‘বিচার চেয়ে সতেরো মাস’ অতিক্রান্ত। এই বিচারহীন সতেরো মাসে ন্যায় বিচারের জন্য নিরবচ্ছিন্ন আন্দোলন চলছে অনেক বাধা, অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে। রাত দখলের প্রহরজাগা যাদবপুর, ছাত্র আন্দোলনের বন্যায় ভাসা যাদবপুর বিচারের দাবিতে আবার উত্তাল হল গত ৯ জানুয়ারি শনিবার অভয়া মঞ্চের কেন্দ্রীয় কর্মসূচিতে ।
ধারাবাহিক লড়াই এর মধ্যে প্রতি মাসের ৯ তারিখকে বেছে নিয়েছে অভয়া মঞ্চ এক সম্মিলিত সংহত প্রতিবাদের দিন হিসাবে। ‘বাংলায় আর নয়’ – নতুন বছরের এই শপথ আর সতেরোটি প্রজ্জ্বলিত মশাল নিয়ে শুরু হয় মিছিল। কয়েকশো মানুষের মশালমিছিল যাদবপুর থানা থেকে যাদবপুর কফি হউসের কাছে অনুষ্ঠান মঞ্চে এসে পৌঁছায়। ক্ষমতার প্রতিষ্ঠানকে চ্যালেঞ্জ করার চিরন্তন গান দিয়ে অনুষ্ঠানের সাংস্কৃতিক সূচনা করে রুপকথার বলিষ্ঠ কণ্ঠ –‘রইল বলে রাখলে কারে, হুকুম তোমার ফলবে কবে’। শিরদাঁড়া সোজা রাখার আহবান জানিয়ে শেষ করে রূপকথা।
আগামী ৯ ফেব্রুয়ারি জলপাইগুড়ির গণ কনভেনশন এবং ৯ মার্চ দিল্লি অভিযান – অভয়া মঞ্চের পরবর্তী দুইটি গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করে ৯ জানুয়ারির কর্মসূচি শুরু করেন মঞ্চের অন্যতম আহবায়ক ডক্টর পুণ্যব্রত গুণ। এই কেন্দ্রীয় কর্মসূচিতে বাদল সরকার নাট্যচর্চা কেন্দ্র প্রযোজিত অঙ্গন মঞ্চের দুটি নাটকের সঙ্কলন ‘শিকল ভাঙ্গার গান’ প্রকাশ করেন ডা: পুণ্যব্রত গুণ, বরিষ্ঠ সমাজকর্মী অমলেন্দুভূষণ চৌধুরী এবং নাট্যকর্মী দেবাশিস চক্রবর্তী ও নাটকের অভিনেতাগণ যাদের সম্মিলিত কথা ও ভাবনার মধ্য দিয়ে “শিকল ভাঙার গান” নাটকটি নির্মিত হয়েছে। সমরেশ বসুর আদাব গল্পটির নাট্যরূপ দিয়েছেন দেবাশিস চক্রবর্তী।
ডক্টর ফর ডেমোক্রেসি র সম্পাদক ডক্টর সুকান্ত চক্রবর্তী এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনীদের পক্ষ থেকে বিহঙ্গদূত শক্তিশালী বক্তব্য রাখেন।
স্থানীয় প্রবীণাদের সাংস্কৃতিক সংস্থা ‘যাদবপুর প্রকৃতি’ হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বীতে শান্তির বারি বরিষণের আবেদন জানান রবীন্দ্রসঙ্গীতের মাধ্যমে । যাদবপুরের ছাত্রছাত্রীদের প্রতিবাদী গানের অনুষ্ঠান নিয়ে আসে সংগ্রামের দৃঢ় প্রত্যয় আর সূর্যোদয়ের রক্তিম স্বপ্ন –
“তু জিন্দা হৈ তো জিন্দেগি কি জীত মে ইয়কীন কর
আগর কহিঁ হৈ স্বর্গ তো উতার লা জমীন পর”
অভয়া মঞ্চের সংগ্রামী যোদ্ধা অরিন্দম দাশ রচিত ও স্পন্দন গোষ্ঠী প্রযোজিত ‘বাবা তুমি ঘুমিয়ো না’ শ্রুতিনাটকের ৯৯ তম অভিনয় অভিনেতা বাপী এবং নীলাঞ্জনার মুন্সিয়ানায় স্বস্তি আর আরামের ঘেরাটোপ ছিঁড়ে ফেলে বিনিদ্রতার বীজ বপন করে। নীলাঞ্জনার তীক্ষ্ণ কণ্ঠ শীতসন্ধ্যার নিস্তব্ধতাকে বিদীর্ণ করে দিকে দিকে ছড়িয়ে দেয় মৃত্যুঞ্জয়ী অভয়ার জীবনের জন্য আমরণ প্রচেষ্টা।
এই দিনের শেষ কর্মসূচি ছিলো—বিতর্কসভা। সভার মতে অভয়া আন্দোলন আজকে কেবলমাত্র শহুরে মধ্যবিত্ত নাগরিকদের সামাজিক আন্দোলনে সীমাবদ্ধ নয়। সভার মতের পক্ষে বক্তব্য রাখেন ডক্টর ফর ডেমোক্রেসির ডক্টর সুকন্যা ঘোষ, পঞ্চায়েত যৌথ কর্মচারী সমিতির সাধারণ সম্পাদক সন্দীপ রায় এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী কৌশিকী চক্রবর্তী। বিপক্ষে বক্তব্য রাখেন সুপ্রভা এবং ঊর্বা চৌধুরী। বক্তাদের সুবিন্যস্ত যুক্তিজাল আর বলিষ্ঠ চিন্তায় সমৃদ্ধ বিতর্ক সভা শেষ হয় এই বিশ্বাসের পুনঃ প্রতিষ্ঠায় –শুধু নাগরিক মধ্যবিত্ত পরিসরে আবদ্ধ থাকা অভয়া আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নয়। এক বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে ওঠার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে ক্যানিং, আমতা, উলুবেড়িয়া, বীরভূম, বাঁকুড়া, মেদিনীপুর, দিনাজপুর, জলপাইগুড়ি, মাথাভাঙ্গা, কার্শিয়ং এবং আরও বহু প্রত্যন্ত গ্রাম-শহরে । লিঙ্গ বৈষম্য আর দুর্নীতির ক্ষমতাতন্ত্র বিরোধী আন্দোলনকে অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে পরিচালিত না করলে আন্দোলনের ব্যাপ্তি সম্ভব নয়। খেতের কিষান আর কলের মজদুরের লড়াই এর সঙ্গে জোট বাঁধার আহবান দিয়েছে অভয়া মঞ্চ- “একসাথে হবে সাথী মিলতে ভুখা মজুরের রাস্তা এটাই “। অভয়া আন্দোলনের বিস্তারের জন্য গড়ে ওঠা অভয়ামঞ্চের কাজ গ্রাম নগরে বাঁচার লড়াই এর পাশাপাশি সারা পৃথিবীতে বৈষম্য ও নির্যাতনবিরোধী গণ আন্দোলনে সংহতি স্থাপন। অভয়ার খুন ও ধর্ষণের অভিঘাতে মুলত প্রবাসী ভারতীয়দের প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক সংগ্রামী মঞ্চ – গ্লোবাল সলিডারিটি কমিউনিটির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অভয়া মঞ্চ।
বলিষ্ঠ বক্তব্য দিয়ে বিতর্ক সভা শেষ করেন অভয়া মঞ্চের অন্যতম আহবায়ক ডক্টর তমোনাশ চৌধুরী। সমগ্র অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অভয়া মঞ্চের আহ্বায়ক মণীষা আদক, মঞ্চের সহযোদ্ধারা এবং অসংখ্য স্থানীয় মানুষ ।
রাতের শৈত্যপ্রবাহ আর ঘড়ির কাঁটাকে অগ্রাহ্য করে কর্মসূচি এগিয়ে চলে অসংখ্য হার না মানা মানুষের অদম্য আবেগ আর অনমনীয় দৃঢ়তায় । আকাশ চক্রবর্তীর দৃপ্ত কণ্ঠে প্রতিবাদী গান দিয়ে শেষ হয় এই বছরের প্রথম কেন্দ্রীয় কর্মসূচি।












As usual a well documented writeup from Gopa…