খুব ছোটবেলায়, মামার বাড়ির ঠাকুরদালানে জগদ্ধাত্রী পুজোয় আলপনা আঁকতে শিখিয়েছিল ছোট মাইমা।
আর একটু বড় হয়ে ইশকুলে যখন কিছুতেই দাঁত ফোটাতে পারছিলাম না কেমিস্ট্রিতে (অথচ সায়েন্স না নিলে ভবিষ্যতে জয়েন্ট এন্ট্রান্স-এ এগজিট হয়ে যাবে গোড়াতেই), তখন খেলাচ্ছলে ভ্যালেন্সি আর পিরিওডিক টেবল বুঝিয়ে দিয়েছিলেন সিস্টার নরবার্ট — যিনি মাত্র কয়েক মাসের জন্য অন্য এক শিক্ষিকার বদলি হিসেবে কেমিস্ট্রি পড়াতে এসেছিলেন আমাদের সেন্ট জোসেফস কনভেন্টে।
ডাক্তারিতে ধাত্রীবিদ্যা বা অবস্টেট্রিকস আমার অসহ্য লাগত – স্নাতক স্তরে হাতেকলমে ঠিকমত শিখতেই পারিনি সেটা। পরে সরকারি চাকরি পেয়ে যখন প্রান্তিক জেলার গ্রামে প্রথম কাজ করতে গেলাম, গ্রামীণ রোগিণীদের উপরে এই ধাত্রীবিদ্যাশিক্ষার সঠিক প্রয়োগ না করতে পারলে পত্রপাঠ ইস্তফা দিয়ে ফেরত আসতে হবে, জানতাম।
প্রথম প্রসূতির ছিন্ন যোনিপথের সেলাই, যাকে এপিসিওটমি বলে, সেটা আমাকে হাতে ধরে বড় যত্ন করে শিখিয়েছিল পুতুলমাসী – কালিয়াগঞ্জ হাসপাতালের আয়া। আমায় রিজাইন করে বাড়ি ফিরে আসতে হয়নি।
সারা জীবনে এমন অসংখ্য প্রথাগত/ অ-প্রথাগত শিক্ষকের দেখানো পথে চলতে চলতে ঋদ্ধ হয়েছি আমি।
সকলেই যে ধরাছোঁয়া বা স্পর্শের অনুভূতির মধ্যেকার জিনিস শিখিয়েছেন এমন নয়।
কেউ কেউ অনুভবও শিখিয়েছেন সন্তর্পণে।
বাবা শিখিয়েছিল অতি বড় বিপর্যয়ের সামনে দাঁড়িয়েও বিচলিত না হয়ে হেসে সব উড়িয়ে দিতে।
“হর ফিকর কো ধুঁয়ে মে উড়াতা চলা গ্যয়া”—
আমার মা আবার ছিল ঠিক বিপরীত চরিত্রের মানুষ। জীবন ঈশ্বরের বড় মূল্যবান দান — তাই হেলাফেলা করে জীবন বাঁচায় বড্ড আপত্তি ছিল মায়ের। যাপনে থাকবে কঠোর শৃঙ্খলা, লক্ষ্য থাকবে স্থির, প্রতিটি পদক্ষেপ হবে দৃঢ়, সাবধানী — কোনও অসংশোধনযোগ্য ভ্রান্তি যেন না ঘটে।
মা আমায় স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে শিখিয়েছে, নির্ভয়ে সহস্র বিপদের মোকাবিলা করতে শিখিয়েছে, শিখিয়েছে সময়ের হাত ধরে এগিয়ে যেতে।
”যত তিক্ত, যত অপ্রিয়ই হোক, সত্যের চেয়ে বড় আর কিচ্ছু না, কেউ না, এমন কি আমিও না –” এই কথাই মায়ের মুখে শুনে এসেছি আশৈশব।
‘হোস্টেলাইট’ বন্ধুরা শিখিয়েছিল বেঁধে বেঁধে থাকতে।
দারিদ্র্য শিখিয়েছিল প্রাচুর্য্যকে ভালবাসতে। প্রাচুর্য্য শিখিয়েছিল নির্মোহকে আপন করে নিতে।
রবীন্দ্রনাথ শেখালেন বিস্তার, প্রসার, ব্যাপ্তি — চিন্তার। অতি বড় জাগতিক শোক, যাপনক্লান্তিও যেন তাঁর অনন্য জীবনবোধের পাশে নিতান্ত তুচ্ছ জ্ঞান হলো।
সময় শেখাল ভুলতে। সুখ,দুঃখ, স্মৃতি, নিজেকে।
রাজনীতি শেখাল ঘৃণা। সারল্য শেখাল অপমান। অপমান শেখাল পরিণত হতে।
ছাপ্পান্ন পেরিয়েছি গত চৈত্রে। এখনও শিখি নিরন্তর। কত মানুষের জীবনকথা, অসহায়তার গোপন উচ্চারণ, অব্যক্ত বেদনার বিচিত্র কাহিনী আমাকে শিখিয়ে যায় জীবনের অর্থ। জানিয়ে যায় প্রাণীজগতে মানুষ নামক জীবটির শ্রেষ্ঠত্বের গূঢ় কারণ। তার বুদ্ধি নয়, তার অসীম সহ্যশক্তি। বিরূপতম পরিস্থিতির সঙ্গেও তার মনের অভিযোজনের অকল্পনীয় ক্ষমতা। তার আশাবাদ।
মার্টিন লুথার কিংএর সেই অবিস্মরণীয় উক্তি আমাকে শিখিয়ে যায় টিকে থাকার মন্ত্র –
We must accept finite disappointment, but never lose infinite hope.
আমার সকল শিক্ষকই আমার ঈশ্বর। সকলকেই আমার প্রণাম। আমার সকৃতজ্ঞ শ্রদ্ধা।
শুধু একজন শিক্ষককে আজকের দিনের আগে তার প্রাপ্যটুকু দেবার কথা মনে হয়নি কখনও।
যে আমাকে পড়ে গিয়ে উঠে দাঁড়াতে শিখিয়েছে। শিখিয়েছে কোনো অবস্থাতেই হাল না ছাড়তে। চোখে জল এলেও হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে সে জল মুছে ফেলে, স্বচ্ছ দৃষ্টি মেলে সামনের দিকে তাকাতে শিখিয়েছে। যে সর্বক্ষণ ধরে থেকেছে আমার হাত — স্বপ্নে, অবচেতনেও কখনো সঙ্গ ছাড়েনি আমার। এই দীর্ঘ ক্লান্তিকর জীবনের প্রতিটি একঘেয়ে মুহূর্তে আমার কানের কাছে বলে গিয়েছে — আমি আছি, আর কেউ না থাকুক তোমার পাশে, আমি রয়েছি। যতদিন তুমি আছো, আমি ছায়ার মত থাকব তোমার সঙ্গে।
তাকে আজ অভিবাদন জানাতে মন চাইছে।
কে সে? সে আমি নিজে। আমার সমস্ত ঠিক-ভুলের কারিগর, সব সাফল্য-ব্যর্থতার বিশ্বকর্মা এই আমি। আমার অহংকার, আমার জীবনযজ্ঞের হোতা এবং ঋত্বিক দুই-ই, এই আমি।
আমার নিজের জন্য, একান্তভাবে শুধু আমারই জন্য, আজকের দিনে অনেক অনেক ভালবাসা রইল।
অতীতের সমস্ত ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রত্যেক নতুন ভোরে যেন এক নতুন ‘আমি’ জেগে উঠতে পারে, নিজেকে আজ এই আন্তরিক শুভেচ্ছা জানালাম।
সমাজমাধ্যমে আমার সমস্ত শিক্ষক বন্ধুকে শিক্ষক দিবসের শুভেচ্ছা ও অভিবাদন।
সাত বছরের #পুরোনো_লেখার সঙ্গে মেশানো নতুন কিছু অনুভূতি।










