আপনারা সকলে অবগত আছেন গতকাল আমাদের সহযোদ্ধা ডাঃ অনিকেত মাহাতো সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করে ওয়েস্ট বেঙ্গল জুনিয়র ডক্টরস ফ্রন্ট-এর ‘সভাপতি’ পদ থেকে পদত্যাগ করার কথা ঘোষণা করেন এবং নিজের পদত্যাগপত্রে এর কারণ হিসেবে নির্দিষ্ট কিছু বিষয় উল্লেখ করেন। সেই প্রসঙ্গে এই বিবৃতির অবতারণা।
প্রথমত, ওয়েস্ট বেঙ্গল জুনিয়র ডক্টরস ফ্রন্ট সংগঠনের কোনো ‘পদ’ আন্দোলনের শুরু থেকে কখনো নির্বাচিত হয়নি। ৯ই আগষ্টের নারকীয় ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্টে জুনিয়র ডাক্তারদের আইনিভাবে প্রতিনিধিত্ব করার জন্যে একটি আইনি বডির তাৎক্ষণিক প্রয়োজন হয়ে পড়ে। সেই সময় অত্যন্ত তড়িঘড়ি করে পাঁচজন জুনিয়র ডাক্তারকে নিয়ে একটি ট্রাস্ট গঠন করা হয়। (ডাঃ অনিকেত মাহাতো, ডাঃ দেবাশিস হালদার, ডাঃ কিঞ্জল নন্দ, ডাঃ রাজদীপ শ এবং ডাঃঅর্ণব মুখোপাধ্যায়।)
কিন্তু উল্লেখ্য এই পাঁচজনের নাম কোনোভাবেই কোনো নির্বাচনের মাধ্যমে ঠিক করা হয় নি এবং ঠিক সেই সময় থেকেই জেনারেল বডি মিটিং এ ঠিক হয় যে এই ট্রাস্ট বডি কেবল মাত্র আইনি একটি সত্ত্বা মাত্র, এই পাঁচ জনের আলাদা করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকবে না, সমস্ত সিদ্ধান্ত হবে বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কর্মরত জুনিয়র ডাক্তারদের মতামতের ভিত্তিতে এবং ব্যস্ততা কমলে একটি এক্সিকিউটিভ কমিটি তৈরি করে সেটিকে ট্রাস্ট এর অন্তর্ভুক্ত করা হবে, অথবা আরও গণতান্ত্রিক কোনো বডি ( সোসাইটি/ এসোসিয়েশন ) বানানোর চেষ্টা করা হবে।
এর মাঝে আন্দোলনের তীব্রতা, এবং তার পরবর্তীতে সরকারের প্রতিহিংসামূলক ভাবে জুনিয়র ডাক্তারদের পুলিশি হেনস্থা, বেআইনি পোস্টিং পরিবর্তন এবং তার আইনি লড়াই ইত্যাদি নানা কারণে বিষয়টি বিলম্বিত হতে থাকে। এরই মধ্যে এই ট্রাস্টের যে ফান্ড তার অডিট ও ইনকাম ট্যাক্স দেওয়ার কাজ সুসম্পন্ন হয়। তার পর থেকেই এক্সিকিউটিভ কমিটি বানানোর কাজ ত্বরান্বিত করা হয়।
সেই ভাবনা থেকেই এখনও অবধি যারা সক্রিয় ভাবে ওয়েস্ট বেঙ্গল জুনিয়র ডক্টরস ফ্রন্ট এর বিভিন্ন কর্মসূচির সাথে যুক্ত তাদের মেইল করে তাদের মতামত নেওয়া হয় যে তারা এক্সিকিউটিভ কমিটির সদস্য হতে চান কিনা। এ ছাড়াও যারা এই মুহূর্তে সক্রিয় নন, কিন্ত আন্দোলনের শুরুর সময় ছিলেন, তাদের কেও হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে বার্তা দিয়ে জানানো হয় যে এক্সিকিউটিভ কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে, যারা অন্তর্ভুক্ত হতে চান তারা যেন মেল করেন।
এই পদ্ধতিতে প্রায় ২০ টি মেডিকেল কলেজ ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রতিনিধিদের নিয়ে ৩৮ জনের একটি প্রাথমিক এক্সিকিউটিভ কমিটি তৈরি হয়। যার কাজ মূলত সংগঠনের গঠনতন্ত্র নির্ধারণ, সদস্যপদ দেওয়া ও পরবর্তী এক্সিকিউটিভ কমিটি তৈরি হওয়া পর্যন্ত সংগঠনের ভিতরে গণতান্ত্রিক পরিসর বৃদ্ধির চেষ্টা হিসেবে নিশ্চিত করা হয়।
শেষ তিন মাস ধরে সর্বসম্মতিক্রমে এই এক্সিকিউটিভ কমিটি তৈরির কাজ চলে, (এবং বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য যেই সক্রিয় “ওয়ার্কিং কমিটি” এই এক্সিকিউটিভ কমিটি গঠনের প্রক্রিয়ায় ছিলেন তার দায়িত্বে ও প্রতিটি পদক্ষেপে ডাঃ অনিকেত মাহাতোও ছিলেন) এবং এক্সিকিউটিভ কমিটি তৈরি অবধি কোনো মতানৈক্যের জায়গা তৈরী হয়না। সেই সাংগঠনিক পদগুলির নির্বাচনের ক্ষেত্রে কয়েকজন বিরুদ্ধমত পোষণ করলেও অধিকাংশ সদস্যরা নির্বাচনের পক্ষে থাকায় সেটিই পদ্ধতি হিসেবে নির্ধারিত হয় এবং ইলেকশনের সমর্থনে থাকা অধিকাংশ সদস্যদের মধ্যেও ডা: অনিকেত মাহাতো ছিলেন একজন। কিন্তু যখন অফিস বিয়ারার পদ গুলিতে নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয় তখন হঠাৎ করে একটি মতানৈক্যের জায়গা তৈরি হয়, ডাঃ অনিকেত মাহাতো পরামর্শ দেন ট্রাস্ট ও এই এক্সিকিউটিভ কমিটির নির্দিষ্ট সম্পর্ক আইনি ভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে কোনো ভাবেই নির্বাচন করা উচিত নয়। আর অন্যদিকে বেশির ভাগ কমিটি সদস্যের বক্তব্য ছিল সংগঠনে অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক নির্বাচন হয়ে যাক, তার পর সেই কমিটিকে কী পদ্ধতিতে ট্রাস্ট এর সাথে যুক্ত করা যায় সে বিষয়ে আইনি পদক্ষেপ করা হবে এবং এই সম্বন্ধে ইতিমধ্যে আইনি পরামর্শ ও নেওয়া হয়েছিল। আমাদের সকলের মনে হয়েছিল এই মতানৈক্যটা খুবই সাধারণ একটি বিষয় এবং নিজেদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে এর সমাধান সম্ভব। কিন্তু কেবল একজনের মতানৈক্যের জন্যে নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত রাখা সকলের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার প্রতি অবিচার বলে সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তার কারণ, ওয়েস্ট বেঙ্গল জুনিয়র ডক্টরস ফ্রন্ট কোনো ব্যক্তি নির্ভর সংগঠন নয়, ব্যক্তিস্বার্থ বা ব্যক্তির রাজনৈতিক দখলদারিত্বের স্বার্থের চেয়ে সাংগঠনিক স্বার্থ অনেক উপরে এবং এইটাই আন্দোলনের প্রথম দিন থেকে বজায় রাখার চেষ্টা আমরা সকলে মিলে করেছি।
আপনারা সকলেই জানেন ওয়েস্ট বেঙ্গল জুনিয়র ডক্টরস ফ্রন্ট এর ভিতর বহুবিধ ভিন্নমত প্রথম দিন থেকেই ছিল। কিন্তু শেষত আলোচনার মাধ্যমে সমস্ত ব্যক্তিগত মতামতের উর্ধ্বে সম্মিলিত সাংগঠনিক মতামতেই আমরা সকলে একমত হয়েছি অজস্রবার। তাই এই বিষয়টি অত্যন্ত বেদনার যে আন্দোলনের প্রথম দিন থেকে যে সহযোদ্ধারা একসাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অভয়ার ন্যায়বিচারের জন্যে, স্বাস্থ্য ক্ষেত্রের ব্যাপক দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করল তার অন্যতম অগ্রণী একজন সৈনিক নিছক এই টেকনিকাল মতানৈক্যের ভিত্তিতে ও নিজের পূর্ববর্তী সিদ্ধান্ত/ মতামতসমূহের সম্পূর্ণ বিপরীতে গিয়ে পদত্যাগের মত সিদ্ধান্ত নিলেন ও সংগঠনের ভিতর এই নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে কোনো সমাধানের অবকাশ না রেখে ব্যক্তিগত ভাবে সমাজমাধ্যমে লিখে ও প্রেস কনফারেন্স করে শাসকের প্রথম দিন থেকে যে উদ্দেশ্য ছিল তাকে একভাবে সাধিত করলেন।
ডা: অনিকেত মাহাতোর তরফ থেকে যেই আকস্মিক পদক্ষেপগুলি একের পর এক নেওয়া হয়েছে তা অত্যন্ত অনভিপ্রেত ও ঘটনার গভীরতার সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
কিন্তু ওয়েস্ট বেঙ্গল জুনিয়র ডক্টরস ফ্রন্ট এখনও মনে করে আলোচনার মাধ্যমে এই মতানৈক্যের সুষ্ঠু সমাধান হওয়া সম্ভব ছিল। কিন্তু এটাও মনে রাখা প্রয়োজন যে কোথাও গিয়ে কারুর ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা যদি সামগ্রিক সংগঠনের বা আন্দোলনের স্পিরিট এর উর্দ্ধে বা বিপ্রতীপে অবস্থান করে তাহলে প্রয়োজনে তাকে ছাড়াই সংগঠনকে চলতে বাধ্য হতে হয়।
শাসক গোষ্ঠীর অনেকে ইতিমধ্যে ‘টাকা নয়ছয় করে এখন পালিয়ে যাচ্ছে ডাঃ অনিকেত’ এরকম তীব্র আপত্তিকর একটি গুজব ছড়ানোর চেষ্টা করছেন। আপনাদের জ্ঞাতার্থে জানানো আমাদের অডিট থেকে শুরু করে ট্যাক্স প্রদান সমস্তটাই সুসম্পন্ন হয়েছে এবং সেখানে ডাঃ অনিকেত মাহাতো সহ সমস্ত ট্রাস্ট মেম্বাররা একসাথে দায়িত্ব নিয়ে সেই কাজ সম্পন্ন করেছেন। ফলত এই নিয়ে মিথ্যে প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে খুব লাভ হবে না।
সবশেষে বলার, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অমান্য করে অনিকেতের পোস্টিং যে এখনও দেওয়া হয়নি তার ভিত্তিতে স্বাস্থ্য সচিবের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আদালত অবমাননার মামলা করা হয়েছে এবং সাংগঠনিক ভাবে আমরা এই লড়াইটা কিন্তু চালিয়ে যাব। (কিন্তু একটা কথা বলা প্রয়োজন, এতদিন ধরে তার সমস্ত আইনি লড়াই এর আর্থিক খরচ ওয়েস্ট বেঙ্গল জুনিয়র ডক্টরস ফ্রন্ট বহন করে আসছিল, সেখানে হঠাৎ সংগঠনের ভিতর কোনরকম কথা/ আলোচনা ছাড়াই বন্ড ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানানো ও তার জন্যে সাধারণ মানুষের কাছে অর্থ সাহায্য চাওয়ার বিষয়টি আমাদের বিস্মিত ও আহত করেছে।) ঠিক যেমন বহু জুনিয়র ডাক্তারদের পুলিশি হেনস্থার বিরুদ্ধে আইনি লড়াই আমরা সাংগঠনিক ভাবে চালিয়ে যাব, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভাবে অভয়ার বাবা – মা যে আইনি লড়াই এই মুহূর্তে হাইকোর্টে চালাচ্ছেন ন্যায়বিচারের জন্যে, তার পাশে সর্বতোভাবে যেমন প্রথমদিন থেকে আমরা রয়েছি ন্যায়বিচার পাওয়া অবধি এই লড়াই এ আমরা থাকব। সর্বোপরি স্বাস্থ্যক্ষেত্রে দুর্নীতির বিরুদ্ধে, জুনিয়র ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীদের অধিকারের জন্যে ও জনস্বাস্থ্যের দাবিতে সমস্ত ব্যক্তিস্বার্থ, দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে আমাদের আপোসহীন লড়াই চলতে থাকবে।










