কোমরে ব্যথা, পায়ে নার্ভ জনিত ব্যথা এবং সায়াটিকা ব্যথা-র অন্যতম কারণ হতে পারে স্পাইনাল স্টেনোসিস। কিন্তু প্রশ্ন হল, এই ‘স্পাইনাল স্টেনোসিস’ কি রোগ?
সহজ কথায় বলতে গেলে, আমাদের মেরুদন্ডের ভেতরে যে স্পাইনাল কর্ড বা ‘সুষুম্নাকান্ড’ থাকে তার চারদিকের খালি জায়গা কমে যাওয়াকে বলে স্পাইনাল স্টেনোসিস।
মূল বিষয়ে যাওয়ার আগে মেরুদন্ডের বিষয়ে কিছু পরিভাষাজনিত বিভ্রান্তি দূর করে নেওয়া দরকার। ‘মেরুদন্ড’ কিন্তু ‘স্পাইনাল কলাম’, মাঝখানে গর্তওলা অনেকগুলো বিভিন্ন আকারের মোটা মোটা চাকতির মত ‘কশেরুকা’র সমন্বয়ে তৈরী। এর ঠিক মাঝখানে থাকে স্পাইনাল ক্যানাল। স্পাইনাল ক্যানালের ভিতরে থাকে ‘স্পাইনাল কর্ড’ বা সুষুম্নাকান্ড যেটা নরম একটা নার্ভের গোছা (অনেকটা চুলের লম্বা বিনুনীর মত) মস্তিস্ক থেকে কোমরের নীচ অবধি বিস্তৃত।
এই স্পাইনাল কর্ডের ক্যানাল বা স্পাইনাল ক্যানাল-এ স্বাভাবিক অবস্থায় সুষুম্নাকান্ড বা স্পাইনাল কর্ড ও তার চারদিকে ডুরাম্যাটার নামক পর্দা ঘেরা তরল (সেরিব্রো স্পাইনাল ফ্লুইড)-এর জন্য যথেষ্ট ফাঁকা জায়গা থাকে। স্পাইনাল ক্যানাল স্টেনোসিসে এই ফাঁকা জায়গা খুব কমে যায়। ফলে সুষুম্না কান্ড ও স্নায়ুর রক্তসঞ্চালন ব্যবস্থা কমে যায়। এমনকি স্নায়ুর উপরে সরাসরি চাপ পড়ে। ফলে সুষুম্নাকান্ড ও স্নায়ু উত্যক্ত হয়, উত্তেজিত হয় এবং স্নায়ুর সংবহন কমে যায় বা এমনকি বন্ধ হয়ে যায়।
স্পাইনাল স্টেনোসিস সাধারণতঃ কোমরে বা ঘাড়ের মেরুদন্ডে হয়। তবে পিঠের মেরুদন্ডেও হতে পারে।
বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে মেরুদন্ডে ডিজেনারেশন বা ক্ষয় থেকে স্পাইনাল স্টেনোসিস হয়। এতে স্পাইনাল ক্যানালের মধ্যে হাড়ের বৃদ্ধি, ফ্যাসেট জয়েন্টের আর্থ্রাইটাস বা বাত হয়ে ফ্যাসেট বড় হয়ে যাওয়া, লিগামেন্ট, বিশেষতঃ লিগামেন্টাম ফ্লেভাম ফুলে ওঠা এবং মোটা হয়ে যাওয়া – এইসব কারণে স্পাইনাল ক্যানাল সরু হয়ে যায়। এটা মূলতঃ মধ্যবয়স্ক ও বৃদ্ধদের হয়। এছাড়া স্লিপ ডিস্ক, মেরুদন্ডে চোট, মেরুদন্ডে সংক্রমণ, মেরুদন্ডের ভেতরে টিউমার – এইসব কারণে স্পাইনাল ক্যানাল স্টেনোসিস হয়।
এই রোগের উপসর্গ হল- কোমরে ব্যথা, পায়ে নার্ভজনিত ব্যথা, কোমর শক্ত হয়ে যাওয়া, পা অবশ হয়ে যাওয়া, হাঁটতে গেলে পা ভারী হয়ে যাওয়া, পায়ে ঝিঁঝি ধরে যাওয়া, পায়ে কামড়ানো বা মাংসপেশীর ক্র্যাম্প। হাঁটলে বা দাঁড়ালে ব্যথা বাড়ে, কোমর সামনে ঝোঁকালে, বসে পড়লে ব্যথা কমে যায়।
ঘাড়ে হলে হাত পা দুই-ই অবশ এবং দূর্বল হতে থাকে, ঝিঁঝি ধরে যায়, সূঁচ ফোটার মত যন্ত্রণা হতে পারে। হাঁটতে গেলে রোগী টাল খেয়ে যায়।
রোগীর এইধরণের উপসর্গ দেখা গেলে অস্থিবিশারদ বা মেরুদন্ড বিশারদের পরামর্শ নিতে হয়। তিনি পরীক্ষা নিরীক্ষা এবং এক্স রে, সিটি স্ক্যান, এম আর আই, নার্ডের সংবহন পরীক্ষার মাধ্যমে রোগ ও তার কারণ নির্ধারণ করবেন। তারপর কারণ অনুযায়ী চিকিৎসা করবেন। চিকিৎসা মূলতঃ ওষুধ, গরম শেঁক, বিশ্রাম, ব্রেস বা বেল্ট, মেরুদন্ডে বা নার্ভের গোড়ায় ইঞ্জেকশন। এছাড়া ওজন কমানো, ধুমপান বন্ধ করা ইত্যাদিতে কিছু কাজ হয়।
এসবে কাজ না হলে এবং পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে থাকলে মেরুদন্ডে অপারেশন করতে হয়। অপারেশন মূলতঃ অতিরিক্ত হাড় ও গজিয়ে ওঠা নরম টিস্যু বাদ দিয়ে স্পাইনাল কর্ড ও নার্ভের উপর চাপ কমানো। এছাড়া প্রয়োজন হলে স্ক্রু-রড দিয়ে হাড় জুড়ে দেওয়া। এসব অপারেশন সাবেক পদ্ধতিতে বড় করে কেটে অথবা ক্ষেত্রবিশেষে মাইক্রো বা এন্ডোস্কোপিক পদ্ধতিতে করা হয়।










