আমাদের মুখ্যমন্ত্রী নিদান দিয়েছেন মেয়েদের রাতে বাইরে না বেরোনোর। মেয়েরা নির্দিষ্ট সময়ের পর বাইরে বেরোবে না, এর কিছুদিন পরে উনি বলবেন মেয়েরা ওই নির্দিষ্ট দিনে নিরামিষ ভোজন করবে, নির্দিষ্ট পোশাক পরবে। তারপরে নির্দিষ্ট সময় বিয়ে করবে নির্দিষ্ট জাতিকেই বিয়ে করবে। আর অবশ্যই নির্দিষ্ট বিষয় ভাববে।
এরকমভাবে আস্তে আস্তে আমরা সেই আগের সময়ের অন্ধকার যুগে পৌঁছে যাব। যেখান থেকে বিদ্যাসাগর বা রামমোহন আমাদেরকে নতুন পৃথিবীর আলো দেখিয়েছিলেন। নতুন রাস্তায় হেঁটে ছিল মেয়েরা। আমরা আর সামনে এগোবো না, পেছনের দিকে যাবো ক্রমশ।
১৬ বিঘা বস্তি। ১৪-১৫ বছর বয়স থেকে মেয়েদের বিয়ে হয়ে যায়। হয় তারা নিজেরা বিয়ে করে নেয় কখনো বাবা-মা দিয়ে দেন। কখনো ভালো থাকার লোভে কখনো অভাবের সংসারে একটা পেট কমানোর দায়ে। ১৫-১৬ বছরে বয়সে গর্ভ নিয়ে বয়েচলা ক্লান্ত মুখগুলো দেখছি প্রায় গত চার বছর ধরে। ভাগ্য পাল্টায় না শুধু মুখগুলো পাল্টে যায়। রান্না বাটি খেলার বয়সে সত্যিকারের হাঁড়ি কুড়ির সঙ্গে সংসারে রাধুনি হয়ে ওঠে বাচ্চা মেয়েরা। মা বাবা গেছেন কাজে। গোল্লা ছুটের মাঠ আর এক্কাদোক্কার গুটির বদলে ছোট ভাইবোনের ওজন বয়ে বেড়ায় শৈশব। জলে ডোবা ১৬ বিঘার বদ্ধ পাক থেকে হাক পাক করতে করতে আমাদের এইসব মেয়েদের কৈশোর মুক্তি খোঁজে নিকা বা সিদুরের আশ্রয়ে। বিয়ের বছর ঘুরতে না ঘুরতেই সমস্ত গ্লানি বয়ে গর্ভ আসে শরীরে। ১৬ বছরের কৈশোর ফুরিয়ে যায়। জরার ভারে নুইয়ে যায় আঠারো বছরের তিন সন্তানের মা। শুধু জেগে থাকে খিদে আর একটু ভালো থাকার ইচ্ছে।
তবুও আমরা ক্যাম্প করি। সচেতনতা আওড়াই। বছরের পর বছর ধরে ছবিটা বদলে যাবে এই আশায় বারবার ছুঁতে যাই ওই বলি হওয়া শহুরে প্রাণগুলোকে। মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন অন্ধকারে মেয়েদের না বেরোনোই ভালো। আমাদের এই মেয়েরা অন্ধকারেই থাকে। স্বাধীনতা- জানা নেই, অধিকার -জানা নেই, সম্মান- জানা নেই। অন্ধকারই এদের বাস।

গত বুধবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৫ ১৬ বিঘায় হয়ে গেল মহিলাদের জন্য বিশেষ গাইনি ক্যাম্প। অভয়া মঞ্চের পক্ষে স্বাস্থ্য শিক্ষা নির্মাণ আয়োজন করে এই ক্যাম্পের।
তিনজন গর্ভবতী সহ ৩৮ জন নানান বয়সের মেয়েদের শারীরিক পরীক্ষা এবং চিকিৎসা হয়েছে ওইদিন। মূলত নানান গাইনি ও চর্ম রোগের সমস্যা নিয়ে রোগী এসেছিলেন সবচেয়ে বেশি। তার সঙ্গে নিয়মিত সুগার প্রেশার আর ব্যথার রোগীও আছে।
বস্তির ওই পরিসরে গাইনি ক্যাম্পের মতো পরিকাঠামো ছিল না। সবাই মিলে বানিয়ে নিয়েছিলাম তবু। হাসপাতাল যেতে অনীহা। কারণ মেয়েদের কৈ মাছের জান। আর মেয়ে মানুষের বা অত চিকিৎসাই বা কিসের!! তার চেয়ে বরং ঘরে প্রসব হলে টাকা সময় সবই বাঁচে।
সরকারি তরফে নাগরিকের স্বাস্থ্যের দায় ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা চলছে বহুদিন। গর্ভবতী মায়ের চিকিৎসা এবং পরিষেবা দেওয়ার হাজারো প্রতিশ্রুতির ফাঁকে উদাসীনতার গোঁজামিল। মহেশতলা বজবজ এলাকার সবচেয়ে কাছের হাসপাতাল বিদ্যাসাগর। সেখান থেকে অনেক দূর। ও আর একটা কথা ১৬ বিঘা যাওয়ার কোন পায়ে হাটা সরাসরি পথ নেই। রেললাইন পেরিয়ে তবেই যোগাযোগ করা যায় মূল রাস্তার সঙ্গে। একটা ১৬ বছরের বাচ্চা মেয়ে ভরা গর্ভ নিয়ে রেললাইন পেরিয়ে বাঁচতে যায় হাসপাতালে। কখনো ফেরে কখনো ফেরে না। তবুও আমরা ক্যাম্প করি। সচেতনতা আওড়াই। একদিন ঠিক সময়টা পাল্টে দেবো।










