ক্যান্সার আর দুরারোগ্য নয়। আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি ক্যান্সারকে সম্পূর্ণ সারিয়ে তুলতে সক্ষম। তবে ক্যান্সারের চিকিৎসা আর পাঁচটা রোগের চাইতে আলাদা। সাধারণত মানুষের মনে ধারণা রোগ মুক্তির উপায় দুটি অপারেশন অথবা ওষুধ। কিন্তু ক্যান্সার চিকিৎসার সাফল্য কিন্তু অপারেশন বা ওষুধের হাত ধরে আসেনি। বড় বড় অপারেশন যাতে ক্যান্সারের সাথে শরীরের অনেকটা অংশ কেটে বাদ দেওয়া হয়েছে সেই সব বড় বড় অপারেশন করেও কিন্তু পুরো সুস্থ করা যায়নি। কেবল মাত্র কয়েকটি খুব আর্লি স্টেজ ক্যান্সার ছাড়া, ক্যান্সার আবার ফেরত এসেছে। ওষুধ বা কেমোথেরাপিতে ব্লাড ক্যান্সারে সাফল্য এসেছে কিন্তু বাকি সলিড টিউমার মানে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের ক্যান্সার কিন্তু শুধু ওষুধ মানে কেমোথেরাপি বা ইমুনোথেরাপি বা টার্গেটেড থেরাপি দিয়ে সম্পূর্ণ সারানো সম্ভব হয়নি। তাহলে সাফল্য এলো কিভাবে? সাফল্য এসেছে রেডিয়েশন চিকিৎসার আবিষ্কারের ফলে। রেডিয়েশন হল উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন ইলেক্ট্রম্যাগনেটিক ওয়েভ বা রে যা ক্যান্সার কোষের মূল উপাদান বা ডি এন এ-কে বিনষ্ট করে দিতে পারে কাঁটা ছেঁড়া ছাড়াই। যে সকল অঙ্গে অপারেশন অসম্ভব বা অপারেশনার পরেও আণুবীক্ষণিক কোষ যেগুলো ক্যান্সারের আসে পাশে রয়ে যায় সেসব ক্ষেত্রে রেডিয়েশন তাদের ধ্বংস করে রোগ নির্মুল করতে সক্ষম। রেডিয়েশন চিকিৎসায় ব্যাবহৃত মেশিন একসময় ছিল খুবই বেসিক মানে তা দিয়ে স্বাভাবিক শরীরের কোষ বাঁচিয়ে ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করা ছিল কঠিন। প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে রেডিয়েশন চিকিৎসায় এলো বিপ্লব। কম্পিউটারের সাহায্যে আধুনিক ইমেজিং মানে সিটি স্ক্যান, এম আর আই, পেট সিটি স্ক্যান-এর সাহায্যে একদম টার্গেটেড ভাবে শুধু ক্যান্সার কোষকে বিনষ্ট করা সম্ভব হল, নর্মাল আশেপাশের কোষগুলো গেল বেঁচে। ফলে কমে গেল সাইড এফেক্ট, আরো বেশি ডোজে রেডিয়েশন দেওয়া সম্ভব হলো। ফলে সুস্থতার হার গেল বেড়ে।
এমনকি ব্রেনের মধ্যে যেখানে অপারেশন করা অসম্ভব অথবা ফুসফুস, লিভার, এসব যায়গায় যেখানে অপারেশনের রিস্ক মাত্রাছাড়া এবং সুস্থতার সম্ভাবনা কম সেখানেও রেডিয়েশন চিকিৎসা দিয়ে সম্পূর্ণ সুস্থ করা সম্ভব হলো।
রেডিয়েশন চিকিৎসার এই অভুতপুর্ব উন্নতির ফলে বর্তমানে ক্যান্সার চিকিৎসার লক্ষ্য হলো অপারেশনের মাত্রা কম করে রেডিয়েশনের সাহায্যে চিকিৎসা করে অপারেশনের রিস্ক ও সাইড এফেক্ট কমানো ও অঙ্গহানি রোধ করা। যেমন ব্রেস্ট ক্যান্সারের ক্ষেত্রে আর ব্রেস্ট কেটে বাদ দিতে হয় না কেবল ক্যান্সারটা বাদ দিয়ে রেডিয়েশন দিলে ব্রেস্ট রেখে ক্যান্সার মুক্তি সম্ভব। তেমনি প্রস্টেট, খাদ্যনালী, মলাশয়, পায়ু এসব জায়গার ক্যান্সারে অপারেশন না করে অঙ্গহানি না করে ক্যান্সার সারিয়ে তোলা সম্ভব রেডিয়েশনের সাহায্যে। স্বরযন্ত্র বা ল্যারিন্স-এর ক্যান্সারে আগে স্বরযন্ত্র কেটে বাদ দিতে হত ফলে রোগী চিরকালের মতো বাকশক্তি হারাতেন আর এখন রেডিয়েশন চিকিৎসা করে গলার স্বর বিকৃত না করে ক্যান্সার সারিয়ে সুস্থ করে দেওয়া যাচ্ছে। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলি আমার সঙ্গীত শিক্ষক এবং মঞ্চে গান করা সঙ্গীত শিল্পী, স্বরযন্ত্র-এর ক্যান্সার রোগী আছের যারা রেডিয়েশন চিকিৎসা করে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে আবার মঞ্চে ও সঙ্গীত শিক্ষায় ফিরে গেছেন।
অত্যাধুনিক স্টিরিও ট্যাকটিক রেডিওসার্জারির মাধ্যমে অত্যন্ত কঠিন ব্রেন টিউমার রেডিয়েশন দিয়ে সুস্থ করা যাচ্ছে। স্টিরিও ট্যাকটিক বডি রেডিওথেরাপি পদ্ধতিতে ফুসফুস, লিভার, কিডনি, প্রস্টেট প্রভৃতি বহু ক্যান্সার সুস্থ করা যাচ্ছে। আর শেষে বলি এই রেডিয়েশন চিকিৎসা কিন্তু সম্পূর্ণ ব্যথাহীন। রেডিয়েশন দেওয়ার সময় বিন্দুমাত্র ব্যথা অনুভুত হয় না। পরবর্তী সময়ের সাইড এফেক্ট ও অত্যাধুনিক রেডিয়েশন টেকনোলজির সাহায্যে অনেকাংশে কময়ে আনা সম্ভব হয়েছে।
তাই ক্যান্সার চিকিৎসায় রেডিয়েশন এক জাদুরশ্মি যা বিগত ১০০ বছর ধরে ক্যান্সার রোগী সুস্থ করে আসছেআর যার শক্তি বহুগুণ বেড়ে গেছে বিগত দুই দশকের প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতি সাথে সাথে।










