৯ই আগষ্টের ভয়াবহ রাতের পর কেটেছে প্রায় ১১ মাস। এখনো অবধি সিবিআই সঞ্জয় রাই-এর বিরুদ্ধে প্রাথমিক চার্জশিটের পর কোনো সাপ্লিমেন্টারি চার্জশিট কোর্টে পেশ করতে পারে নি, তথ্য প্রমাণ লোপাট এর মামলায় জামিন পেয়ে গেছেন টালা থানার ওসি অভিজিৎ মন্ডল, আর জি কর এর প্রাক্তন প্রিন্সিপাল সন্দীপ ঘোষ।
যেই আর্থিক দুর্নীতির মামলায় এখনো জেলে রয়েছেন সন্দীপ ঘোষ, (তার সাথে আশীষ পান্ডে সহ আরো ৩ জন) সেই মামলার শুনানি হচ্ছে আলিপুর স্পেশাল সিবিআই কোর্টে।
অন্যদিকে, প্রতিহিংসামূলক অভিসন্ধিতে নিয়ম বহির্ভূত ভাবে বেছে বেছে তিন জন সিনিয়র রেসিডেন্ট-এর পোস্টিং বদলে দেওয়ার বিরুদ্ধে তাঁরা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। এই মামলার শুনানি চলছে কলকাতা হাইকোর্টে মাননীয় বিচারপতি বিশ্বজিৎ বসুর বেঞ্চে।
এই সংক্রান্ত কিছু আপডেট সকলের জানার জন্যে রইল:
১. আর.জি. কর হাসপাতালের আর্থিক দুর্নীতির মামলায় সিবিআইকে চূড়ান্ত সময়সীমা বেঁধে দিলো
আলিপুর স্পেশাল সিবিআই আদালত।
কোর্টের নির্দেশ আর.জি. কর হাসপাতালের আর্থিক দুর্নীতির মামলার তদন্ত শেষ করে আগামী ১লা সেপ্টেম্বর, ২০২৫-এর মধ্যে চূড়ান্ত রিপোর্ট জমা দিতে হবে।
এই মামলায় অভিযুক্ত:
সন্দীপ ঘোষ (প্রাক্তন প্রিন্সিপাল, আর.জি. কর মেডিকেল কলেজ)
অশীষ পাণ্ডে (TMCP ছাত্রনেতা)
আরও তিনজন, বর্তমানে সিবিআই হেফাজতে রয়েছে।
মূল অভিযোগ:
হাউসস্টাফশিপের সিট বিক্রি করে ব্যাপক আর্থিক দুর্নীতি, সরকারি হাসপাতালে নিম্নমানের ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ, দুর্নীতিগ্রস্ত টেন্ডার ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকারি অর্থ লোপাট।
আদালত পর্যবেক্ষণ করেছে যে, তদন্ত দ্রুত শেষ করে চার্জশিট জমা দেওয়া আবশ্যক, যাতে বিচার প্রক্রিয়া শুরু করা যায়।
এই প্রেক্ষাপটে কিছু প্রশ্ন সামনে আসে—
সিবিআই কেন এত দীর্ঘ সময়েও আর্থিক দুর্নীতির মামলার তদন্ত সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হচ্ছে? তদন্তের সাফল্যের হার এত কম কেন? অভিযুক্তরা দিনের পর দিন কীভাবে মুক্তভাবে ঘুরে বেড়াতে পারে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জনসাধারণের জানার অধিকার রয়েছে। সত্যের প্রতি দায়বদ্ধ থেকে তৎপর তদন্তকারী সংস্থা ও নিরপেক্ষ বিচার ব্যবস্থাই এর একমাত্র উত্তর।
২. অভয়ার ধর্ষণ ও হত্যার মামলায় তদন্ত অগ্রগতির অভাব। ২০২৪ সালের ৯ই আগস্টের ঘটনায় এখনও পর্যন্ত কোনও সাপ্লিমেন্টারি চার্জশিট সিবিআই দাখিল করেনি। কিছুদিন আগে শিয়ালদা কোর্টে সিবিআই তদন্তের অগ্রগতি সংক্রান্ত চতুর্থ স্টেটাস রিপোর্ট জমা দিয়েছে, যা কার্যত আগের স্টেটাস রিপোর্ট এর থেকে খুব আলাদা নয়।
পিছিয়ে যাওয়া যাক, ১৪ই সেপ্টেম্বর, ২০২৪: সন্দীপ ঘোষ (আর জি কর মেডিকেল কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ) ও অভিজিৎ মন্ডল (টালা থানার তৎকালীন ওসি) কে অভয়ার খুন ধর্ষণের তথ্য প্রমাণ লোপাট করার অভিযোগে গ্রেফতার করে সিবিআই। কিন্তু নব্বই দিন নিজেদের হেফাজতে রেখেও প্রাথমিক চার্জশিটে এই বিষয়ে কোনো সুস্পস্ট বক্তব্য উল্লেখ করেনি সিবিআই। তার ফলে এমনকি তারা জামিনও পেয়ে গেছেন এই মামলায়। সাপ্লিমেন্টারি চার্জশিট পেশ তো হয়ই নি, শিয়ালদহ আদালতে জমা পড়া চতুর্থ স্টেটাস রিপোর্টেও কার্যত কোনও অগ্রগতি নেই।
মৃত্যুর প্রায় দশ মাস পরেও মূল সত্য এবং প্রত্যক্ষ , পরোক্ষ ভাবে কারা কারা এই নারকীয় ঘটনার সাথে যুক্ত, তা অজানা!
এই ধরণের নারকীয় অপরাধে তদন্ত প্রক্রিয়া এরকম দীর্ঘ সময় ধরে নিরুত্তর থাকলে বিচার ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে। সিবিআই কার/ কাদের অঙ্গুলিহেলনে এহেন অকর্মণ্য হয়ে থাকছে, কতটা প্রভাবশালী যোগ থাকলে সিবিআই কে অবধি প্রভাবিত করে ফেলা যায় এই প্রশ্ন গুলো যেভাবে প্রতিটা মানুষের মাথায় গেঁথে যাচ্ছে, তা কোনো সুস্থ গণতান্ত্রিক দেশের জন্যে মোটেই ভালো কিছু নয়। অন্যদিকে, ৩০শে জুন কলকাতা হাইকোর্টে মূল মামলার মনিটরিং সংক্রান্ত শুনানি হবে মাননীয় বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষের বেঞ্চে। সেখানে তদন্ত সংক্রান্ত খামতি, প্রশ্নের কথা ইতিমধ্যে বাবা মা-এর পক্ষ থেকে রাখা হয়েছে। আমাদের নজর থাকবে সেইদিকে।
৩. ৩ আন্দোলনকারী চিকিৎসকদের মেধাভিত্তিক কাউন্সেলিং উপেক্ষা করে, নিয়মবহির্ভূত ভাবে পোস্টিং এর পরিবর্তন নিয়ে হাইকোর্ট রাজ্যের কাছে লিখিতভাবে ব্যাখ্যা চাইলেন।
‘জাস্টিস ফর অভয়া’ আন্দোলনের সামনের সারিতে থাকা তিন সিনিয়র রেসিডেন্টকে নিয়মবহির্ভূতভাবে পোস্টিং পরিবর্তন করা হয়েছে। (১৬০০ জন এর মধ্যে বেছে বেছে ডাঃ অনিকেত মাহাতো, ডাঃ আসফাকুল্লা নাইয়া ও ডাঃ দেবাশিস হালদারের পোস্টিং-এর জায়গা, মেধাতালিকা ভিত্তিক যে কাউন্সেলিং স্বাস্থ্যভবনেই করা হয়েছিল, তার প্রাপ্ত পোস্টিং-এর জায়গা থেকে পরিবর্তন করে দেওয়া হয় কোনো কারণ না দেখিয়েই।) এই পোস্টিং পরিবর্তন নিয়ম বহির্ভূত, প্রতিহিংসামূলক তা জানিয়ে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন তিন জুনিয়র ডাক্তার।
বিচারপতি বিশ্বজিৎ বসুর বেঞ্চ জানতে চেয়েছে—কোন যুক্তিতে মেধাভিত্তিক কাউন্সেলিংকে অগ্রাহ্য করে এই পোস্টিং পরিবর্তন করা হয়েছে। রাজ্যের পক্ষে কোর্টে লড়ছেন এডভোকেট জেনারেল, তিনি বলেছেন ব্যাখ্যা দিতে তার সময় লাগবে। আসলে কিছুই নয়, গোটা প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করাটাই মূল উদ্দেশ্য। এছাড়াও তিনি বলেন ‘পাবলিক সার্ভিস’ এর প্রয়োজনীয়তা তে এরকম পোস্টিং পরিবর্তন করা যেতেই পারে, কিন্তু এই নিয়ে কোনো বক্তব্য নেই যে কিভাবে বেছে বেছে তিনজন কে ‘পাবলিক সার্ভিস’ এর উন্নতিকল্পে বেছে নেওয়া হল! ফ্যালাসি আরও অনেক, ডাঃ দেবাশিস হালদার কে যে গাজোল স্টেট জেনারেল (!) হাসপাতালে পোস্টিং দেওয়া হয়েছে এনেস্থেশিওলজিস্ট হিসেবে, সেখানে কোনো অপারেশন থিয়েটার নেই, গত চার পাঁচ বছর কোনো সিজারিয়ান হয়না সেখানে, অন্যান্য অস্ত্রোপচার তো দূরের কথা! অর্থাৎ যদি ওখানে শূন্যপদ থাকে তাহলে তা দীর্ঘদিনের, তবুও কাউন্সেলিং এর সময় ওখানে কোনো শূন্যপদ দেখানো হয়নি, যদি দেখানো হত হয়তো মালদা বা ওই অঞ্চলে বাড়ি এমন কোনো চিকিৎসক মেধাভিত্তিক কাউন্সেলিং এর পদ্ধতি মেনে ওই জায়গায় পোস্টিং পেতে পারতেন।
উল্লেখ্য, তিনজনের মধ্যে দুইজন ইতিমধ্যেই পরিবর্তিত পোস্টিং এর জায়গাতেই কাজে যোগ দিয়েছেন, যাতে ‘চিকিৎসকেরা গ্রামে যেতে চায়না’ জাতীয় অযৌক্তিক কিন্তু পপুলার প্রোপাগান্ডা কে নস্যাৎ করা যায়। তৃতীয়জনের ( ডাঃ অনিকেত মাহাতো ) ক্ষেত্রে আদালত মৌখিকভাবে জানিয়ে দিয়েছে, ২৪ জুন পরবর্তী শুনানি পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে কোনও জবরদস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না এবং আর জি কর হাসপাতালে তার যে শূন্যপদটি ছিল, তাতে অন্য নিয়োগ করা যাবেনা!
সরকারের তরফ থেকে এই ধরনের প্রতিহিংসামূলক পদক্ষেপ জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে বাধাগ্রস্ত করে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, গত কয়েকদিন ধরে সিনিয়র চিকিৎসক রজতশুভ্র ব্যানার্জি (ব্রিটিশ নাগরিক- চিকিৎসক, সম্প্রতি কেলগ বিশ্ববিদ্যালয়ে মুখ্যমন্ত্রীর ভাষণের সময় প্রতিবাদ করেছিলেন) এর বিরুদ্ধে মেডিকেল কাউন্সিল ও পুলিশি হেনস্থার যে অভিযোগ সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে তা অত্যন্ত নিন্দনীয় এবং চিকিৎসক হিসেবে আমাদের কাছে গভীর উদ্বেগের। বিরোধী কন্ঠস্বর, তার রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক না কেন, তাকে এভাবে প্রতিহিংসামূলক হেনস্থার মাধ্যমে কন্ঠরোধ করতে চাওয়া গণতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত বিপদজনক সংকেত।
WBJDF-এর অবস্থান স্পষ্ট:
স্বাস্থ্যখাতের আর্থিক দুর্নীতির তদন্ত দ্রুত শেষ করে চার্জ গঠন ও বিচার শুরু করতে হবে।
অভয়ার ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে।
প্রতিবাদে যুক্ত চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসামূলক পোস্টিং পরিবর্তন অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে, মেধাভিত্তিক কাউন্সেলিং অনুযায়ী প্রাপ্ত পোস্টিং এর জায়গায় নিয়োগ করতে হবে।
সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য দায়বদ্ধ প্রশাসন ও কার্যকর বিচারব্যবস্থা অপরিহার্য এবং তার দাবিতে আমাদের প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ জারি থাকবে।









