মহাকালের অস্বাস্থ্যকর ক্ষুধাবৃদ্ধি হয়েছে। তার ক্ষুণ্ণিবৃত্তির জন্য সুখী, সুস্থ, মজলিশি, তরতাজা মানুষের প্রয়োজন হচ্ছে আজকাল। যারা প্রিয় ক্রিকেটদলের জয় উদযাপনে রাস্তায় নেমে উল্লাস করছে, যারা হাসিমুখে সপরিবার দেশে বিদেশে সফর করছে, যে তরুণ রক্তের সঞ্জীবনী-শিক্ষায় হাতেখড়ি হচ্ছে চিকিৎসা বিদ্যায়তনে, তাদের দিয়েই রসনাতৃপ্তি হচ্ছে মহাকালের।
আমি যে বিষাদসিন্ধু সাঁতরাতে সাঁতরাতে শ্রান্ত — মহাভোজের আসরে আমাকে বিস্বাদ ট্যালটেলে ঝোলের বাটির মতো সন্তর্পণে সে সরিয়ে রেখে দিচ্ছে বারবার।
মন আর নতুন করে বেদনার্ত হতেও পারছে না। ইলাস্টিসিটি নষ্ট হয়ে গিয়েছে।
কিচ্ছু দেখতে পারছি না। টিভি, মোবাইল, খবরের কাগজ, সোশ্যাল মিডিয়া, হারিয়ে যাওয়া আত্মজনদের পুরোনো ফোটোগ্রাফ — মনকে সংহত করে কিচ্ছু দেখতে পারছি না ঠিকঠাক।
এরই মধ্যে বাড়ির কিছু জরুরি সরকারি কাগজ খুঁজতে বিশ-পঁচিশ বছরের পুরোনো ফাইল ঘাঁটতে হলো।
কত কিছু যে আবিষ্কার করলাম নতুন করে!
মায়ের তামাদি সব প্রেসক্রিপশন, বাবার কিনে রাখা নিষ্ফলা লটারির টিকিট (বেচারা আশাবাদী নিরুপায় বাবাটা আমার), ২০০৪ সালের শেষবারের মতো কালিয়াগঞ্জ ছেড়ে আসার সময় কাটা নর্থ বেঙ্গল ডিলাক্স সার্ভিস বাসের দু’খানা টিকিট (আমার আর মায়ের), ২০০৭ সালে জুন মাসে কোনও এক দুপুরে পুরীর ভিক্টোরিয়া ক্লাবে মা-মেয়ের ডাল-ভাত-শুক্তো-আলুভাজা খাওয়ার দামের রসিদ, ডাক্তারি পাশ করার পরে চাকরি খুঁজে বেড়ানোর দিনে বাবার নিজের হাতে টাইপ করা আমার বায়োডাটা (তখন সিভি/রেজুমে বলার চল ছিল না), বোনের বিয়ের উপলক্ষে কেনা নিজের প্রথম কাঞ্জিভরমের ক্যাশমেমো — এমন কত কি ধনরত্ন যে খুঁজে পেলাম!
সেগুলোয় হাত বুলোতে বুলোতে বুঝলাম — এই সব আপাত তুচ্ছ টুকরোটাকরাগুলো দিয়ে একটা ফেলে আসা আস্ত জীবনের অনিন্দ্য মানচিত্র আমি চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাবো, কোনও ফোটোগ্রাফ লাগবে না আমার।
এমনি করেই কোনও আধপোড়া টিকিটের টুকরো, একপাটি জুতো, ভাঙা পুতুল আর ছেঁড়া, বিবর্ণ শাড়ির আঁচল হয়ত উত্তরপ্রজন্মকে মনে পড়িয়ে দেবে কিছু নিরুদ্দিষ্ট মানুষের কথা — যারা এসেছিল, হেসেখেলে বেঁচেছিল, তারপর একদিন মহাকালের ক্ষুধার্ত গহ্বরে চিরতরে বিলীন হয়ে গিয়েছিল — আর ফিরতে পারেনি কোনওদিন।
ছবি ঋণ : আন্তর্জাল










