অধ্যায় ১
কেন আজ থ্যালাসেমিয়া সহ বিভিন্ন প্রতিবন্ধীরা বিপদে’র মুখে, সমস্যা কোথায়?-
সাম্প্রতিক সময়ে (২৫/৯ /২৫) উলুবেড়িয়া শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় গভঃ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে থ্যালাসেমিয়া সহ বিভিন্ন প্রতিবন্ধীদে’র জন্য যে প্রতিবন্ধী শংসাপত্র শিবির হয়েছিলো, সেখানে দেখা গেছে যে, প্রত্যেকেরই প্রতিবন্ধকতার পরিমাপ একটা নির্দিষ্ট মাত্রা’য় দেওয়া হয়েছে (সর্বনিম্ন ৪০% থেকে সর্বোচ্চ ৪৮%),অথবা কম হয়েছে। এমনকি অনেকের পুরানো গভঃ স্বীকৃত শংসাপত্র বাতিল হয়ে ঐ পরিমাপে নেমে এসেছে। এছাড়াও পর্যাপ্ত মেডিক্যাল বোর্ড ছিলো না, ছিলো না চেক আপ, ছিলো না কোনো মেডিক্যাল তথ্যে’র মুল্যায়ন। প্রতিবন্ধীদে’র পরিবারে’র তরফে দাবি করা হয়েছে যে, আগে থেকেই পার্সেন্টেজ লেখা ছিলো, শুধু নাম ডেকেছে আর খাতা দেখে পার্সেন্টেজ বসানো হয়েছে। বিষয়টি’র মধ্যে প্রথম থেকেই সংশয় ছিলো বলে, ২৬/৯ /২৫ তারিখে এক থ্যালাসেমিয়া আক্রান্তে’র ‘মা’ পূর্ণাঙ্গ লিখিত অভিযোগ জানান উক্ত হাসপাতালের MSVP কে এবং সমগ্র বিষয়টি রিভিউ করার আবেদন জানান। এখানে যেটা জানা যায়, ঐ বছরে’র জানুয়ারি মাসে একই ক্যাটাগরির প্রতিবন্ধীদে’র শংসাপত্র শিবির থেকে উচ্চ মাত্রায় প্রতিবন্ধকতা’র পরিমাপ দেওয়া হয়েছিলো।
এরপর উলুবেড়িয়া মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের MSVP র সাথে দেখা করা হয়। পরবর্তীতে MSVP’ র পক্ষ (১৫/১০/২৫) থেকে একটি লিখিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয় যে, ‘২০২৪ সালে’র ভারত সরকার কর্তৃক প্রকাশিত প্রতিবন্ধী সংক্রান্ত একটি পুনঃমুল্যায়ন সুচক গেজেট প্রকাশিত হয়েছে, সেই গেজেটকে সামনে রেখে ১৮/৩/২৫ তারিখে পশ্চিমবঙ্গ স্বাস্থ্য দপ্তরে’র HCP সেলের একটি ভিডিও কনফারেন্সে’ র সুত্র ধরে ২৫/৯ /২৫ এর শিবিরে প্রতিবন্ধকতার পরিমাপ দেওয়া হয়েছে, যেখানে এই পরিমাপ কমেছে। আমরা একটি ভিডিও কনফারেন্সে’র মাধ্যমে কি এই ধরনের কাজ করা যায়, নাকি নির্দিষ্ট সরকারি অর্ডারের ভিত্তিতে করা উচিত প্রশ্ন তুলে আবারো লিখিত ভাবে জানাই এবং দেখা করি। কিন্তু সেই একই উত্তর থাকে। আমরা আরো বলি যে, ২০২৪ সালে’র এপ্রিল মাসে প্রকাশিত গেজেট কেন ২০২৫ এর সেপ্টেম্বর মাসে প্রয়োগ করা হলো? কেন তা জানুয়ারিতে প্রয়োগ করা হলো না? নিরুত্তর থাকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং স্বাস্থ্য ভবন। এই সময় আমরা পশ্চিমবঙ্গ স্বাস্থ্য দপ্তরের ২০২২ সালের একটি অর্ডার পাই, যেখানে নির্দিষ্ট করে প্রতিবন্ধকতার পরিমাপ কিসের ভিত্তিতে দেওয়া হবে তার উল্লেখ আছে। তখন আমরা ২০২২ সালে’র অর্ডার কে কেন প্রয়োগ করা হলো না বা তাকে বাতিল কেন করা হলো তার উত্তর চাওয়াতেও এরা নিরুত্তর থাকে। এরপর নভেম্বর মাস ২০২৫ এর শুরুর দিকে ৬/৫/২৫ তারিখে’র পশ্চিমবঙ্গ স্বাস্থ্য দপ্তরে’র প্রতিবন্ধী সংক্রান্ত একটি অর্ডার পাই। তখন আমরা প্রশ্ন করি, ১৫/১০/২৫ তারিখে’র MSVP’ র দেওয়া ব্যাখ্যায় কেন ৬/৫/২৫ এর অর্ডারের উল্লেখ নেই? এবং আরো প্রশ্ন তুলি যে, ২১/৪/২০২৫ তারিখে স্বাস্থ্য দপ্তর, ২০২৪ সালে’র প্রকাশিত গেজেট কে সামনে রেখে একটি মেনটরিং এক্সপার্ট টিম তেরি করে, যার কাজ হলো বাকি বিশেষজ্ঞদের এই সম্পর্কে বোঝানো ইত্যাদি। তাহলে ১৮/৩/২৫ তারিখে স্বাস্থ্য দপ্তরের কোন মেনটরিং টীম ভিডিও কনফারেন্স করলো?
এবং কিসের ভিত্তিতে সেটাকেই অর্ডার বলে চালিয়ে দেওয়া হলো?
এইসব প্রশ্নের কোনও উত্তর দিতে পারেন নি MSVP। এরপর ৬/১২/২৫ তারিখে MSVP আরো একটা লিখিত ব্যাখ্যা দিয়ে জানান যে, ‘৬/৫/২৫ তারিখে’র অর্ডার তিনি ২৫/৯ /২৫ তারিখে’র শিবিরে’র সময় কোনো ভাবেই হাতে পান নি, এবং উক্ত শিবিরে তা প্রয়োগ করার সম্ভব ছিলো না’। তাহলে আমাদের তরফে পরিষ্কার ভাবে প্রশ্ন রাখা হয় যে, যেখানে ৪মাস ১৯ দিন পরেও অর্ডার/সার্কুলার তিনি হাতে পান নি, তাহলে কোন অর্ডার সার্কুলারে’র ভিত্তিতে উক্ত শিবিরে নতুন প্রতিবন্ধকতার পরিমাপ নির্ধারণ করা হলো? এবং কোন অর্ডারের ভিত্তিতে পুরানো শংসাপত্র বাতিল করা হলো? এটা আমরা স্বাস্থ্য দপ্তরের Joint DME কে রাখি.. সেই একই ভাবে নিরুত্তর থাকে আর আমাদের ওপর চাপ দিতে থাকে।আমরা আইনি নোটিশ দিয়েও জানাই। এরমধ্যে MSVP ২৫/৯ /২৫ এর শিবিরের শংসাপত্রের চূড়ান্ত প্রক্রিয়াকরন শুরু করে দেয় কারোর সাথে আলোচনা না করেই।গত ৩০/১২/২৫ এর গণ ডেপুটেশনের দিন আমরা টাইম লাইন নিয়ে আমরা প্রশ্ন রেখেছিলাম, এবং একটাই দাবি ছিলো যে, ২৫/৯ /২৫ তারিখে’র অনৈতিক প্রতিবন্ধী শংসাপত্র শিবির বাতিল করে সঠিক তথ্যের মুল্যায়নে’র ভিত্তিতে স্বচ্ছ ভাবে প্রতিবন্ধী শিবির করতে হবে। MSVP সমস্ত ঔদ্ধত্যের সীমা ছাড়িয়ে বলেন “আপনারা অর্ডার নিয়ে আসুন স্বাস্থ্য ভবন থেকে। আপনারা যতো চেল্লান আমার কিছু যায় আসে না”। আমরা আলোচনা বয়কট করি। কড়া ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানানো হয়। MSVP কে বলা হয় “আপনি দুর্নীতিবাজ সন্দীপ ঘোষে’র থেকেও বাজে মানুষ!”এদের তরফে বিভিন্ন প্রতিবন্ধীদের পরিবারবর্গে’র কাছে মিথ্যা কথা বলা হয়েছে যে,” প্রতিবদ্ধকতার”পরিমাপ যখন কম, তখন এরা সবাই সুস্থ আছে”! ভাবা যায়, একজন অসুস্থ কে নম্বর দিয়ে সুস্থ করে তোলার চক্রান্ত!!। কিন্তু ২৫/৯ /২৫ এর শিবিরে’র সময় অনেকেরই হাই আয়রন ছিলো, অনেকেরই Splenectomy অপারেশন হয়েছে, আবার অনেকেরই HCV ছিলো (হাই ভাইরাল লোড ২ লক্ষের ওপরে), তাহলে কি এদের সুস্থ বলা যাবে? কেন এই তথ্যগুলোর মুল্যায়ন করা হলো না?
এটা ঠিক যে, কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলো আজ সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা থেকে হাত তুলে দিয়েছে, এবং তার ফলশ্রুতিতেই ২০২৪ এ অনৈতিক গেজেট প্রকাশ করেছে। কিন্তু প্রথম থেকেই আমাদের প্রশ্ন ছিলো , ১)রাজ্য স্বাস্থ্য দপ্তর কেন এর বিরোধিতা করলো না ?২)রাজ্য স্বাস্থ্য দপ্তর কেন এতো মাস পরে অর্ডার বের করলো?
৩) যেখানে রাজ্য স্বাস্থ্য দপ্তর জানতো যে, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মানবিক প্রকল্পের আওতায় থাকতে গেলে নুন্যতম ৫০% প্রতিবন্ধকতার পরিমাপ লাগে। এছাড়াও অন্যান্য সুযোগ – সুবিধার ক্ষেত্রেও একটি নির্দিষ্ট পরিমাপ লাগে। এতো কম পরিমাপে তা হয় না। সেটা জেনেও কেন কোনো ব্যাবস্থা নিলো না?
আমরা প্রথম থেকেই আমাদের অভিযোগে’র অভিমুখ রাজ্য ও কেন্দ্রে’র এই জনবিরোধী নীতির বিরুদ্ধেই ছিলো এবং এখনও আছে। কারন এইসব প্রতিবন্ধীদে’র (সমগ্র রাজ্যে) ভাতা সহ অন্যান্য সরকারি সুযোগ সুবিধা বন্ধ হতে বসেছে। কেন্দ্র ও রাজ্য উভয় মিলিত ভাবে কিছু জন কে দেবে আর বাকিদের বঞ্চিত করে সুদে – আসলে উসুল করবে। কিন্তু উলুবেড়িয়া মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে’র MSVP কোনো অর্ডার ছাড়াই বা সঠিক তথ্যের মুল্যায়ন না করেই কেন প্রতিবন্ধকতার পরিমাপ দিতে গেলো? বহুবার ভুক্তভোগীরা নিজেরাই অভিযোগ করার পরেও তাতে আমল না দিয়েই চূড়ান্ত প্রক্রিয়াকরন শুরু করলো? এখানে উল্লেখ্য যে – একজন সিভিয়ার হিমোফিলিয়া আক্রান্তের ‘ মা’, তার সন্তানের জন্য প্রতিবন্ধকতা’র পরিমাপ কমিয়ে পাঠানো UDID কার্ডটি অনৈতিক দাবি করে বাতিল করার জন্য MSVP কে গত ৩০/১২/২৫ তারিখে চিঠি পাঠিয়েছেন।আসলে একেই বলে স্বেচ্ছাচারিতা!
এমনকি MSVP কারোর সাথে উক্ত শিবিরটির আগে কোনো আলোচনা করে নি। যেখানে অনেক প্রতিবন্ধীরা জানেই না যে “প্রতিবন্ধী শংসাপত্র” আসলে কি!।
আর স্বাস্থ্য দপ্তরও জানে যে, এরকম কোনো ব্যাক্তিকে দিয়েই শুরু করে দেখে নিতে হবে যে, জল কতদুর গড়ায়!।
আশ্চর্যজনক ভাবে উলুবেড়িয়া মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে’র MSVP’র এইসব অনৈতিক কাজের মদতপুষ্ঠ হলেন হাসপাতালের বর্তমান হেডক্লার্ক। কিন্তু হেড ক্লার্কের সেই পদগত ক্ষমতা – অধিকার কিছুই নেই। অথচ যিনি অতিরিক্ত সুপার যার অধিকার আছে তাকে ক্ষমতার অপব্যবহার করে হাসপাতালে কার্যত একটি শো-পিস করে রেখে দেওয়া হয়েছে।
এর দ্বারা আমরা বোঝাতে পারলাম যে কেন আজ সমস্ত প্রতিবন্ধীরা সংকটের মুখে ও সমস্যাটা কোথায়।
আমাদের আন্দোলন চলবে। এই স্বেচ্ছাচারিতার অবসান আমরা চাই যেকোনো মুল্যে।
এই আহ্বান রাজ্যের অন্যান্য হাসপাতালের মধ্যে থাকা সাধারণ মানুষদে’র কাছেও রইলো।










