ধর্মক্ষেত্রে রণক্ষেত্রে সমবেত লোকজনেরা
সবাই মিলে কী করল তা বলো আমায় হে সঞ্জয়
অন্ধ আমি দেখতে পাই না, আমিই তবু রাজ্যশিরে
কাজেই কোথায় কী ঘটছে তা সবই আমায় জানতে হবে
সবই আমায় বুঝতে হবে কার হাতে কোন্ অস্ত্র মজুত
কিংবা কে কোন্ লড়াইধাঁচে আড়াল থেকে ঘাপটি মারে
অন্ধ আমি দেখতে পাই না, আমিই তবু রাজ্যশিরে
এবং লোকে বলে বলে এদেশ যে তিমিরে সেই তিমিরে
(অন্ধবিলাপ – শঙ্খ ঘোষ)
সম্প্রতি, সবাই জানেন কিংবা দেখেছেন-শুনেছেন, “অভয়া” আন্দোলনের সাথে যুক্ত বিভিন্ন স্তরের ডাক্তারদের (সে সিনিয়র কিংবা জুনিয়র যিনিই হ’ন না কেন) সঙ্গে পুলিসের (পেছনে থাকা ধৃতরাষ্ট্র-রাষ্ট্রের সোহাগে) এক নতুন খেলা শুরু হয়েছে – হঠাৎ হঠাৎ করে “সমন” পাঠানোর খেলা।
এখনও অব্দি ডজনখানেক ডাক্তারকে “সমন” পাঠিয়ে থানার শীততাপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে চা দিয়ে আপ্যায়ন করে ডাক্তারদের পিতৃদেব এবং উর্ধতন চতুর্দশ গুষ্টির ঠিকুজি-কুলজি জানা হচ্ছে। এদের আচরণে মনে হচ্ছে, স্বেচ্ছায় নয়, অদৃশ্য চাপে “সমন” পাঠানোর খেলায় নামতে বাধ্য হয়েছে। কোন বড়ো রেজিস্টার তৈরি হচ্ছে নিশ্চয়ই! এই ধরুন SIR কিংবা NRC-র মতো। হবেও বা!
আমরা তো সামান্য মানুষ। ধৃতরাষ্ট্রদের উদ্দেশ্য-বিধেয় বা এর পাইক-পেয়াদার ছলা কলা বোঝা কী আমাদের সাজে? আমরা দেখে যাই। যেমন চাকরিহারা শিক্ষক-শিক্ষিকাদের বা চিকিৎসা না-পাওয়া রোগীর পরিজনদের অসহায়তা, প্রক্ষোভ, রাস্তায় নেমে পুলিশের লাঠি খাওয়া ইত্যাদি সবই আমরা দেখে যাই। কিংবা পর্দায় অতি চড়া তারে বাঁধা ভাবগম্ভীর আলোচনায় মজে যাই।
আবার সেই শঙ্খ ঘোষ! তিনি আমাদেরকে জানিয়েছিলেন –
পেটের কাছে উঁচিয়ে আছো ছুরি
কাজেই এখন স্বাধীনমতো ঘুরি
এখন সবই শান্ত, সবই ভালো …
এখন সবই শান্ত সবই ভালো
সত্য এবার হয়েছে জমকালো
বজ্র থেকে পাঁজর গেছে খুলে
এ-দুই চোখে দেখতে দিন বা না দিন
আমরা সবাই ব্যক্তি এবং স্বাধীন
আকাশ থেকে ঝোলা গাছের মূলে।
ভিন্ন প্রসঙ্গ
১৮৭৪ সালে প্রকাশিত বসুর সেকাল আর একাল গ্রন্থে রাজনারায়ণ ভারতীয়দের তরফে ইংরেজদের “হনুকরণ”-কে তীব্র শ্লেষে বিদ্ধ করে লিখেছিলেন, “হিন্দু”দের প্রাতঃস্মরণীয়া নারীদের নিয়ে যে শ্লোক চালু ছিল, সে শ্লোক পরিবর্তিত হয়ে সেকালে নকল শ্লোক তৈরি হয়েছিল –
হেয়ার কল্বিন্ পামরশ্চৈব কেরি মার্শমেনস্থতা।
পঞ্চ গোরা স্মরেন্নিত্যং মহাপাতক নাশনং।।
আজকের এই জাল ওষুধ থেকে টাকা নিয়ে রোগী ভর্তি, মেধাবী ছেলেদের পাশ করিয়ে দেওয়া থেকে ইউনিভার্সিটি রেজিস্ট্রেশন… ইত্যাদি প্রতি পদে “অদৃশ্য, সন্ত্রাস ও হুমকি সংস্কৃতি-নির্ভর” যে মেডিক্যাল সাম্রাজ্য চলছে (রাজধানী – আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ), প্রতিটি আনাচে-কানাচে নকলের যে সাম্রাজ্য চলছে সেখানে হেয়ার, কেরি, মার্শম্যান প্রভৃতিদের সরিয়ে “প্রাতঃস্মরণীয়” অভীক, বিরুপাক্ষ, সন্দীপ এবং সুদীপ্তদ্বয়দের নাম স্বচ্ছন্দে বসিয়ে দেওয়া যায়! এ বলে আমায় দ্যাখো, ও বলে আমায় দ্যাখো। মজার ব্যাপার, এদের অনেকেই আবার স্ব স্ব জায়গায় সস্মমানে ফিরে এসেছে, সরকারের আনুকূল্যে।
সেপ্টেম্বর মাসের ১৪ তারিখ, ২০২৪। বৃষ্টিস্নাত কলকাতার সে রাতের কথা মনে পড়ে? সে রাতের ছবি ওপরে। “দিদি” হিসেবে আমাদের মাননীয়া চলে গিয়েছিলেন ১০ সেপ্টেম্বর থেকে স্বাস্থ্য ভবনের সামনে অবস্থানরত জুনিয়র ডাক্তারদের মাঝে। “ভাই”দেরকে অবস্থান তুলে নিয়ে কাজে যোগ দিতে বলেছিলেন। সে সন্ধেতেই জুনিয়র ডাক্তারেরা তাঁর ডাকে কালীঘাটের বাসভবনে যায় আলোচনার জন্য। আমাদের ভাইদের দাবী ছিল, সমগ্র আলোচনা লাইভ স্ট্রিমিং করতে হবে। সুপ্রিম কোর্টের অজুহাতে পরিষ্কার না করে দেওয়া হয়। “দিদি”র “ভাইয়েরা” দিদির বাড়িতে চা খাওয়ার আমন্ত্রণ প্রত্যখ্যান করে আবার অবস্থান মঞ্চে ফিরে আসে – কেউ কেউ চোখের জল নিয়ে।
যৌক্তিকভাবেই, এসমস্ত দুর্নীতির নিয়ামক সরকারের তরফে ভারপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য দপ্তরের সেক্রেটারির পদত্যাগের দাবীতে “ওরা বীর, ওরা আকাশে জাগাতো ঝড়”-এর বাহিনী স্বাস্থ্য ভবনের সামনে অবস্থানে বসেছিল, যেমনটা তার আগে কলকাতার পুলিশ কমিশনারের সাথে দেখা করে তাঁর পদত্যাগের দাবীপত্র এবং একটি সবল, ঋজু শিরদাঁড়া উপহার দিয়ে এসেছিল খোদ লালবাজারে।
একদল মেধাবী, মানুষের চিকিৎসা করার স্বপ্ন-মাখা চোখ নিয়ে তাদেরই সাথী আরেক স্বপ্ন দেখা সাথী “অভয়া”র নৃশংস খুন এবং নৃশংসতম হত্যার (বিশেষণদুটোর স্থান বদলও হতে পারে) বিচার (সুবিচার অনেক দূর গ্রহের কোন ছায়াময় অস্তিত্ব!) এবং সরকার ও রাষ্ট্রের তরফে সযত্নে তৈরি করা “আইনসিদ্ধ আইনহীনতা” (legalized lawlessness)-এর বিরুদ্ধে তখন দীর্ঘ লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছে, একটি সিস্টেমের মধ্যেকার নীরব “সন্ত্রাস সিন্ডিকেট”, সম্পূর্ণ অবৈধ ও অনৈতিকভাবে টাকার বিনিময়ে ছাত্রছাত্রীদের পাস-ফেল করানো বা নম্বর বাড়ানো, মর্গের মৃতদেহ বিক্রী থেকে নিম্ন মানের ওষুধ (কোন কোন ক্ষেত্রে ওষুধই নয়, গায়ে দেবার পাউডার) সরবরাহের ঠিকাদারি থেকে কয়েক শ’ কোটি টাকা কামানো, ওয়েস্ট বেঙ্গল মেডিক্যাল কাউন্সিল এবং মেডিক্যাল শিক্ষাবিভাগের অভ্যন্তরের অবর্ণনীয় দুর্নীতি – সমস্ত কিছুর ক্লেদাক্ত আবরণকে একটানে খুলে ফেলে দিচ্ছে আমজনতার সামনে।
“অভয়া” আন্দোলন
এ আন্দোলনের ফলে এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল যে, শাসকদল এবং সরকারকে এর প্রতিক্রিয়ায় নিত্যনতুন কৌশল ভাবতে হচ্ছিল। যেমন ১ বছর পার করেও ধৃতরাষ্ট্ররা ভাবছে।
জুনিয়র ডাক্তারদের proactive movement সরকারকে reactive position-এ ঠেলে দিয়েছিল। এক অভূতপূর্ব ঘটনা। এরা বিভিন্ন স্তরে গণ অংশগ্রহণের flood gate খুলে দিয়েছিল।
শুধু এটুকুই নয়, এ আন্দোলনের অভিঘাতে নারীরা সামাজিক সুরক্ষা এবং ব্যক্তি নারীর স্বাতন্ত্র্যচিহ্ন খুঁজে পেয়েছে। সমস্ত নাগরিক সমাজ – সবরকমের দলীয় প্রভাবকে দূরে সরিয়ে রেখে – একটি নতুন পরিসর তৈরি করেছে। এরকম তৃতীয় পরিসর বা নাগরিক পরিসর স্মরণীয় কালের মধ্যে উন্মোচিত হয়নি।
রাজনৈতিক দল এবং ঝান্ডা ছাড়া মানুষের বিশুদ্ধ আবেগ এবং পবিত্র ক্রোধকে রাষ্ট্র সবসময় ভয় পায়। চায়, একে বারংবার সহিংস হবার পথে ঠেলে দিতে। সফল না হলে একে প্রশমিত করার জন্য গণতন্ত্রের তথাকথিত চারটি স্তম্ভই কাজ করে – বিভিন্ন স্তরে, বিভিন্ন মাত্রায়। সে কাজ করা শুরু হয়েছে, এবং করবেও। আমাদের রাস্তা ধর্ণায় বসে থাকা, পথে নেমে বন্ধু এবং সাথীকে চিনে নেওয়া। নাগরিক সমাজের বিপুল অংশগ্রহণ আমাদের নতুন ‘Human Bondage’ তৈরি করেছে। অজানা অচেনা প্রত্যন্ত গ্রামের প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষ এ আন্দোলনের সাথে জুড়ে যাচ্ছে। আড়ে-বহরে “অভয়া”-র জন্য বিচার চাওয়ার অবয়ব ক্রমাগত বড়ো হচ্ছে।, দীর্ঘ হচ্ছে। আরও গভীরতায় প্রবেশ করছে।
আমাদের কাছে অজানা শিশু-কিশোর-কিশোরী-যুবক-যুবতী-মাস্টার মশাই-দিদিমণি-দাদা-বৌদি-ভাইদের আমরা জড়িয়ে ধরছি – যেন আরও বেঁধে বেঁধে থাকতে পারি আমরা।
কিন্তু সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলো হল
(১) আমাদের সন্তানসম জুনিয়র ডাক্তারেরা একটি অতি শীলিত, দৃঢ় এবং প্রত্যয়ী সামজিক যুক্তিবোধের জন্ম দিয়েছে, যুক্তি এবং শিষ্ট বিতর্কের সীমানা কোন সময়েই অতিক্রম করেনি,
(২) এর পরিণতিতে অগণন মানুষের অংশগ্রহণের মাঝেও নিঃসারে এই শিষ্ট যুক্তির প্রয়োগ ও পরিণতিতে অনুশীলনের সূচনা করেছে। আজকের অশিষ্ট, কদর্য, ক্লেদাক্ত সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রতিবেশে এ এক জীবন্ত সামাজিক যুক্তির প্রতিরোধ।
এটুকু প্রাপ্তি আমাদের ইতিহাসের মহাফেজখানায় চিরকালীন স্থান করে নেবে। ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচন অব্দি ওদের ওপরে আরও জানা-অজানা নানা পথে বিভিন্ন আক্রমণ নেমে আসবে। নাগরিক সমাজের কি দায়িত্ব নেবে ওদেরকে আগলে রাখার? ওদের পাশে দাঁড়ানোর? এর উত্তর তো নাগরিক সমাজই দিতে পারে।
রাষ্ট্রের প্রত্যাঘাত
আরজি কর-এ “অভয়া”র নৃশংস ধর্ষন, নৃশংসতর খুন এবং মরা হতভাগ্য মেয়েটিকে তড়িঘড়ি পুরিয়ে ফেলাকে (পরে যুক্ত হয়েছিল আরজি কর-এর রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতিপরায়ন একটি মেডিক্যাল সাম্রাজ্যের স্বরূপ উদ্ঘাটন) কেন্দ্র করে সমগ্র বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ভারত ও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে প্রায় ৩ মাস ধরে যে বিপুল উত্তাল জনরোল তৈরি হয়েছিল, সেসময় যাদেরকে বারংবার ইলেকট্রনিক মাধ্যম ও সংবাদপত্রে দেখা গেছে, যাদের বিবৃতি সবার কাছে পৌঁছেছে তাদের ৩ জন হল দেবাশিস হালদার, অনিকেত মাহাতো এবং আসফাকুল্লা নাইয়া।
গত ক’দিন হল আবার এদের নাম সমস্ত ধরনের সংবাদমাধ্যমে ভেসে উঠেছে। কারণ? দুর্জনেরা বলে, যে আন্দোলন সরকার এবং ক্ষমতাশীল দলকে সাময়িকভাবে টলিয়ে দিয়েছিল, সে আন্দোলনের মূল্য গুণে দিতে হচ্ছে এই প্রধান তিন মুখকে।
এমনটাই তো স্বাভাবিক। কারণ draft constitution রচনার সময়ে আম্বেদকর আমাদের সতর্ক করেছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, আমরা একটি গণতান্ত্রিক সংবিধান রচনা করছি, কিন্তু ভারতবর্ষ এখনও গণতন্ত্রের জন্য প্রস্তুত নয়। তাঁর প্রশ্ন ছিল – “How to cultivate democracy in a soil that is essentially undemocratic?”
আজ প্রায় ৮০ বছর পরেও কি আমরা প্রস্তুত হয়েছি? গণতন্ত্রের একটি সামাজিক-রাজনৈতিক স্তম্ভ হচ্ছে – বিরোধী স্বর, কণ্ঠ এবং পরিসরকে সম্মান দেওয়া, যতক্ষণ অব্দি গণতন্ত্রের মৌলিক শর্তগুলো রক্ষার জন্যই এই ভিন্ন পরিসর বা তৃতীয় পরিসর কাজ করছে। এই পরিসরটিকে কোন রাজনৈতিক দলের অনুগত বা দলদাস হবার প্রয়োজন নেই। দলের উর্ধে এই পরিসর থাকবে, এর ভিন্ন রাজনীতিও থাকবে – দলহীন রাজনীতি।
আরও দুয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আমরা স্মরণ করে নিই –
(১) সিনিয়র ডাক্তার পুণ্যব্রত গুণ, তমোনাশ চৌধুরি, সুবর্ণ গোস্বামী, মানস গুমটা এবং জুনিয়র ডাক্তার দেবাশিস, অনিকেত, আসফাকুল্লা এবং তাদের হাজার হাজার সহযোদ্ধাদের আন্দোলন আগাগোড়া আক্ষরিক অর্থে অহিংস ছিল। শত প্ররোচনাতেও অহিংসার গণ্ডির বাইরে যায়নি।
এ ব্যাপারটা শাসকের পক্ষে খুবই অস্বস্তিকর – কোথায় সহিংস হবে, পুলিশ এবং ক্যাডার মিলে পেটাবে এবং লকআপে ঢুকিয়ে দেবে। হাত নিশপিশ করা সত্ত্বেও ওরা এগুলো কিছুই করতে পারেনি। বরঞ্চ জুনিয়র ডাক্তাররা ঠায় রাস্তায় বসে থেকেছে। পুলিশ কমিশনারকে একটি শিরদাঁড়া উপহার দিয়েছে, দিয়েছে তাঁর পদত্যাগের দাবীপত্র।
(২) এদের আন্দোলোনের মাঝে প্রবল কষ্টের মধ্যেও রসবোধ ছিল। বিশ্বখ্যাত সঙ্গীত Imagine-এর গায়ক এবং লেখক জন লেনন ১৯৬০-এর দশকের উত্তাল সময়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছিলেন – “When it gets down to having to use violence, then you are playing the system’s game. The establishment will irritate you – pull your beard, flick your face – to make you fight. Because once they’ve got you violent, then they know how to handle you. The only thing they don’t know how to handle is non-violence and humor.”
(৩) এই আন্দোলন আক্ষরিক অর্থেই জনআন্দোলনের চেহারা নিয়েছিল – এক অভাবিতপূর্ব ঘটনাপ্রবাহের সাক্ষী থেকেছিল আমার বাংলা।
(৪) এদের ১০ দফা বা তার বেশি দাবীর মধ্যে একবারের জন্যও এদের মাইনে বাড়ানোর দাবী আসেনি। এসেছিল রোগিদের স্বার্থে হাসপাতালগুলোর সিস্টেমকে পরিবর্তন করা, বাৎসরিক ছাত্র সংসদ নির্বাচন এবং একটি ভয়মুক্ত, সন্ত্রাসহীন পরিবেশ কর্মক্ষেত্রে বজায় রাখা, ডাক্তারদের সুরক্ষা ব্যবস্থাকে কার্যকরী করা।
(৫) এরা লড়েছিল একটি আইনসিদ্ধ আইনহীনতার (legalized lawlessness) বিরুদ্ধে।
একটি প্রশ্ন তো করাই যায় – দিদি এবং দিদিগিরির মাঝে দূরত্ব কতটুকু? অর্বাচীন, অর্ধশিক্ষিত, অশিষ্ট বিধায়ক এবং “সফরি ফরফরায়তে” নেতাদের দিয়ে ডাক্তারদের ওপরে ভাষগত, দৈহিক (কিছুক্ষেত্রে) এবং সন্ত্রাসের আক্রমণ প্রায় মাস দুয়েক ধরে শুরু হয়ে গেছে। আন্দোলনের ভাটার সময় এটা কখনো প্রত্যক্ষ, কখনো নিঃসাড়ে চলতে থাকবে।
স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীর সাথে মিটিং চলবার সময়ে মিটিং চলাকালীন আমরা দেখেছি, ঘটনার সত্যতা জানানোর জন্য কিভাবে কলেজের অধ্যক্ষকে এক ধমকে চুপ করিয়ে দেওয়া হয়। একটি সংবাদপত্রের খবরের শিরোনামও হয়েছে “‘না জানিয়ে ৪৭ জনকে সাসপেন্ড, এটা থ্রেট কালচার নয়?’ আর জি করের অধ্যক্ষের কাছে জবাব চাইলেন মমতা”। ছাত্রদের সামনে অধ্যক্ষের এরকম অপমান কোথায় বাজতে পারে, ভেবে দেখুন? প্রকৃতপক্ষে “হুমকি সংস্কৃতি”র গর্ভগৃহে বসেই আমরা ঠাণ্ডা গলায় হুমকি শুনলাম।
সাম্প্রতিক সময়ে একেবারে হাতেগরম উদাহরণ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য শান্তা দেবী – মেরুদণ্ড সোজা রেখে নিজের কাজটি করেছেন।
ধৃতরাষ্ট্রদের চেষ্টা থাকবে আমাদের যুক্তির এবং চলনের ধরনের ওপর ক্রমাগত আক্রমণ আসতে থাকবে এবং আমাদের সাথে বিপুল জনতার যে গাঢ় ও গভীর সংযোগ তৈরি হয়েছিল, সেটাকে ছিঁড়ে দেবার। কারণ সামাজিক আন্দোলনের অনিবার্য dynamics-এই আন্দোলনে এখন আপাত ভাটার সময় চলছে। রাষ্ট্রের আক্রমণের এটাই মোক্ষম সময়।
আপাতত এরই চূড়ান্ত পরিণতি হল “প্রাতঃস্মরণীয়” অভীক ও বিরুপাক্ষের পুনঃস্থাপন। জীবন্ত বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করা হল মেডিক্যাল কাউন্সিলে। সামনে আরও অনেক আক্রমণ একে একে আসবে। ডাক্তাররা বুঝতে পারছেন। এবং মাটি কামড়ে পড়ে রয়েছেন।
কিন্তু রাষ্ট্র হৃদয়হীন, হিংস্র, প্রতিশোধস্পৃহ, মুখ এবং মুখোশ একাকার হয়ে যাওয়া একটি যান্ত্রিক ব্যবস্থা। এর সঙ্গে আমাদের লড়াই এককথায় অসম লড়াই। এ লড়াইয়ে মাটি, জল, ভূমি, বাতাস, পুষ্টি দিতে পারে নাগরিক ও প্রান্তিক সমাজের অস্নগখ্য মানুষের অপরিমেয় শক্তি। এজন্য আমাদের অন্তহীন সামাজিক সংলাপ চালিয়ে যেতে হবে। মাটি কামড়ে পড়ে থাকতেই হবে। আর কী কোন পন্থা খোলা আছে আমাদের সামনে?
এই প্রত্যাঘাতেরই ক্রমবর্ধমান চেহারা দেখছি এখন। আরও বাড়বে। বিচক্ষণতা, ঠান্ডা মাথা, যৌক্তিক পদক্ষেপ – এগুলো এখন সময়ের একান্ত দাবী।
মানুষেরর দরবারে আমরা আবার ফিরে আসছি – “জনস্রোতের নানান মতে পথেই হবে এ পথ চেনা।” এ বিশ্বাসটুকুই আমাদের পুঁজি।
শেষের কথা
অনেকদিন আগে সামাজিক ন্যায় ও নৈতিকতাবাদী জন রলস (John Rawls) তাঁর A Theory of Justice গ্রন্থে (অমর্ত্য সেন যে বইয়ের বহুল ব্যবহার করেছেন) বলেছিলেন – “all people have equal claims to as much freedom as is consistent with everyone else having the same level of freedom.”
সামাজিক ন্যায়ের একেবারে গোড়ার কথা বলা যায়। কিন্তু সমগ্র সিস্টেমটিই যেখানে দুর্নীতি, দুরাচার, অবদমন, পীড়ন এবং অনুদান-নির্ভর সেখানে এই jaustice-এর কথা কে শুনবে? হয়তো বিচারব্যবস্থা শুনতেও পারে।
মনে পড়ছে জ্যাক লন্ডনের The Iron Heel বইটির কথা। বইটি একটি dystopia (an imagined society, place, or state where life is extremely unpleasant and oppressive, often characterized by deprivation, inequality, and a repressive social order)। ১৯০৮ সালে আমেরিকার বলদর্পী মুষ্টিমেয় পুঁজিপতিদের হাতে সমস্ত ক্ষমতা-কেন্দ্রিক এক সমাজের সাথে শ্রমিকশ্রেণি তথা বিক্ষুব্ধ মানুষের লড়াইয়ের কথা বলেছেন। সবাইকে নির্বিচারে অত্যাচার, কারাবন্দী ও হত্যা করা হচ্ছে। এরই ভিন্নতর সংস্করণ আজ আমরা প্রত্যক্ষ করছি। এ বইয়ের একজায়গায় জ্যাক লন্ডন বলছেন – “It is far easier to see brave men die than to hear a coward beg for life.” বলছেন – “No man can be intellectually insulted. Insult, in its very nature, is emotional.”
দেবাশিসরা জেনে রাখো, আমরা ডাক্তার সমাজের বড়ো অংশ তোমাদের পাশে এবং সঙ্গে। আমরা যতদূর যাওয়া যায়, যাবো। তবে সব লড়াইয়ে জয়-পরাজয় আছে, একথাও মাথায় রাখতে হবে। চরৈবেতি!
সুকুমার রায়ের দুটি ছোট্ট ছড়া মনে পড়ছে?
মাসি গো মাসি পাচ্ছে হাসি
নিম গাছেতে হচ্ছে শিম্-
হাতীর মাথায় ব্যাঙের ছাতা
কাগের বাসায় বগের ডিম।।
আরেকটিও মনে পড়ে যাবে –
বলব কি ভাই হুগলি গেলুম
বলছি তোমায় চুপিচুপি
দেখতে পেলাম তিনটে শুয়োর
মাথায় তাদের নেইকো টুপি।।











ভাল লিখেছেন। ন্যায়ের জন্য আন্দোলনে রাষ্ট্র বিরোধীতা করবে এটাই স্বাভাবিক। ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য তাই তো ক্ষতি স্বীকার করার মনের জোর রাখতে হবে।
শাসক কখনো সামন্য বিরোধীতা সহ্য করতে পারে না।সব সময় তাদের ক্ষমতা হারানোর ভয় থাকে।তাই সামান্য স্ফুলিঙ্গ দেখা গেলেই জল ঢেলে দাও।বর্তমান দুই চরম দক্ষিনপন্থি শাসক দল বিরোধীদের প্রতি অনেক বেশি নির্মম এবং নির্দয়।
ধর্মের ক্ষেত্রেও এখন আর রণক্ষেত্র নয় কাকু এখন সেটা একটা নোংরা পাঁক। ধর্ম নিয়ে এখন দিনরাত রাজনীতি হয়। সামাজিক ন্যায় ভাবনার কোন সুস্থ পরিচয় এখন আর আমরা পাই না যা দেখতে পাই সবই খেলা। দুস্থ অসামাজিক খেলা।