


লাগাতার তুষারপাতের কারণে পর্বতের উঁচু অংশগুলো তখন কেবলই সাদা আর সাদা। এই বরফ এক অর্থে নতুন আশার বাণী বয়ে নিয়ে আসে কাশ্মীরের মানুষের কাছে – একটু উষ্ণতার পরশে বরফ গলে গিয়ে পরিণত হয় প্রাণদায়ী জল ধারায়। পাহাড়ের পাদদেশে থাকা এ্যাকুইফার বা জলাধারগুলো পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে জলে আগামী দিনে যা মানুষের জীবনে সত্যিকারের আনন্দ বয়ে নিয়ে আসে।
অবশ্য কাশ্মীরের অধিবাসীদের ধারণা বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে আবহমণ্ডলের ভারসাম্যে যে পরিমাণ পরিবর্তন ঘটেছে তাতে করে বলা যায় যে তুষারপাতের পরিমাণ ক্রমশই কমছে। কাশ্মীর এখন তুষার খরা বা Snow drought এর শিকার যার অর্থ হলো আগের তুলনায় কাশ্মীরে তুষারপাতের মাত্রা কমে যাওয়ায় রাজ্যের অর্থনীতি ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, খেসারত দিতে হয়েছে আম আদমিকে। সেচের জলের পাশাপাশি পানীয় জলের জোগানে টান পড়েছে ব্যাপকভাবে।
গতবছরেই কাশ্মীর উপত্যকা ছিল বরফ শূন্য। পশ্চিমী ঝঞ্ঝা খুব সক্রিয় না থাকায় গতবছর চিল্লা- ই- কালানের দেখা মেলেনি সেভাবে। প্রায় ৭৯% ঘাটতি ছিল বৃষ্টি ও বরফের জোগানে। মাঝেমাঝেই এমন অনিয়মিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে যা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে কাশ্মীরের অধিবাসীদের কাছে। আমাদের এখানে ঠিক সময়ে বর্ষা না হলে যেভাবে চতুর্দিকে হাহাকার ওঠে কাশ্মীরের হালও অনেকটাই তেমন হয় ঠিক সময়ে তুষারপাতের পসরা সাজিয়ে চিল্লা-ই-কালান না এলে। আশার খবর হলো এই যে এ বছর ঠিক সময়েই তিনি হাজির হয়েছেন কাশ্মীরভূমে। উপত্যকা সহ উঁচু পাহাড়ী এলাকাতেও নেমেছে বৃষ্টি আর মেঘলা আকাশ থেকে শরতের শিউলি ফুলের মতো টুপটাপ ঝরে পড়ছে তুষারের কুঁচি। আর তা দেখতে, বরফের সাদা গালিচায় গড়াগড়ি দিতে, দেদার মস্তি লুটতে বড়ো সংখ্যায় হাজির হয়েছে রসপিপাসু পর্যটকের দল। আমদানির সুযোগ এসেছে বুঝতে পেরে খেটে খাওয়া কাশ্মীরের মানুষজন উচ্ছ্বসিত। কাশ্মীরের ভাগ্য এবছর বোধহয় সুপ্রসন্ন কেননা, পাশাপাশি থাকা দুই পার্বত্য রাজ্য উত্তরাখণ্ড ও হিমাচল প্রদেশ এবছর তুষার খরার কবলে পড়েছে, যতটা তুষারপাতের আশা করেছিলো তার দেখা এখনও পর্যন্ত পাওয়া যায় নি। ফলে কাশ্মীরের সামনে সুযোগ বেড়েছে আর্থিক সমৃদ্ধির।
ঘরে ঘরেও এক আশ্চর্য ব্যস্ততা শুরু হয়ে যায়। পুজো এলে বাঙলিদের ব্যস্ততা, পোঙ্গল এলে তামিলদের ব্যস্ততা, ওনাম এলে মালয়ালিদের ব্যাস্ততার মতো চিল্লা-ই-কালানের সময় কাশ্মীরের অধিবাসীদের ব্যস্ততা বেড়ে যায় অনেকটাই। শীতাগমের সংকেত পেতেই প্রস্তুতি শুরু হয় জোরকদমে। নাগাড়ে দু মাসেরও বেশি সময় জেঁকে বসবে শীত,তাই নানান রকমের রসদ জোগাড়ের ধুম পড়ে যায় – জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করে রাখা, গরমের তাজা সবজিগুলোকে কেটে, ধুয়ে রোদে শুকিয়ে নেওয়া, বাড়ির জীর্ণ হয়ে যাওয়া অংশের প্রয়োজনীয় মেরামতির কাজ সেরে ফেলা, এইসব আর কি! সাথেসাথে বাক্স পেটরা খুঁজে বের করা হয় গুছিয়ে রাখা ফিরান ( লম্বা জোব্বা জাতীয় শীত পোশাক) কাঙ্গরি ( শরীর গরম রাখার মাটির তৈরি হিটার),কারাকুলি, পশমিনা শাল। বাড়ির সকলেই বিশেষ করে মহিলারা ব্যস্ত হয়ে ওঠেন ভন্দ সাল ( সবাই মিলে একসাথে খাওয়া দাওয়া করার রীতি) এর প্রস্তুতিতে। কাশ্মীরের বিচিত্রসব লোভনীয় খাবারের খুশবু এই সময় রান্নাঘরের সীমানা পেরিয়ে মিশে যায় উপত্যকার আনাচে কানাচে। শীত তো এক অর্থে অ- প্রাচুর্যের সময়। অত ঠাণ্ডায় শাক সবজি মিলবে কী করে? তার ব্যবস্থা আগে থেকেই করা হয়। গরমের সময় রোদে শুকিয়ে রাখা হয় নানান কিসিমের সবজি।আর সেসব দিয়েই তৈরি করা হয় হোক্ সিউন। নানান রকম শুকিয়ে রাখা সবজিকে ব্যবহার করা হয় অত্যন্ত উপাদেয় স্টু এবং স্যুপ। শীতকালের ঘাটতি পূরণে এই আয়োজন সত্যিই অনবদ্য।
শীতকাল যতোই নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিকনা কেন আসলে শীতকাল হলো এক কঠিন সময়। চিল্লা – ই – কালান কাশ্মীরীদের ঘরোয়া গেট টুগেদারের সময়। এই সময়ে তাঁরা আয়োজন করে ভন্দ সাল এর। আত্মীয় স্বজন, বন্ধুবান্ধবের ডেকে এনে একসঙ্গে খাওয়া দাওয়া, সুখ দুখের কথা বলে সময় কাটানো। এরফলে পারস্পরিক সহযোগিতা আর সহাবস্থানের আদর্শ বড়ো হয়ে ওঠে। সঙ্গে থাকে ট্রাউট মাছের মনলোভা জায়কা।
ভূস্বর্গ এখন নিথর, গভীর শ্বাসে ভরি বুকের হাপর,
চিল্লাই কালান এসেছে বরফের পশরা সাজিয়ে।
ডিসেম্বরের সকাল থেকে টানা চল্লিশ দিন,
হালকা কুয়াশার চাদরের পেছনে মুখ ঢেকে থাকবে সূর্য।
চেনা ডাল হ্রদ এখন বরফের কাঁচের তলায়, আর
উপত্যকা ঘিরে থাকা পাহাড়ের পরনে সবুজ আঙরাখা।
তারপর স্তরে স্তরে সাজানো সব স্বপ্ন,
প্রতিফলিত হয় জমে যাওয়া নদীর আয়নায়।
ফিরানে মোড়া শরীর এখন পশমী ওম নিচ্ছে,
কাঙ্গরির আগুন উষ্ণতার আরাম ছড়িয়ে দেয় শরীর মনে।
এখন কোনো তাড়া নেই সবকিছু সেরে ফেলার,তাই
অবসরের আলস্য কাটাই খোয়া চায়ের পেয়ালায় তুফান তুলে
এ বুঝি নিজের ভেতরে থাকা নিজেকে খোঁজার সময়।
বাইরের বাতাসে এখন তীক্ষ্ণ বর্ষার খোঁচা, বিদ্ধ করে অবিরত
তবুও হৃদয় উথলে ওঠে, মনের গহীনে থাকা
অনেক দিনের গল্প আর সুখস্মৃতির মূর্ছনায়।
তবুও, অনেক সম্ভাবনা,
চাপা পড়ে আছে সাদা বরফের নিচে,
নীরব নীলিম আকাশের নিচে মাটি
উঠবেই ভরে ফসলের সম্ভাবনায়।
বরফের থাবা মুক্ত হলেই জানি –
পৃথিবী গাইবে চেনা সুরের গান।
সেই গানের সুর, ছড়িয়ে পড়বে
পাহাড়ের চূড়ায়, পাদদেশের নিভৃত জনপদে।
এই আশা দেখেই তো লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিই আমরা। সকলকে নতুন বছরের শুভকামনা। ভালো থাকুন। পাঠে থাকুন।
জানুয়ারি ০২. ২০২৬
https://www.indiatoday.in/newsmo/video/what-is-kashmirs-chillai-kalan-2840662-2025-12-23














Bishoy ti jantam. Sena Bahini te kajer subadey Kashmir amar kachey onektai kacher, ba porichito ! Ekhon aro onekta gyan badlo. Koto jey shundor shundor protha, riti niti achey amader ei bishal deshey ! Mon bhorey jay. Lekhatir jonyo onek dhanyobad. Aro erokom lekha ashtey thakuk. Amrao shomriddho hoi.
ধন্যবাদ ঋতব্রত আপনাকে। ভূগোল বইয়ের একটা দুটো কথা থেকে যে এতোখানি লেখা হয়ে যাবে তা শুরুতে বুঝতে পারিনি। লেখালেখির পরে ছবির সন্ধান করতে গিয়ে আরোও অনেক কথা জানা হয়ে গেল। এটাই মজার। জানার মজার শেষ নাই, নতুন করে জানো তাই।
ভালো থাকবেন সবসময়।
Kashmir ghora hoye gelo. Onobodyo
খরচ বাঁচিয়ে দিলাম।