যেটাকে পান্তু সতরঞ্চি বলেছিল, সেটার ছবি তোলা হলো, স্যাম্পেল নেওয়া হলো, তারপরে দুজনে দেবীমূর্তির কাছে গিয়ে দেখল, তার পেছনে একটা ছোটো-মতো বড়োমুখ কলসি, আর এক সারি গাঁইতি আর কোদাল। খাটো হাতল, প্রায় এক ফুট লম্বা, আর ব্লেডগুলো লোহার — এখন মরচে পড়েছে। উত্তেজিত হয়ে পান্তু বলল, “দেখ, দেখ… এগুলোই ঠগীদের। ওদের পূজ্য যন্ত্র ছিল। সাহেবরা ধরে নিয়েছিল একরকমই পিক-অ্যাক্স। কিন্তু ওরা দুরকমই ব্যবহার করত। স্লীম্যান বেশ কয়েকটা নাম রেকর্ড করেছিল, তার মধ্যে কোদালও ছিল। তবে পরে যারা লিখেছে তারা বেশিরভাগই পিক-অ্যাক্স নামটাই লিখেছে।”
ছৈনা বলল, “কী করে জানলি ঠগীদেরই এগুলো?”
পান্তু বলল, “ঠগীরা কী করে এগুলো পুজো করত জানা আছে। মন্ত্র বলত, জল, দই আর গুড় মেশানো জল দিয়ে ধুত, তারপরে সাতবার সিঁদুর লাগাত। দেখ… সবকটার গায়ে সিঁদুরের দাগ। ঠগী ছাড়া আর কে এরকম গুহায় সিঁদুর লাগানো গাঁইতি রেখে যাবে?”
এবার পান্তু ফিরল কলসিটার দিকে। বলল, “আর এটা কী?”
ছৈনা বলল, “এত বড়ো মুখ… এ তো জল রাখার কলসি নয়?”
পান্তু ভেতরে আলো ফেলে বলল, “কিছু একটা ছিল। শুকিয়ে, পচে কালো হয়ে গেছে।”
ছৈনাও উঁকি দিল। বলল, “গুড় হতে পারে?”
পান্তু হাসল। বলল, “দু-চার মাসের পুরোনো গুড় দেখতে কেমন হয় জানি। এ যদি গুড় হয়ও, প্রায় দুশো বছরের পুরোনো। সে কেমন দেখতে কেউ জানে?”
টর্চটা নামিয়ে রেখে তার আলোতেই স্যাম্পেলের গায়ে লিখছিল ছৈনা, এবারে টর্চটা আবার তুলে হাতে নেওয়া মাত্র চমকে বলল, “পান্তু, ওগুলো কী?”
ছৈনার দৃষ্টি অনুসরণ করে পান্তুও তাকাল। দেবীমূর্তির পেছনে একটা গুহামুখের ভেতরে ছৈনার টর্চের আলো পড়েছে — পান্তুও নিজের টর্চের আলো ফেলল। যতটা দেখা যাচ্ছে, গুহার ভেতরে সারি সারি ওই একই রকম ছোটো ছোটো জালা বা কলসি।
“অতগুলো জালায় নিশ্চয়ই গুড় রাখত না?”
ভেতরের গুহায় ঢুকল ওরা। আবার গাঢ় অন্ধকার। পান্তু বলল, “সাবধান। সাপ-টাপ থাকতে পারে। ভালো করে দেখে নিয়ে তবেই হাত দিবি।”
ছৈনা বলল, “আমি কিছুতেই হাত দেব না। তুই দিবি। আমি গ্লাভস পরে নেই।”
পান্তু বলল, “তাহলে পরে নে…” কিন্তু ছৈনা কিছু বলল না। গ্লাভস পরলোও না।
জালাগুলো প্রায় সবই খালি। পান্তু একটা একটা করে সবকটাই দেখতে দেখতে এগোচ্ছিল। হঠাৎ বলল, “এটাতে কিছু আছে। এবং সেটা পয়সাকড়ি জাতীয় কিছুই হবে।”
উত্তেজনায় তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে ছৈনা উঁকি দিতে গিয়ে দুজনের মাথা ঠুকে গেল। “উঃ,” “আঃ,” “বাপরে,” “আরে, সামলে…” শেষ করে আবার সাবধানে উঁকি দিল দুজনেই। জালাটা অর্ধেকেরও কম ভর্তি, কিন্তু ভেতরে যে আদ্যিকালের টাকাকড়ি, তা এতদিনের নোংরা, কালিমাখা চাকতিগুলো দেখেই বোঝা যায়।
“কয়েক রকম আছে মনে হচ্ছে,” ছৈনা বলল। “ওগুলো কি সোনার? মোহর?”
পান্তু বলল, “দাঁড়া, কয়েকটা বের করি…” বলে বিভিন্ন ধরণের কয়েকটা চাকতি বের করল। হলদেটেগুলো সোনার মনে হয়, কিন্তু বাকিগুলো কালচে হয়ে গেছে। কিছু বোঝা যায় না।
পান্তু বলল, “কয়েকটা সিল করি, আর কয়েকটা নিয়ে বাইরে যাই। দিনের আলোয় দেখব ওগুলো কী।”
ছৈনা এবারে হাতে গ্লাভস পরে টর্চ হাতে অতি উৎসাহে বাকি জালাগুলো খুঁজতে লেগেছে। একটু পরে গুহার ভেতর থেকে ডেকে বলল, “ওখানে হলে এদিকে আয়… আরও আছে।”
পান্তু বলল, “দাঁড়া। তুই তো কাজ ছেড়ে পালিয়ে গেলি। আমি লেবেলগুলো লিখে আসছি।”
ছৈনা উত্তর দিল না।
পান্তু সিল করা টাকাকড়িগুলো ব্যাগবন্দী করে এসে বলল, “কী?”
“এই দেখ…” ছৈনার হাতে একটা বড়ো তরোয়াল। বলল, “তরোয়ালের চেয়ে হাতলটা দেখার মতো…”
সত্যিই দেখার মতো। “ওটা কী হীরে?” জিজ্ঞেস করল পান্তু।
ছৈনা বলল, “পরীক্ষা করতে হবে। এটা হীরে, ওটা চুনী, এটা পান্না… আর মাঝের বড়ো হলদেটা কী?”
পান্তু জানে না। ছৈনা বলল, “এই জালাটায় বেশ কিছু আরও পাথর রয়েছে মনে হয়। সবই বোধহয় দামী।”
বেশ কিছু পাথর — গুনে দেখা গেল একুশটা। আর আরও চারটে রত্নখচিত ছোরা, বা ছোটো তরোয়াল।
ছৈনা বলল, “পাথরগুলো সব নিয়ে নে। এখানে ফেলে রাখা ঠিক হবে না।”
পান্তু মাথা নাড়ল। “এগুলো এখানে রয়েছে দুশো বছর ধরে। এতদিন যখন কিছু হয়নি, আর ক-দিনে কিছু হবে না। বরং নিয়ে গেলে যদি জানাজানি হয়, তাহলেই চোর-ডাকাত এসে হাজির হবে।”
ছৈনার মতে জানাজানি হবেই। আর তাহলে যতদিনে এখানে ওরা ফিরে আসবে তার আগে যদি কেউ এসে চুরি করে নিয়ে যাই? “আমরাই নিয়ে যাই, ছবি তুলে, ইনভেন্টরি করে — ইউনিভার্সিটিতে প্রফেসর চিদানন্দর জিম্মা করে, সবাই মিলে সেদিনই ব্যাঙ্কে ভল্ট খুলে সেখানে রাখব। তাহলে চুরি-চামারির সম্ভাবনা কম।”
দুজনে খানিকক্ষণ তর্কাতর্কি করল, তারপরে পান্তুর কথাই রইল। পাথরগুলো জালা থেকে বের করে ছবি তুলল প্রমাণ হিসেবে। তারপরে আবার ওখানেই রেখে দিল।
“সবকটা?” জিজ্ঞেস করল ছৈনা। “অন্তত জাচাই করার জন্য দু-চারটে নিয়ে চল।”
“বলছিস?” টিসু পেপারে মুড়ে তিনটে পাথর নিল পান্তু। ব্যাকপ্যাকে সিল করা ব্যাগ ঢুকিয়ে বলল, “চল, বাইরে যাই। কয়েনগুলো দেখি ভালো করে।”
বাইরে জ্বলে থাকা আলোগুলো সঙ্গে নিয়ে ওরা বেরিয়ে এল গুহামুখে। সূর্য এখনও মাঝ-আকাশে পৌঁছয়নি, তবু গুহামুখ উজ্জ্বল। ভেতরের গাঢ় অন্ধকারের পরে চোখে লাগে। পান্তু যে কয়েনগুলো এখন দেখার জন্য এনেছিল, সেগুলো ব্যাগ থেকে বের করে একটা একটা করে পরিষ্কার করতে শুরু করল।
“প্রথমে হলদেগুলো করি, কেমন? এগুলো মনে হচ্ছে সোনার, বা সোনা মেশানো।”
একটা বোতল থেকে পরিষ্কার রুমালে কী একটা ঢেলে নিয়ে ভালো করে কয়েন দুটো মুছল পান্তু। কিছুক্ষণ দুটোকে ভালো করে দেখে বাড়িয়ে দিল ছৈনার দিকে। ছৈনা বলল, “এগুলো সোনার মোহর?”
পান্তু মাথা নেড়ে বলল, “একটা মোহর। আমার অত জ্ঞান নেই, তবে দেখে মনে হচ্ছে মোগলদের সময়কার মোহর। অন্যটা সম্ভবত প্যাগোডা।”
অবাক ছৈনা বলল, “প্যাগোডা তো বাড়ি!”
পান্তু হেসে বলল, “বাড়ি-ও বটে, সোনার কয়েনও বটে। দক্ষিণ ভারতে ব্যবহার হত। বিভিন্ন রাজ্যের রাজাদের কারেনসি ছিল প্যাগোডা। এমনকি নানা ইউরোপিয় ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানিও প্যাগোডা বানাত — যেমন ইংরেজরা, ওলন্দাজরা…” বলতে বলতে পান্তু উত্তেজনায় সোজা হয়ে বসল। হাতে ধরা ছোটো ছোটো কয়েনগুলোর একটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “এটা কী জানিস? এটা ফানাম। এটা পৃথিবীর সবচেয়ে ছোটো কয়েন। এটাও দক্ষিণ ভারতীয়। আর এগুলো… এগুলো দেখ — পরিষ্কার বোঝা যায় মোগলাই। আর… এটার নাম কপার ক্যাশ…”
পয়সাটা হাতে দিয়ে বলল, “দেখ। পরিষ্কার পড়া যাচ্ছে। ইংরেজিতে লেখা আছে। আর সালটা…”
“আঠেরোশ’ আট,” বলল ছৈনা।
“তুই যা-ই বল, আমার আর সন্দেহ নেই। এটা ঠগীদের আড্ডা ছিল…”
(আগামী রবিবার শেষ।)











