সূর্যসেন থেকে ওঠা যাত্রীটির সাথে ঠেসাঠেসি ভিড়ে পাশাপাশি থাকা
কালীঘাট থেকে ওঠা যাত্রীর একটাই মিল,
দুজনের গন্তব্য এক।
এসপ্ল্যানেড, বাঙালির ধর্মতলা।
বাকি পুরো বিপরীতে চলা।
সূর্য সেন সেখান থেকে রেড রোড যাবে,
পুজোর কার্নিভেল মিস করে না সে।
কালীঘাট চলেছে গোটা পুজোয় গিয়েছে যেখানে, সেই থানে,
গুটিকয় ডাক্তার রয়েছে যেখানে দশদিন উপবাসে,
গিয়েছে আই সি ইউ বেশ কয়জন,
তবুও নিখাকি হতে তৈরি হচ্ছে আরো কিছু অভয়া-সেনানী..
একবার দেখা করে সে যাবে হাঁটতে ভিড়ে রাণী রাসমনি।
কপাল ভীষণ ভালো,
পাশাপাশি দুটো সিট ফাঁকা হলো পরের স্টেশনে,
(কিমাশ্চর্যম, সেটা যতীন দাস পার্ক,
নাম তো শুনা হোগা,
যে দধীচি দেহ দেন দেশমাতা-মুক্তিতে তেষট্টি দিন অনশনে),
তারপর যথারীতি পাশাপাশি বাঙালিরা বসলে যা হয়,
হয়ে গেলো আলাপ
আর শুরু হলো কথা-বিনিময়।
‘ম্যাড়ম্যাড়ে পুজো গেলো, ধুর! যদিও ঘুরে ক’টা দেখেছি ঠাকুর,
ওই আর জি কর-এর পর আনন্দ ফিরছে না আর, বুঝলেন, তাই গিয়ে দেখি পুজো কার্নিভেলে,
জম্পেস প্রোগ্রাম দেখে কিছু সুখ যদি মেলে!’
বক্তা সূর্য সেন থেকে ওঠা যাত্রীটি।
কালীঘাট হাসে মিটিমিটি।
তারপরে বলে, ‘আনন্দ খুঁজতে গিয়ে যাচ্ছেন ভুল ভিড়ে চলে,
এ বছর উপোসী ছিলাম টানা বারো ঘন্টা অথচ অঞ্জলি ছিলো না,
বিশ্বাস করুন,
তাতে যে শান্তি পেয়েছি, আজ অবধি নেই তুলনা।:
‘ওওও.. সেই প্রতীকি অনশন! এইটা বুঝি না মশাই,
আমিও তো সবার মতোই জাস্টিস চাই,
তাই বলে দশ দফা দাবীতে না খেয়ে বসে যাওয়া আমরণ অনশনে,
ভীষণ বোকামি।
ঘরের না খেয়ে কেউ মোষ তাড়াতে গেলে বনে,
লাভটা কী হবে অন্তিমে!
সবই দাদা তা দেওয়া অশ্বের ডিমে,
দাবীগুলো ন্যায্য তা মানি,
বাদ যাবে দালালের কাটমানি, রোগীদের কমবে হয়রানি,
বুঝলাম সবই।
কিন্তু সে লাভ তো জনতার হবে,
ওরে ও বোকার দল, তোরা কোন রাজাগজা হবি! ‘
বলতে বলতে আসে রবীন্দ্র সদন।
কাকতালীয়তে তখন স্টেশনে বাজছে গান..
‘বিধির বিধান কাটবে তুমি কি এমন শক্তিমান’
কালীঘাট বলে ওঠে
‘ভাগ্যিস এ ভাবনা ভাবেননি যতীন দাস, সূর্য সেন, নেতাজী সুভাষ,
নয়তো পাঠক্রমে আজও পড়তে হতো ব্রিটিশের ইতিহাস!
ওরা যে স্বপ্ন দেখেছে,
আপনি বা আমি সেটা দেখতে পারিনি,
অচলায়তন ধরে ঝাঁকুনি দিয়েছে একঝাঁক রঞ্জন, বিশু নন্দিনী,
রক্তকরবী পড়েছেন বা দেখেছেন আশা করি?’
সূর্য সেন বলে,
‘হ্যাঁ মশাই, এখনো সময় পেলে খুব বই পড়ি। বলছেন কিছু একটা হবে,
বলছেন আশা আছে তবে এই শান্তিপূর্ণভাবে গণ-বিপ্লবে?’
কালীঘাট বলে, ‘সেটা আগামীই জানে।
আমি শুধু জানি, যে স্বপ্ন হারিয়ে ফেলেছে দেশ,
ওরা আছে তারই সন্ধানে।
ঝমঝম করে ট্রেন ঢোকে ‘ময়দান’এ।
সূর্য সেন থতমত খায়। মৃদুস্বরে বলে,
‘সারা পুজো নিজেকে বুঝিয়েছি এসব কোঁদল শুধু শাসক আর বিরোধী’র দলে,
কি জানেন, এইবারে মা’র মুখ দেখেছি যে যে মণ্ডপে,
বিষাদ দেখেছি শুধু, যেন উৎসবে তিনি খুশি না আদপে।
বলছেন, যে নিরানন্দ মনে বসত করছে আজ, কিছুটা কাটবে তার মঞ্চতে গেলে?’
কালীঘাট জিজ্ঞেস করে ‘ কী মনে হয়, কেটে যাবে সে অ-সুখ পুজো কার্নিভেল-এ?
আবার অভয়া কেউ হবে না কখনো, ওদের ওই দাবী গেলে মিটে’
ট্রেনের দরজা খুলে যায়। যাত্রীরা ওঠা নামা করে পার্ক স্ট্রিটে।
ওরা উঠে দরজার দিকে যায় ভিড় ঠেলে।
সূর্য সেন বলে ঠাট্টা’র ছলে ‘আপনার রাসমনিতে একশো তেষট্টি জারি,
যাওয়াটা কি খুব দরকারি?
পুলিশ ভরতে পারে ধরে নিয়ে জেলে,
বরং আসুন, একসাথে যাই সামান্য দূরে হওয়া পুজো-কার্নিভেলে
এ বাজারে ওটাই কিন্তু শুধু নিরাপদ ভেন্যু!’
কালীঘাট হেসে বলে
‘বরং চাখবো বসে পুলিশী লকআপে দেওয়া রাত্রের মেনু,
তেষট্টি কথাটাতে বিপ্লব লেগে আছে আজও অমলিন,
অতদিনই অনশনে চব্বিশে ঝরে গেছিলেন যে যতীন।
আপনি আনন্দ খুঁজতে যান ওই রোড রেডে,
আমি শান্তি খুঁজি গান্ধীকে আঁকড়িয়ে এসপ্ল্যানেডে।’
ট্রেন থেকে নেমে ওরা চড়েছে এসকালেটর,
বেরিয়ে দুজন যাবে দুইদিকে চলে..
হঠাৎই সূর্যসেন ফিসফিস করে ওঠে বলে,
‘চলুন, বিসর্জনে যাওয়া দেবীপ্রতিমা ছেড়ে আজ আগামীর আগমনী দেখি!’
কালীঘাট বলে ওঠে ‘সে কি! একজন লোক কমে যাবে তবে পুজো-কার্নিভেলে!’
‘সে যাকগে!’সূর্য সেন বলে ‘ বরং দুজনে দেখি রাতের কি মেনু আজ জেলে’
ধর্নামঞ্চের দিকে এগোতে এগোতে
কালীঘাট চোখ বড় করে বলে ‘সত্যি?’
তখনই কে একটা যেন চিৎকার করে বলে
‘আদালতে জিতে গেছি, উঠে গেছে একশো তেষট্টি!’










