চারপাশে ঘটে চলা অবিরাম শাসকের অন্যায়, অপরাধ, মনুষ্যত্বের পরাজয়ে রাগ হয় খুব, বিষন্ন হয়ে উঠি, পাল্টা কিছু বলতে ইচ্ছে করে। আমি তাই লিখে ফেলি গান, সুর না হলে কবিতা কিংবা নিছকই গদ্য। চেষ্টা করি সমাজমাধ্যমে সেটা মানুষের সাথে কমিউনিকেট করার।
কিন্তু এই করতে গিয়ে, বাঁচতে বাঁচতে বুকের ভেতরে যে বিন্দু বিন্দু অপার্থিব জমে ওঠে তাকে প্রকাশ করতে পারি না। আকাশের অসীমে, শ্রাবণের আদিগন্ত নীল মেঘে, রৌদ্রে, শিশিরে, পলাশে, হৈমন্তী কুয়াশায়, নারীর অতলস্পর্শী কুসুমে, শিশুর অমলে কিংবা মানুষ মানুষ শুধু মানুষের ভালোটুকুতে যে আলোপাখিটি জেগে ওঠে তাকে যদি তুমি প্রেম বলো তো বেশ হয় কিন্তু আমি তো তাকে খাঁচার বাইরে আনি না, প্রতিদিন মরে যেতে দিই।
রবিঠাকুরের গান আমার প্রথম প্রেম। আত্মপ্রকাশে কখনো কণ্ঠে নিই, মুদ্রিত করি সে অমৃত! কিন্তু তখনই হয়ত সমাজ জীবনে ঘটে যায় কোনো অঘটন। সে মুদ্রিত গান আর সামনে আনতে মন চায় না। এই যেমন শেষ বসন্তে রেকর্ড করলাম ‘কার যেন এই মনের বেদন, চৈত্রমাসের উতল হাওয়ায়’! কিন্তু সমাজমাধ্যমে পোস্ট করার ঠিক আগের মুহূর্তে ঘটে গেল পহেলগাঁওয়ের নারকীয় হত্যালীলা! সকলের মত আমি বাকরুদ্ধ তখন, সম্বিত এলে সে হত্যা বিষয়ে লেখার তাগিদ অনুভব করি অস্তিত্ব জুড়ে। লিখি। আর অন্যদিকে হার্ড ডিস্কের অন্ধ খাঁচায় পড়ে থাকে আমার বেদন-বিহঙ্গটি। সে দেখে গ্রীষ্ম ফুরিয়ে বর্ষা আসে। চৈত্র মাসের উতল হাওয়া কখন কাল বৈশাখী ঝড় হয় তারও পরে ভিজে বাতাস পূবালী বয় আষাঢ়ে।
এবার শ্রাবণে রেকর্ড করলাম একটি রবি ঠাকুরের মেঘ, ‘শ্রাবণের গগনের গায়’। কিন্তু দেখো চারপাশে কেমন তখন চাকরিহারাদের হাহাকার আর শাসক চোরেদের আস্ফালন ঘনিয়ে উঠছে! সেই সঙ্গে হুড়মুড়িয়ে এসে পড়ে অভয়ার হত্যাদিন। কেন্দ্র রাজ্য উভয় শাসকের যৌথ সঙ্গতে সে হত্যার বিচার না পাওয়া ৩৬৫ দিন পেরিয়ে গেছে কখন যেন। এই গান পোস্ট করতে গেলে স্বার্থপর মনে হয় তখন। মনে হয় শাসকের গালে সপাটে গানের থাপ্পড় মারাটাই এই সময় জরুরি। অভয়া আর ওই নিরপরাধ চাকরিহারা ছেলেমেয়েগুলোর জন্য চিৎকার করা জরুরি। আমি মিছিলে হাঁটি আর তাই করি, করেই চলি। আর ওই রবি-গানের পাখিটি কান্না করে! কী করব আমি!
অবশেষে, অবশেষে অবশেষে সে কান্নার কাছে হার মানতে হল। শ্রাবণ চলে যাওয়ার পরে অনেক কুন্ঠা নিয়েও পোস্ট করলাম সেই মেঘের গান। জানি না কতটুকু ছোঁবে তোমাকে, তবু মুক্তি তো হোক তার, আকাশ তো হোক!
(কবিতা ঋণ বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়)।










