“আমরা আস্তে আস্তে নিজেদের শিক্ষাটা ভুলতে বসেছি। আজ দেখলাম একজন বাটি আইসক্রিমের ঢাকনাটা না চেটেই ফেল দিলো”
“নেত্রী বললেন বুদ্ধবাবুর চুল খাড়া হয়ে যেত আমার নাম শুনলেই।”
“হীরামন্ডি নামক ওয়েব সিরিজে পাছা নাচিয়ে গজসম গমন দেখিয়েছেন এক অভিনেত্রী।”
আপাতত মোটের ওপর এসবই ভেসে আসে আমার নিউজফিডে। ফেসবুকের। অর্থাৎ, অবশ্যম্ভাবী রূপে এসব বিষয়েই চর্চা হয়ে চলেছে অধুনা। এ জগতে। অন্তত এই গত পাঁচদিন কতক ধরে তো বটেই।
আর….সুপ্রিম কোর্ট গ্রীষ্মবকাশে গেছেন মাস দেড়েকের জন্য।
সুতরাং
বেশি গোল করো না। ভগবান নিদ্রা গেছেন।
আর
ঝুলে আছে – শিক্ষক হিসেবে যাঁদের পরিচয় তাঁরা কি সত্যিই সৎ? নাকি দলদাস? এ বিষয়টা।
যদি একটু তলিয়ে খোঁজ রাখেন তাহলে হয়ত এটাও জানবেন আপনারা যে এমত নির্দেশও এসে গিয়েছে যে এ যাবৎ তাবৎ সরকারি মদত পুষ্ট ( govt. aided) স্কুলের প্রতিটি শিক্ষক শিক্ষিকা তাঁদের নিয়োগ-নথিপত্র পেশ করবেন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকটে। খতিয়ে দেখা হবে যে এ যাবৎ প্রতিটি শিক্ষক শিক্ষিকার নিয়োগ স্বচ্ছ ছিল কিনা!
তোফা চলছে। এ অবস্থার আসল নাম– কফিনের শেষ পেরেক।
*****
আমি সাধারণত নিজের পরিচয় দিই না প্রথম আলাপে। বলি– আমি ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ার অথবা ইলেকট্রিক মিস্ত্রি। কিংবা তুচ্ছ হরিপদ কেরানি।
অথচ আমি বেশক জানি, আমি চকমকে চিকিৎসক। তবুও সে পরিচয় দিই না আজ ঠিক একুশ বছর হলো। যখন থেকে আমি থার্ড ইয়ার ডাক্তারির। আর মসনদে সিপিএম। আর নিজেদের তাবৎ ব্যর্থতাকে ঢাকতে গিয়ে মদদপুষ্ট সংবাদপত্রকে দিয়ে শিরোনাম লেখানো হচ্ছে সেই সব দিনে থেকেই–
“স্বাস্থ্য বেহাল, অথচ ডাক্তারও নাকি বাড়িতে ভাত খেতে গেছেন!”
সেইসব সময় ঘুমিয়ে ছিলেন আপনারা সকলে। আর জেগে ছিলাম… আর দগ্ধ হচ্ছিলাম– স্রেফ আমরা। চিকিৎসকেরা। স্রেফ। সেরেফ!
কিন্তু সেও বোধ করি ভালো ছিল। ডাক্তার পেটাতে তো ভালোই লাগে মোটের ওপর। তাই না? বলতে ভালো লাগে,– আমার মাসি-শাশুড়িকে স্রেফ টাকার জন্য পেট কেটে দিল, এ কথা তো দেখুন… মিথ্যে নয়! ভেলোরে গিয়ে স্বস্তি মিললো অবশেষে! তারপর হোমিওপ্যাথি করে।
বলতে পারিনি সেসব দিনে, বলতে পারিনা আজও যে,– ভেলোর-এ আর যাতি পারব না ছার। পেশেন ভালো হয় নাই ওঠে যায়েও। ট্যাকা নাই। এহন যা করার আফনেই করেন। এঠে।
এরকম স্বর/সুর শুনে শুনে আর শু-নে হেজে গেছি। মরে গেছি আমি।
কিন্তু তাতে কী?
ডাক্তার/ বা স্বাস্থ্যকর্মী নাহয় এ বঙ্গে– অযোগ্য।
ঘুষ- পয়সা খোর।
যেমন, এই বাংলার পুলিশ প্রশাসনও।
মেনে নিলাম।
লেকিন মানতে পারছি না যেটা সেটা হলো, কোর্টে প্রমাণ দেখাতে হচ্ছে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের যে তাঁরা যোগ্য।
এসব মোটেও ফেলে দেওয়ার কথা নয়। এগুলি আদতে আই.পি.এল থামিয়ে রেখে ভাববার কথা।
শেখাচ্ছেন যাঁরা, শিক্ষা দিচ্ছেন যাঁরা… তাঁরাই আজ প্রশ্নচিহ্নের মুখে।
হ্যাঁ হাঁড়ির একটি ভাত টিপেই বোঝা যায়, তাবৎ চাউল সিদ্ধ হলো কিনা! হাতা-য় ওঠা ওই একটি চাউল যদি ভাত-এ উত্তীর্ণ হতে না পারে আজ, তাহলে নর্দমায় ফেলে দেওয়া যেতে পারে সমস্তই। আর হাসি হাসা যেতে পারে তাচ্ছিল্যর– সালা পুরো চালের বস্তাটাই পচা।
অতএব, আজ অভুক্ত-রাত।
চালের বস্তায় লাথি।
কিংবা এক্ষেত্রে, বিগত-শিক্ষা।
শিক্ষক/শিক্ষিকাদের মুখে থুতু।
****
আমি জানি গুটখা খাওয়া, পড়াশুনা না করা টোটো চালক অধুনা নিজের ছেলে মেয়েকে ভর্তি করেন বেসরকারি কিন্ডারগার্টেন ইস্কুলে। যে ইস্কুলের কোনো কিছুই নিঃশুল্ক নয়। আর সে সব বিদ্যালয়ে শিক্ষা প্রদান করেন যাঁরা তাঁদের যোগ্যতা নিয়ে সংশয় থেকে যায় বেজায়।
কিন্তু তাতে কী?
বেসরকারি হলে পরিষেবা ভালো হবে।
আর কিন্ডারগার্টেন ইস্কুলের সামনে ঢাউস সাইন বোর্ড টাঙ্গালো থাকবে– কিন্ডারগার্ডেন। তাতেই তৃপ্তি। পাগলের গোদেই আনন্দ।
যেমত নিখরচার হাসপাতাল বিমুখ করা গেছে জনতাকে, আর প্রলুব্ধ করা গেছে– গ্লো সাইন বোর্ড ওয়ালা নার্সিংহোমের প্রতি।
এবং প্রমাণ করা গেছে মগজ-ধোলাই করে– যা কিছু সরকারি, যা কিছু নিঃশুল্ক তা সকলই ফালতু।
প্রশ্ন করেনি কেউ,
সরকার যখন আপনি তখন এসব সরকারি বিষয় ফালতু হলো কেন?,
বলেনি–
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের রমরমা-তে আদতে পকেট ভর্তি হবে কার?
*****
চিকিৎসক আর পুলিশ অনেক দিন আগেই হ্যাক থু প্রমাণ করা গেছে।
এখন পালা – শিক্ষক/শিক্ষিকাদের।
চলুক।
আপনি আই. পি.এল দেখুন।
আপনি গেরুয়া-সবুজ-লাল তাস খেলুন।
আমি অন্তত শেষ দিন পর্যন্ত নিজের পরিচয় দিয়ে যাব অপরিচিত জনতার সম্মুখে– আমি টোটো চালাই। চপ বেচি। আমি গরিব। এবং এবং এবং এইটাই আমার সার্টিফিকেট। আমি, গরিব। আর যেহেতু গরিব আমি, ঠিক সেই হেতুই আমি– ভরসাযোগ্য। গরিবের সমার্থক শব্দ অধুনা–সৎ। সুতরাং আমিই একমাত্র আপনাদের নিজের লোক।
শিক্ষিত যাঁরা, ঠাঁই-কাপড় আছে যাঁদের, যোগ্যতা প্রমাণ করে ভাত কাপড় নিশ্চিন্ত করে ফেলেছেন যাঁরা– তাঁরা অবশ্যই শ্রেণীশত্রু।
হ্যাঁ আমি এখনো ভাবি–
টোটোচালক– কোথায় যাবেন?
যাত্রী– অমুক স্কুলে।
টোটোচালক– আপনি মাস্টার?
যাত্রী– হুম
টোটোচালক–অ। তুমি কোন বসোরে পরিখা?
যাত্রী– নিশ্চুপ।
টোটোচালক–সব টিচারদের খবর আছে! জালি! আর আমার মেয়েকে ফেল করাই দিলো শালীরা!
অতঃপর, মিনিট খানিক নীরবতা। কারণ নেপথ্যে তখন– ফেসবুক রিল বেজে চলছে– দিদি আছেন। দাদা আছেন। সবাই পাস।
লাল-নীল-গেরুয়া …ঘেন্না ধরে গেল মাইরি।
এ জন্মদিনে প্রথম ইচ্ছে আমার–
প্রশ্ন করতে শিখুন। অকুতোভয়। হয়ত চাকরি যাবে আপনার। বা– ভাত কাপড়। কিন্তু নিশ্চিন্তে চোখ বুজতে পারবেন অন্তত শেষ দিনে। বলতে পারবেন– আমি reels দেখে ভুলে থাকিনি। আমি তর্জনী উঁচিয়ে সওয়াল করেছি।
◻️◻️◻️◻️◻️◻️
দ্বিতীয় ইচ্ছা
–———
জন্মদিন-পালন এমন কিছু নতুন বিষয় নয়। নয় মোটেও আহামরি-আশ্চর্য-অজুবা। বরং হুঁশ হওয়ার পরের বছরটি থেকেই প্রতিটি মানুষ-শাবক পালন করে চলেন তাঁর জন্মের ওই বিশেষ দিনটিকে।
হয় উদযাপনে, নাহয় একাকী সংগোপনে। কিন্তু করেই থাকেন। করেই চলেন। উম্রভর।
হ্যাঁ, আপাত- উদাসীন মানবও জন্মদিনটির রাতে চকিতে হলেও নিজেকে বলেন চুপিচুপি– হ্যাপি বার্থ ডে টু মি।
অতএব, জন্মদিন পালন নতুন কোনো বিষয় নয়। এবং আমিও ব্যতিক্রম নই তার। কিন্তু ফেসবুক-জন্মদিন পালনের এইটা আমার এমত প্রথম বর্ষ, যে বৎসরে প্রজ্ঞাদীপা নেই।
” শুনছেন ডাক্তার-মশাই, জন্মদিনের ভালোবাসা নেবেন। আর প্লিজ, নিজের লেখালিখির বিষয়ে একটু সিরিয়াস হোন। বড় কিছু লিখুন তো একটা…ভালো কিছু।”
ছদ্ম-তিরস্কারে সেসব বলবে, এমন মানুষটি এইবারে আর নেই। চলে গিয়েছেন ধ্রুবতারার দেশে। এই নিয়ে এটা চার নম্বর। চতুর্থ মৃত্যু। আমার নিকটজনের।
যে মৃত্যু তারা একটু চেষ্টা করলেই পারত, এড়িয়ে যেতে। কিন্তু যায়নি। যে মৃত্যুসমূহের প্রত্যেকটির ক্ষেত্রেই আমার মৃত মানুষগুলির সাথে যোগাযোগ হয়েছিল পাঁচ-সাতটা দিন আগেও। আর তৃপ্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম– আঃ, বড় নিবিড় কথা হলো আজ।
হয়নি কিন্তু আদতে। এরা, এই চারজনই যা কিছু এড়িয়ে যেতে পারতেন একটু…সামান্য…এতটুকু চেষ্টা করলেই, সেসবকেই বরং আরো আঁকড়ে থেকেছেন মাদকাসক্তর মতো।
আজ, ইচ্ছা হয় এই জন্মদিনের কেক কাটতে কাটতে এদের ঘেঁটি ধরে নাড়া দিই সজোরে। বলি, এ বিশ্বসংসারে এমত কিছুই নেই, যার জন্য জীবন বিমুখ হওয়া যায়।
“আমার বেশ মনে পড়ছে একদিন আমার জীবনের মহা অনুভূতির কথা- আমার ছেলে মারা গেছে, আমার মন তীব্র পুত্রশোকে যখন ভেঙ্গে পড়ছে ঠিক সেই দিন, সেই সময়ে আমার বাড়ীতে হাস্নাহেনা ফুটেছে। আমি প্রাণভরে সেই হাস্নাহেনার গন্ধ উপভোগ করেছিলাম।”
–নজরুল ইসলাম।
হ্যাঁ। এতটা কাব্যিক হয়ত নয়। কিন্তু এটাই। চরম গদ্য ভাষায় বলতে গেলে, আজ ঠিক যে কারণে মনে হচ্ছে সব শেষ, যদি টিঁকে থাকেন তবে, ঠিক তার এক মাস/ এক বছর পরেই সেই বিশেষ দিনটিতে দেওরের বিয়েতে চোখের মাস্কারা ঠিক হয়নি বলে ঠোঁট ফোলাবেন আপনি নিজেই। বা ভাইপোর বিয়ের প্যান্ডেলের ঠিক পিছনে, সজনে গাছের নিচে ওল্ড মংক ধকাস করে গিলতে গিলতে বলবেন, ভাই, পানু আছে? কতদিন পানু দেখিনি…আমি মাতাল বাঁড়া… মা আমায় ক্ষমা করো।
জাগতিক সমাজ বা বলা ভালো সমাজ আমাদের সর্বদা বেঁধে রাখছে নিয়ম নীতি দিয়ে। ডিভোর্স করতে নেই, পানু দেখতে নেই, পরকীয়া করতে নেই, খিস্তি মারতে নেই, ঘর ছেড়ে যেতে নেই, টাকা ইনকাম করার জন্য উদগ্র হতে নেই…।
বলতে নেই, করতে নেই, ভাবতে নেই…কে কী ভাববে আবার এই সব নিয়ে….এসব ঠিক ভুল ঠিক বিচার করতেই সিম্পলি ডুবে যান অনেকে। আর ফেসবুক জনতা হ্যাজ নামান–টক্সিক রিলেশনশিপ, কিংবা ইস আহা গো।
জন্মদিনে একটাই বার্তা হতে পারে আমার। এ বৎসরে।
Fuck this world. Live, like you want to live. Nothing is more importent than your fucking life.
****
আমার জন্মের দিনটির কথা আমি জানি না। জানবার কথাও নয়। ন্যাড়ামুন্ডি আমি তখন মায়ের বুক চুষবার চেষ্টা করছিলাম একটু একটু। পারছিলাম না ঠিক মতো। বোঁটা নেড়ে ঘেঁটে, কেঁদে কঁকিয়ে হেসে ফেলছিলাম অকস্মাৎ। আর নার্স বলছিল– বেবি হাসছে আপনার। আমার মাতৃদেবীর মনে যদিও তখন চামচিকের মতো ঘুরপাক খাচ্ছিল একটাই শব্দ– দেয়ালা করছে সোনা আমার, ঘুমের ঘোরে স্বপ্ন দেখছে রাজকন্যের।
বাবা নামক মানুষটি যদিও তখনও কিলোমিটার দুই শত দূরে। কলিকাতায়। ট্রাংক কলে খবর পেয়ে ছুটি নিয়েছে বড় সাহেবের কাছ থেকে। আর তারপর দৌড়ে দৌড়ে গিয়েছে ছে কলেজ স্ট্রিটে। খরিদ করেছে বিশালাকায় উপেন্দ্রকিশোর-সুকুমার রচনাবলী। অতঃপর পরিতৃপ্ত তথা উৎসুক মননে, বিনা টিকিটে, পাগল-পারা চেপে বসেছে আসানসোল-অভিমুখী বাষ্পশকটে। মধ্যে গাড়ি থামলো সিগন্যালে। মস্ত কলারওয়ালা আর বাবরি-চুল ওয়ালা পিতাটি অস্থির হয়ে পড়লেন– অপত্য জন্মেছে। অ-পত্য। শালার গাড়িকে থামতে হলো? আজকেই?
এরও ঘন্টা দুয়েক পরে যখন একপ্রকার হাঁফাতে হাঁফাতে নার্সিং-হোম বেডের পর্দা সরিয়ে ঢুকতে গেলেন সেই সদ্য-পিতা আর তাঁর শ্যালিকারা তাঁর পথ রোধ করলো কোমরে আঁচল গুঁজে– ঢুকতে দেব না। ছেলের মুখ দেখবেন যে…কী এনেছেন বলুন তো জামাইবাবু….তখন বড়ো বেকুবের মতো সেই পিতা বের করে আনলেন– প্রকান্ড সেই বইটি। যে বইটি বয়ে নিয়ে আসার জন্য তাঁর দক্ষিণ স্কন্ধে বড় ব্যথা।
হাসির হররা উঠলো মুহুর্মুহু– ওমা, কী আশ্চর্য লোক মশাই আপনি! ছেলে হয়েছে আপনার। ছে-লে! সোনার আংটি আনবেন কোথায়! তা না…বই এনেছেন খোকার জন্য!
ঘাবড়ে যাওয়া সেই পিতা,যাঁর পিতা হিসাবে জন্মদিন সেই একই দিনে, বলতে পারেননি– বউ কেমন আছে? আমার বউ? আর খোকা? আমার আসলে…আমি তো আমারই উত্তরাধিকার দিয়ে যেতে চাই…যা কিছু আমার স্বর্ণসম অমূল্য…তাই…বই।
বলতে পারেননি। আনাড়ি লজ্জায়। আর তার দিন চারেক পরে নিজের স্ত্রীয়ের বুকে মুখ রেখে খুঁজতে চেয়েছিলেন নিজেরই শৈশব। যে শৈশব এখন বাস্তব। তাঁরই পাশে, ন্যাকড়া পরিহিত।
হ্যাঁ এসব আমি দেখিনি। কিন্তু অধুনা সব গুলিয়ে যায়। ঠিক কী কী যে দেখেছি, আর ঠিক কী কী আমার কল্পনা।
*****
বড় বেশি আবেগ জ্যাবড়া জেবড়ি হয়ে গেল তাই না? নাঃ মশাই না। মোটেও না। এসব মনে রাখবেন। রাখবেন। রাখতেই হবে। মনে রাখবেন যে, আপনি স্রেফ উদ্দাম সঙ্গমের সাইড-ইফেক্ট নন। এই যে আপনি ফেসবুক করেন, বক্কা মারেন, মদ খান অথবা নিদেন পক্ষে পাদেন ভড়ভড়িয়ে, এসবের কিছুই সম্ভব হত না যদি…আপনাকে এমত সক্ষম করে তুলতো কেউ বুকে চেপে ধরে।
সেসব মিথ্যে হতে দেবেন না প্লিজ। মনে রাখবেন স্রেফ আপনার মুখ দেখবে বলেই একটা লোক জীবনে প্রথম আর শেষ বার বিনা টিকিটে ট্রেনে চেপেছিল। শুধু আপনি কাঁদছেন বলেই একটি নারী রমণ-তৃপ্তির আশ্চর্য সুখ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে বলেছিল– এই শুনছ, এই, দাঁড়াও, বেটু কাঁদছে।
এসব বিফলে যেতে দেবেন না। আপনাকে মানুষ হারামি বলুক বা বলুক ঘর-ভাঙানি…কিন্তু বেঁচে থাকুন সেসব শুধরে নিয়ে।
লেকিন, চলে যাবেন না প্লিজ। মনে রাখবেন সেই যে সেই বয়সে যখন আপনি আবিষ্কার করেছেন যে মেয়েদের হিসু করার পাইপ নেই আর আলোচনা করছেন হাত পা নেড়ে, বন্ধু মহলে, সেইসব দিনের কথা। ‘ কী বলতে আছে আর কী কী করতে নেই” দিকদারি-রহিত আশ্চর্য জগতের থোড়াই কেয়ার যে মনোভাব– সেটাই অপাপবিদ্ধতা।
যে ইনোসেন্স আপনাকে শিখিয়েছিল জীবনের একটি মাত্র পাঠ– কোনো কিছুর জন্যই মৃত্যুপথকে বেছে নিতে নেই। এই কাঁদলাম দাদু মরে গেল বলে আর সেই রাত্রেই মস্ত বড় হাঁ করে কান্না জুড়লাম– আমি সেদ্ধ ভাত খাবো না। মুরগি খাবো। মুরগির ঝোল। আলু দিয়ে।
প্রজ্ঞাদীপা, শুনতে পাচ্ছেন?
এ জন্মদিন বড় বেকার হয়ে গেল আপনার বেকুবির জন্য।
******
আচ্ছা, শেষপাতে আসুন গল্প শোনাই একটা।
টুকরো ঘটনা। আমার জীবনেরই। যে ঘটনাটা ঘটেছে এই দিন পাঁচেক হলো। টাটকা। প্রিন্টিং প্রেসের কালির গন্ধ এখনও ঠাহর করা যায় যে ঘটনার প্রতিটি অক্ষরে ঘ্রাণ নিলেই। সেই ঘটনা। সে-ই ঘটনা।
সঞ্জিত এখানে এসেছে আজ মাস পনেরো হলো। বেমারির নাম– এক্সটেন্সিভলি ড্রাগ রেজিস্ট্যান্স টিউবারকিউলোসিস। বেঁচে থাকার সম্ভাবনা শতকে পঞ্চাশ। সোজা ভাষায় বলতে গেলে– মরে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। আর বেঁচে থাকলে– ইয়া গজব।
যদিও বেঁচে থাকার বিন্দুমাত্র স্পৃহা থাকার কথা নয় সঞ্জিতের। খবর পেয়েছিলাম আগে ভাগেই– এর বাড়ি ঘর নাই স্যার। মদ খায় প্রচুর। আর একটা দোকানে কাজ করে। ঠিকে। তয়, লোকটা ভালো। অই দোকানদারটা। শুতে দেয় নিজের উঠানে। মালটা সেখানেই ঘুমায় হাগে মোতে।
এমত একটি লোকের এইরকম রোগ হলে, সে যে মরে যেতেই চাইবে, চাইবে…মুক্তি পেতে, তেমনটাই তো স্বাভাবিক। তাই না? কিন্তু “তাই” হলো না। রোগ ধরা পড়ার দিন তিনেকের মধ্যেই উদয় হলো সঞ্জিতের ঠাকুমা। অথবা ঠাকুমা জাতীয় এক বুড়ি। হাজার চেষ্টা সত্ত্বেও ওয়ার্ড থেকে ভাগানো যায়নি তাকে। বুড়ি শুয়ে থাকত মেঝেতে কাঁথা বিছিয়ে। সঞ্জিতের বেডের ঠিক পাশেই। ফলত ঠান্ডা লেগে যেত। রাউন্ডে গিয়ে দেখতে পেতাম– নরম থান-কাপড়ের আঁচল দিয়ে নাক মুচছে আর বোকার মত হাসছে বুড়ি। কখনো কখনো তো সে বেটিরও চিকিৎসা করতে হত আমাদের–কমরে বড্ডো বিষ বাবা…দুইটা বড়ি দ্যান বাবা-ঠাকুর। খাই।
তা দিতাম। এবং বুড়ির তদারকিতে সঞ্জিত ভালোই ছিল মোটের ওপর। কিন্তু তারপর সেও একদিন চলে গেল। অর্থাৎ ঠাকুমা। বুড়ির নাকি ঘর দুমড়ে গেছে আচমকা ঘূর্ণি ঝড়ে। সঞ্জিতই দুঃখী দুঃখী মুখে খবরটা দিলো– ঠাকুমাও চলে যাবে স্যার। ঘর বাঁধতে লাগবে।…
এবং আবার সঞ্জিত একা হলো। এক্কেবারে একা। সুস্থ হবে যেদিন সোদিন কোন চুলায় ফেরত যাবে সেসব সুদূর সুলুক বিহীন।
অথচ সঞ্জিত হার মানলো না। টিঁকে গেল। টিঁকে গেল। টিঁকে গেল। ওজন বাড়ল। মধ্যে সেই ‘দোকানের মালিকের বারান্দা’, যেখানে ও ঘুমাত, হাগত, মুততো সেখানেও কাটিয়ে এলো একদিনের ছুটি নিয়ে। চেঞ্জ অফ ওয়েদার। হ্যাঁ। মদ খেয়েছিল সেদিন ব্যাটা। পরে স্বীকারও করেছে অবশ্য– এক কাপ বিয়ার খাইছিলাম সার। বন্ধুরা আসছিল দ্যাখা করতে…।
ঘটনা এমত।
সে সন্ধ্যায়, যেই সন্ধ্যায় বিয়ার পেঁদিয়ে ফিরেছিলেন সঞ্জিত বাবু, সেইদিন তিনি চুপিচুপি ফিমেল ওয়ার্ডে গিয়ে নাচও দেখিয়ে এসেছিলেন– ও জ্যায় জ্যায় শিবো শঙ্কর…। ভেবেছিলেন, খুব ফাঁকি দেওয়া গেছে যাহোক সিস্টারদের চোখকে।
সেসব কিছু হয়নি যদিও। পর দিন হি হি করে হাসতে হাসতে কমপ্লেইন করেছিলেন মৌমিতাদি– আপনার সঞ্জয় কিন্তু মদ খেয়ে ফিরেছিল কাল। নাচ দেখিয়েছে অমিভা- পূজাদের।
হ্যাঁ খিস্তি মেরেছিলাম মারাত্মক। মারতেই হতো, কঠোর হতে হত আমাকে চিকিৎসক হিসাবে। কিন্তু ভালো লাগছিল বড্ডো। বুঝতে পারছিলাম সঞ্জিত জীবনকে ভালো বেসে ফেলেছে। এইবার, ঠিক এইবারে ওষুধ কাজ করতে শুরু করবে। এ মহাবিশ্বের খুব কমই আমরা জানি। মৃত্যুর সাথে গত পনের বছর পাঞ্জা লড়ে আসছি তো। তাই জানি। বেঁচে থাকার অদম্য ইচ্ছাই হলো জীবনের মূল চালিকাশক্তি। নয়ত সময়ের পূর্বেই ফুরিয়ে যায় অনেক বেকুব।
সঞ্জিত তেমন নয়। সঞ্জিতের ঠিকানা– C/O রাণী অশ্রুমতি টিবি হাসপাতাল, জলপাইগুড়ি। সঞ্জিতের এর পরের ঠিকানা– C/O বাবুর বারান্দা। তাও সঞ্জিত হার মানেনি। গত এগারো মাস ধরে রোজ একুশটা মারাত্মক ‘কড়া’ ট্যাবলেট খেয়েও। তবুও, সঞ্জিত ছাপ রেখে যায় আদরের। আসক্তির। সর্বত্র।
আর সঞ্জিতই আমায় দেখিয়েছে কিভাবে জাপটে জড়িয়ে রাখতে হয় জীবনকে।
হ্যাঁ, এই তো ঠিক পাঁচদিনের আগের ঘটনা। রাউন্ডের সময় দেখলাম সঞ্জিতের রুমের জানালায় রাখা গাছটা টগবগে হয়েছে। এবং গাছটা অপরিচিত। বুধন বললো– মির্চা হ্যায় স্যার। ডল্লে। সঞ্জিত নে রাখখা হ্যায়।
উৎসুক হয়ে দেখতে গেলাম তাই ডল্লে-শোভা। আর ঠিক তখনই চোখে পড়ল গাছের একটা পাতায় কলম দিয়ে লেখা আছে – সোনজিত।
জন্মদিনের সেইটাই প্রথম উপহার আমার। এ বছরের।
২১শে মে, ২০২৪









