রাজ্যের বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার বছরকয়েকের মধ্যেই কোনও একটি বিদ্যুৎ-উপকেন্দ্র ও হাই-টেনশন ইলেকট্রিক লাইন বসানোর ব্যাপারে জমি অধিগ্রহণ ঘিরে ভাঙরে আন্দোলন হয়েছিল। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামে জমি-অধিগ্রহণের প্রতিবাদে যাঁরা আন্দোলনে নেমেছিলেন, তাঁদের যে অংশটা ক্ষমতার নতুন জামা পরে তুরীয় আনন্দলাভে ব্যস্ত হননি, ভাঙরের মানুষের পাশাপাশি তাঁরাই মূলত এই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন। না, বিদ্বজ্জনদের উপস্থিতি বা মিডিয়ার অকুণ্ঠ সহযোগিতা এই আন্দোলন পায়নি, সুতরাং সোশ্যাল মিডিয়া বা শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালি সে নিয়ে তেমন একটা উদ্বেল হয়ে ওঠেনি।
পরবর্তী সময়ে, এই আন্দোলনের পুরোভাগে থাকা একজন বলেছিলেন, বড়সড় বলপ্রয়োগ ছাড়া, স্রেফ একের পর এক ভুয়ো মামলা সাজিয়ে কীভাবে একটা জন-আন্দোলনকে ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া যায়, এই আন্দোলন ও তাতে পুলিশের ভূমিকা সে বিষয়ে আগামী দিনে চমৎকার একটা কেসস্টাডি হয়ে থাকতে পারবে।
তো আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে ভুয়ো মামলার গুরুত্ব বিষয়ে এই রাজ্যের পুলিশ সেই থেকেই অবহিত। এবং সে বিষয়ে চূড়ান্ত আত্মবিশ্বাসীও বটে।
ফ্যাসিবাদ প্রতিহত করার ব্যাপারে বর্তমান সরকারের সাফল্য কতখানি, সে নিয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলতে না পারলেও একদিকে অবাধ দুর্বৃত্তায়ন ও আরেকদিকে আদ্যোপান্ত একটি পুলিশ-রাষ্ট্র তৈরি করে ফেলার ব্যাপারে বর্তমান সরকার যে অত্যন্ত কুশলী, সে কথা হলফ করে বলা যায়।
যে রাজ্যে পুলিশ শাসক দলের তাণ্ডবে টেবিলের তলায় লুকোতে যায় (একেবারে শুরুর দিকের ঘটনা), পুলিশের বড়কর্তা নেত্রীর বাড়ির পুজোয় খালিপায়ে প্রসাদ বিতরণ করার দায়িত্ব পেয়ে বিমলানন্দ লাভ করে – এবং পুলিশ-অফিসার স্থানীয় নেতার কাছ থেকে বাড়ির মহিলাদের উদ্দেশে গালিগালাজ শুনে বেমালুম হজম করে নিতে বাধ্য হয় (এবং সেই নেতার সুরক্ষার দায়িত্বও পালন করে) – তারা-ই আবার ধর্ষিতার মায়ের উপর বলপ্রয়োগ করতে কুণ্ঠিত হয় না, সরকার-বিরোধী প্রতিবাদীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার ব্যাপারে অতি-উৎসাহী (পুলিশের লাঠিতে আহত যুবকের মৃত্যু, পুলিশ-হেফাজতে জেলে নিয়ে যাবার পথে বাস থেকে পড়ে মৃত্যু, এমনকি তাড়া করে ছাদ থেকে ফেলে মেরে ফেলার ঘটনাও রয়েছে)। ক্ষমতাসীন দলও খুশি। বিধানসভা ভোটে “ভালো কাজ” করার বখশিশ হিসেবে পুলিশের জন্য বাড়তি এক মাসের বেতন বরাদ্দ হয় – যাঁরা কথায় কথায় ভিনরাজ্যের সরকার-প্রশাসন ইত্যাদি নিয়ে গালি পাড়েন, তাঁরা একটিবার জেনে বলবেন প্লিজ, সরকার-কর্তৃক এমন বখশিশের বন্দোবস্ত দেশের কোথাও কস্মিনকালেও ঘটেছে কিনা?
চোর-ডাকাত-খুনী-ধর্ষক ধরার ব্যাপারে পুলিশের যে একটা ভূমিকা থাকার কথা ছিল, সে কথা স্বয়ং পুলিশ তো বটেই, আপামর রাজ্যবাসীই ভুলে যেতে বসেছেন। অতএব, পুলিশ দোষীদের আড়াল করছে এই অভিযোগের উত্তরে পুলিশ কমিশনার বিনীত গোয়েল যখন বলেছিলেন যে তাঁরা কাউকে আড়াল করছেন না, কেননা “উই আর আ রেসপন্সিবল ফোর্স”, তখন যে বিরল কয়েকজন হাসেননি, তাঁরা হাসেননি শুধু এই ভেবেই যে, হ্যাঁ, ঠিকই তো, রেসপন্সিবল তো বটেই, শাসক দলের স্বার্থ রক্ষার মতো বড় রেসপনসেবলিটি পুলিশের কাঁধে, সে তো সহজ কম্মো নয়!
পুলিশি অনাচারের আরেক ধাপ – সবচেয়ে কার্যকর ধাপ, সম্ভবত – ভাঙরের সাফল্য থেকে পাওয়া আত্মবিশ্বাস তথা শিক্ষা – ইতিউতি মামলা, একাধিক থানায় ডেকে পাঠানো। এবং পুলিশ-রাষ্ট্রের অব্যর্থ লক্ষণও বটে। হোয়াটসঅ্যাপে কার্টুন ফরোয়ার্ড করার জন্য অধ্যাপককে থানায় ডেকে হেনস্থা করে মামলা দায়ের করা দিয়ে যার শুরু, তা ডালপালা মেলে বিস্তার লাভ করেছে।
অভয়া-আন্দোলন ও সেখানে পুলিশের ভূমিকা কোনও ব্যতিক্রম নয়। একদিকে সভা-জমায়েতের অনুমতি না দেওয়া, যত্রতত্র ব্যারিকেড খাড়া করে স্বতঃস্ফূর্ত জমায়েত ও মিছিলে বাধা সৃষ্টি করা – ক্ষেত্রবিশেষে ধাক্কাধাক্কি লাঠি বলপ্রয়োগ ইত্যাদি – কিন্তু তার চাইতে ঢের কার্যকরী বন্দোবস্ত হলো, আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা মানুষদের (ক্ষেত্রবিশেষে কর্মীদেরও) ছড়িয়েছিটিয়ে বিভিন্ন থানায় ডেকে পাঠানো। গতবছর আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখনও এমন ঘটেছিল। আন্দোলন-সংক্রান্ত খবর হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে শেয়ার করার কারণে এক কলেজছাত্রীকে যাদবপুর থানায় ডেকে পাঠিয়ে আটকে রাখা হয়েছিল। মাথায় রাখুন, অভয়া-আন্দোলন সেসময় তুঙ্গে – তবু পুলিশ অতখানি বাড়াবাড়ি করার ব্যাপারে দু’বার ভাবেনি। সুপরিচিত দুজন চিকিৎসককে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য লালবাজারে ডেকেও পাঠিয়েছিল।
আপাতত, অন্তত প্রকাশ্যত, গতবছরের তুলনায় আন্দোলন খানিক স্তিমিত। মানুষের ক্ষোভ যদিও অন্তঃসলিলা ফল্গুধারার মতো প্রবহমান। ভোট এসে পড়েছে। বাঙালির অস্তিত্বরক্ষার ভ্যালিড প্রশ্নটি ঘিরেই শাসকদল আগামী নির্বাচনে লড়বে, এমনই অনুমান। যদিও আপাদমস্তক দুর্নীতিতে নিমজ্জিত একটি দল, শিক্ষা-স্বাস্থ্য-অর্থনীতিকে নিঃশেষ করে দিয়ে, ঠিক কীভাবে বা কোন পথে বাংলা ও বাঙালির অতীত গৌরব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবে, তার উত্তর আমার জানা নেই – তবু এটুকু নিশ্চিত, এই মাহেন্দ্রক্ষণে সামান্য বেচালও শাসকদল বরদাস্ত করবে না। এবং সেই বরদাস্ত না করার ব্যাপারে শাসকদলের এক ও একমাত্র অস্ত্র পুলিশ। তথা পুলিশি মামলা।
অতএব, গতবছরের মিছিলের জন্য থানায় ডাক পেয়েছেন ডা কৌশিক চাকী, ডা সুবর্ণ গোস্বামী, ডা মানস গুমটা এবং জুনিয়র ডাক্তারদের মধ্যে কিছু পরিচিত মুখ। বউবাজার থানায়। হেয়ার স্ট্রিট থানায়। আরও কেউ অন্য কোনও থানায় ডাক পেয়েছেন কিনা জানা নেই।
আজ, অতীত কোনও দিনে কোনও একটি সাইকেল মিছিলের ডাক দেবার অভিযোগে ঠাকুরপুকুর থানায় ডাক পড়েছে ডা পুণ্যব্রত গুণ ও ডা তমোনাশ চৌধুরীর।
এই নামগুলো আমার জানা। এই ডাক পাওয়ার খবরগুলো আমি জানি। নিশ্চিতভাবেই, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন থানায় আরও অনেকেই এমন জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সনির্বদ্ধ আমন্ত্রণ পাচ্ছেন, কতটুকু খবরই বা পাই সবসময়!
তবে আশার কথা এই, রাজা যখন রাজপেয়াদার উপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েন এবং মগজধোলাই-হওয়া রাজপেয়াদা যখন রাজার আদেশ তামিল করার বাইরে আর কোনও দায়িত্বই পালন করেন না – তখন প্রজাদের দুর্গতি বা রাজ্যের দুর্দশা চরমে ওঠে, বলাই বাহুল্য – তবে, সেই দুর্দশা সাধারণত দীর্ঘস্থায়ী হয় না।









