গত ১ লা মার্চ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় তৃণমূলের শিক্ষক সংগঠন WEBCUPA র সম্মেলনে যোগ দিতে এসেছিলেন শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে না হতেই যাদবপুর তোলপাড়।
২০২০ সালে শেষ ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়েছিল। নির্বাচন না হবার কারণে জরুরি মিটিং বা ডেপুটেশনে ছাত্র প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে সর্ব ক্ষেত্রে জটিলতা। এই জটিলতা তুঙ্গে ওঠে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন স্থায়ী উপাচার্য থাকেন না। স্থায়ী শিক্ষক পদে নিয়োগ বন্ধ বহুকাল, সরকারী অনুদানের স্বল্পতায় পরিকাঠামোগত উন্নতি ও স্তব্ধ UGC দ্বারা ‘Institute with potential for excellence’ হিসাবে স্বীকৃত, NAAC ( National Accreditation and Assessment Council) এর মূল্যায়নে A+ পাওয়া রাজ্যের দ্বিতীয় প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে পড়ার খরচ যৎসামান্য বলে নিম্নবিত্ত পরিবারের মেধাবী ছেলে মেয়েরাও পড়ার সুযোগ পায়। এর আগে বহুবার ছাত্র ছাত্রীরা অস্থায়ী উপাচার্যের কাছে এই দাবিগুলি নিয়ে ডেপুটেশন দিয়েছে। উপাচার্য সরকারকে মেইল করেছেন যার কোন উত্তর আজ পর্যন্ত আসেনি। এমতাবস্থায় সমস্ত সংগঠনের ছাত্র রা সম্মিলিত ভাবে সিদ্ধান্ত নেয় WBCUPA সম্মেলন শেষে শিক্ষামন্ত্রীর কাছে ডেপুটেশন দেবে। প্রায় দেড়শ ছাত্রছাত্রী সম্মেলন স্থল Open Air Theatre এর বেশ কিছুটা দূরে শান্তিপূর্ণ জমায়েত করে এবং অপেক্ষা করতে থাকে।
শিক্ষামন্ত্রী সম্মেলনে আসেন, সম্মেলনে অংশ গ্রহণ করতে শুধুমাত্র শিক্ষকরা আসেন নি, সম্মেলনস্থল ভরে ওঠে বহিরাগত তৃণমূলের বিভিন্ন স্তরের নেতা নেত্রীর উপস্থিতিতে। তাঁরা কি জানতেন আগে থেকেই যে যাদবপুরে সেদিন ধামাকা হবে? কেউ খবর দিয়েছিল?
তৃণমূলের শক্তি প্রদর্শনের সম্মেলন, তাই বহিরাগত দুষ্কৃতীরা তাঁদের কর্মনিষ্ঠতা প্রমাণ করতে কোন ত্রুটি রাখেন নি। ব্যানার ছেঁড়া, একটু আধটু জলের বোতল ছোঁড়া এই সব ছোটোখাটো কাজ দিয়ে তারা শুরু করে। মেয়েদের গায়ে হাত দিয়ে টেনে হিঁচড়ে ছাত্র ছাত্রী দের ভিড় পাতলা করার চেষ্টা এমন কিছু গর্হিত কাজ হতে পারেনা যেখানে সরকারি হাসপাতালের মহিলা ডাক্তারকে হাসপাতালের মধ্যে কর্তৃপক্ষের মদতে ধর্ষণ ও খুন করে ফেলা যায় সহজেই।
আসল কাজটা শুরু হয় মন্ত্রী মঞ্চ থেকে নেমে বেরোবেন যখন। ছাত্র ছাত্রী ওদের ডেপুটেশন নিতে মন্ত্রী সম্মত হন। উলটো দিকের মাঠে ছাত্রছাত্রীদের এনে দেওয়া চেয়ারে বসেও পড়েন। দুইটি ছাত্র সংগঠন লিখিত ডেপুটেশন জমা দেয়। তারপর শুরু হয় চিত্রনাট্যের ক্লাইম্যাক্স
WBCUPA র সম্মেলনে যোগ দিতে আসা বহিরাগত তৃণমূল গুণ্ডারা হাজির হয়ে আলাপ আলোচনা তৎক্ষণাৎ থামিয়ে মন্ত্রীকে গাড়িতে তুলে ফেলে। মদত দেন যাদবপুরের এক প্রবীণ শিক্ষক, যিনি অনুজ্ঞা নামে একজন ছাত্রীকে শারীরিক নিগ্রহও করেন। ঘটনার আকস্মিকতায় হতচকিত ক্ষুব্ধ ছাত্রছাত্রীরা মন্ত্রীর গাড়ি ঘিরে ধরে। নেতা মন্ত্রীর গাড়ি আটকে বিক্ষোভ কোন অভূতপূর্ব অচিন্তনীয় ঘটনা নয়। মাত্র পঞ্চাশ বছর আগে জয়প্রকাশ নারায়ণের গাড়ির উপরে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর নৃত্যকুশলতা এখনও জনস্মৃতিতে অম্লান! কিন্তু এবারের শো স্টপার গাড়ির উপর নাচ নয়, শো স্টপার স্বয়ং শিক্ষা মন্ত্রী। কোন এক দুর্জ্ঞেয় দুর্দম প্রণোদনায় মন্ত্রী চালককে হুকুম করেন সবেগে গাড়ি চালিয়ে উত্তেজিত জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে। কর্তার ইচ্ছায় কর্ম। বিক্ষোভরত ইংরেজি স্নাতক প্রথম বর্ষের ছাত্র ইন্দ্রানুজ রায় লুটিয়ে পড়ে গাড়ির চাকার তলায়। ছাত্রের পায়ের উপর দিয়ে চলে যায় শিক্ষা মন্ত্রীর গাড়ি । চোখের পাশে গভীর ক্ষত থেকে অবিরাম রক্তস্রোত ভিজিয়ে দেয় মাটি, যে মাটি একদিন স্বপ্ন দেখেছিল বিপ্লবের, যে মাটি এখনো স্বপ্ন দেখে দিন বদলের। তুলনামূলক সাহিত্যের স্নাতকোত্তর প্রথম বর্ষের অভিনব বসু গুরুতর আহত হয়। এই নির্মমতা বিরলতম। ছাত্রের শরীরের উপর দিয়ে মন্ত্রীর দম্ভের রথচালনা- বাংলা তথা ভারতের ইতিহাসে এমন কখনো ঘটেছে বলে জানা নেই। বিক্ষোভের বারুদে অগ্নি সংযোগ করে এই ঘটনা। স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্র বিক্ষোভে কিছুক্ষণের জন্য অবরুদ্ধ হয়ে যায় যাদবপুর এলাকা, থানা ঘেরাও শুরু হয়।
এর মধ্যে শুরু হয় আর এক ঘৃণ্য চক্রান্ত। তৃণমূল প্রভাবিত শিক্ষাবন্ধু সমিতির সম্পাদক বিনয় সিং সন্ধ্যে সাড়ে সাতটায় তাঁর কোয়ার্টারে ভাঙচুর এবং শিক্ষাবন্ধু সমিতির অফিসে অগ্নি সংযোগের অভিযোগ এনে যাদবপুর থানায় ছাত্রদের বিরুদ্ধে FIR করেন, যখন ছাত্ররা মরণাপন্ন ইন্দ্রানুজকে KPC Medical College & Hospital এ রেখে এসে সবে জি বি শুরু করেছে। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের রেকর্ড অনুযায়ী রাত সাড়ে দশটায় বলরাম বাবু নামে এক জন নিরাপত্তারক্ষী ‘হেডগার্ড‘ কে জানান যে শিক্ষা বন্ধু সমিতির অফিসে আগুন দেখা যাচ্ছে। বিক্ষোভরত ছাত্ররাও এই সময় আগুন জ্বলতে দেখে ডিনকে জানায়। দমকল ঢোকে পৌনে এগারোটা নাগাদ। বিনয় বাবুর কাছে বিনীত প্রশ্ন, সাড়ে সাত টায় আগুন জ্বালানোর অভিযোগ লিখিয়ে এসে আপনি কোথায় ছিলেন? আগুন কি তুষ দিয়ে জ্বালানো হয়েছিল যেটা ধিকি ধিকি জ্বলছিল রাত সাড়ে দশটা অবধি? বিনয় সিং criminal conspiracy এবং attempt to murder এর অভিযোগ আনেন, যার স্বপক্ষে কোন প্রমাণ দাখিল করতে পারেন নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের রিপোর্টে কোয়ার্টারে হামলার অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হয়।
এবার খেলা শুরু প্রশাসনের। শিক্ষাবন্ধু সমিতির অফিসে আগুন লাগানোর অভিযোগে পর পর তিনজন ছাত্রকে গ্রেফতার করা হয় । সাহিল আলি গ্রেফতার হয় ২ মার্চ, জামিন হয় ১২ তারিখ। ওই দিনেই গ্রেফতার হয় সৌম্যদীপ (উজান)। যেদিন উজানের জামিন হয় সেই দিনই গ্রেফতার হয় সৌপ্তিক। ৬ দিন পর ২৫ তারিখ জামিন হয় সৌপ্তিকের। আন্দোলনের অভিজ্ঞ নেতাদের বাইরে রেখে জুনিয়র ছাত্রদের গ্রেফতারি ছাত্র সংগঠন ভেঙ্গে দেবার অপচেষ্টাকে প্রমাণ করে। প্রায় ৪০/৫০ জন ছাত্রছাত্রীর কাছে পুলিশের compliance letter যায় হাজিরা দেবার জন্য, যাদের কেউ কেউ এখন কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গের বাইরে! এই গ্রেফতারি আর compliance এর মূল কারণ বিনয় সিং এর ভিত্তিহীন অভিযোগ আর বছর দুয়েকের পুরনো কাশ্মীরের আত্ম নিয়ন্ত্রনের স্বপক্ষে একটি দেয়াল লিখন! বিভ্রান্তি হয়, আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক তো?
তুষের আগুন আসলে শিক্ষাবন্ধু সমিতির অফিসে লাগেনি, আগুন জ্বলছিল শিক্ষায় স্বাস্থ্যে ও নাগরিক সমাজে। ২ মার্চ থেকে যাদবপুরের বিক্ষোভ ক্রমে বিস্ফোরণের চেহারা নেয়। অভয়ার নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর স্বতস্ফুরত ভাবে গড়ে ওঠা প্রতিবাদী অভয়া মঞ্চ, গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা সমিতি এবং যাদবপুরের অধ্যাপক অধ্যাপিকা এবং বহু প্রতিবাদী মানুষ যাদবপুরের ছাত্র আন্দোলনের পাশে এসে দাঁড়ান ।
১ মার্চ ভারতের ছাত্র ফেডারেশনের ডাকে ক্যাম্পাসে ধর্মঘট হয়।
২ মার্চ বামফ্রন্টের ডাকে একটি মিছিল হয় সুকান্ত সেতু থেকে থানা পর্যন্ত ।
৩ তারিখ বিকেলে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রসংগঠন ও সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের উদ্যোগে বড় মিছিল হয়।
৫ তারিখ কমরেড সাহিল আলি’র নি:শর্ত মুক্তির দাবীতে ফেটসু মিছিল করে।
এই দিনেই শিক্ষক ও ননটিচিং স্টাফরা মিছিল ডাকেন।
৬ই মার্চ যাদবপুরের পাশে দাঁড়ানোর জন্য রাজ্যজুড়ে আহত কমরেডদের সংহতিতে মিছিল হয়, ভারতের ছাত্র ফেডারেশনের পক্ষ থেকে।
৭ই মার্চ, ছাত্রছাত্রীদের ওপর তৃণমূল -বিজেপি যৌথ আক্রমণের বিরুদ্ধে নাগরিক মিছিল হয়।
১৮ই মার্চ উজানের নি:শর্ত মুক্তির দাবীতে মিছিল হয়।
১৯শে মার্চ ভারতের ছাত্র ফেডারেশনের পক্ষ থেকে দাবীসমূহ নিয়ে অরবিন্দ ভবন অভিযান হয়।
১৯ই মার্চ ছাত্র ছাত্রীদের ডাকে ক্যাম্পাস জুড়ে গ্রাফিতি করা হয়।
২০ শে মার্চ হয় গণকনভেনশন। সংহতি জানায় অভয়া মঞ্চ।
২৫ শে মার্চ ভারতের ছাত্র ফেডারেশনের মিছিল হয়, যাতে যোগ দেন সবাই, এমন কি ভিন্ন রাজনীতির মানুষেরাও।
‘যাদবপুর শিক্ষা দেয়, পথ দেখায়, আঘাত যদি নেমেই আসে, পাল্টা আঘাত ফিরিয়ে দাও’– এ আন্দোলন থামার নয়। গাড়ি চালিয়ে, পুলিশ দিয়ে ছাত্র আন্দোলন দমন করা যায়নি, যাবে না। শিক্ষা স্বাস্থ্য স্বাধীনতা বিপন্ন। ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামই স্বৈরাচারীর সিংহাসনকে চূর্ণ করতে পারে।
এ লড়াই শুধু যাদবপুরের নয়। লড়াই ঔদ্ধত্য আধিপত্য আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে।
এ লড়াই জিততে হবে।
তথ্য ঋণ :
দেবার্ঘ্য যশ
কৌশিকী ভট্টাচার্য











যুক্তিযুক্ত বিশ্লেষণ। অভিনন্দন জানাই।