সম্প্রতি ভারতীয় উপমহাদেশে ভারতের দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্র শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের পর বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতমালা হিমালয়ের কোলে একদা শান্তি, স্থিতি ও সৌন্দর্যের নীড়, গত কয়েক দশক ধরে রাজনৈতিকভাবে অস্থির, নেপালে গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে দিয়ে প্রবল ক্ষমতাশালী, শক্তিধর, দাম্ভিক, উদ্ধত, দুর্নীতিগ্রস্ত, পরিবারতান্ত্রিক ও স্বজনপোষণকারী স্বৈরাচারী শাসকের ক্ষমতার অবসান হল। জনগণের তাড়ায় তিনটি দেশ থেকেই শাসকদের অন্যত্র পালিয়ে যেতে হয়েছে। এখনবধি যেটুকু জানা যাচ্ছে নেপালের কট্টর চিনপন্থী ও ভারত বিদ্বেষী দাপুটে কমিউনিষ্ট প্রধানমন্ত্রী খড়গ প্রসাদ শর্মা ওলি সেনা বাহিনীর হেলিকপ্টারে অজানা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছেন। রাজনৈতিক মহলের ধারণা চিন ও পাকিস্তানের সহায়তায় তাঁর সম্ভাব্য গন্তব্য দুবাই। ফেলে গেছেন তার সহযোগী মন্ত্রী ও নেতাদের যারা এখন গণপিটুনির শিকার এবং যাদের স্থানীয় সম্পত্তি ও ঘরবাড়িতে বিক্ষুব্ধ জনতা বহ্নুৎসব করে চলেছে। নেপাল পুলিশ বিদ্রোহী জনতার কাছে আত্মসমর্পণ করেছে এবং যে পুলিশ আধিকারিকের আদেশে গুলিচালনায় বহু আন্দোলনকারীর মৃত্যু হয়েছিল তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। দীর্ঘদিনের দুই শাসক দল কমিউনিষ্ট ও কংগ্রেসের অফিস ও কর্মীরা আক্রান্ত। সেনাবাহিনী বিদ্রোহীদের কাজে কোন হস্তক্ষেপ করছে না। রাজধানী কাঠমান্ডু ও প্রাদেশিক সদর গুলি বিদ্রোহী ছাত্র যুবদের দখলে। শোনা যাচ্ছে কাঠমান্ডু র তরুণ র্যাপ গায়ক, দলহীন রাজনীতিক ও সক্রিয় মেয়র বলেন শাহ পরবর্তী শাসক হিসাবে বিদ্রোহীদের পছন্দ। কিছুদিন আগে এশিয়ার অপর দেশ ইন্দোনেশিয়াতে এই ধরণের গণ অভ্যুত্থান হয়েছিল, যদিও তা সফল হয়নি।
নেপালের এই গণ অভ্যুত্থান এখনও ঘটে চলেছে ফলে কারণ ও ফল ভবিষ্যতে উঠে আসবে। তবে এটুকু বলা যায় শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপাল তিনটি দেশের ক্ষেত্রেই বিদেশি দেশের হাত, ডিপ স্টেট ইত্যাদির ভূমিকা থাকলেও মূল সমস্যা একদিকে আর্থিক মন্দা, ক্ষমতাসীন কতিপয় অতি ধনী পরিবারের সঙ্গে সাধারণের আকাশ পাতাল আর্থিক বৈষম্য, দারিদ্র্য, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, কর্ম সংস্থানের অভাব, শিক্ষিত যুব সমাজের হতাশা ইত্যাদি; অন্যদিকে শাসকের চাপানো স্বৈরতন্ত্র, ক্ষমতার দম্ভ, দুর্নীতি, পরিবারতন্ত্র এবং অপশাসন। নেপালের ক্ষেত্রে ২০০৮ সাল থেকে ১৭ বছর ধরে শাসক দলগুলির মধ্যে খেয়খেয়ি আবার মিলিঝুলি মুখ বদলিয়ে কুরশি তে টিকে থাকা এবং অথর্ব প্রশাসন চালানো মানুষকে খুব হতাশ করে। এরসঙ্গে এই ডিজিটাল যুগে চিনের কায়দায় (নেপাল চিন নয়) সাধারণের ক্ষেত্রে সমাজ মাধ্যম বন্ধ ও প্রবল দমন পীড়ন ক্ষোভে ঘৃতাহুতি দেয়। কোন কোন সূত্রের মতে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী এই Gen Z (১৯৯৬ – ২০১০ এর মধ্যে যাদের জন্ম) বিপ্লবের সংগঠক একদা ডি জে বর্তমানে সমাজসেবী ‘ হামি নেপাল ‘ এনজিও সংস্থার তরুণ কর্ণধার সুদান গুরুং। কোকা কোলা কোম্পানি, ভাইবার প্রভৃতি বহু বিদেশী বহুজাতিক সংস্থা হামি নেপালের শিক্ষা প্রসার, ভূমিকম্পে ত্রাণ প্রভৃতি কাজে অর্থ সাহায্য করে থাকে।
দীর্ঘ রাজতন্ত্রের অবসানে এবং ১৯৯৬ – ২০০৬ অবধি ঘনশ্যাম ওরফে পুষ্প কমল দহল (প্রচণ্ড), বাবুরাম ভট্টরাই প্রমুখের নেতৃত্বে কমিউনিষ্ট পার্টি অফ নেপাল (মাওইস্ট সেন্টার) (CPN M – C) এর সশস্ত্র গেরিলা বাহিনীর সঙ্গে নেপাল রাজের সেনাবাহিনীর রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের পর ২০০৬ এ দুপক্ষের শান্তি চুক্তি হয়। ইতিমধ্যে এক রহস্যজনক প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে রাজা বীরেন্দ্র ও তার পুরো পরিবারকে ২০০১ এ হত্যা করা হয়। সেনাবাহিনীর সাহায্যে বীরেন্দ্র ভ্রাতা জ্ঞানেন্দ্র সিংহাসনে বসেন। বহু আলাপ আলোচনার পর ২০০৮ এ নেপাল রাজতন্ত্র থেকে বহুদলীয় প্রজাতন্ত্র তে পরিবর্তিত হয়। CPN (M – C) এবং মদন ভান্ডারীর দুর্ঘটনায় মৃত্যুর পর মাধব কুমার নেপালের নেতৃত্বাধীন সংসদীয় কমিউনিস্ট দল CPN (ML) মিশে CPN (Unified Marxist – Leninist) গঠিত করে ক্ষমতায় বসে। নেপালি কংগ্রেসের মদেশিয়া নেতা ডা: রামবরণ যাদব দেশের প্রথম প্রেসিডেন্ট এবং CPN UML এর প্রচণ্ড দেশের প্রধানমন্ত্রী হন।
২০০৮ থেকে নেপালী কংগ্রেসের শের বাহাদুর দেওবা-র দুটি (২০১৭ – ‘১৮, ২০২১ – ‘২২) ও সুশীল কৈরালার একটি (২০১৪ – ‘১৫) পর্ব এবং সুপ্রীম কোর্টের প্রধান বিচারপতি খিলরাজ রেজমির একটি অন্তর্বর্তী পর্ব (২০১৩ – ‘১৪) বাদ দিয়ে ব্রাহ্মণ কমিউনিস্ট রাই নেপালে শাসন করে গেছেন। প্রচণ্ড (২০০৮ – ‘০৯, ২০১৬ – ‘ ১৭, ২০২২ – ‘২৪), মাধব নেপাল (২০০৯ – ১১), বাবুরাম ভট্টরাই (২০১১ – ১৩), কে পি এস ওলি (২০১৫ – ‘ ১৬, ২০১৮ – ‘ ২১, ২০২১, ২০২৪ – ‘২৫), ঝালানাথ খানাল (২০১১)। দুর্গম পশ্চাদপদ দরিদ্র নেপালে ব্রাহ্মণরা সামাজিকভাবে সুবিধাভোগী একটি ক্ষুদ্র তুলনামূলক উন্নত সম্প্রদায়। মদন ভান্ডারী, বিদ্যা দেবী ভান্ডারী (রাষ্ট্রপতি ২০১৫ – ‘২৩), প্রচণ্ড, বাবুরাম, মাধব নেপাল, ঝালানাথ – সমস্ত কমিউনিস্ট নেতা ও প্রধানমন্ত্রীই ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের।
ভঙ্গুর হিমালয় যেমন মাঝেমাঝে ভূমিকম্প ঘটিয়ে নেপালকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তেমনি বহু মানুষ ও বিপ্লবী যোদ্ধার প্রাণের আহূতির বিনিময়ে আধুনিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর নেতাদের লোভ ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব মানুষকে আশাহত করে ক্ষমতাসীন দলকে টুকরো টুকরো করে। ২০২১ এ CPN (UML) থেকে প্রচণ্ড র CPN (M – C) বেরিয়ে যায়। আবার
CPN (M – C) থেকে বাবুরাম, হিসিলা ইয়ামি রা বেরিয়ে গিয়ে প্রথমে Naya Sakti Party, তারপর Nepal Socialist Party তৈরি করেন। মোহন বৈদ্য বেরিয়ে গিয়ে করেন CPN (RC)। এরকম চলতেই থাকে। অন্যদিকে CPN (UML) এ ওলির সঙ্গে দ্বন্দ্বে মাধব নেপাল বেরিয়ে গিয়ে তৈরি করেন CPN (US)। বামদেব গৌতম বেরিয়ে গিয়ে তৈরি করেন CPN (UNC) …. ।
এই অভ্যুত্থানের জল এখন কতদূর গড়ায় দেখার। চিন ও ভারতের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অপরিণত, অস্থির ও আগ্রাসী ট্রাম্প চাচা যাকে মার্কিন সাংবাদিকরা এখন আদর করে ডাকছেন টাকো তিনিই বা কি করেন দেখার। সীমান্ত সংলগ্ন উত্তরাখণ্ড, উত্তর প্রদেশ, বিহার পশ্চিমবঙ্গ ও সিকিমে সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব পড়বেই। ১৭৭০ কিমি ভারত – নেপাল পুরো সীমান্ত টাই অরক্ষিত। দুই দেশে যাতায়াতে কোন পাসপোর্ট ভিসা লাগেনা। সিকিম ও দার্জিলিঙে যেমন নেপালী ভাষাভাষী গুরুং, রাই, লিম্বু, তামাং, মগর – গোর্খা জনজাতির দুই দেশের মানুষ সবসময় যাতায়াত করেন সেরকম বিহার – উত্তরপ্রদেশে থারু, মদেশিয়া রা এবং উত্তরাখণ্ড তে ছেত্রী, নেহার, বহুন, থারু, রানা, ঠাকরি, খাস প্রমুখেরা। অল্প বয়সে আমরাও বিদেশি জিনিসের লোভে দার্জিলিং থেকে মিরিক যাওয়ার পথে নেপালে অবস্থিত পশুপতিনাথ বাজারে ঢুকতাম। আবার আপনি যদি মানেভঞ্জন থেকে সান্দেকফু হয়ে ফালুট ট্রেক করে অথবা গাড়িতে যান আপনাকে মেঘমার মধ্যে দিয়ে যেতে এবং সাধারণত এক রাত থাকতে হবে তামলিং এর হোটেলে। দুটোই নেপালের ইলাম জেলায় অবস্থিত। মাঝেমাঝে ‘সশস্ত্র সীমা বাল (SSB)’ এর আউটপোষ্ট আছে ঠিকই কিন্তু এত দীর্ঘ পাহাড় অরণ্য নদী ভরা দুর্গম সীমান্তে নজরদারি রাখা প্রায় অসম্ভব। সুতরাং পিছিয়ে থাকা অর্থনীতির নেপাল থেকে ঘটমান অভিবাসন বেড়ে যাওয়ার সম্ভবনা।
পশ্চিমবঙ্গের মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী উত্তরবঙ্গে পৌঁছেই তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিমায় কেন্দ্র সরকারের তোয়াক্কা না করে নেপালে শান্তির বার্তা দিয়েছেন। তাতে কাজ হোক না হোক বিভিন্ন ঘটনা বিচারে স্বীকার করতেই হবে যে তার ক্ষমতা অসীম। সারদা কেলেঙ্কারি থেকে শিক্ষক নিয়োগের কেলেঙ্কারি প্রতিটি তিনি দক্ষতার সঙ্গে সামলিয়েছেন। সম্প্রতি রেড রোডে তাকে দূর থেকে দেখেই নাকি দুই কোম্পানি ভারতীয় সেনা পালিয়ে গেছিল। প্রসঙ্গক্রমে বলতে হয় যে বিভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ক্ষুব্ধ পশ্চিমবঙ্গের মানুষ গতবছর আর জি কর কান্ডে বিস্ফোরিত হয়। তিলোত্তমা ধর্ষণ, হত্যাকান্ড ও প্রমাণ লোপাট তীব্র জনরোষ আছড়ে পড়ে। কিন্তু চিকিৎসক নেতৃত্ব ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি এই গণবিক্ষোভ কে বিদ্রোহে রূপান্তরিত না করে দোষী ও ষড়যন্ত্রকারীদের বাঁচিয়ে সেটিকে দ্রোহের কবিতা – গানের উৎসবে পরিণত করেন।
৯.০৯.২০২৫










