১. আত্মকথন -১
২২ আগস্ট, ২০২৪ঃ
ঘটনার দিন সকালে প্রবল ব্যস্ততার মধ্যে আর. জি. করের নাম বারবার ভেসে উঠছিল, কী ঠিক ঘটেছে জানতে জানতে আমার ক্ষেত্রে অন্তত সন্ধ্যা হয়ে যায়। এখানে উদ্ধৃত খবরের অংশটি তার পনেরো দিন পরের। কারুরই কার্যক্রম এত পরিষ্কারভাবে জানা ছিল বলে মনে হয় না আমার।
“৯ অগস্ট আরজিকর মেডিক্যাল কলেজের জরুরি বিভাগের চারতলার সেমিনার হল থেকে দেহ উদ্ধার হয়। পুলিশের তরফে জানানো হয়েছে, ওই দিন সকালে ১০টা ১০ মিনিটে টালা থানায় খবর পৌঁছয়। সেই সময়ে অভিযোগ (জিডি) দায়ের হয়। সকাল ১০টা ৩০ মিনিট নাগাদ ঘটনাস্থলে পৌঁছয় পুলিশ। ঘটনাস্থল সংরক্ষণ করা হয়। সকাল ১১টা নাগাদ ঘটনাস্থলে পৌঁছয় পুলিশের হোমিসাইড শাখা। দুপুর ১২টা ২৫ মিনিটে ঘটনাস্থলের ভিডিয়ো তোলার জন্য পৌঁছন ভিডিয়োগ্রাফার। দুপুর ১২টা ৪৪ মিনিটে চিকিৎসককে মৃত ঘোষণা করেন আরজি করের ইএমও (ইমার্জেন্সি মেডিক্যাল অফিসার)। দুপুর ১টা ৪৭ মিনিটে অস্বাভাবিক মৃত্যু (ইউডি)-র মামলা রুজু হয়। এই নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সুপ্রিম কোর্ট। প্রধান বিচারপতি ডি.ওয়াই. চন্দ্রচূড়ের নেতৃত্বাধীন তিন বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চ প্রশ্ন তুলেছে, কী ভাবে ময়নাতদন্তের আগে ‘অস্বাভাবিক মৃত্যু’ বলে দেওয়া হল। তা হলে ময়নাতদন্তের প্রয়োজন হল কেন?
দুপুর ৩টে ৫০ মিনিটে নির্দেশ জারি করেন অতিরিক্ত মুখ্য বিচার বিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেট। বিকেল ৪টে ১০ মিনিটে ঘটনাস্থলে পৌঁছন বিচার বিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেট। বিকেল ৪টে ২০ মিনিট থেকে ৪টে ৪০ মিনিট পর্যন্ত চলেছিল সুরতহাল (ইনকোয়েস্ট)। বিকেল ৫টা ১০ মিনিটে মর্গে নিয়ে যাওয়া হয় চিকিৎসকের দেহ। সেখানেও হয় ভিডিয়োগ্রাফি। সন্ধ্যা ৬টা ১০ মিনিটে ময়নাতদন্ত শুরু হয়। সন্ধ্যা ৭টা ১০ মিনিট পর্যন্ত চলে ময়নাতদন্ত। রাত ৮টার সময় আরজি কর হাসপাতালের ঘটনাস্থলে পৌঁছয় ডগ স্কোয়াড। সেখানকার থ্রিডি ম্যাপিং করা হয়। রাত সাড়ে ৮টার সময় পরিবারের হাতে ওই চিকিৎসকের দেহ তুলে দেওয়া হয়। রাত ৮টা ৩০ মিনিট থেকে ১০টা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন জিনিস বাজেয়াপ্ত করার প্রক্রিয়া চলে। রাত ১১টা ৪৫ মিনিটে দায়ের করা হয় এফআইআর।”
১0 ই আগস্ট, ২০২৪, সকাল
জয়েন্ট প্ল্যাটফর্ম অফ ডক্টর্স্-এর ডাকে আর. জি. কর – এ বিকেল ৪ টায় জমায়েত । ৯ই আগস্ট বহু ডাক্তার যাঁরা ওখানে ছিলেন, তাঁরা জমায়েত হন আবার। জমায়েত হন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মীরা ।
১0 ই আগস্ট, ২০২৪, সন্ধ্যা
টিভিতে অভয়ার মা বলছেন,‘ মা বলে বলছি না, বিশ্বাস করুন, সোনার প্রতিমার মতো মেয়ে ছিল আমার। এত ভালো মেয়ে। আমাকে আত্মহত্যা কেন বলা হল? কেন আত্মহত্যা করবে ও?’ আর অভিষেক ব্যানার্জি বলছেন, ‘খুব অন্যায়, দোষীদের এনকাউন্টার করে মেরে দেওয়া উচিত।’ মুখ্যমন্ত্রী সওয়াল করছেন ফাঁসির।
সুস্থতা, মতিস্থিরতা, বিচক্ষণতার শেষটুকুও অন্তর্হিত – the very last vestiges of sanity have disappeared ……
১১ই আগস্ট,২০২৪
ভিনীত গোয়েল বলছেন, খুনিকে ধরা হয়েছে এবং আমরা সন্দেহ করছি নেক্রোফিলিয়া। এমনভাবে বলছেন যেন এ-জিনিস তিনিই পৃথিবীতে প্রথম আবিষ্কার করলেন। এবং এতবার আশ্বস্ত করছেন ‘আমরা আমাদের কাজ করছি, আপনারা গুজব ছড়াবেন না’ বলে যে তিনি নিজেই নিজের কথা বিশ্বাস করছেন না, এটা স্পষ্ট।
১২ ই আগস্ট, ২০২৪, ডায়রির অংশঃ
আর.জি.কর প্রসঙ্গ এবং এনকাউন্টার বিষয়ে দু-চার কথাঃ
দোপ্দি কী ভেবে নিল। তারপর বলল, ‘ঘর যা। কী হবে জানি না, মোরে ধরলে তুরা মোরে চিনবি না।’
–তু পালাতে পারিস না ?
–নাঃ । কতবার পালাব বল ? ধরলে বা কী করবে বল? কাঁউটার করে দিবে, দিক।
মুসাইয়ের বউ বলল, ‘মোদের আর কুথা যাবার নাই।’
দোপ্দি আস্তে বলল, ‘কারো নাম বলব না।’
দোপ্দি জানে, এতদিনে শুনে শুনে শিখেছে, কেমন করে নির্যাতনের সঙ্গে মুকাবিলা করা যায়। যদি নির্যাতনে শরীর ও মন ভেঙে পড়ে তখন দোপ্দি নিজের জিভ দাঁতে কেটে ফেলবে। সেই ছেলেটা কেটে ফেলেছিল নিজের জিভ। তাকে কাঁউটার করে দিল। কাঁউটার করে দিলে তোমার হাত থাকে পেছনে বাঁধা। শরীরের প্রতিটি হাড় থাকে চূর্ণ, যৌনাঙ্গে ভীষণ ক্ষত। কিলড বাই পোলিস ইন অ্যান এনকাউন্টার… আননোন মেল .. এজ টুয়েন্টি টু…
এইসব ভাবতে ভাবতে পথ চলতে চলতে দোপ্দি শুনল কে তাকে ডাকছে, দোপ্দি!……”
মনে পড়ছে নিশ্চয়ই মহাশ্বেতা দেবীর দ্রৌপদীর কথা? ছোটোবেলা থেকে যে(ধরণের) লেখা পড়ে ‘কাঁউটার’/এনকাউন্টার আমাদের কাছে এমন একটা শব্দ হিসাবে প্রতিভাত হয়েছে, যা রাষ্ট্রশক্তির কুৎসিততম দিকটিকে প্রতিনিধিত্ব করে। ভয় পেয়ে পিছন থেকে ছোবলানোর উপায় হিসাবে যা রাষ্ট্র উদ্যাপন করে থাকে। ‘এক্সট্রা-জুডিসিয়াল কিলিং’ এর মত। কিন্তু আমাদের দেশে সাম্প্রতিককালে এনকাউন্টারের হাই প্রিস্ট উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীও কিন্তু এনকাউন্টার করা উচিত বলে (ভবিষ্যৎ কালে বা future tense এ) প্রকাশ্যে হুমকি দেন না, করেই দেন। তার একটা কারণ আছে। কারণটা মহান নয়, তবু সেটা কারণ। একজন নিরস্ত্র মানুষকে বিচারের আগে পুলিশ আইনত মেরে ফেলতে পারে না কিছুতেই (এবং বিচারের পরেও নয়)। কাজেই আত্মরক্ষার্থে বলতে হয় যে, পালানোর চেষ্টা করছিল, আহত করার চেষ্টা করছিল, গুলি ছুঁড়ছিল, তাই পারষ্পরিক যুদ্ধে হত হয়েছে। ভারতবর্ষে অধুনাকালে এর সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ সোহ্রাবুদ্দিন শেখ এনকাউন্টার (Sohrabuddin Shaikh, Kausar Bi, Tulsiram Prajapati)। যে এনকাউন্টার ভুয়ো বলে দাবি উঠেছিল (তার সম্পর্কে আপনারা যে-যা জানেন তার থেকেও বিশদ জানতে গেলে সাংবাদিক নিরঞ্জন টাক্লের বই “Who Killed Judge Loya” এ-মুহূর্তে পড়ুন। গুজরাটের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী হরেন পান্ডিয়া থেকে যা শুরু হয়, নিরঞ্জন দেখাচ্ছেন সেটা ঠিক কীভাবে অনিঃশেষ মৃত্যুমিছিলে পরিণত হয়, সি.বি.আই-এর বিচারক ব্রিজগোপাল লোয়া এবং তার পরেরও বেশ কিছু হত্যাসহ।) যাই হোক, রাষ্ট্রকে একথা অধিকাংশ ভুয়ো এনকাউন্টারের সম্পর্কে বলতেই হয় যে এনকাউন্টার ছাড়া উপায় ছিল না। সোহ্রাবুদ্দিন-এর ভাই রুবাবুদ্দিন শেখের মতো কেউ নিজের জীবন বাজি রেখে এগিয়ে মামলা করতে এলে, বাইরের মানুষ কিয়দংশে জানতে পারেন ঘটনা, নতুবা তাও নয়। বুক বাজিয়ে এনকাউন্টার করে মেরে দিয়েছি, পুলিশ এটা সাধারণভাবে বলে না কারণ এটা অসাংবিধানিক, বেআইনী এবং পুলিশ আইনের উর্দ্ধে নয়।
তাহলে কী করে একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হয়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তথাকথিত দোষীকে সরাসরি ‘এন্কাউন্টার’-এর পক্ষে সওয়াল করতে পারেন ঘটনা ঘটার ২৪ ঘন্টাও পার না হতে হতে? এটা আইনের খোলাখুলি বিরুদ্ধাচারণ নয়? আর. জি. করের প্রসঙ্গে তাঁর এই knee-jerk reaction এর পেছনের কারণ অনেকেই অনুধাবন করেছেন এবং ঠিকভাবেই করেছেন। কোনো একজনকে কোনোক্রমে দোষী খাড়া করে দিলে জনরোষ তার দিকে চালিত করলেই সরকারের দায় অনেকখানি কমে যায়।
কিন্তু এবার বোধহয় এত সহজে সবাই ভুলবেন না। দেখা যাক।
ডায়েরির অংশ (১৫ ই আগস্ট, ২০২৪)ঃ
রাত দখলের রাতে অযুত মেয়ে এবং ট্রান্স/কুইয়্যার মানুষ এবং পুরুষ রাস্তায় নেমে এল মোমবাতি, মশাল, পোস্টার, ব্যানার, পতাকা হাতে। কিন্তু আর.জি.করে তার আগে যা হয়েছিল সাক্ষ্যপ্রমান নষ্ট করার জন্য, অর্থাৎ হঠাৎ মৌখিক নির্দেশে রেনোভেশনের কাজ শুরু করে সেমিনারের হলের আশপাশ ভেঙে দেওয়াসহ, তারপরও ১৪ই আগস্ট যে আর কিছু করার থাকতে পারে সেটা আমাদের অভিজ্ঞ মাথাতেও মাথায় আসে নি। কিন্তু তাও হল। কোথাও খুন, ধর্ষন, ধ্বস্তাধ্বস্তির চিহ্ন যদি থেকে যায় ভেবে সমস্ত ঘর – এমেরজেন্সি, চেষ্ট থেকে শুরু করে সব ঘর তছনছ করা হল, ভেঙে দেওয়া হল প্রায় সব গুরুত্ত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি, মারা হল নার্স, জুনিয়র ডাক্তার, রোগীর আত্মীয়, পুলিশকেও, ধ্বংস করা হল ডাক্তারদের প্রতিবাদস্থল। সেমিনার রুম ওই আক্রমণ থেকে কোনোক্রমে বেঁচে গেছে বলে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলার সঙ্গে সঙ্গে ঘনীভূত হল ভয়ঃ এত পূর্বপরিকল্পিত যে আক্রমণ, সেটা কী করে সেমিনার হল বাদ দিল?
একমাত্র উত্তর, ওই ঘরে কিছু হয়ই নি। সব চিহ্ন ছিল অন্যত্র।
২. ডাক্তারের সঙ্গে কথোপকথন
পোস্ট-মর্টেম
- পুরোনো প্রশ্ন, তবে আপনাকে করার সুযোগ হয় নি। অভয়াকে নিয়ে আপনার ব্যক্তিগত মতামত কী?
- ব্যক্তিগত মতামত কেন?
- ডাক্তার হিসাবে।
- ডাক্তার হিসাবেই আলাদা ব্যক্তিগত মতামতের জায়গা নেই। সাংগঠনিক মতামত অবশ্যই আছে।
- কী সেটা?
- দুটো মূল কথাঃ এক, সমস্ত আঘাত অ্যান্টিমর্টেম। দুই, সাধারণ ধর্ষণ আর খুন এটা নয়। তাহলে এত আঘাত, এত মারাত্মক আঘাত করতে হয় না। এই দ্বিতীয়টার থেকে বোঝা যায় মেয়েটি কতটা ভয় উত্পাদন করেছিল প্রভাবশালীদের মনে। হুইস্ল্ব্লোয়ার হিসাবে। ও যে হুইস্ল্ব্লোয়ার ছিল সেটা আমরা প্রথম এক-দুদিনে বুঝতে পারিনি। কিন্তু প্রথম থেকেই — এই যে পুলিশ কমিশনার সঞ্জয় রায়কে ধরার পর বলছিলেন, আগে খুন, পরে রেপ, মানে নেক্রোফিলিয়ার গল্পটা – এটা আমাদের কখনও মনে হয় নি। যখন আমাদের লোকজনেরা, ডাক্তারেরা পোস্ট-মর্টেম রিপোর্ট দেখে তাতে পরিষ্কারভাবে বলা ছিল সব আঘাত মৃত্যুর আগে ঘটা। অ্যান্টিমর্টেম। সেই পোস্ট-মর্টেম রিপোর্টেই যে-ধরণের আঘাত ছিল স্কালবোনে – আমাদের মাথার খুলি অনেক ছোটো ছোটো হাড়কে জুড়ে তো হয় – এই খুলির যে সুচার বা জাংশন বলি আমরা, সেই সুচার-এর নিচে ব্লিডিং। সুচার-এর নিচে ব্লাড জমে আছে, এটা যদি মাথা ঠোকা না হয় বা ভারি কিছু দিয়ে আঘাত না করা হয়, তাহলে হবার কথাই নয়। এর মধ্যে প্রতিশোধের জায়গাটা স্পষ্ট। আর, তারপরে তো যখন আমরা দেখলাম, ঘটনার দিন থেকেই, সকাল থেকেই যেভাবে একে চাপা দেওয়ার জন্য উঠেপড়ে লাগল, পুলিশ কমিশনার, হেল্থ সেক্রেটারি, এম.এল.এ, সুদীপ্ত রায় তাতে করে এর মধ্যে গন্ডগোল যে কিছু আছে সেটা তো আমাদের মনে হচ্ছিলই। আর আর.জি.করের প্রিন্সিপাল সম্পর্কে আমাদের সবার ধারণা আছে। দুবছর আগে আর.জি.করের ছাত্ররা একটা আন্দোলন করেছিল। হাউসস্টাফশিপের সিলেকশন যাতে ঠিকভাবে হয় তার জন্য, হোস্টেলের জন্য, এ-ধরণের কিছু ডেমোক্রেটিক দাবি ছিল । সেই আন্দোলনঅটার পাশে আমরা দাঁড়িয়েছিলাম, মানে আমাদের যে সংগঠন, ওয়েস্ট বেঙ্গল ডক্টরস ফোরাম, এবং ডাক্তারদের যে যৌথমঞ্চ তার পক্ষ থেকে। তো শেষ অবধি আন্দোলনটায় জিত হয় নি। জিত হয় নি, মানে স্থানীয় যে অবস্থা ছিল সেটা আমাদের পক্ষে ছিল না। যারা আন্দোলন করছিল তাদের একটা বড়ো অংশকে ভয় দেখিয়ে মেনে নিতে বাধ্য করা হয়। দুজন ইন্টার্ন, যারা মানেনি প্রিন্সিপালের কথা, তাদের ইন্টার্ণশিপ প্রায় এক বছর আটকে থাকার পর হাতকোর্টে গিয়ে ছাড়িয়ে আনতে হয়। সে-সময় আমাদের বিরুদ্ধে দুটো এফ.আই.আর হয়। আমার এবং এখন যে ওয়েস্ট বেঙ্গল হেলথ ফোরাম-এর প্রেসিডেন্ট, কৌশিক চাকীর। শেষ পর্যন্ত কিছু করতে পারেনি এসব করে অবশ্য।
গতবছরও নন-মেডিকাল ডেপুটি সুপার, আখতার আলি যখন অভিযোগ করে, রাজ্য পুলিশের দুর্নীতি দমন শাখা সে-সময় হেল্থ্ সেক্রেটারিকে চিঠি দেয়। তদন্ত করে জানান কী হয়েছে – সেটা নিয়ে হেল্থ্ সেক্রেটারি চেপে বসে থাকে্ন। এটা নিয়ে আমরা গতবছর, মানে ২০২৩-এ, আমরা হেল্থ্ সেক্রেটারিকে চিঠি দিই। সেটাও তিনি চেপে বসে থাকেন। সে-অভিযোগ নিয়ে এখন দুর্নীতির মামলাটা হচ্ছে।
- আখতার আলির অক্ষত থাকার…
- আখতার আলির পিছনে পোলিটিক্যাল সাপোর্ট আছে। এটা আর আলোচনা না করলাম এ-মুহূর্তে।
- তাও এটা করাটা সাহসের ব্যাপার। কিন্তু অভয়ার সেই ফল্ ব্যাক অপশন ছিল না, অবশ্যই।
- না সাধারণ বাড়ির মেয়ে, ওর বাড়িতে গেলেই তো বোঝা যায়, যাই হোক, দুজনকে (ডাক্তার) নিয়ে আমরা আগের বার আর. টি. আই করি, তাদের মধ্যে একজন অভিজিৎ ভক্ত, একজন সন্দীপ ঘোষ। অভিজিৎ ভক্তের সব তথ্য আমাদের দিয়েছে, সন্দীপ ঘোষের একটা তথ্যও হাতে আসেনি আমাদের। সে যাই হোক, অভয়ার পরিবার নিম্ন-মধ্যবিত্ত. বাবা সেলাই-এর ব্যবসা চালান/চালাতেন। টালির ঘরে থাকতেন, অভয়া কল্যাণী থেকে এম. বি. বি. এস. করেছে, তারপর এম. ডি. পাওয়ার আগে যে-সময়টা, অনেকে যেমন বাবা-মার পয়সা থাকলে বাড়িতে বসে পড়াশুনা করে, ও সেরকম করে নি, ও বিভিন্ন জায়গায় কাজ করেছে, আর. এম. ও-র ডিউটি করেছে, প্র্যাকটিস করেছে, তারপর নিজে আস্তে আস্তে বাবাকে সম্ভবত সাহায্যও করেছে বাড়িটা তৈরি করতে। ওর পেছনে কোনো সংগঠিত সাপোর্ট ছিল না। চিকিৎসার ক্ষেত্রে নানাকিছু আর সহ্য করতে না পেরে প্রিন্সিপালের কাছে গিয়েছে, তার আগে সম্ভবত ডিপার্টমেন্টাল হেডকে বলেছে। যে ডিপার্টমেন্টাল হেডকে সরিয়েছে সে নয় কিন্তু, তার খুব একটা কিছু করার ছিল না। তার কারণ, সে হেড-এর দায়িত্ব নিয়েছে ১ তারিখ। তার আগে অন্য কেউ ছিল। তাকে বলেছে, তারপর প্রিন্সিপালকে বলেছে, ভেবেছে এটাই তো আমার কাজ…
- সংঘবদ্ধ হয়ে যেতে পারত না কি?
- আর. জি. কর.- এ বা বেশির ভাগ মেডিকাল কলেজে, একদম পরিষ্কারভাবে বলছি যে, আমাদের সময় যেটা সম্ভব ছিল, মানে আমাদের এটা একা করতে হতো না, আমরা যখন প্রতিবাদগুলো করতাম, আমরা সংগঠিত প্রতিবাদ করতাম, কারণ সেখানে একটা সংগঠন ছিল, এখন মেডিকাল কলেজ বাদ দিয়ে অন্যান্য কোনো কলেজে তো সংগঠন নেই।
আঘাত
- সম্ভবত যেটা হয়েছিল সেটা হচ্ছে যে, ওকে অন্য কোথায় মেরে ওখানে এনে রেখেছিল, যেভাবে রেখেছিল তখন (যেখানে দেহ ছিল), মানে রেপ বা মার্ডার হলে যেভাবে রেসিস্ট করে, রেসিস্ট করার সময় যেভাবে ইনজুরি হয়, এবং যেভাবে তাতে জিনিসপত্র থাকার কথা, তার কিছুই ছিল না।
- অভয়ার আঘাতের ধরণ দেখে একসময় মনে করা হয়েছিল যে, ওর ওপর একটা গণপিটুনি ধরণের কিছু ঘটেছিল।
- অনেকগুলো ইঞ্জুরি আছে। আমি যেটা শুনেছি যে কথা পোস্ট-মর্টেম রিপোর্টে শরীরের পিছনের দিকের যে ইঞ্জুরিগুলো, সেগুলোর উল্লেখ নেই। কিন্তু প্রথমে যারা দেখেছে বডি, তারা কিন্তু দেখেছিল যে শরীরের সামনে পিছনে, উভয়দিকেই ইঞ্জুরি মার্ক, এবং অনেকগুলো ইঞ্জুরি।
- প্রবল যন্ত্রণা, মারাত্মক ব্যথার মধ্যে দিয়ে গেছে তাহলে। হাসপাতালের কোনো এক ঘরে গণপিটুনির আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না, তাহলে।
- ইঞ্জুরির ধরণ দেখে তাই মনে হচ্ছে।
আদালত-নামচা
- ৯ তারিখ আমরা সকালে খবর পাই এবং বিকেল থেকেই জমা হতে শুরু করি স্পটে। ১১ তারিখে আমাদের পক্ষ থেকে ৭ জন ডাক্তার – মহিলা এবং পুরুষ – অভয়ার বাড়িতে যায় এবং বাবার কাছে পোস্ট-মর্টেম রিপোর্টের যে কপি ছিল, সেটা দেখে। ১২, অর্থাৎ সোমবার আমাদের একটা প্রেস কনফারেন্স হয় আমরা আর আই. এম. এ মিলে। তার আগে শণিবার অর্থাৎ ১০ তারিখ আর.জি.কর-এ একটা জমায়েত ছিল। ১৩ তারিখে হাইকোর্ট সুও মোটো কেসটা নেয় এবং সি.বি.আই ইনভেস্টিগেশন-এর কথা বলে দেয়। তার আগে অবশ্যই মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, আপনারা যদি চান সি. বি. আই ইনভেস্টিগেশন করাব। দোষীকে সাতদিনের মধ্যে ফাঁসি, পারলে এক্ষুনি এনকাউন্টার করা উচিত, এসব কথা চলছে। হাইকোর্টের এটাকে নিয়ে নেওয়াটা আমাদের কাছে আশাব্যঞ্জক ছিল। তার কারণ, হাইকোর্টের যে চিফ জাস্টিস তিনি কেসটার ব্যাপারে পসিটিভ ছিলেন, আর সাধারণভাবে উনার সম্পর্কে যেটা জানা যায় উনি আপরাইট, সৎ তার দুদিন বাদে সুপ্রিম কোর্ট আবার এটাকে সুও মোটো নিয়ে নেয়। তখন থেকেই আমরা মনে করতে থাকি যে এর মধ্যে অন্যকিছু আছে, যেন হাইকোর্টের হাত থেকে নিয়ে নেওয়ার জন্যই এটা করা হল।
এখন সুপ্রিম কোর্ট প্রথমে যতটা প্রো-অ্যাকটিভ ছিল, তাড়াতাড়ি হিয়ারিং-এর ডেট দিচ্ছে, শুনছে, অনেকটা সময় ধরে শুনছে, কয়েকটা হিয়ারিং-এর পর থেকে হিয়ারিং-এর মধ্যেকার গ্যাপ বাড়তে থাকল। তারপরে ডেট দেওয়া হল, শুনানি হলনা। পরের দিন আবার সময় দেওয়া হল, পরের দিনও শুনানি না হয়ে তারপরের দিন আবার শুনানি দেওয়া হল। এবার শেষ যেটা হল নতুন চিফ জাস্টিস, তিনি তো তিনমাসের পর একটা সময় দিলেন। সুপ্রিম কোর্ট যেটা করছে, সেটা দোষীদের আড়াল করার জন্য বলেই মনে হয়, এবং সেখানে রাজ্য সরকার যে-হারে পয়সা খরচ করে যে-ধরণের উকিলদেরকে নামাচ্ছে, সেটা একেকজন উকিল, মানে কপিল সিব্বাল-এর একেকটা হিয়ারিং- এই ১৫ লাখ টাকা, ১৭ লাখ টাকা করে…সে একটা টিম নিয়ে নামছে, বড়ো টিম নিয়ে, সুপ্রিম কোর্টটাকে আমরা, আমাদের যারা ল’ইয়ার, জয়েন্ট প্ল্যাটফর্ম অফ ডক্টরস এর পক্ষে করুণা নন্দী এটা লড়ছেন প্রো বোনো। আমরা কেবল উনাকে জোর করে উনার টিমের যে খরচ, সেই খরচটা বেয়ার করছি। প্রথমে তো এরা কেউই কেসগুলো নিতে রাজি ছিলেন না। ইন্দিরা জয়সিং, করুণা নন্দী, বৃন্দা গ্রোভার — এদের ধারণা হচ্ছে যে মমতা ব্যানার্জীকে সরিয়ে বিজেপিকে ক্ষমতায় আনার… যাই হোক্, করুণা নন্দীকে আমাদের লোকেজনেরা বোঝায়। তারপর ইন্দিরা জয়সিং এবং বৃন্দাকেও একই জিনিস করে। আমাদের উকিলেরা স্টেট-এর আর্গুমেন্ট -এর যে ফাঁক-ফোঁকরগুলো এইটা তারা ভালোভাবেই পয়েন্ট আউট করতে পেরেছে। কিন্তু শেষ অবধি তো কেসটা হচ্ছে লোয়ার কোর্টে। এবং আমাদের সেখানে পার্টি হবার কোনো উপায় নেই। সিনিয়র ডাক্তারদের সংগঠন সেখানে পার্টি হতে পারে না। পার্টি হতে পারে ওর বাবা-মা। এবারে ওর বাবা-মার সঙ্গে বৃন্দা গ্রোভারের যে কথাবার্তা হয়েছিল সেখানে তিনটে কোর্টেরই আইনী জায়গাটা উনি দেখবেন, বা ওঁর টিম এরকম একটা কথা হয়েছিল। শেষ অবধি যেটা ওরা জানালো আমাদেরকে যে ওরা বৃন্দা গ্রোভার-এর টিমকে নিয়ে সন্তুষ্ট নয়, এবং বৃন্দা গ্রোভারও একই কথা বলছেন যে, একমাত্র সঞ্জয় রায়ই দোষী, সি. বি. আই. যে তদন্ত করছে সে তদন্তটাই ঠিকঠাক। এবং পরে যখন আমাদের উকিল পাল্টানো হয়, তখন আমরা বাবা-মাকে সাহায্য করি, to find out other lawyers. করুণা নন্দী জানিয়ে দেন প্রথমে যে ওঁর পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের নিচের দায়িত্ব নেওয়া সম্ভব না। তো, আমরা হাইকোর্টে এবং লোয়ার কোর্টে এমন উকিলদের নিয়োগ করি যারা করুণা নন্দীর সঙ্গে সম্পর্ক রেখে কাজ করতে রাজি আছে। সে-অনুযায়ী শুরু হয়েছে টিমের কাজ। সেখানে স্টেটের উকিলের সঙ্গে নাকি সি.বি.আই.উকিলের -এর ভালো সম্পর্ক সর্বসমক্ষে দেখা যাচ্ছে– সি. বি. আই এর যে এস. পি[1] এখানে দায়িত্ব নিয়ে এসেছিলেন, তিনি ভালো অফিসার, একজন, সীমা পাহুজা তার নাম। উনি অন্য প্রদেশে একইরকম একটা কেসকে সমাধান করে, যারা অভিযুক্ত ছিল তাদেরকে শাস্তি দিয়েছিল, কিন্তু যদি ওপর থেকে কোনোকিছু হয়, চাপ আসে, সেটা তো ওঁর পক্ষে সমস্যার, ওঁর পক্ষে হয়তো কিছু করা সম্ভব না। গতকাল নাকি, মানে বিস্তারিত আমার পক্ষে জানা সম্ভব নয়, কারণ শেয়ালদা কোর্টে পুরোটাই ক্যামেরাবন্দি হয়, কাল সীমা পাহুজা সাক্ষী ছিলেন শেয়ালদা কোর্টে। কালকে নাকি ভালো শুনানি হয়েছে। ঠিক কোন দিক থেকে ভালো, এটা আমি সেভাবে বলতে পারব না।
সমস্যাটা হল, সি.বি.আই তার দুদিন আগে সুপ্রিম কোর্টে বলে এসেছে যে ওদের কাছে নতুন এভিডেন্স আছে যার ভিত্তিতে ওরা সাপ্লিমেন্টারি চার্জশিট করতে পারে, সেটা হচ্ছে ন’শো ঘন্টার ভিডিও টেপ, সেটা দেখতে যা সময় লাগবে সেটা তো লাগবেই। সেন্ট্রাল ফরেন্সিক ল্যাবরাটারিতে তে পাঠিয়েছিল ওরা। সেখান থেকে প্রসেস্ড্ হয়ে আসতে একটা সময় লেগেছে। কিন্তু সে-কথা শোনা হয় নি। কোর্ট দোষীদের ছেড়ে দিল। এবং ছেড়েওছে যে, এত বড়ো একটা অপরাধ, সেক্ষেত্রে ২০০০ টাকার ব্যক্তিগত জামিনের বন্ড, এটাও অদ্ভুত।
বৃন্দাকে নিয়ে জিগেস করছো? বৃন্দা গ্রোভার নিজে ছাড়েননি। একটা কমিউনিকেশন -এর সমস্যা হয়েছে। এদের তো কনফারেন্স হয়, মানে, কল কনফারেন্স হয়, কল কনফারেন্স -এ লোয়ার কোর্টের উকিলরা বাবা-মার কথা একেবারেই শুনত না, তারা তাদের নিজেদের মতো করে বলে যেত, এটা আমাদের বলা হয়েছে। এমনকি, বাবা-মা প্রত্যেকটা হিয়ারিং-এ উপস্থিত থাকতে পারে। সেটাও ওঁদেরকে ভুলভাবে গাইড করা হয়েছে যে, না, আপনারা থাকতে পারবেন না। আরেকটা সমস্যার কথা, এটা সি.বি.আই কে ঘিরে। সি.বি.আই-এর দু নম্বর সাক্ষী ছিল ওর মা। মার এখনও অবধি সাক্ষ্য নেওয়া হয় নি। উকিল বদলানোর পরে যখন জিগেশ করা হল যে, কেন নিলেন না, তখন উত্তর এল, বাবার সাক্ষ্য তো নেওয়া হয়েছে। ওর মা তখন বলেছিলেন, আমরা দুজন স্বামী-স্ত্রী হতে পারি, কিন্তু আমরা তো আলাদা লোক, আমার কাছে এমন তথ্য আছে যেটা হয়তো ওর বাবার কাছে নেই। তো সেই জায়গা থেকে সি. বি. আই ও চাপের মধ্যে আছে এবং কাজ করছে বলেই আমাদের ধারণা।
আর একটা কথা, যদি সঞ্জয় রায় একাই হয়, তাহলে তাকে বাঁচানোর জন্য রাজ্য এই কোটি কোটি টাকা খরচ করছে?
হাসপাতাল/চিকিত্সা/প্রতিরোধ
-এমনি হাসপাতালের সংখ্যা বেড়েছে আগেকার জমানার তুলনায়। চকচকে বিল্ডিং। নতুন যন্ত্রপাতি এগুলো কেনা হয়েছে। এর পাশাপাশি যেটা হয়েছে যে, নতুন রিক্রুটমেন্ট হয় নি। ডাক্তার, হেল্থ ওয়ার্কার, নার্স রিক্রুটমেন্ট কোনোটাই হয় নি। এবং তার পাশাপাশি RSBY – যেটা বামফ্রন্টের শেষাশেষি এসেছে — স্বাস্থ্যসাথী পরে এসেছে — এগুলোর মাধ্যমে সরকারের টাকাটাকে বীমা কোম্পানির কাছে, কিংবা বেসরকারী হাসপাতালে দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এগুলোর ফলে সামগ্রিকভাবে যদি বলো, পরিষেবা খারাপ হয়েছে, আমি বলব। যেমন স্বাস্থ্যসাথী বা আয়ুষ্মান ভারত বা এর আগে যে RSBY হয়েছিল, এগুলো স্বাস্থ্যবীমা কিন্তু আগেকার বীমাগুলোর সঙ্গে এগুলোর ফারাক কী? আগে আমি যদি বীমার আওতায় আসি, তাহলে আমি প্রিমিয়াম দেব। এই বীমাগুলোতে প্রিমিয়ামটা দিয়ে দেয় সরকার। আর পরিষেবা দেয় বেসরকারী হাসপাতাল। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকারী হাসপাতাল। মূলত। কীসের ক্ষেত্রে পরিষেবার খরচ দেয়? পরিষেবার খরচ দেয় যেগুলোতে হাসপাতাল আছে, সেগুলোতে। আমাদের দেশের স্বাস্থ্যের প্রায় ৭০ % চিকিৎসা হয় আওটডোর- এ। তার মধ্যে কম হচ্ছে ডাক্তারের ফি, তার চেয়ে বেশি পরীক্ষা বা ইনভেস্টিগেশন, সবচেয়ে বেশি ওষুধের দাম। তো এর কোনোটাই স্বাস্থ্যসাথী বা আয়ুষ্মান ভারত কভার করে না। স্বাস্থ্যসাথীর অনেক ক্যাপও আছে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে-তে। লিমিট আছে। সুতরাং ইনডোর চিকিত্সারও তোমার কাছে ৫ লাখ টাকার স্বাস্থ্যসাথী আছে, তোমার কোনো প্রসিডিওর-এ ৩ লাখ টাকা খরচ হল, তারপর এমন হতে পারে যে তুমি ১ লাখ টাকা পেলে। বাকিটা পেলে না। তো সরকার এই টাকাটা নিজের পরিকাঠামো উন্নয়নের কাজে লাগাত, তাহলে সেই পরিকাঠামো দিয়েই প্রয়োজনীয় যে জিনিস বা সার্ভিসগুলো সেগুলো দেওয়া সম্ভব ছিল।
আরেকটা কথা, ডাক্তারদের টাকা পাওয়ার যে-হিসেব সরকার দেখাচ্ছে সেটা অদ্ভুত। স্বাস্থ্যসাথীর টাকার ১০-১২% ডাক্তারেরা পায়। আর অভয়ার মৃত্যুর পর কর্মবিরতির পর্বে সরকার অভিযোগ করেছিল ৫০০ কতজন ডাক্তার, তারা একদিকে স্ট্রাইক করেছে আর অন্যদিকে প্রাইভেট প্র্যাকটিস করেছে। সেটা ছিল মূল অভিযোগ। যাঁদের নাম উঠেছে, তাঁদের বেশির ভাগই জুনিয়র ডাক্তার নয়। এটা রেজিস্ট্রেশন নম্বর দেখলেই বোঝা যায়। এগুলো অনেক পুরোনো রেজিস্ট্রেশন নম্বর । সরকারী হাসপাতালগুলোতে পরিষেবা সিনিয়র ডাক্তাররা কাজ চালু রেখেছিল। সরকারের অভিযোগটার তিন-চারদিন আগে হেল্থ্ সেক্রেটারি V.C. বা virtual conference -এ একটা মিটিং করেছিল, সমস্ত মেডিকাল কলেজের প্রিন্সিপাল, এম.এস.ভি.পি। ডিপার্টমেন্টাল হেড -দের নিয়ে এবং সেখানে হেল্থ্ সেক্রেটারি প্রশংসা করেছেন সিনিয়র ডাক্তারদের যে তারা পরিষেবাটাকে চালু রেখেছে। এবারে সিনিয়র ডাক্তাররা অতিরিক্ত সময় কাজ করে সার্ভিসগুলো চালু রেখেছে কিন্তু তার মানে কি এই যে সাধারণ অবস্থায় যা ছিল তাই হয়েছে? সেটা হয়নি। সেটা হয়নি, তার কারণ মানুষজন যখন শুনেছে যে জুনিয়র ডাক্তাররা নেই, তখন বহু মানুষ হাসপাতালে না গিয়ে বেসরকারী জায়গায় দেখিয়েছে। আর পুরোপুরি কর্মবিরতি হলে ডাক্তারদের প্রতি মানুষের যে প্রতিক্রিয়া হওয়ার কথা, এবারের আন্দোলনে কিন্তু তা হয় নি। সেটা না হওয়ার কারণ সিনিয়র ডাক্তারদের সার্ভিসটাকে চালিয়ে যাওয়া।
আগের আমলের স্ট্রাইকে (জ্যোতি বসুর মুখ্যমন্ত্রিত্বের সময়) আমরা সমান্তরাল আউটডোর চালু রেখেছিলাম। এরা যেটা অনেক পরের দিকে করেছে ‘অভয়া ক্লিনিক’, সেটাও সপ্তাহে একদিন বা দুদিন, আমরা যে ক’দিন কাজ বন্ধ রেখেছিলাম, একদম সকাল থেকে নিয়ে, আউটডোর -এর সময়টা সমান্তরাল আউটডোর চালু রেখেছিলাম। আমাদের ওই সময়ের দ্রোহকাল ছিল ১৯৮৩-৮৪ আর তার পরেরটা ’৮৭। তখন দাবী ছিলঃ হাসপাতালের সার্বিক অবস্থা, ওষুধের সাপ্লাই ডাক্তারদের নিয়োগ, এক্স-রে, প্যাথোলজি এসবের উন্নতিকরণ।
যাই হোক, প্রসঙ্গে আমি ফিরে আসি। সব অর্থে, স্বাস্থ্যব্যবস্থার বেসরকারীকরণ, আমি সেটাকেই খারাপ হওয়া বলছি। সার্বিক বিচারে আগের আমলের চেয়েও। কিন্তু সে-ব্যবস্থার বীজটা পুঁতে গিয়েছিল আগের সরকারই। স্বাস্থ্যের বেসরকারীকরণের তো আমরা বিরুদ্ধে। এবার যেটা বলছিলাম, ২০১০-এ প্ল্যানিং কমিশন একটা হাই-লেভেল এক্সপার্ট গ্রুপ তৈরি করেছিল, ইুউনিভার্সাল হেল্থ কভারেজে-এর পাব্লিক হেল্থ্ ফাউন্ডেশন অফ ইন্ডিয়ার শ্রীনাথ রেড্ডি বলে, তিনি PHFI -এর চেয়ারপার্সন তিনি এই কমিটিটারও চেয়ারপার্সন ছিলেন। তাঁরা যে রেকমেন্ডেশন করে সেটা খুব স্বচ্ছ ছিল। তাঁরা হিসেব করে দেখান যে, ২০১০-এ স্বাস্থ্যখাতে খরচ হচ্ছে গ্রস ডোমেস্টিক প্রোডাক্ট-এর ৪.১%। এর মধ্যে ১.৪% খরচ হচ্ছে সরকারী খরচ। বাকি খরচটা প্রাইভেট। প্রাইভেটের মধ্যে বেশির ভাগটা হচ্ছে পেশেন্ট-এর এর আউটডোর-এর পকেট খরচ। তো ওঁরা হিসেব করে দেখান যে, স্বাস্থ্যক্ষেত্রে যদি খরচ ২.৫%, ২০১৭-এর মধ্যে করা হয়, যদি সরকার এটা করে এবং ২০২২- এর মধ্যে যদি ৩% করা হয়, তাহলে সেই টাকা দিয়ে সমস্ত নাগরিকের এসেন্সিয়াল যে সার্ভিস, প্রাইমারি, সেকেন্ডারি এবং টার্সিয়ারি সমস্তটাই যোগান হয়ে যাবে। অনেকটা সরকারী হাসপাতালে হবে, যেগুলো সরকারী হাসঅপাতালে ব্যবস্থা নেই, সেগুলো একটা অটোনোমাস কমিটি গঠন হবে, যে কমিটি বেসরকারী জায়গা থেকে কিনে নেবে রুগীদের জন্য। এখন যেমন ডাক্তার যদি লিখে দেয় এটা আমার এখানে হয় না, তাহলে রুগী প্রাইভেট জায়গায় গিয়ে কেনে সেটা, সেই জিনিসটা এই কমিটিটা কিনবে। তো, ওঁরা একটা Health Entitlement Card বার করেছিল, সেইটা নিয়ে আমি দেশের যে-কোনো জায়গায় যাই না কেন, এবং যে স্তরের পরিষেবাই লাগুক না কেন, ঐ কার্ডটা থাকলে আমি সেটা নিতে পারব। সেটা তো UPA সরকারের সময় হয়েছিল। UPA সরকার সেটাকে আমল দেয় নি। ২০১০ এ এই কমিটি গঠন হয়, ২০১১তে ওরা ওদের রেকমেন্ডেশন দেয়। ২০১২ র প্ল্যান্ড্ ডক্যুমেন্ট-এ স্বাস্থ্যখাতে ১.৫৮% খরচ করার কথা বলা হয়। ২০১৪ তে মোদী সরকার আসার পর প্রথম বছরই স্বাস্থ্যখাতে ২০% খরচ কমিয়ে দেয়। এখনও যে খরচ হচ্ছে সেটা GDP র ১%-এর কাছাকাছি। সরকার যে খরচ করছে। তার মধ্যেও একটা বড়ো অংশ হচ্ছে আয়ুষ্মান ভারতের যে প্রিমিয়াম, তার পেছনে। তো এই প্রিমিয়াম তো বেসরকারী হাসপাতাল বা বীমা কোম্পানিতে যাচ্ছে। তো এইটা না হয়ে সরকারী পরিকাঠামোতেই তো সম্ভব হতে পারত। সেই জিনিসটা তো বহুদিন আগে থেকে হয়েছে, তাই না? বামফ্রন্টও তো এগুলো উত্সাহের সঙ্গে করেছে। K.S. Roy T.B. হাসপাতালের জমি এক টাকায় K.P.C. কে দিয়ে দিয়েছে। বাইপাসের ধারের প্রাইভেট হাসপাতালগুলো জলের দরে জমি দিয়েছে, ট্যাক্স রিবেট করেছে। সুতরাং……
৩. আত্মকথন -২
রাতের দখলদারি
অক্টোবর, ১০, ডায়রির অংশঃ
বেজিং-এর কিছুদূর থেকে শহরে ফিরছি। যা-কিছু অন্য কাজই থাক, কাজের মধ্যে খবর দেখা, বা সুযোগ না পেলে সারাদিনের পর, বিশেষত, অভয়ার খবর দেখা, দুমাসের অভ্যাসের অন্তর্গত। জুনিয়র ডাক্তারেরা অনশন করছেন তার আগের পাঁচ দিন ধরে। যেখানেই থাকি, অস্থিরতা আর দুশ্চিন্তা ঘিরছে। আমার সঙ্গে বেজিং ইউনিভার্সিটির School of Foreign Languages-এর দুই ছাত্রছাত্রী, একজন গবেষক, অন্যজন স্নাতকোত্তর করছে, এরা সবাই এক বা একাধিক ভারতীয় ভাষা জানে, এরা সবাই দক্ষিণ-এশিয়ার ব্যাপারে আগ্রহী। গাড়ির মধ্যে অন্য কথার মাঝে আমি বলি তিলোত্তমা নামের এক মেয়ের কথা, ওরা প্রথমে বোঝে না, তারপর বলে ‘কিন্তু এই মেয়েটির খবর তো আমরা রোজ রাখছি, ওর নাম এত কঠিন করে বলছো কেন তুমি? ওর নাম তো অভয়া। আমাদের মিছিল করার অনুমতি নেই, তুমি জানো, নয়তো ৮ সেপ্টেম্বর সারা পৃথিবীর মতো আমরা মিছিল করতাম, বিচার চাইতাম।’
৮ সেপ্টেম্বরের সারা পৃথিবীর দিকে আমি একবার চোখ বুলাইঃ
USA –
- Albany, NY
- Ann Arbor, MI
- Atlanta, GA
- Austin, TX
- Baton Rouge, LA
- Bay Area, CA
- Wayne, PA
- Wilmington, DE
- Wisconsin
- Boston, MA
- Charlotte, NC
- Chicago, IL
- Cincinnati, OH
- College Park, MD
- Columbus, OH
- Cupertino, CA
- Dayton, OH
- Denver, CO
- El Paso, TX
- Fremont, CA
- Frisco, TX
- Hartford, CT
- Houston, TX
- lowa
- Jacksonville, FL
- Lansing, MI
- Minneapolis, MN
- Mountain House, CA
- New York City, NY
- North Brunswick, NJ
- Novi, MI
- Orlando, FL
- Peoria, IL
- Phoenix, AZ
- Princeton, NJ
- Raleigh, NC
- Rochester, MN
- Sacramento, CA
- Salt Lake City, UT
- San Antonio, TX
- San Diego, CA
- San Francisco, CA
- Seattle, WA
- St. Louis, MO
- Tampa, FL
- Toledo, OH
- Troy, MI
- Virginia
UK –
- Barnsley
- Belfast
- Birmingham
- Cambridge
- Cardiff
- Edinburgh
- Glasgow
- Gloucester
- King’s Lynn
- Lancashire
- Leeds
- Leicester
- Liverpool
- London
- Manchester
- Milton Keynes
- Newcastle
- Peterborough
- Sheffield
- Swansea
- York
Ireland –
- Belfast
- Cork
- Dublin
Canada –
- Galifax
- Montral
- Toronto
- Waterloo
Germany –
- Cologne
- Essen
Netherlands –
- Amsterdam
- Eindhoven
Switzerland –
- Zurich
- Sweden –
- Stockholm
Czech Republic–
- Prague
Spain –
- Madrid
Japan –
- Tokyo
Australia –
- Brisbane
- Canberra
- Geelong
- Melbourne
- Perth
- Sydney
New Zealand –
- Auckland
- Christchurch
এখনও বহু জায়গা বাদ পড়ল নাকি? নিশচয়ই পড়ল। আমাদের দেশের শহর- গ্রাম-সদর-অন্দর-মফস্বল। এই রাজ্যের প্রথম রাতদখলের ছবি আসে পুরুলিয়ার গ্রাম থেকে। ১৮ ই আগস্ট রাত ৮-৩০ নাগাদ। যাবতীয় সংবাদ মাধ্যমের আলো শহর, বিশেষত, শহর কলকাতার ওপর থাকলেও, আমি মফস্বলে পড়ানোর সূত্রে জানি, বহু গ্রামে, অন্তত কলকাতার আশেপাশের জেলাগুলোর বহু গ্রামে, অন্তত ৯ আগস্ট-এর পরের প্রথম এক-দেড় মাসে অগুনতি মিছিল হয়েছে। হাজার হাজার মানুষের নয়, কিন্তু কিছু সংখ্যক মেয়েদের। কিছু ছেলেদেরও। নাড়া খেয়ে বহু মানুষ। ক্লাসে জিগেস করেছিলাম, সুটিয়ার বরুণ বিশ্বাসের কথা মনে পড়ে? কারুর কারুর পড়ে, কিন্তু তখন ওরা বড়োই ছোটো। আজ ওদের ‘We want justice’ বলা কেউ থামাতে পারছে না।
১৪ ই আগস্ট ছিল রাতদখল। ‘Reclaim the night’ । কিন্তু ১৭ ই আগস্ট-এর পর ‘Reclaim the night’ হয়ে যায় রাতের আরো বেশি বেহাত হওয়া থেকে পুনরুদ্ধার।
‘সম্ভব হলে মেয়েদের নাইট ডিউটি থেকে অব্যাহতি’! মহিলাদের নিরাপত্তায় ১৭ দফা নির্দেশিকা দিল নবান্ন
Throwing the baby out with the bathwater. রাত দখলের তিনদিনের মধ্যেই রাত বেদখলের অসামান্য চেষ্টা।
এরপর আর কী করে থামানো সম্ভব রাত-দিন-সকাল-দুপুর-বিকালের পুনর্দখল?
৪. কথোপকথনের শেষ অংশ
- আসলে অভয়ার প্রতিবাদ আটকে ছিল মুলত কলকাতা, ডিস্ট্রিক্ট হেড-কোয়ার্টার, কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাব-ডিভিশনাল………
- না, গ্রামে হয়েছে। কিন্তু অত বড়ো আকার হয়তো নেয় নি, অতদিন ধরে হয়তো চালানো সম্ভব হয়নি।
- যারা করেছিল তাদের ব্যাপক হুমকি দেওয়াও হয়েছে। যাই হোক, ২৮ শে সেপ্টেম্বর আমরা যে ‘অভয়া মঞ্চ’ তৈরি করেছি তার তিনটে লক্ষ্যঃ ১) সমস্ত ‘অভয়া’র বিচার, শুধু তিলোত্তমার নয় ২) নারী এবং প্রান্তিক লিঙ্গের মানুষের যে-সমস্ত অধিকা্রের দাবি, তাকে পূর্ণ মর্যাদা দেওয়া ৩) আমাদের রাজ্যকে ভয়ের আবহ থেকে মুক্ত করা। আমরা ‘জয়নগর থেকে জয়গাঁও’ একটা কর্মসুচী নিচ্ছি। অভয়া এবং তার পরবর্তী চারমাসে এরকমের যা যা ঘটনা ঘটেছে, সেই জায়গাগুলোকে আমরা একটু ছোঁব, আর ২৬ টা মেডিকাল কলেজ তাদের নিয়ে প্রায় ২০০0 কি.মি. যাত্রা করার পরিকল্পনা আছে। এটাকে আমরা পাঁচ-ছটা অঞ্চলে ভাগ করেছি। আমরা বাইরের টিম পৌঁছানোর পর দু-তিন হাজার মানষের একটা মিছিল হয়তো অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। আমরা সেই মিছিল নিয়ে কোনো সভায় পৌঁছোলাম। এ-ধরণের একটা বড়োকিছুর প্রস্তুতি আমরা নিচ্ছি। ইন্টেন্সিভ কিছুর। দেখা যাক, কী অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য।
লেখকের কথাঃ
এই লেখার অনেকটাই ডঃ পুণ্যব্রত গুণের সঙ্গে কথোপকথন এবং নিজস্ব ডায়রির খণ্ডীকৃত টুকরোর ওপর নির্ভর করে লেখা। লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল ‘পরিচয়’ পত্রিকার অঘ্রাণ-ফাল্গুণ, ১৪৩১ (৯৪ তম বর্ষ) সংখ্যায়। এ-লেখাটি তার সামান্য পরিমার্জিত রূপ। ‘পরিচয়’ -এর লেখাটি যেহেতু শেষ করতে হয়েছিল গত বছর শেষের সঙ্গে সঙ্গে, তাই এ-বছরে এত অবধি এই মামলায় যা-কিছু হয়েছে বা হয়নি, তা লেখা হয়ে ওঠে নি এতে। পরবর্তী কিস্তিতে এ-সংক্রান্ত অন্য কথা।
[1] বস্তুত এ.এস.পি ।











চমৎকার লেখা! 🌹
ধন্যবাদ আপনাকে।
পাঠ-প্রতিক্রিয়ার জন্য।