এই মুহূর্তে তুমুল লড়াই চলছে মধ্যপ্রাচ্যের মাটিতে। পৃথিবীর সব আলো শুষে নিয়ে আন্ধার নামিয়ে আনতে তৎপরতা চালাচ্ছে যুযুধান উভয়পক্ষ। একালের যুদ্ধের কায়দা কানুন বিলকুল বদলে গেছে। নিজের দেশের মাটিতে বসেই অনেক দূরবর্তী শত্রুর ঘরে মারণাস্ত্রের আঘাত হানা সম্ভব হচ্ছে হাই টেক প্রযুক্তির সাহায্যে। পদাতিক সেনাদের সরিয়ে দিয়ে জায়গা করে নিয়েছে উড়ন্ত দ্রোনের বহর।
যুদ্ধ মানেই হলো বিবেক বুদ্ধি আড়ালে রেখে হিংস্রতার অনর্থক আস্ফালন। অবশ্য আমাদের মহাকাব্য দুটির মূল প্রতিপাদ্যই যে যুদ্ধ তা ভুলি কি করে? মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ আজ ত্রয়োদশ দিনে পড়লো। তৈল ক্ষেত্রগুলোর ওপর যথেচ্ছ মিসাইল হানার পর এখন আক্রমণের শিকার হচ্ছে এই অঞ্চলের জল লবণ বিমুক্তিকরণের পরিকাঠামোর ওপর। কি নিদারুন আগ্রাসন! ইরানের তৈল ক্ষেত্রগুলোর ওপর বোমাবাজির পর এখন ইরানের ডিস্যালিনেশন প্লান্ট গুলোকে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু করে তুলেছে ইজরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ বাহিনী।ইরানী বাহিনীর গোলার আঘাতে বাহেরিনের বৃহত্তম BAPCO তৈল শোধনাগারটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সাথেসাথে বাহেরিনের ডিস্যালিনেশন প্লান্টের ওপরেও নেমে এসেছে বোমার আঘাত। মরুভূমির দেশে খনিজ তেল যতটা সুলভ,জল ঠিক ততটাই দুর্লভ। সমুদ্রের জলকে লবণমুক্ত করে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জলের প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা করা হয়।এই প্রক্রিয়া স্বাভাবিক ভাবেই বেশ ব্যয়সাপেক্ষ। বিকল্প উৎসের অভাব থাকায় লবণাক্ত সমুদ্র জলের লবণবিমুক্তিকরণই হলো জলের ঘাটতি পূরণের একমাত্র উপায়। সেক্ষেত্রে বোমা বর্ষণের ফলে এই পরিকাঠামোর বিনাশ অন্যতর বিপদের ইঙ্গিত দিচ্ছে। অনেকেই মনে করছেন যে দক্ষিণ ইরানের কোয়েশম জল শোধনাগারের ওপর মার্কিন আক্রমণের পাল্টা হামলা করতেই এই আক্রমণ। ইরান অবশ্য বলেছে যে এরফলে প্রায় তিরিশটি গ্রামে জলসরবরাহ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়েছে। দেশের অত্যাবশ্যকীয় পরিষেবা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করার এই প্রচেষ্টা অত্যন্ত গর্হিত এবং নিন্দনীয়। যদিও মার্কিন সেনা কর্তৃপক্ষ ইরানের এই দাবি অস্বীকার করেছে। অন্যায় যুদ্ধে এমনটাই স্বাভাবিক।
একেবারে গোড়ার দিকে ইরানের পারমাণবিক শক্তি উৎপাদন ক্ষেত্র এবং সামরিক বাহিনীর ঘাঁটিগুলোতেই আক্রমণ চলছিল। পরবর্তী সময়ে লক্ষ্যবস্তু বদলে দুপক্ষই পরিকাঠামোর ওপর হামলাকে জোরদার করছে। মার্কিন সেনাবাহিনীর ঘাঁটি ধ্বংসের নামে ইরান দুবাইয়ের জেবেল আলি বন্দরের লাগোয়া পৃথিবীর সর্ববৃহৎ জল শোধনাগারের ওপর আক্রমণ শানিয়েছে। ইউনাইটেড আরব এমিরেটসের ফুজাইরা শক্তি উৎপাদন কেন্দ্র সংলগ্ন জল শোধনাগার এবং কুয়েতের পশ্চিম দোহা ডিস্যালিনেশন প্লান্টের ওপরেও হামলা করেছে ইরান।প্রশ্ন হলো কেন এই ধ্বংসাত্মক কাজে মেতে উঠেছে যুদ্ধবাজ রাষ্ট্রগুলো? পরিশোধিত জলের উৎসগুলোকে এভাবে নষ্ট করে ফেলছে কেন? এটা সর্বজনবিদিত সত্য যে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে জলের জোগান অত্যন্ত পরিমিত কিন্তু চাহিদা দ্রুত গতিতে বেড়ে চলেছে । চাহিদা ও জোগানের মধ্যে সমতা রক্ষা করতে এই অঞ্চলের দেশগুলোতে বহু লবণ বিমুক্তিকরণ প্লান্ট স্থাপন করা হয়েছে। কীভাবে কাজ করে এই প্লান্টগুলো? এখানে সমুদ্রের জলকে প্রথমে ফুটিয়ে বাষ্পে পরিণত করা হয় জলের সঙ্গে মিশে থাকা অশুদ্ধ পদার্থগুলোকে পৃথক করার জন্য। পরবর্তী কালে বাষ্পকে ঘনীভূত করে জলে পরিণত করা হয়। এই জল নাগরিকদের ব্যবহারের জন্য সরবরাহ করা হয়।
এই পদ্ধতির পাশাপাশি আরও একটি উপায়ে জলকে শোধন করে ব্যবহার্য করা হয়। বিশেষ ধরনের ছাঁকনি দিয়ে জলের মধ্যে দ্রবীভূত লবণকে আলাদা করা হয়। ছাঁকনির ফাঁক দিয়ে জল গলে বেরিয়ে গেলেও লবণকণা আটকে যায়। উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে রিভার্স অসমোসিস পদ্ধতিতে জল শোধন করা হয় জলের ঘাটতি পূরণের জন্য। এছাড়া কোনো বিকল্প নেই এখানে। ২০২০ সালে আল্ জাজিরার রিপোর্ট সূত্রে জানা গেছে যে এই অঞ্চলের দেশগুলোতে জলের চাহিদা মেটানোর জন্য ভৌম জল এবং পরিশোধিত জলের ওপরই নির্ভর করে থাকার কোনো বিকল্প নেই।আরব সাগরের তীরবর্তী এলাকায় প্রায় ৪০০ ডিস্যালিনেশন প্লান্ট স্থাপন করা হয়েছে এই উদ্দেশ্যে। পৃথিবীর মোট লবণ বিমুক্তিকরণ প্রযুক্তির ৬০% এই অঞ্চলে ব্যবহার করা হয় এবং বিশ্বের ৪০% লবণ বিমুক্ত সমুদ্রজল এখানেই উৎপাদন করা সম্ভব হয়।পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখা গেছে যে ইউনাইটেড আরব এমিরেটসের পানীয় জলের ৪২% পাওয়া যায় এই বিশেষ পরিশোধনের মাধ্যমে। অন্যদিকে কুয়েতের জলের চাহিদার ৯০% , ওমানের মোট চাহিদার ৮৬% এবং সৌদি আরবের জলের চাহিদার ৭০% এভাবেই মেটানো হয়।
সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে এই অঞ্চলের দেশগুলোতে জলের জোগান দিতে এই ডিস্যালিনেশন প্লান্টগুলোর অপরিহার্যতা অনস্বীকার্য। ফলে যে কোনো ধরনের উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে যুদ্ধে লিপ্ত দেশগুলোর সামরিক হানার লক্ষ্য করা হচ্ছে এগুলোকে।
বিশিষ্ট পরিবেশবিদ ও বিশেষজ্ঞ নাসের আলসায়েদ আল্ জাজিরার সাংবাদিককে জানান এই এলাকার মানুষের জীবনের সঙ্গে জল শোধনাগারের সম্পর্ক নিবিড় । এগুলোর ওপর আক্রমণ করা হলে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনে তার গভীর প্রভাব পড়বে। উন্নয়নের ধারা ব্যাহত হবে। যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্যই হলো জনজীবনকে ব্যতিব্যস্ত, বিভ্রান্ত করা। ফলে এগুলো হলো সফট্ টার্গেট।
দ্বিতীয়ত, এই অঞ্চলের দেশগুলোর মানুষ এই পরিশোধিত জলের ওপরই নির্ভর করে থাকে। বাহেরিন,কাতার, কুয়েতের মতো দেশের মানুষের কাছে এই পরিশোধিত জলের কোনো বিকল্প নেই। ফলে এই ডিস্যালিনেশন প্লান্ট গুলোকে বিধ্বস্ত করা হলে তা যুদ্ধ জয়ের পথকে প্রশস্ত করবে বলে মনে করেন তিনি।শিক্ষাবিদ আব্দুল্লা বাবুদ অবশ্য মনে করেন যে এই কেন্দ্রগুলোতে আক্রমণ করার মূল কারণ হলো যে যুদ্ধের তীব্রতা অনেক বেড়ে গিয়েছে। উভয়পক্ষই মরীয়া হয়ে উঠেছে। বাহেরিনের জল শোধনাগারের ওপর আক্রমণ শানানোর অর্থ হলো এক নীতির অবমাননা করা যা সংঘর্ষ বেড়ে গেছে বলে মনে করা হয়। জল সরবরাহ ব্যবস্থা একটি দেশের আভ্যন্তরীণ পরিকাঠামোর এক অপরিহার্য অংশ। তাকে নষ্ট করে ফেললে সাধারণ মানুষের জীবন গভীর সংকটময় হয়ে উঠবে।এই ধরনের আক্রমণ নাগরিক সমাজকে বিপন্ন করার জন্যই করা হচ্ছে।
যুদ্ধ কখনোই কোনো নিয়মের তোয়াক্কা করে না। উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর মানুষ জলের জন্য এই কেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল । ফলে একটু একটু করে গড়ে তোলা এই ব্যবস্থায় কোনো রকম বিপর্যয় গোটা ব্যবস্থাপনাকেই বিশৃঙ্খল করে দেবে। এই অঞ্চলের মানুষের জীবনে নেমে আসবে গভীর সংকট, তাঁদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। এই অঞ্চলের অপেক্ষাকৃত বড়ো দেশগুলোর পক্ষে যে ধরনের জল সরবরাহের পরিকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে, তুলনায় ছোট দেশগুলোর পক্ষে তেমনটা গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। ফলে এই আক্রমণ এলাকায় নতুন অসমতার জন্ম দেবে। মনে রাখতে হবে যে জল কেবলমাত্র একটি পানীয় নয়,জল হলো প্রাণের স্পন্দনরেখা। জলের অভাবে অর্থনীতির গতি রুদ্ধ হবে, ভেঙে পড়বে কৃষি ও শিল্প উৎপাদন ব্যবস্থা। এক গভীর অনিশ্চয়তায় ভরে উঠবে এই অঞ্চলের দেশগুলো
এই লেখাটা শেষ করার মুহূর্ত পর্যন্ত যুদ্ধের সমাপ্তি ঘোষণার কোনো ইঙ্গিত নেই। যুদ্ধ দীর্ঘদিন ধরে চলার অর্থ হলো গোটা দুনিয়া জুড়েই এক অস্থিরতার বাতাবরণ তৈরি হওয়া। পৃথিবীর সবচেয়ে প্রয়োজনীয় উপকরণটিই আজ রেষারেষির শিকার। আগামী দিনে পৃথিবীতে জলের টানাটানি আরও বাড়বে। বাড়বে হানাহানিও। আমাদের সভ্যতা ( ? ) আজ আমাদের ব্যঙ্গ করছে। বর্বরতা বিন্দুমাত্র কমেনি। এক ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে আজ জীবনের জয়গান গাইতেও মন সায় দিচ্ছে না। খালি প্রার্থনা করবো – যুদ্ধের সমাপ্তি হোক। এক উজ্জ্বল দিন নেমে আসুক আমাদের সকলের জীবনে।
জল বিণা ক্যামনে বাঁচি ভাই
টলমল ঐ জলের লাইগা
প্রাণ করে আইঢাই।
জল হইলো প্রাণের দোসর
তারে নষ্ট না করিও।
যতন করে রাখো ধরে
আইলে বরষারই প্রহর।
ওগো বরষারই প্রহর।
Sugata Bhattacharjee
7 days ago
ব্যতিক্রমী প্রতিবেদন এর জন্যে ধন্যবাদ দাদা। যুদ্ধের করাল ছায়া থেকে পানীয় জলও বাদ যাচ্ছে না। স্কুল, হাসপাতাল তো আগে থেকেই আক্রান্ত হয়েছে। সত্যিই মহাসংকট এ পড়েছে পৃথিবী।
মিসেস দেবনাথ প্রার্থী হলেন। একমাত্র কন্যাকে হারিয়ে যে অবর্ণনীয় কষ্ট তাঁরা পেয়েছেন তা ভাষায় প্রকাশের অতীত। তাঁদের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা। খটকা দুটো জায়গায়। ওঁরা কিন্তু
স্বাস্থ্য মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত হোক। স্বাস্থ্য পরিষেবা দেওয়ার প্রধান দায়িত্ব রাষ্ট্রের। নাগরিকদের কাছ থেকে নেওয়া করের টাকায় সরকার এই পরিষেবা দেবেন। জি ডি পি
আমাদের লক্ষ্য সবার জন্য স্বাস্থ্য আর সবার জন্য চিকিৎসা পরিষেবা। আমাদের আশা, এই লক্ষ্যে ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মী, রোগী ও আপামর মানুষ, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সমস্ত স্টেক হোল্ডারদের আলোচনা ও কর্মকাণ্ডের একটি মঞ্চ হয়ে উঠবে ডক্টরস ডায়ালগ।
জল জল কর সখা জলে তোমার কে আছে?
মনেতে ভাবিয়ে দেখো জলে সবার প্রাণ আছে।
টুসু গান। পরিবর্তিত।
জল বিণা ক্যামনে বাঁচি ভাই
টলমল ঐ জলের লাইগা
প্রাণ করে আইঢাই।
জল হইলো প্রাণের দোসর
তারে নষ্ট না করিও।
যতন করে রাখো ধরে
আইলে বরষারই প্রহর।
ওগো বরষারই প্রহর।
ব্যতিক্রমী প্রতিবেদন এর জন্যে ধন্যবাদ দাদা। যুদ্ধের করাল ছায়া থেকে পানীয় জলও বাদ যাচ্ছে না। স্কুল, হাসপাতাল তো আগে থেকেই আক্রান্ত হয়েছে। সত্যিই মহাসংকট এ পড়েছে পৃথিবী।
সংকটকালে মানুষের বুদ্ধি নাশ হয়। আর যুদ্ধ হলো মহাসংকটের কাল।
Manuser subho budhhir udoy hok o bibek jagroto hok.
এমন প্রার্থনা ছাড়া অন্য কোনো পথ খোলা নেই। মানুষের মান আর হুঁশ দুইই উধাও।