“একদিন সমাজের সব স্তরের মানুষ রেগে গিয়ে রাস্তায় নেমে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে গর্জন করেছিল তাতে নবান্নের চোদ্দ তলা অব্দি কেঁপে উঠেছিল। এইটুকু তোলা থাক পাওয়ার খাতায় বাকিটা থাক ভবিষ্যতের গর্ভে ” (শুভাংশু পাল, দ্রোহ কালের দিনলিপি )
আর জি কর হাসপাতালে তরুণী চিকিৎসকের নৃশংস হত্যার পর স্বতঃস্ফূর্ত গণ জাগরণ এক নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা করে। জুনিয়র চিকিৎসকদের শুরু করা আন্দোলনে যোগ দেন সমাজের বিভিন্ন অংশের অগণিত মানুষ। এই আন্দোলনে এক নতুন বাংলার ছবি ভেসে ওঠে। ভিন্ন আঙ্গিকে এই অসামান্য সময়ের দিনলিপি লিখেছেন শুভাংশু পাল, সৃজন ভট্টাচার্য এবং নীল মালাকার।
বিভিন্ন সঙ্কলন গ্রন্থে প্রকাশিত হবার পর পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ হিসাবে প্রণতি প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে ‘দ্রোহকালের দিনলিপি’। শুভাংশুর বই টির পরিধি ৯ অগাস্ট থেকে ২৯ অক্টোবর- অনশন অবস্থান প্রত্যাহার পর্যন্ত। তথ্য ও বিশ্লেষণে এই সময়ের অন্যতম সেরা দলিল। নারকীয় হত্যাকাণ্ডের পরবর্তী দুদিনে সন্দীপ ঘোষের অনুচর গুন্ডা বাহিনীর সন্ত্রাস, ভয়কে জয় করে আর জি কর ও মেডিক্যাল কলেজে ছাত্র ছাত্রী ও জুনিয়র ডাক্তার দের জি বি, ১৪ অগাস্টের রাত দখল এবং রাত দখলের রাতে আর জি কর হাসপাতালে ভাংচুর, বাতিল হওয়া ডার্বি ম্যাচের দিন বিচারের দাবি লাল হলুদ সবুজ মেরুন লাল কালো এক হয়ে প্রতিবাদ এবং, স্লোগান -‘তিন প্রধানের একই স্বর / জাস্টিস ফর আর জি কর “, কলেজ স্ট্রিট থেকে ধর্মতলা পর্যন্ত বিরাট মিছিল, জুনিয়র ডাক্তারদের কর্মবিরতি, লালবাজার অভিযান, স্বাস্থ্যভবনে টানা দশ দিনের অবস্থান, অবস্থান তুলে নেবার দিনেই দুর্গত এলাকায় বন্যাত্রাণ নিয়ে পৌঁছে যাওয়া, মহালয়ার দিন কলকাতায় মহামিছিল, ধর্মতলায় অনশন অবস্থান এবং মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে মিটিং – এই ইতিহাসকে ধরা আছে শুভাংশুর আবেগময় অথচ তথ্যনিষ্ঠ দিনলিপিতে।
সৃজন ভট্টাচার্যের সম্পাদনায় এন বি এ থেকে প্রকাশিত হয়েছে ‘জাগরণের নাম তিলোত্তমা- আর জি কর আন্দোলনের ইতিবৃত্ত’। বই-এর শুরুতে আন্দোলনের প্রথম পর্বের দিনপঞ্জি এবং রাত দখলের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা আছে এই বইয়ে। ঐতিহাসিক দলিল হিসাবে দিনপঞ্জিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সমস্ত সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড এবং চক্রান্তে যেমন অনেক ফাঁক থেকে যায়, এই পৈশাচিক ধর্ষণ-হত্যা এবং প্রমাণ লোপাটের নির্লজ্জ চক্রান্ত বহু প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে যার কোন উত্তর মেলেনি, সরকারি তরফে উত্তর দেবার কোন চেষ্টাই করা হয়নি। তেমন কিছু প্রশ্ন তুলে ধরা হয়েছে ‘যে প্রশ্নগুলির উত্তর মেলেনি’ অধ্যায়ে। বই-এর দ্বিতীয় অংশ ‘মুক্ত করো ভয়’। এই অংশে মেডিকেল কাউন্সিলের দুর্নীতি এবং দুর্বৃত্তায়ন, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অবনতি, নিরাপত্তাহীনতা, থ্রেট কালচার, সিবিআই তদন্ত এবং অভয়ার মৃতদেহের ময়না তদন্ত ইত্যাদি বিষয় নিয়ে লিখেছেন বিশিষ্ট চিকিৎসকেরা – ডক্টর সুবর্ণ গোস্বামী, ডক্টর উৎপল ব্যানার্জি, ডক্টর অভিজিৎ চৌধুরী, ডক্টর অরুণ সিং, ডক্টর কুনাল সরকার, ডক্টর সুকান্ত চক্রবর্তী এবং ডক্টর তমোনাশ চৌধুরী। ডক্টর তমোনাশ চৌধুরী তাঁর লেখায় নিহত তরুণী চিকিৎসক তিলোত্তমার মা-বাবাকে সুবিচার এনে দেবার শপথ ঘোষণা করেন। পরবর্তী অংশ ‘দৃষ্টিকোণ’-এ এই ঘটনার পর বিভিন্ন রাজনীতিবিদের প্রতিক্রিয়া সংকলন করা হয়েছে। ‘যুগ সঞ্চিত শক্তি দিয়েছে সাড়া’ এই অংশে বিভিন্ন প্রতিবাদী মানুষের লেখা সংকলন করা হয়েছে। অভয়াকাণ্ডকে কেন্দ্র করে অনাবৃত দুষ্কৃতিরাজ, এই ঘটনার আগে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও দুর্বৃত্তচক্রের শিকার আনিস খান, বরুণ বিশ্বাসের মৃত্যু, অভয়াহত্যাকে কেন্দ্র করে নারী জাগরণ, রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে গণজাগরণ প্রভৃতি বিষয়ে লিখেছেন অম্বিকেশ মহাপাত্র, কণীনিকা ঘোষ, মীনাক্ষী মুখার্জি, দেবাঞ্জন দে, দীপ্সিতা ধর, কলতান দাশগুপ্ত, উর্বা চৌধুরী, প্রমীলা বিশ্বাস, সালেম খান এবং রূপসা মন্ডল। প্রতিবাদী শিক্ষিকা মোনালিসা মাইতির একটি সাক্ষাৎকার রয়েছে এই বইটিতে। গণজাগরণ থেকে উঠে আসা কিছু স্লোগান লিপিবদ্ধ করা আছে বইয়ের শেষে।
দিনলিপির আঙ্গিকে নীল মালাকার লিখেছেন ‘দ্রোহ কালের ডায়েরি’ শালিধান প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত হয়েছে। আন্দোলনকে ঘিরে যে হাজার হাজার মানুষের আবেগ উদ্বেলতা সেই মানুষেরাই নীলের লেখার প্রধান উপজীব্য। এই বইয়ের ব্লার্ব অংশে সংক্ষিপ্ত পরিচিতি বইটিকে এক অন্য ধারার সৃষ্টি হিসাবে চিহ্নিত করে- “অভয়ার জন্য পথ চলতে চলতে সঞ্চিত হয়েছে নানা ধরনের অভিজ্ঞতা প্রতিদিনের আন্দোলনের শামিল হয়েছেন হাজার হাজার সাধারণ মানুষ সেই মানুষের স্রোত নিজের জীবন সমস্যার চোরা স্রোতকে কাটিয়ে এগিয়ে এসেছেন প্রতিবাদ মিছিলে ন্যায় বিচারের দাবি জানাতে …প্রতিদিনের পথ চলা মসৃণ ভাবে মিশে যেতে চেয়েছে বহমান আন্দোলনের সঙ্গে… দেশ কালের সীমানা পেরিয়ে ব্যস্ত জীবনের কোলাহলকে সঙ্গে নিয়েই মানুষ এগিয়ে এসেছে বারবার। আবেগ আশা হতাশা চাওয়া–পাওয়ার সূক্ষ্ম সুতোয় একটা করে স্বপ্ন বুনতে চেয়েছে হৃদয়।”
রাত দখল, লাল বাজার অভিযান, স্বাস্থ্য ভবনের ধর্না মঞ্চ, ধর্মতলায় অনশন অবস্থান এবং কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মিছিলের প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন মানুষের গল্প। চরিত্রদের স্থান কাল বদলে দিয়ে বাস্তব আর কল্পনার ঠাস বুনটে এক ‘সত্যি রূপকথা’ তৈরি করেছেন নীল। এত মানুষের ভিড়ে খুঁজে নিয়েছেন বর্ধমানের আমরুল গ্রামের স্বাগতা পাগলি, পরিত্যক্ত সামগ্রী কুড়িয়ে বিক্রি করা অপ্সরা মাঝি, মেমারির নুরজাহান বেগম, গ্লাভস-পাপেটিয়ার অরুণ কুমার ঘোষ, ডোমজুড়ের বাচ্চা মেয়েটি, বেলজিয়ামের গোকেন, কলকাতার তন্ময় বসাক (যিনি অভয়া নামাঙ্কিত ব্যাজ, ব্যানার, প্রভৃতি নিজের টাকায় বানিয়ে বিনামূল্যে বিতরণ করে চলেছেন প্রাত্যহিক যাপনে অভয়াকে ভুলতে না দেবার উদ্দেশ্যে) বা ডঃ কমলেন্দু মালাকারকে, যিনি “হুইল চেয়ারের ককপিটে বসে দাবানলের আগুন মেখে রাজপথের প্রতিবাদ মিছিলে” আসেন।
এই তিনটি দিনলিপি প্রকাশিত হবার পর কেটে গেছে প্রায় একটি বছর। বাম গণতান্ত্রিক শক্তিকে পরাজিত করতে কেন্দ্র রাজ্য সেটিং আরও গভীর হয়েছে। হরেক রকম উৎসবের প্রকোপে মানুষকে ভুলিয়ে দেবার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তবু আশাহীনতাই শেষ কথা নয়।
“এই গ্রহণের অন্ধকারের চারিদিকে যে উজ্জ্বল বলয়- যে মানুষেরা এখনও রাজপথ আঁকড়ে পড়ে আছেন” (শুভাংশু পাল),ইতিহাসের সারথি হবেন তাঁরাই।।










