নতুন গাড়ি কেনা হয়েছে।
অশোকের এমনিতেই সমস্যার অন্ত নেই। তার ওপর আবার নতুন ঝামেলা যোগ হলে পেরে ওঠা মুশকিল। ছন্দা মানে অশোকের বউ অভিযোগ করছিল ড্রাইভার বিনয়কে নিয়ে। আগের গাড়িটাও ওই চালাত। কী ব্যাপার, জিজ্ঞেস করায় বউ বলল, বিনয় নাকি আজকাল বেশ আয়েসি হয়ে উঠেছে।
কোথাও অশোককে পৌঁছে দিয়ে এক আধ দিন হয় তো বাড়িতে ফিরতে হয়, ছন্দার বেরোবার ব্যাপার থাকলে। ছন্দা খেয়াল করেছে, বিনয় সেই একলা ফেরার সময়েও গাড়ির এসি চালু রাখে। শুনে অবধি অশোক দারুণ অবাক। এমনটি হবার কথা নয়। গাড়ি চললেও মালিক গাড়িতে না থাকলে, এসি বন্ধ রাখাই দস্তুর।
তবু অশোক ছন্দাকে বোঝাল,- আহা, গরমখানা যা পড়েছে। তাই হয়তো এসি চালিয়েছে এক আধদিন।
বিনয়ও আবার এর মাঝে নিজেই বলল অশোককে, – কাকু, আমি আর আপনার গাড়ি চালাব না।
এর আবার কী হল? কী নতুন বাহানা? ছন্দা কি কোনও খারাপ কথা বলেছে ড্রাইভারকে?
ব্যাপার জানতে বিনয়কে আলাদা করে ধরল অশোক। অবশ্যই ছন্দার আড়ালে। চেপে ধরতে বলল…
কী বলল পরে বলছি।
★
ঘটনার উদ্ভব গত কয়েকমাস আগে।
– কী যে একই গাড়িতে চাপছ। চেপেই চলেছ। সেই দশ বছর আগে কেনা অল্টো। এখানে তোবড়ানো। ওখানে ধুলোর পরত। এসি কাজ করে না। সাউন্ড সিস্টেমে ফাটা আওয়াজ বেরোয়। পাল্টাও বাবা, পালটিয়ে নাও।
অশোকের কাজের প্রয়োজনে আগের গাড়িটা কেনা। নইলে ওদের পরিবারে গাড়ি কেনার কথাই না। এটা একরকম বাধ্য হয়েই।
আলাদা ফ্ল্যাটে থাকা বড় ছেলে জয়ের একগাদা আক্ষেপ ঝরে পড়ল। তার নিজের দুটো গাড়ি। একটা নিজে চালায়। অন্যটা বধূমাতা।
অশোক আত্মরক্ষা করতে মিনমিন করে বলেছিল, -আরে, কড়া করে সার্ভিসিং করে নিলে আর ডেন্টিং পেন্টিং করে নিলেই একদম চকচকে দাঁড়াবে। নতুন না হলেও নতুনেরই মত।
যদিও সে জানে কথাটা ঠিক না।
আজ থেকে কুড়ি বছর আগে থেকেই ধারা পাল্টেছে। দু তিন বছর ব্যবহারের পরই গাড়ি পালটায় লোকেরা। আগেকার মত ভিন্টেজ গাড়ি চাপার গৌরবে গর্বিত হতে চায় না কেউই।
কনজিউমারিজম্?
না বোধ হয়। ব্যবহারিক দিকও রয়েছে কিছু। আধুনিক গাড়ি মানেই আধুনিক সুযোগ সুবিধা।
এইবারের এই পরিকল্পিত গাড়িটাই যেমন। গিয়ার চেঞ্জের ঝামেলা নেই। সামনে পেছনে ক্যামেরা। জিপিএস ট্র্যাক করার সুবিধে। এয়ার ব্যাগ। আরও কত কিছু।
আমতা আমতা করে অশোক বোঝাল টাকাপয়সার অসুবিধেটা। সত্যি বলতে একটু সমস্যা রয়েইছে। গ্র্যাচুইটি আর অন্যান্য পাওনা একজোট করে, হাত মোটামুটি খালি করে নতুন ফ্ল্যাটটা কেনা হল। সে নিজে রিটায়ার্ড। এখন এই সত্তরের কাছাকাছি বয়সে লোন দেবে না কোনও ব্যাংকই।
কিন্তু ছেলের জেদ। এগোতেই হল। সম্বল বলতে একটা মোটে এফডি ছিল। সেটা ভাঙিয়ে কেনা হল নতুন গাড়ি। আগের গাড়ির চেয়ে অনেক আধুনিক। এসিটা বলার মত। ছন্দা আর তার ছেলে দুজনেই খুব খুশি। একেবারে চিলিং।
জয় ওর মাকে বলল, – দেখেছ, বাবা টাকা নেই টাকা নেই বলে। কিন্তু চাপ দিতেই ভাঙাবার মত কেমন একটা ফিক্সড ডিপোজিট বেরিয়ে পড়ল।
★
চাকরি ছাড়ার কারণ হিসেবে বিনয় যা বলেছে, যে কেউ শুনলে বলবে গুল মারছে।
বিনয় কাঁপা গলায় বলেছে, ও একলা গাড়ি নিয়ে যখন ফেরে, তখন ও এসি বন্ধই রাখতেই চায়। রাখেও। সেটাই তো দস্তুর, সেটা ও জানে।
কিন্তু গাড়ি চলতে শুরু করলেই ও বোঝে গাড়িতে আর কেউ বসে আছেন।
বয়স্ক এক অদৃশ্য মহিলাকণ্ঠ ওকে এসি চালাতে হুকুম করেন। নইলে নাকি গরম লাগছে। বিনয় প্রথমে ভেবেছে মনের ভুল। কিন্তু তারপরেই অবাক বিস্ময়ে দেখেছে জানলার কাচ আপনা থেকেই উঠে গেছে। চালু হয়ে গেছে এসিও।
– এদিকে কাকিমাও এসি চলেছে টের পেলেই বকাবকি করেন। আমাকে আপনি ছেড়েই দিন কাকু!
বিপন্ন বিনয় মিনতি জানায়।
★
একমাত্র অশোকই জানে এই সমস্যার মূল কোথায়।
আর কেউ এত ডিটেইলসে জানে না। বোঝালে বুঝবেও না।
ওই যে এফডিটা ভাঙিয়ে গাড়ি কেনা হল, ওটা তার চলে যাওয়া মায়ের সঙ্গে জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট। মারই ফার্স্ট নেম। বাবা আর মায়ের খুব শখ ছিল শেষ জীবনে একটা দামি এসি গাড়ি চড়ার। সেই বাবদেই তিল তিল করে জমানো টাকাতে এই এফডি।
মা খুব আবদার করে বলত, – আমাকে আর তোর বাবাকে এই জমা টাকায় একটু এসি গাড়িতে চড়াবি বাবু? মানুষটা সারা জীবন এই গরমের দেশে তেতে পুড়ে ট্রেনে বাসে চড়েছে।
দিচ্ছি দেব করে আর ওই কথা শোনা হয়নি। তার আগে মা বাবা দুজনেই না ফেরার দেশে।
সেই ইচ্ছেটুকু বুকে নিয়ে মায়ের এই এফডিটা দিন গুণছিল, কবে তাকে ভাঙানো হয়।
সেটা ভাঙিয়ে নতুন গাড়িটা কেনা হয়েছে। মা এতদিনে তার অপূর্ণ সাধ মেটাচ্ছে।
★









