যিনি সহজ ও সহযোগী পরিবেশে রেকর্ড করেন তিনি নন, যিনি প্রচণ্ড প্রতিকূল পরিবেশে দল ও দেশকে বাঁচান এবং জেতান তিনিই সর্বার্থে সেরা খেলোয়াড়। অনন্য প্রতিভা লিওনেল মেসি, শচীন তেন্ডুলকারদের একান্ত অনুরাগী হলেও আমাদের কাছে সেরা ক্রিকেটার অপরাজেয় সুনীল গাভাস্কার কিংবা চিরসংগ্রামী কপিলদেব নিখাঞ্জ। ফুটবলে পেলে, জোহান ক্রয়েফ, জর্জ বেস্ট, ডি’ স্টেফানো, পুসকাস, ইউসোবিও প্রমুখ অতুলনীয় খেলোয়াড়দের মধ্যে তেমনি চৌকষ দিয়োগো মারাদোনা। কি সব কঠিন পরিস্থিতিতে নাপোলি এবং আর্জেন্টিনাকে মারাদোনা তাঁর অনবদ্য দক্ষতা, লড়াই আর নেতৃ গুণে টেনে তুলেছেন, জিতিয়েছেন, চ্যাম্পিয়ন করেছেন – এক কথায় অকল্পনীয়। আবার একই সঙ্গে তিনি দিশাহীন, অপরাধপ্রবণ, কামাতুর, নেশাগ্রস্ত এক দিগভ্রান্ত রাজপুত্র।
রাজনীতিতেও সেইরকম মারাদোনার মত কালীঘাটের ঘিঞ্জি অমলিন পল্লীর প্রবল দারিদ্র্য থেকে উঠে আসা পশ্চিমবাংলার অগ্নিকন্যা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (জন্ম: ১৯৫৫)। গত শতাব্দীর সত্তর দশকের ইন্দিরা গান্ধী – সিদ্ধার্থ রায় কংগ্রেস জমানার জঙ্গি ছাত্র পরিষদ ও যুব কংগ্রেস কর্মী থেকে আশির দশকে প্রতিবাদী, লড়াকু ও জনপ্রিয় জাতীয় কংগ্রেস নেত্রী হয়ে ওঠা। প্রদেশ কংগ্রেস নেতা সোমেন মিত্রের সঙ্গে বিবাদে ১৯৯৮ তে তৃণমুল কংগ্রেস গঠন। বাকিটা ইতিহাস। সাত বারের সাংসদ, চার বারের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, তিন বারের বিধায়ক এবং টানা ১৪ বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। সঙ্গে স্বরাষ্ট্র, স্বাস্থ্য, ভূমি – রাজস্ব সহ ১২ – ১৩ টি দফতর। একই সঙ্গে তৃণমুল কংগ্রেসের একমেবাদ্বিতীয়ম সুপ্রিমো এবং জাতীয় স্তরের অন্যতম প্রধান বিরোধী নেত্রী।
মমতার রেকর্ড: (১) জাতীয় কংগ্রেসের ইতিহাসে আজ অবধি কেউ দল থেকে বেরিয়ে গিয়ে নিজে দল গঠন করে সুবিধা করতে পারেন নি তিনি ছাড়া। শুধু তাই নয় পশ্চিমবঙ্গ থেকে তিনি জাতীয় কংগ্রেস দলটিকেই প্রায় উঠিয়ে দিয়েছেন, সেই সঙ্গে জাতীয় ক্ষেত্রেও দুর্বল করে দিয়েছেন।
(২) কংগ্রেস ছিল এক ঢিলেঢালা দল যেখানে নেতাদের মধ্যে অবিরত গোষ্ঠী দ্বন্দ্ব চলত। তাঁর কৃতিত্ব যে তাঁর নিজের এই বিশাল দলে যেমন তাঁর বিরুদ্ধে টু শব্দ কেউ করতে পারেন না, তেমনি তাঁর প্রশাসনেও তাঁর কর্তৃত্ব একচ্ছত্র। ম্যাডামের ভয়ে সিনিয়র আমলা – পুলিশ – আধিকারিক সবাই তটস্থ।
(৩) সুব্রত, পার্থ ও সিদ্ধার্থর সাময়িক মেন্টরশিপ বাদ দিলে একক প্রচেষ্টায় তাঁর যাবতীয় অগ্রগতি ও রূপ কথার মত উত্থান। পশ্চাদপদ পুরুষতান্ত্রিক ভারতীয় রাজনীতিতে এরকম নজির খুঁজে পাওয়া যায়না। সেখানে ইন্দিরা গান্ধী, জয়ললিতা, মায়াবতী যৎসামান্য মহিলা রাজনীতিকদের উত্থানের ক্ষেত্রে প্রবল প্রতাপশালী পিতা বা মেন্টরের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
(৪) মার্কিন ডিপ স্টেট, পশ্চিমা পুঁজিবাদী রাষ্ট্র, বৃহৎ পুঁজি, আর এস এস প্রমুখরা অর্থ, মদত, প্রচার ইত্যাদি দিয়ে সাহায্য করেছে ঠিকই; অন্যদিকে সিপিএমের ৩৪ বছরের শাসনের শেষদিকে এত পচন ধরেছিল যে মানুষ অব্যহতিও চাইছিলেন – কিন্তু সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম সহ তাঁর রাস্তায় নেমে একের পর এক অদম্য জঙ্গি আন্দোলন ছাড়া সিপিএমের মত প্রবল জনভিত্তি ও শক্তিশালী সংগঠন সম্পন্ন দল এবং তাঁদের সরকারকে উৎখাত করা সম্ভব ছিল না।
(৫) তাঁর রাজনীতির কৌশল শেখার অন্যতম গুরু জ্যোতি বসু কংগ্রেসের ইন্দিরা গান্ধী, জনতা দলের নেতৃবর্গ ও ভিপি সিংহদের সঙ্গে চমৎকার এক বোঝাপড়া গড়ে তুলেছিলেন বাইরে দল যতই লোকদেখানো কংগ্রেস বিরোধী আন্দোলন করুক। মমতা দেবী জ্যোতি বসুকে ছাপিয়ে গিয়ে রাজ্যরাজনীতির সিংহভাগ পরিসরটা দখল করে বাম – কংগ্রেসকে প্রায় অপ্রাসঙ্গিক করে দিয়ে অপর দক্ষিণপন্থী দল বিজেপিকে সামান্য পরিসর দিয়ে রেখে এক লোকদেখানো কৃত্রিম লড়াই চালিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিটা ধর্ম ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি; মুসলমান, তপসিলি ও আদিবাসী সম্প্রদায় ও জাতগোষ্ঠীগুলিকে ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও অর্থনীতিক সুবিধা প্রদান, কেন্দ্র সরকারের বঞ্চনা, সংখ্যালঘু স্বার্থরক্ষা প্রভৃতি ইস্যুতে তাঁর নিয়ন্ত্রিত সহজ আঙিনায় আবর্তন করাচ্ছেন এবং ব্যাপক নির্বাচনী সাফল্য পাচ্ছেন। অথচ একইসঙ্গে বৃহৎ পুঁজি, কর্পোরেট প্রভৃতির স্বার্থরক্ষার জন্য বরাভয় ছাড়াও আর এস এস এবং বিজেপির সর্বোচ্চ নেতৃত্বের সঙ্গে এক অসাধারণ বোঝাপড়া ও সমন্বয় গড়ে তুলেছেন। পাশাপাশি ছন্নছাড়া বিরোধীদের মাঝেমধ্যে অনুষ্ঠিত ‘ইন্ডিয়া’ মঞ্চসজ্জাতেও তিনি মুখ্য চরিত্র থাকছেন। এই ধরনের রাজনৈতিক বুদ্ধিমত্তা, দক্ষতা, অভিনয় ও ভারসাম্য রক্ষা বিরলতম।
(৬) বৈষম্যময় ও শোষণমূলক সমাজের র্যাডিকাল ও সমাজতান্ত্রিক পরিবর্তন রোধ করে নাগরিকদের পৃথক উপভোক্তা তৈরি করে একদিকে পুঁজির অফুরন্ত সস্তা শ্রমের যোগান ও অন্যদিকে বাজারের স্থিতিশীল ক্রেতা হিসাবে গড়ে তুলতে আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদ নির্ধারিত আমাদের দক্ষিণ ভারতে এবং বিশ্বের বিভিন্ন গরিব রাষ্ট্রে প্রবর্তিত ক্ষুদ্র Cash Transfer প্রকল্প গুলির সফল রূপায়ণে তিনি নারী, মুসলমান, তফসিলি, জনজাতি, গরিব, নিম্নমধ্যবিত্ত প্রভৃতিদের মধ্যে যেমন এক পর্যায়ে জনবাদী সামাজিক – অর্থনীতিক সংস্কার ঘটাতে সক্ষম হয়েছেন, তেমনি সংখ্যাগরিষ্ঠ তাঁদের স্থায়ী ভোটার তৈরি করতে পেরেছেন। এরমধ্যে তাঁর দু টাকার চাল, কন্যাশ্রী, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, পাঁচ টাকার ডিম ভাত প্রভৃতি প্রকল্পগুলি সুপারহিট। যেগুলিকে কিনা বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলি অনুকরণ করছে।
(৭) এতদিন দেশ ও রাজ্যের সংসদীয় রাজনীতি এবং সরকার ও প্রশাসন মূলতঃ সংবিধান, আইনসভা ও আদালত নির্ধারিত ভাষা, রীতি ও পদ্ধতি মেনে চলত। তিনি ক্ষমতায় এসে সমস্তটি ওলটপালট করে নিজের সুবিধা ও হিসেব মত চালিয়ে যেমন পুরো ব্যবস্থাটা নিজের হাতের তালুর মধ্যে নিয়ে এসেছেন, অন্যদিকে বিরোধী দল, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যক্তিবর্গ, আইন – আদালতকে হতবাক ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে দিয়েছেন। এর সঙ্গে নিজের শ্রেণিজ নিম্নবর্গীয় ও সমাজবিরোধী বিষয়গুলি মিশিয়ে পুরো ব্যাবস্থাপনাটি নিম্নবর্গীয় ও সমাজবিরোধী বান্ধব করে দিয়ে সমাজের এই দুটি অংশের মধ্যে দৃঢ় ভিত্তি অর্জন করেছেন এবং সরকার, প্রশাসন ও দলে তাদের একদম সামনের সারিতে নিয়ে এসেছেন। এটিও বঙ্গ তথা ভারতীয় রাজনীতিতে সম্পূর্ণ নতুন।
(৮) সমস্ত বিরোধী ও প্রতিবাদীদের যেমন তিনি নানা কায়দায় দমন ও নিয়ন্ত্রণ করেছেন, তেমনি দলে তাঁর আদেশ এবং ভাগের ফর্মূলা অমান্য করলে তাদের উপযুক্ত সবক শিখিয়ে দিয়ে নিজের সর্বময় কর্তৃত্ব নিরঙ্কুশ করে তুলেছেন। কুণাল, পার্থ, অনুব্রত, জ্যোতিপ্রিয়, মদন কয়েকটি হেভিওয়েট উদাহরণ। আবার বেশ কিছু বিরোধী নেতাদের সুযোগ সুবিধা দিয়ে দলে টেনে তাঁর বিরোধিতা অনেকটাই প্রশমিত করে দিতে পেরেছেন। সোমেন মিত্র, মানস ভূঁইয়া থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক জন বারলা, শঙ্কর মালাকার অজস্র উদাহরণ। একইভাবে জনগণের টাকায় সরকারি খরচে নানারকম আর্থিক, আবাসন, পদ, সম্মাননা, পুরস্কার, গাড়ি, কাজ প্রভৃতির সুযোগ সুবিধা দিয়ে এবং কেস ও বিজেপির জুজু দেখিয়ে বহু তথাকথিত বিপ্লবী, শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও ‘বিদ্বজ্জন’দের নিজের পারিষদ ও মোসাহেব করে তুলতে পেরেছেন। ফলে দলের বৈচিত্র্য এবং গ্ল্যামার বেড়েছে।
(৯) প্রতিকূল পরিবেশেও বুক চিতিয়ে লড়াই করে এবং অসম্ভব পরিশ্রম করে বিজয়কে ছিনিয়ে এনেছেন। জনগণের মতিগতি বুঝে সেইমত চলেছেন, তাঁদের মধ্যে সরাসরি চলে গেছেন এবং আপন করে নিয়েছেন। ফলে তাঁর অসংস্কৃত লব্জ, ত্রুটিপূর্ণ উপমা ও সহজ কথাবার্তা মানুষ গ্রহণ করেছে। একেবারে নিজের হাতে উত্তরবঙ্গ থেকে দক্ষিণবঙ্গ এক বিশাল সংগঠন, এক ঝাঁক নিবেদিতপ্রাণ তরুন নেতা এবং হাজার হাজার একনিষ্ঠ কর্মী গড়ে তুলতে পেড়েছেন। মহিলা, গৃহ বধূদের বেশিবেশি করে রাজনীতিতে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছেন। বিচক্ষণ নেত্রী হিসাবে ভ্রাতুষ্পুত্র অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে উত্তরাধিকারী হিসাবে গড়ে তুলেছেন। ইতিমধ্যে মুকুল ও শুভেন্দুর নিষ্ক্রমণ ঘটে গেছে।
(১০) দুটি ক্রম বর্ধমান শক্তিশালী সশস্ত্র আন্দোলন – দার্জিলিং পাহাড়ের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোর্খাল্যান্ড এবং জঙ্গলমহলের নৈরাজ্যবাদী মাওবাদী আন্দোলন – যেগুলি সিপিএম এনং বামফ্রন্ট সরকার সামলাতে পারেনি, সিপিএম কে উৎখাত করতে তাদের সাহায্য নিয়েও ক্ষমতায় এসে তাদের কৌশলে ও কঠোর অবস্থান নিয়ে দমন করতে সক্ষম হন। মাওবাদী নেতা কিশেনজীকে হত্যা করা হয় এবং বিমল গুরুং দুবার কোনরকমে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে পরে তৃণমূলে যোগ দিয়ে নিষ্ক্রিয় হয়ে যান।
মমতার বিবর্তনঃ একদা সততার প্রতিমূর্তি এবং আটপৌরে শাড়ি ও সস্তা হাওয়াই চপ্পল পরিহিত তাঁর শাসনকালে ঘটে গেছে সীমাহীন সব দুর্নীতি ও অপশাসন। ২০১১ তে ক্ষমতায় আসার পর দুবছর কাটতে না কাটতেই ২০১৩ তে প্রকাশিত হল সারদা কেলেঙ্কারি। সারদা ও অন্যান্য চিট ফান্ডে জনগণকে তাঁদের কষ্টার্জিত অর্থ রাখতে প্ররোচিত করে সেই অর্থ দুহাতে লুঠ করে বিভিন্ন জায়গায় সরানো, বিপুল পারিবারিক সম্পত্তি গড়া এবং যথেচ্ছ ভোগ মচ্ছবে খরচ করে চিট ফান্ডগুলিকে উঠে যেতে বাধ্য করা। ব্যাপক জনরোষ ও কেন্দ্রের অনুসন্ধানে যখন তাঁর দল ও সরকারের নাজেহাল অবস্থা, তাঁর ও তাঁর পরিবারের দিকে আঙ্গুল উঠেছে, তখন সিপিএম সহ বিরোধীরা একটু চাপ দিলেই সরকার পড়ে যায়। কিন্তু সিপিএম সহ বিরোধীরা কার্যত নিষ্ক্রিয় রইলেন। মানুষের কাছে নির্বাচনে প্রত্যাখ্যাত হয়ে হয়তো সিপিএমের সেই মনোবল ছিলনা। আজও ছাত্র – যুবদের দিয়ে প্রতীকী কিছু আন্দোলন ছাড়া তৃণমুল অপসারণের কোন সিরিয়াস প্রচেষ্টা সিপিএম ও অন্য বিরোধীদের ক্ষেত্রে অনুপস্থিত। অথচ ক্রমশ তাদের রক্তক্ষরণ চলছে এবং তাঁরা ক্রমশ প্রান্তিক ও কেউ কেউ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছেন। তিলোত্তমা হত্যাকাণ্ড ও যোগ্য শিক্ষকদের বঞ্চনার ইস্যু দুটি ধরেই ঠিকভাবে আন্দোলন করলে মমতা দেবীর টিকে থাকা মুশকিল ছিল। চিকিৎসক, নাগরিক, শিক্ষকরা যথেষ্ট প্রতিরোধ গড়ে তুলে মমতা সরকারকে বিপাকে ফেলে দিয়েছিলেন। কিন্তু বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি টোকেন প্রতিবাদ ছাড়া আগের মতই নিস্ক্রিয় রইল।
সারদার ক্ষেত্রে বিরোধীদের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে মমতা দেবী রাজীব কুমারের নেতৃত্বে তাঁর পুলিশ প্রশাসনকে দিয়ে যাবতীয় প্রমাণ লোপাট করালেন, দলের দ্বিতীয় স্থানাধিকারী মুকুল রায় কে বিজেপিতে পাঠালেন বিজেপিকে প্রশমিত করতে, নিজে মরিয়া হয়ে তাঁর প্রণবদা রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের সাহায্যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে দেখা করলেন। কেন্দ্র এজেন্সির অনুসন্ধান স্তিমিত হয়ে এল। এভাবে সারদা – রোজ ভ্যালি কেলেঙ্কারি গুলি সামলালেন। সুদীপ্ত ঘোষ কে শিখণ্ডী করে আমৃত্যু জেলে পুরে দিয়ে আবার জনগণের টাকায় সরকারি খরচে বঞ্চিত উপভোক্তাদের সামান্য কিছু মাসোহারার ব্যবস্থা করে অসহায় আম জনতার কাছে নিজের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ালেন। তারপর থেকে সিবিআই পোষা হয়ে গেল যারা আজ অবধি অসংখ্য দুর্নীতি, বোগটুই গণহত্যা, রেশন কেলেঙ্কারি, নিয়োগ কেলেঙ্কারি, শিক্ষা কেলেঙ্কারি, হাসপাতাল কেলেঙ্কারি, তিলোত্তমার মত হাড়হিম করে দেওয়া প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ষণ ও হত্যার কোন কিনারা করতে পারলেন না। ধরা পড়লেন না অপরাধের আসল মাথা, ষড়যন্ত্রী ও প্রধান উপভোক্তারা। সেরকমই পোষা হয়ে গেল কেন্দ্র বাহিনী। তারা নির্বাচনের সময় দলে দলে আসে, গুড়জল খায় আর শাসক দল ও দলদাস পুলিশ কর্তৃক রিগিং এর সময় নির্বিকল্প সমাধিতে থাকে। গণভিত্তি ও জনসমর্থনের পাশাপাশি একচেটিয়া রিগিং পঞ্চায়েত নির্বাচন থেকে সংসদীয় নির্বাচন (বিজেপিকে দেয় আসনগুলি বাদ দিয়ে) জয়লাভ অনায়াসলব্ধ হয়ে গেল। অন্যায় করে শাস্তি না পাওয়া, পুলিশ প্রশাসন তাদের কথায় চলা, যা খুশি তাই করেও কোন উপযুক্ত বিরোধী ও প্রতিরোধের অভাবে প্রতিটি নির্বাচনে জিতে চলা নেত্রীর সঙ্গে কর্মী বাহিনীরও আত্মপ্রত্যয় এতই বাড়িয়ে দিল যে সিপিএমের জমানায় যে পার্টিতন্ত্র ও সিন্ডিকেট রাজ জাঁকিয়ে বসেছিল সেই জায়গায় একেকটি অঞ্চলে তৃণ আশ্রিত দুষ্কৃতীদের মাফিয়াতন্ত্র ও মুক্তাঞ্চল গড়ে উঠল যা শেখ শাজাহানের সন্দেশখালি, কেষ্ট মন্ডলের বীরভূম, হামিদুল রহমানের চোপরা, শওকত মোল্লার ক্যানিং, আরাবুল ইসলামের ভাঙ্গর, হুমায়ুন কবীরের বেলডাঙ্গা, হাজী নুরুলের বসিরহাট, গোলাম রাব্বানির গোয়ালপোখর, উদয়ন গুহর দিনহাটা প্রভৃতি ক্ষেত্রে দেখা গেল যেখানে তোলাবাজি, জমি দখল, দাঙ্গা, উচ্ছেদ, অত্যাচার, মারধর, খুন, ধর্ষণ নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। বালি, কয়লা, গরু, মানব, ড্রাগস, জাল টাকা, অস্ত্র পাচার; খুন, ধর্ষণ, তোলাবাজি; বোমা বিস্ফোরণ – তৃণমূল নেতা কর্মীদের একের পর এক কেলেঙ্কারি, তাঁর পরিচালিত পুলিশ ও নিয়োজিত ‘সিভিক ভলান্টিয়ার’ দের একের পর এক কুকীর্তি সামনে আসতে থাকে। সিপিএমের আইনজীবী বাহিনী এবং হাইকোর্টের কয়েকজন বিচারক যেটুকু প্রতিরোধের চেষ্টা করলেন। তখন মাননীয়া পশ্চিমবঙ্গের জনগণের টাকায় চুবিয়ে রাখা উচ্চমূল্যধারী আইনজীবী মনু সিংভি, কপিল সিব্বল দের মাধ্যমে শীর্ষ আদালতকেও ম্যানেজ করে নিলেন। ডিএ মামলা, তিলোত্তমা মামলা, যোগ্য শিক্ষকদের মামলা প্রভৃতি নিয়ম বহির্ভূত কাজে যুক্ত ও দুর্নীতিকে প্রশ্রয়দানকারী রাজ্য সরকারের প্রতিটি সংকটজনক মামলায় বিষয়গুলি প্রতীয়মান।
মুখে ২০০% কাজ করে ফেলেছি ইত্যাদি বললেও মমতা দেবী একদম শুরুতে রাস্তাঘাটের উন্নতি সহ পরিকাঠামো উন্নয়নে ব্রতী হন। ক্রমে এগুলির মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ ও আত্মপ্রচারের প্রতি মনোযোগী হন। ফলে পরিকাঠামো উন্নয়ন থমকে গিয়ে নীল সাদা রঙের বেশ কিছু অনাবশ্যক নির্মাণের সৃষ্টি হয়। বাম আমলে কোমায় চলে যাওয়া কৃষি, শিল্প, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, গণ পরিবহনে তিনি শেষ পেরেকটি ঠুকে দেন। অন্যরা তো বটেই দু দুটি প্রজন্ম সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কর্মসংস্থানের অভাবে গ্রাম ও শহর দুই জায়গা থেকেই দলেদলে ভিন রাজ্যে পাড়ি দেন। বাদ বাকিদের ডোল নির্ভর অলস কিংবা তোলা নির্ভর অপরাধীর জীবন চালাতে হয়। ফলে রাজ্যের সমাজ – অর্থনীতিক – সাংস্কৃতিক মানের প্রবল অবক্ষয় ঘটে। অপরাধ, নারী ও শিশুর উপর যৌন নির্যাতন, মদ্য পান, ড্রাগের নেশা প্রভৃতি বেড়ে চলে। এগুলি আড়াল করতে তিনি সরকারি অর্থে সারা বছর ধর্ম, পুজো, উৎসব, মেলা, ক্লাবে খয়রাতি ইত্যাদির ব্যবস্থা করেন এবং তাতে ধর্মপ্রাণ, পশ্চাদপদ, হুজুগে জনগণ কে সামিলও করে ফেলেন। যুব সমাজের কিছু আয় রোজগারের ব্যবস্থাও করে দেন। আর ভোট যুদ্ধে এদের সবাইকে সমাবেশিত করেন।
বিজেপি যদি মনে করত বিভিন্ন ঘটনায়, গণতান্ত্রিক উপায় না হলেও, তৃণমুল সরকারকে রাষ্ট্রপতির অনুশাসনে ফেলে দিতে পারত। যেমন করেছে কাশ্মীর ও মণিপুরে। কিন্তু বিজেপির উদ্দেশ্য কেন্দ্রে ক্ষমতায় টিকে থাকতে পশ্চিমবঙ্গ নামক এক ছোট রাজ্যে, যেখানে সে দুর্বল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর উপর ছেড়ে রেখে কেন্দ্রে বিজেপির সরকারকে টিকিয়ে রাখার কার্যকর সমর্থন এবং প্রধান বিরোধী কংগ্রেসকে দুর্বল করা। এবং সেটিই ঘটে চলেছে। অন্যদিকে বিজেপি কোন প্রকৃত উন্নয়ন মূলক কাজ না করে কেবল ধর্মীয় বিভাজনের তাস খেলায়, যেটি বিহার, উত্তরপ্রদেশ, দিল্লি, হরিয়ানা, রাজস্থান ও মধ্যপ্রদেশের গোবলয়ে সফল হলেও, ৩৫ – ৩৭% মুসলমান অধিবাসী এবং দীর্ঘ বাম আন্দোলন সম্বলিত পশ্চিমবঙ্গে সফল তো হলইনা, উপরন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর কাছে সোনায় সোহাগা হয়ে এসে এককাট্টা বিশাল মুসলিম ভোট ব্যাঙ্ক এবং হিন্দুত্ববাদী বিজেপি বিরোধী প্রগতশীল ভোট ব্লক তৈরি করে নির্বাচনে খুব সুবিধা করে দিল। অন্যদিকে তিনি মুসলিমদের কিছু সুযোগ সুবিধা দিয়ে তাঁদের জনগোষ্ঠীর ত্রাতা হয়ে উঠলেন। তরাই ডুয়ারসের গোর্খা ও জনজাতির প্রবল অবহেলিত চা শ্রমিকদের জন্য কেন্দ্র সরকার কিছু না করায়, মমতা দেবী তাঁদের রাজ্যের প্রকল্পগুলির সুযোগ দেওয়ায় এবং ‘চা সুন্দরী’, ‘হোম স্টে’ ইত্যাদির ঘোষণা উত্তরবঙ্গের আদিবাসীদের বিজেপির থেকে তৃণমূলের দিকে নিয়ে যায়।
এর উপর বিজেপির এন আর সি, সি এ এ, সাম্প্রতিককালের এস আই আর প্রভৃতি পদক্ষেপ এবং অসমের মত রাজ্যে তার ভয়ঙ্কর ফলাফল মুসলমান ছাড়াও নমঃশূদ্র, রাজবংশী ইত্যাদি বৃহৎ জাতিগোষ্ঠীকে, যাদের প্রধান অংশটিই পূর্ব পাকিস্তান ও বাংলাদেশে ইসলামি নিপীড়নের কারণে উদ্বাস্তু, তাঁরা বিজেপির প্রতি সন্দীহান হলেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বীণাপাণি ঠাকুর, অনন্ত মহারাজ, তহা সিদ্দিকি প্রমুখ এদের ধর্মীয় নেতাদের অনেককেই গুরুত্ব দিয়ে নিজের দিকে টেনে আনলেন। আবার ধর্মীয় কারণে হিন্দুরা ছাড়াও রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে বাংলাদেশ থেকে যে মুসলমানরা প্রতিনিয়ত আসছেন এবং মায়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমান শরণার্থী যারা পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে দিয়ে ভারতে ঢুকছেন তাদের দ্রুত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরি করে নিজেদের ভোটার বানিয়ে ফেলছেন। বিজেপির রাজ্য নেতৃত্বে দিলীপ ঘোষ বনাম শুভেন্দু অধিকারীর আদি বনাম নবীন দ্বন্দ্বেও তাঁর সুবিধা হচ্ছে। রাজ্য বিজেপি নেতৃত্ব আরেকটি মারাত্মক ভুল করছেন। কোথায় আরও কেন্দ্রীয় অনুদান ও প্রকল্পগুলি দ্রুত রাজ্যে নিয়ে এসে জনসমর্থন বাড়াবেন, তা না করে সেগুলি আটকে দেওয়ার কৃতিত্ব নিয়ে মানুষের থেকে আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন। প্রশ্ন আসছে তাঁরা যে দুর্নীতি ও অনুপ্রবেশের কথা বলছেন সেগুলি তো দেখার কথা কেন্দ্রের সি বি আই, ই ডি, বি এস এফ এর। প্রতিবার নির্বাচনে ঘুরপথে জেতার চেষ্টায় বিজেপি যে পরিকল্পনাগুলি নেয় বিহার সহ গোবলয়ে অনেকটা কার্যকর হলেও মমতা দেবী দক্ষতার সঙ্গে এবং তাঁর মুসলিম ও বাম ভোট ব্যাঙ্ককে রাস্তায় নামিয়ে সেগুলি প্রতিহত করেন, বরং সেগুলিকেই ইস্যু করে পরিস্থিতি নিজের অনুকূলে নিয়ে যান। বিজেপির এস আই আর, ভোটার লিস্ট সংশোধনী ইত্যাদিকে বাংলা ভাষা ও বাঙালী অস্মিতার ঢেউ তুলে যেরকম ‘২৬ বিধানসভা নির্বাচনের আগে পরিস্থিতি নিজের অনুকূলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।
এতদসত্তেও বিজেপির দিকে বিশেষত উত্তরবঙ্গে একটি হাওয়া তৈরি হওয়ায় এবং ১৯১৯ এর লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ৪২ টি আসনের মধ্যে প্রদত্ত ভোটের ৪০.৭% ভোট পেয়ে ১৮ টি আসনে বিজয়ী হওয়ায় ২০২১ এর বিধানসভা নির্বাচনের আগে মমতা ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সংগঠনকে বুথ স্তরে সংহত করার, দলীয় নেতাদের বিজেপিমুখী হওয়া আটকানোর এবং সামগ্রিক রণকৌশল পরিবর্তন করার উপর জোর দেন। সেই লক্ষ্যে ভোট কুশলী প্রশান্ত কিশোরের ‘আই প্যাক’ সংস্থাকে কয়েকশো কোটি টাকায় ভাড়া করেন। তাতে কাজও হয়। প্রশান্ত কিশোর সংগঠনের দুর্বলতা গুলি মেরামত করতে এবং উপযোগী রণনীতি তৈরি করতে সাহায্য করেন। সেই সময়ে একদিকে ‘দুয়ারে সরকার’, ‘পাড়ায় সমাধান’, ‘দিদিকে বলো’ প্রভৃতি তৃণমূল স্তর অবধি সরকার ও দলীয় উদ্যোগ, অন্যদিকে ‘বাংলা তার মেয়েকে মুখ্যমন্ত্রী দেখতে চায়’ জাতীয় নির্বাচনী শ্লোগান। এর উপর পায়ে ব্যান্ডেজ জড়িয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর মারাদোনার মত খেলা। ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল বিজেপিকে ২৯৪ টি আসনের মধ্যে ৭৭ আসনে আটকে রেখে ২১১ আসনে জয়লাভ করে বিপুল সংখ্যা গরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গড়ে। সিপিএম এবং কংগ্রেস বিধানসভা শূন্য হয়। ২০২৩ এর পঞ্ছায়েত নির্বাচন এবং ২০২৪ এর লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূলের এই জয়ের ধারা অব্যহত থাকে। ইতিমধ্যে দিলীপ ঘোষকে বিজেপির সভাপতি পদ থেকে সরিয়ে কোণঠাসা করে দেওয়ায় বিজেপি দুর্বল হয়ে যায় এবং নানারকম সুবিধা দিয়ে একের পর এক বিজেপি বিধায়ক ও নেতাদের তৃণমূলের দিকে নিয়ে আসা হয়। প্রশান্ত কিশোর নিজে ‘জন সুরজ পার্টি’ গড়ে বিহার নির্বাচনে দাঁড়িয়ে পড়লেও প্রতীক জৈনের পরিচালনায় ‘আই প্যাক’ আজও রয়েছে। ২০২৬ নির্বাচনের আগে তাদের পরামর্শে সরকার – তৃণমূল উদ্যোগ ‘আমাদের পাড়া, আমাদের সমাধান’।
এই ধারাবাহিক বিশাল সাফল্য, দীর্ঘদিন ক্ষমতার শীর্ষে থাকার ফলে মমতা দেবীর এবং তাঁর অনুগামীদের মধ্যে এমন এক আত্মবিশ্বাস জন্মায় যে সবকিছু তিনি করে ফেলতে পারেন। এই মমতা মিথের সুবিধা হচ্ছে তৃণমূল অপশাসনের যাবতীয় ত্রুটি এতে ঢাকা পড়ে এবং মানবী মমতা অতিমানবী দেবী রূপে তাঁদের কাছে পরিগণিত হন। যার উপর ভর করে ঘাটাল সহ রাজ্যের বিস্তীর্ণ এক অঞ্চল প্রতিবারের মত মনুষ্য সৃষ্ট বন্যার কবলে থাকা সত্ত্বেও, রাজ্যের রাস্তাঘাট ও পরিবহনের বেহাল দশা, অস্বাভাবিক দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের প্রবল অভাব ও রোজগারের জন্য ভিন রাজ্যে যেতে বাধ্য হওয়া এবং সেখানকার বিড়ম্বনা, রাজ্যের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়া, ডেঙ্গিতে এত মৃত্যু, সামসেরগঞ্জ দাঙ্গা, বিভিন্ন শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মচারী ও প্রার্থীদের দীর্ঘ পথের লড়াই, রাজ্য সরকারের ত্রুটিতে ২৬ হাজার যোগ্য শিক্ষকের চাকরি চলে যাওয়া, ক্রমবর্ধমান নির্যাতন … সবকিছু উপেক্ষা করে এবারের ২১ জুলাই মঞ্চে তিনি আগামী ভোটে পশ্চিমবঙ্গের স্থায়ী মুসলমান বাসিন্দা এবং বাংলাদেশ ও মায়ানমার থেকে অনুপ্রবেশকারী বাঙালী ও রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিশাল সংখ্যার ভোট পাখির চোখ করে বাঙালী অস্মিতা ও বাংলা ভাষার জন্য সংগ্রামের আখ্যান নির্মাণ করেন এবং সেটি পরেরদিন থেকে রাজ্য ও জাতীয় রাজনীতিতে আলোড়ন তোলে। এই আত্মবিশ্বাসের জায়গা থেকে তিনি খোদার উপর খোদকারি করে, বিজয়া দশমীর পর দুর্গা প্রতিমার কার্নিভাল এবং সরকারি অর্থে দীঘায় জগন্নাথধাম প্রতিষ্ঠা করেন এবং সফল হন। ‘বিভিন্ন ভাষায় প্রায় দুই শত পুস্তক’ লিখে নাচ, গান, কবিতা, চিত্রাঙ্কন সবেতে ‘পারদর্শিতা’ দেখিয়ে বহুমুখী প্রতিভায় বাঙ্গালীর সেরা প্রতিভা রবিন্দ্রনাথকে প্রতিযোগিতায় ফেলে দেন। আবার স্বাস্থ্য দুর্নীতির প্রধান মুখ স্নেহভাজন সন্দীপ ঘোষ সহ প্রশান্ত রায়, সুদীপ্ত রায়, নির্মল মাঝি, অভীক দে প্রমুখ স্বাস্থ্য মাফিয়া এবং অন্যান্য সহযোগীদের লম্পট সন্তানদের রক্ষা করতে আর জি কর হাসপাতালে তিলোত্তমাকে অত্যাচার ধর্ষণ ও খুনের ঘটনাকে আড়াল করতে সহযোগী পুলিশ কমিশনার বিনীত গোয়েল, স্বাস্থ্য সচিব নারায়ণ নিগম, তৃণমূল নেতা নির্মল ঘোষ প্রভৃতিদের দিয়ে প্রমাণ লোপাট করাতে হয়। যার প্রতিক্রিয়ায় চিকিৎসক ও নাগরিকদের মধ্যে ব্যাপক জনরোষ সৃষ্টি হয়। কামদুনি ধর্ষণ ও হত্যা, বরুণ বিশ্বাস, আনিস খান, তপন দত্ত হত্যা প্রভৃতি চেপে দিতে পারলেও এবং অনেক পরিশ্রম করে কেন্দ্র সরকার, সুপ্রিম কোর্ট, সিবিআই, কিছু চিকিৎসক নেতাদের সাহায্যে তিলোত্তমার বিচারের জন্য আন্দোলন সামলে দিতে পারলেও বিতর্ক তাঁকে ছাড়ে না। যেরকম টাকা নিয়ে চাকরি দেওয়া অযোগ্য শিক্ষকদের বাঁচাতে যোগ্য শিক্ষক ও তাঁদের পরিবারগুলিকে পথে বসানো।
মমতা মিথের ভবিষ্যৎঃ আমরা ভবিষ্যৎদ্রষ্টা নই। মিথ ততদিনই থাকে, যতদিন সাফল্য থাকে। আর কোন কিছু চিরস্থায়ী নয়। পশ্চাদপদ সমস্যাসঙ্কুল পশ্চিমবঙ্গের আর্থ – সামাজিক পরিস্থিতি এবং কংগ্রেসের ৩০ এবং সিপিএমের ৩৪ বছরের রাজনীতির ফসল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর বিতর্কিত বর্ণময় দীর্ঘ শাসনকাল। কোন বড় অঘটন না ঘটলে ২০২৬ এর বিধানসভা নির্বাচনে জয়লাভ করে পশ্চিমবঙ্গের টানা চতুর্থ বার মুখ্যমন্ত্রী হওয়া তাঁর ক্ষেত্রে শুধু সময়ের অপেক্ষা। তবু তাঁর বয়স হয়েছে, সব ক্ষমতা ও সম্পদ পুঞ্জীভূত করেও জড়াকে রোধ করা সম্ভব নয়। সুগার থেকে অস্টিওআরথ্রাইটিস রোগব্যাধি ভোগাচ্ছে । স্বভাবসুলভ হেঁটে সেই দীর্ঘ পদযাত্রা, মঞ্চে দাপাদাপি, শাড়ি পরে দৌড়, মাইকের সামনে প্রবল গর্জন অন্তর্হিত। খ্যাতির বিড়ম্বনা এবং দল ও সরকারের সমস্ত কিছু নিজের হাতে রাখার প্রবল চাপ তো রয়েছেই। তাই মেজাজ সবসময় খিটখিটে। প্রবন্ধের প্রথমেই বলেছি চৌকষ খেলোয়াড় মারাদোনার সমস্যার মত তাঁর নেই কোন নির্দিষ্ট আদর্শ, দিশা ও মূল্যবোধ। এর সুবাধাটি হল যখনকার যেরকম পরিস্থিতির সঙ্গে মানানো যায়, আর সমস্যাটি হল অ্যাড হক এ চলতে হয়। একটি সমস্যা মেটাতে আর পাঁচটি সমস্যার জন্ম, একটি মিথ্যা ঢাকতে দশটি মিথ্যার অবতারণা , মূল্যবোধের অভাবে ক্রমাগত পচন, দুর্নীতি গ্রাস ও দুর্বৃত্তকরণ এবং ভয়ঙ্কর সামাজিক – সাংস্কৃতিক ক্ষয়। আর সব ক্ষমটা করায়ত্ব অর্থ স্বৈরশাসনের সৃষ্টি। বাঘিনী বৃদ্ধা হলেও বাঘিনী। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে পশ্চিমবঙ্গের রাজ সিঙ্ঘাসনে অভিষিক্ত করে তিনি তাঁর দীর্ঘদিনের অভিলাষ দেশের প্রধানমন্ত্রীত্বের আসনের দিকে আরেকবার ঝাঁপাবেন নিশ্চিত। সেই চমকপ্রদ ঘটনা দেখার জন্য আমরা প্রতীক্ষা করব।










