আচ্ছা বন্ধুগণ, ফেসবুকের কি হয়েছে বলুন তো? সে নাকি ইদানিং সর্বজ্ঞ অন্তর্যামী হয়েছে — আপনি হালফিল যা যা ভেবেছেন বা ভাবছেন (সামলে মশাই), হুবহু সেইসব রিল এনে হাজির করছে চোখের সামনে — এমনটাই শুনেছিলুম অনেকের কাছে।
এমনিতে অবকাশেও রিল-ফিল দেখি না কস্মিনকালে, কিন্তু গঙ্গাযাত্রা করানোর জন্য কোনো সুদূর সম্পর্কের জ্যাঠাও যখন আর অবশিষ্ট রইলেন না পারিবারিক গাছে — এবং খই ভেজে ভেজে হেঁশেলে জমিয়ে রাখা বস্তাগুলো যখন উপচে গেল, তখন কি-ই বা করণীয় থাকে? চুল কাটাবার জন্য সেলুন রয়েছে — সময় কাটাবার জন্য মুঠোফোন কিংবা বোকাবাক্স!
সিরিয়াল আমি দেখি না। দিনকতক আগে সপ্তাহান্তে দিদির বাড়ি থাকতে গিয়ে তার পাল্লায় পড়ে গোটা দুই বাংলা সিরিয়াল দেখতে হয়েছিল বাধ্য হয়ে। বাপ্রে! পরচুলো পরে ভয়ানক পরকীয়া আর কাঞ্জিভরম-লিপিস্টিক শোভিত ক্যালিডোস্কোপিক ভিলেনিতে নারীর ক্ষমতায়ন আমার ডিসপেপটিক হজমতন্ত্র সহ্য করতে পারল না মোটেই।
অগত্যা মুঠোফোনের রিল দর্শনকে মোটামুটি নিরাপদ অপশন ভেবেছিলুম। জাতীয়-বিজাতীয় রান্না আর হরেকরকম নাইটিই বড়জোর দেখতে হবে — ও ম্যানেজ করে নোব’খন।
কিন্তু বললে বিশ্বাস করবেন না, আমার ফোনের রিলে কেবল রণথম্ভোরের বাঘ, আফ্রিকার রাজা আর স্পিলবার্গের নানা কিসিমের প্রাগৈতিহাসিক জানোয়াররা দেখা দিতে আরম্ভ করল। কোনও অবস্থায় আমার পরম মিত্র, চরম পশুপ্রেমী উদয়াদিত্যের সঙ্গে ফোনটি বদলাবদলি হয়ে যায়নি, এ গ্যারান্টি আমি নিয্যস দিতে পারি। তবু এ কি বিপত্তি বলুন তো? একে চাদ্দিকে বর্ষায় ফনফনিয়ে বেড়ে ওঠা দু’মানুষ উঁচু হোগলাবন — জলভরা রাস্তা ঠ্যাঙাতে গিয়ে মোড় ঘোরার আগে বুঝতেই পারি না সেই এলিফ্যান্ট সদৃশ গ্রাস ভেঙে হাতি আসছে না প্রতিবেশীর মাহিন্দ্রা থর — তাকে কিনা এইসব ভয়াবহ রিল দ্যাখানো? রাতে টয়লেটে যেতে থরহরি কম্প হচ্ছে — দোর খুলে আলো জ্বালতেই হয়ত দেখব কমোডের পাশে ন্যাজ গুটিয়ে ডোরাকাটা জামা গায়ে মামা (আমার নয় কক্ষণো) বসে গোঁফ চুমরোচ্ছে। কিংবা মাঝরাতে ঘুম ভেঙে খাটের পাশের জানলায় ভেলোসির্যাপটরের সিল্যুয়েট দেখতে পাবো হয়ত — বাদলা মেঘের ফাঁকে নষ্টচাঁদের জোছনায় তার দাঁত চমকাচ্ছে, এক্কেবারে জুরাসোডেন্ট স্মাইল ইন পেপসোডেন্ট স্টাইল আর কি!

সেদিন গুছিয়ে ভাবতে বসেছিলুম, আমার মতো বিশ্বভিতু মানুষের ফেবু ফিডে এইসব হিংস্র রিল কেন? হোয়াই? আমাকেই কেন? তাহলে কি আমার অন্তরে আসলে আদিম হিংস্রতা জাগরূক? আমি যে বুদ্ধত্ব প্রাপ্তি মার্কা ঢুলু ঢুলু হাসি নিয়ে বাহ্যিকভাবে ঘুরে বেড়াই, সেটা মিথ্যে? ফেক? মুখোশ? চিন্তিতভাবে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চেহারাটা মন দিয়ে দেখলুম। চোখ পাকিয়ে, দাঁত বের করে হিংস্রভাব আনার চেষ্টা করলুম খানিক – আয়নার মধ্যে থেকে হেড অফ দ্য ডিপার্টমেন্ট স্যার মোলায়েম ভাবে ভর্ৎসনা করে উঠলেন — ছিঃ, অমন করে মুখের জ্যোগ্রাফি চেঞ্জ করতে আছে? ঐ জন্যে রোগীর বাড়ির লোক ভড়কে গিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে – রিপ্লেসমেন্ট ব্লাড ডোনেশন হ্যাজ রিচড ইটস লোয়েস্ট লেভেল! নো নো, দিস ইজ নট অ্যাকসেপ্টেবল অ্যাট অল!
হেদিয়ে পড়ে ফেসবুক খুলে ভিডিওর অপশনে গিয়ে সার্চ দিলুম — উত্তম-সুচিত্রা ফিল্মস।
তা সত্যের অপলাপ করব না বন্ধুগণ, প্রথম ক’দিন ভালই ছিলুম। পথ যদি না শেষ হয়, কিছু’খন আরো না হয় রহিতে, টাচ করবে না, আমার স্বামী আমাকে ভুলে গেছেন ইত্যাদি মনোমুগ্ধকর নস্টালজিক ক্লিপিংস নিয়ে চলছিল বেশ। তারপরেই চিত্তির! ট্র্যাক চেঞ্জ হলো না বটে, তবে ঘনঘন নানারকম ট্রেন আসতে আরম্ভ করল। কোনওটায় সুচিত্রা সেন শেয়ারিং স্ক্রিন উইথ তুলসী চক্কোত্তি তো কোথাও উত্তমকুমার ব্লাস্টস নবদ্বীপ হালদার!
তারও পরে, উত্তম-সুচিত্রা যবনিকার আড়ালে বিলীন হলেন – মুঠোফোনের মিনি পর্দায় শুধু শ্যাম লাহার ভুঁড়ি আর গঙ্গাপদ বসুর হেঁটো ধুতি। বললে পেত্যয় যাবেন না, সাদাকালো সমস্ত বাঙালি চরিত্রাভিনেতাকে মুখস্থ করে ফেলেছি এ ক’দিনে – নৃপতি চাটুজ্জে থেকে ধীরাজ ভটচায, বীরেন মুখুয্যে থেকে লীলাবতী করালী, সুনন্দা দেবী থেকে যমুনা সিংহ — ফোন খুললেই এঁদের দাপট!
অতীতচারী মনকে জুকারবার্গ এইভাবে শাস্তি দিয়েছেন — এবারে ভ্রমণেচ্ছায় কোনও জায়গার নাম সার্চ দিলে ‘হাও টু রিচ ওয়েনাড বাই বুলক কার্ট’ উঠে আসবে অচিরাৎ। শাড়িফাড়ির সার্চ তো মোটেই দিচ্ছি না — শেষে ‘অথেন্টিক ইণ্ডিয়ান ট্রি বার্ক ড্রেপ’ বলে ছালবাকলের পরিধেয় শিউলির বোঁটার রঙে ছুপিয়ে ‘পূজা কালেকশন’ বলে হাজির করবে চোখের সামনে!
এখন কেবল ‘রেসকিউ পাপিজ’ বলে অসহায় কুত্তুছানা উদ্ধারের সার্চ দিচ্ছি ফেসবুকে।
জনৈক পরমহিতৈষী বন্ধু উপদেশ দিয়েছেন — ‘খেলবি সেফ। থাকবি সেভড’।
শুভ রজনী।











